কোটা বাতিল নিয়ে দেশব্যাপী অনেক তুলকালাম হলো!
সব ধরণের কোটা বাতিল করে গতকাল পরিপত্রও জারী হলো। এতে করে মুক্তিযোদ্ধা কোটার পাশাপাশি আদিবাসী কোটা, প্রতিবন্ধী কোটাও বাতিল হলো। আর নারী কোটা না হয় এখনকার জেনারেশন দরকারই মনে করে না।

যাহোক, অনেককিছুই হয়েছে, হবে কিন্তু দেশকে মুক্তিযুদ্ধের আলোকেই এগিয়ে নিতে হবে। আর দেশকে মুক্তিযুদ্ধের আলোকে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে হলে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। আর তা করতে হলে প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের সকল অর্গান থেকে স্বাধীনতাবিরোধীদের দূরে রাখতে হবে। হবেই, নতুবা দেশটি আবারও সুযোগ পেলেই পেছনের দিকে হাটতে শুরু করবে। ধরে নিচ্ছি, মুক্তিযুদ্ধের পরে দেশটি ৪৭ বছর পার হয়ে এসেছে বলে প্রজন্ম এখন আর মুক্তিযোদ্ধা কোটা চায়না। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশ কি মুক্তিযুদ্ধের আলোকে গঠিত হয়েছে? বর্তমান প্রজন্মের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, ‘৭৫ পরবর্তী এদেশে রাজাকার পুনর্বাসন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকার কারণে প্রশাসনসহ সর্বত্র যে স্বাধীনতাবিরোধী মনোভাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো আজকের প্রজন্মের একটি অংশ তাই লালন করে চলেছে। প্রশ্ন আসতে পারে গত দশবছর তো আর স্বাধীনতাবিরোধী কেউ নিয়ন্ত্রণে নেই, তবে কেনো? এর ব্যাখ্যা একটাই, প্রজন্মটির মগজ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে কাদের মাধ্যমে?

পৃথিবীতে আগমনের পর মানবশিশুর প্রথম আদর্শ হচ্ছে জন্মদাতা পিতামাতা, তারপর শিক্ষক। তাদের কাছেই মানবশিশুর জীবনের প্রথম পাঠ ঘটে। এরপর আসে পারিপার্শ্বিকতা। তো, যারা আজকের পিতামাতা এবং শিক্ষক তারাই ‘৭৫ পরবর্তী প্রজন্ম। আর ওই ‘৭৫ পরবর্তী প্রজন্মই বর্তমান প্রজন্মের কারিগর। তাহলে কি দাঁড়ায়? সেই যে স্বাধীনতাবিরোধী বীজ বপন হয়েছিলো, আজ তা মহীরুহ।

১৯৭৫ টু ১৯৯৫ টানা বিশ বছর এদেশে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সমস্ত কার্যকলাপ তো বন্ধ ছিলোই, উপরন্তু মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রোপাগান্ডাই কার্যকর ছিলো (উদাহরণ: “হাসিনা গো হাসিনা, তোর কথায় নাচি না, তোর বাপের কথায় নাইচ্চা, দেশ দিছি বেইচ্চা” ছোটবেলা ইনোসেন্ট মনে এসব প্রোপাগান্ডামুলক বাক্য মুখেমুখে নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। বর্তমানে সেই তাঁর (হাসিনা) হাতেই দেশের মানচিত্র বর্ধিত হয়েছে)। দেশটি টানা বিশ বছর যে অন্ধকারে ডুবেছিলো প্রজন্ম ‘৯৬ পরবর্তী সময়ে আস্তে আস্তে অবাক বিস্ময়ে মুক্তিযুদ্ধের স্বর্নালী প্রজন্মকে জানতে শুরু করে। সত্যাগ্রহী প্রজন্ম নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী ‘জয়বাংলা’ স্লোগান মুখে ফিরিয়ে আনে। স্বাধীনতাবিরোধী কুলাঙ্গারদের চরিত্র উন্মোচনে ‘তুই রাজাকার’ (এর প্রথম উচ্চারণ ঘটেছিলো হুমায়ুন আহমেদের একটি নাটকে) শব্দটির প্রয়োগ ঘটিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের চিহ্নিত করে।

