জ্ঞানের কান্ডারী শিক্ষক...
জ্ঞানের কান্ডারী শিক্ষক…

দশ বছরের স্কুল জীবন শেষ করে যেদিন প্রথম কলেজে পা রাখলাম, তখন কি ভেবেছিলাম এখান নতূন এক আমার জন্ম হবে? সব শিক্ষকদের কথা আমি যেনো সিলেট উওমেনস কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দেই। বাপিকে বললাম বিশ্ববিদ্যালয় জীবন তো বাইরেই কাটাবো। এখন আমি কমলগঞ্জ কলেজে ভর্তি হই? বাপি কখনোই আমার আব্দার ফেলে দেয়নি। শমশেরনগরের থানা শহর কমলগঞ্জ কলেজে ভর্তি হলাম। কলেজ মানে স্বাধীনতা। অনেক বই নিয়ে যেতে হয়না। আটটা পিরিয়ড থাকেনা। এসব ভেবেই কি আনন্দ! যাক যেদিন ভর্তি হলাম, পরের সপ্তাহে ক্লাশ শুরু হলো। কলেজ জীবনের প্রথম ক্লাশ বাংলা। ক্লাশে গিয়ে বসলাম, একজন এলেন। বয়স অনেক কম, বুঝিনি উনি-ই শিক্ষক। কিন্তু উনি যেই ডায়াসে উঠলেন, চেয়ারে বসলেন। যে কয়েকজন এসেছিলাম ক্লাশে তখন উঠে দাঁড়ালাম। প্রথমে রোল কল করলেন। তারপর উনি দাঁড়িয়ে গেলেন। সাথে সাথে আমরাও। স্কুলের অভ্যাস কি সহজে বদলায়? স্যার বললেন, “আরে বসো, বসো। আমি বসে ক্লাশ নেয়াটা পছন্দ করিনা।” মামনিকে দেখেছি বসে ক্লাশ নিতো না। তারপর দেখলাম রায়হান স্যারকে।

পুরো কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা সেলিম স্যার বলে ডাকতো, আর আমি-ই শুধু রায়হান স্যার বলে ডাকতাম। স্যার ময়মনসিংহের মানুষ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স-মাষ্টার্স করেছেন। উনার প্রথম চাকরী আমাদের কমলগঞ্জ ডিগ্রী কলেজে। স্বাভাবিক ভাবেই স্যার সিলেটি ভাষা বুঝতেন না। তাই বেশ সমস্যায় পড়েছিলেন। যাক প্রথম দিন ক্লাশে এসে এতো সুন্দর করে বললেন যে আমার মনে গেঁথে গেলো কথাগুলো। জীবনের এক নতূন ধাপ যেমন আমাদের, ঠিক তেমনি স্যারেরও। শুধু দুটো পার্থক্য আমাদের সাথে স্যারের। প্রথমটা হলো, আমাদের উচ্চশিক্ষার যাত্রা শুরু, আর উনার শেষ। আর দ্বিতীয়, স্যারের নিয়োগ হয়েছে একজন শিক্ষক হিসেবে। আর আমাদের পরিচিতি শিক্ষার্থী। আভিধানিক অর্থে শিক্ষকের মানে হলো শিক্ষাদান করেন যিনি। কিন্তু শিক্ষা কি দান করা যায়? কারণ আমরা সকলেই আজীবন শিখেই চলি। শেখার কোনো শেষ নেই। তাই নাকি স্যার শিক্ষাদান করতে নয়, আমাদের থেকে শিখতে এসেছেন। আর উনি যা কিছু উনার শিক্ষকদের থেকে গ্রহণ করেছেন, সেসব আমাদের কাছে বলতে এসেছেন। এতো সুন্দরভাবে স্যার এ কথাগুলো বলেছিলেন আমি আজও ভুলিনি। ঠিক এভাবেই আমিও বলেছিলাম আমার ছাত্র-ছাত্রীদের, যখন কলেজে শিক্ষক হিসেবে চাকরীতে নিয়োগ পাই। ক্লাশে যে কয়জন ছিলাম আমরা চুপ করে শুনছিলাম।

তারপর আমরা বই খুলতেই স্যার জিজ্ঞাসা করলেন, ক্লাশে এমন কেউ কি আছে কবিতা-গল্প লেখে? আমাদের ক্লাশে দুজন কাইয়ূম ছিলো। একজন খাটো, হাল্কা-পাতলা তাকে ছোট কাইয়ূম বলা হতো। কাইয়ূম উঠে দাঁড়ালো, স্যার বললেন নিয়ে যেতে। আমার বন্ধু নাসিমা আমাকে খোঁচা দিয়েই যাচ্ছে, “তুই দাঁড়া।” আমি বললাম উফ নাহ! থামতো। হঠাৎ করে ও আমার খাতাটা টেনে নিয়ে দাঁড়িয়ে বললো, “স্যার নীলাঞ্জনা লেখালেখি করে।” আমি তো লজ্জ্বায় শেষ। সেদিনই বাসে আসার সময় খাতায় লিখেছিলাম,

আমি কোথায় যাবো ?
কোন বুকে শুয়ে বলবো আমি নষ্ট হয়ে গেছি পৃথিবী!
হাতের তালুতে হেমলক
তবুও ঠোঁটের কাছে এনে বলতে পারিনা
আমি আত্মহত্যা করতে চাই।
আকাশের সূর্য্যে
বিষাক্ত আলফা ভায়োলেট রে
তবুও চাইতে পারিনা
আমার চারপাশে অজস্র মানুষ–
তবুও কারো হাত ছুঁয়ে বলতে পারিনা
আমিও বাঁচতে চাই ।(নিঃসহায় , ১৯৯০ সাল)

স্যার খাতাটা রেখে দিলেন। আর বললেন, “লেখালেখি লজ্জ্বার কিছু নয়। সবাই লিখতে পারেনা। কখনো কেউ যদি জানতে চায়, মাথা উঁচু করে বলবে তুমি কবিতা লেখো। লজ্জ্বা কিসে জানো? অহঙ্কারে, মিথ্যে বলায়, ফাঁকি দেয়ায়।

ক্রমশ

হ্যামিল্টন, কানাডা
৬ আগষ্ট, ২০১৬ ইং।

**স্যারের থেকে আরোও অনেক কিছু শিখেছি, জেনেছি। সে সবই বলবো। এই একভাগে স্যারকে নিয়ে লেখা শেষ হবার নয়।

৪৮০জন ৪৮০জন
0 Shares

৩৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