১৯৯৬ টু ২০১৮ বাইশটি বছরে আমরা কি দেখেছি?
প্রথম পাঁচ বছর (১৯৯৬ টু ২০০০) মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক যে মেরুকরণ ঘটেছে, এর খেসারত হিসাবেই ২০০১ সালে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রটি পুনরায় ফিরে এসে দেশব্যাপী নারকীয় তাণ্ডবলীলা বইয়ে দেয়। জাস্ট পাগলাপারা হয়ে প্রতিশোধের তাণ্ডব শুরু করেছিলো। এর জের হিসাবেই পরবর্তীতে ‘২১শে আগস্ট’, ‘বিডিআর হত্যাকাণ্ড’র মতো ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডগুলোর জন্ম। উল্লেখ না করলেই নয় যে, জাতীয়তাবাদী দলটি কখনোই নিজস্ব শক্তিতে এই দেশে নেতৃত্ব দিতে পারেনি। শুরুতে তাদের পেছনের শক্তিটি আড়ালে থাকলেও সময়ের প্রবাহে আস্তে আস্তে সেটি সামনে এসে ২০০১ সালে স্বরুপে আবির্ভূত হয়। আর যেদিন থেকে স্বরুপে প্রকাশ পায় সেদিন থেকেই জাতীয়তাবাদী দলটির জনবিচ্ছিন্নতা ঘটতে থাকে। এখন কেবলই সঙ্গে আছে দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রকাশকারী অংশটি আর ‘৭৫ পরবর্তী ভাবধারায় বেড়ে উঠা প্রজন্মটি। কিন্তু সাধারণ মানুষ, যারা সর্বাগ্রে দেশকে বুকে ধারণ করে, তারা এ দলটির স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির যাঁতাকলে পড়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তলিয়ে যাওয়া দেখে অনেকটাই হতাশাগ্রস্ত এবং ক্ষুব্ধ।

আর এ জন্যেই এখন আলোকিত দেশকে স্থিতিশীল রাখতে জাতির মনন গঠনে শক্তিশালী ভীত তৈরিতে এবং সে ভীতকে মজবুত রাখতেই প্রয়োজন স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতিরোধ। কথায় বলে, “দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিতাজ্য।” সেজন্যে তেমন কেউ যেন কেবল মেধার জোরেই সরকারী চাকরীতে আসার সুযোগ নিতে না পারে। ‘মেধাবী’ পরিচয়ের পাশাপাশি তার মুক্তিযুদ্ধের আলোকে গঠিত দেশের প্রতি আনুগত্য, জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা কতোটুকু সে বিষয়টা অবশ্যই সর্বোচ্চ বিবেচ্য হওয়া উচিত। দেশবিরোধী কেউ দেশ তথা প্রশাসন পরিচালনায় আসীন হলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর কিরকম বিকলাঙ্গ মানসিকতার জাতি পয়দা হয়, চারদিকে চোখ মেললেই তা দেখা যায়। এদের হাতে পড়লে দেশ আলো থেকে পুনরায় অন্ধকারেই নিমজ্জিত হবে।

কাজেই অবক্ষয়ের হাত থেকে জাতিকে নিষ্কৃতি পেতে হলে এবার আওয়াজ তুলুন, রাজাকার পরিবারের সকল রাষ্ট্রীয় সুবিধা বাতিল চাই। সরকারী চাকুরীতে স্বাধীনতাবিরোধী মনোভাবাপন্নদের সুযোগ প্রতিহত করা হোক।
মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়তে হলে এর গত্যন্তর নেই।

১০৩জন ১০০জন
0 Shares

৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য