রাজন্য প্রাধিকার (ম্যাগাজিন)

ছাইরাছ হেলাল ১০ মে ২০১৯, শুক্রবার, ০৩:২৫:০৪অপরাহ্ন গল্প ৪৯ মন্তব্য

 

ঝেঁপে আসেনি বৃষ্টি, জাঁকিয়ে বসেছে দাবদাহ, পা-হাত মেলে, আসন গেড়ে, ঘনঘোর বরিষায় দু’জনে হবো দু’জনার এমন ভাব-ভাবনা তাপিত হৃদয়ে উদ্বাস্তু-কথনে পর্যবসিত। ভরা বাদরে (বিদ্যাপতি) অবিরল অবিরত জলধারা হৃদয়ে প্রলম্বিত-প্রবাহে প্রবাহিত হলেও বহিরঙ্গে খা খা রোদ্দুরের মরু-শুষ্কতা, আহারে জীবন আহা জীবনের আকুল বিরহ। রাত-বৃষ্টির রিমঝিম সুর দূরের বাদ্য হয়ে বাজছে।

তক্ষশীলার ফেসবুক পেজে নক দিলাম, এই-ই প্রথম, এদের সাথে নেই কোন লেনাদেনা হয়নি এখন-ও।এখানে আগে টাকা দিয়ে বই নিতে হয়, এসব ব্যবস্থাপনা অচল, আমরা বই পাই টাকা দেই। কিন্তু এবারে নিরুপায়, ‘এবং মুশায়েরা……মার্সেল প্রুস্ত’ এই পত্রিকাটি আর কেউ বেঁচে না। জানালো, এখন নেই, তবে সামনের মাসে আসবে। অপেক্ষা সামনের কোন্‌ মাসে কী আসে!! এর পর জানতে চাইলাম ‘মুশায়েরার’ আর কী কী আছে, সেই থেকেই নিরুত্তর।

চাপা হাসির হুল্লোড় ছড়িয়ে/জড়িয়ে ম-ম সুঘ্রাণ-মাতোয়ারা হয়ে হাজির এই নিঝুম নিঃশব্দ রাত্রির শেষ প্রহরে। সাজুগুজু ডাইনি। সুখবর সুখবর বলে কত্থক নাচের তালে ঘুরছে ঘরময়, আনন্দ শঙ্কা দোলা দিচ্ছে কী না কী;

সম্পূর্ণ নূতন, নূতনের ঝলমলে রূপে দুলে ওঠা দৃষ্টি পথে মোহাবিষ্ট হতে হতে-ও হই-নি
কুহকিনী দেখেছি ঢেঁড়, ধীর পাদচারী ডাইনি রানীর মনোজ উঠনে বিচরণ রাখি-নি,
যদিও এই উঠোন দিয়েছে অনেক অনেক হিমেলাশ্রয়ী প্রশ্রয়, দাবিদার হইনি নীরব নিপুণ ঋদ্ধ আশ্রয়ের।
কুয়াশাময় সূর্যোদয়-হীন ভাবনায় ও কবিতার বিদ্যুৎস্পৃষ্ট, যদিও শব্দ ভিখারি নই/ছিলাম ও না।
শ্রান্ত ভারাক্রান্ত , ক্লান্ত টানাপোড়নেও চোখ ঝলকের ছন্দ শব্দে ফিরে আসি, চুল ছেঁড়ার দমনেচ্ছা নিয়ে হাল ছাড়ি না,
কুহক মগজের নির্ঘুম রাত কাটাকুটিতেও জেগে থাকে কিছু শব্দমালা।

কী ব্যাপার! এত্ত দিন পরে কী মনে করে! পরে না পরে না, বিশাল নজরদারী চলছে এ তল্লাটে, কিছু বুঝতে না দিয়ে, অনেক চোখ, চোখ রাখছে, কিছু টের না পাইয়ে। ভয় দেখাতে চাও!! অ্যারে না না। সু সংবাদ সু সংবাদ, সু সংবাদ আমার তা তুমি লাফাচ্ছ কেন!! বুঝতে পারবে একটু পরেই। তা এবার তোমার শ্মশান-দিনযাপনের কথা বল। আচ্ছা আচ্ছা বলছি; সেদিন দিয়ে ছিলাম একটা ব্যাটাচ্ছেলের ঘাড় মটকে, সে কী কান্না, মেড়েই ফেলতাম। তা করছিল কী সেটি তো আগে বলবে!! নাহ, তোমাকে তা বলা যাবে না। সে একটি ইয়ে ব্যাপার ছিল। তা থাকলই বা, তাই বলে মেরে দিবে একদম। তুমি হলে কাঁচা খেতে। এই এই, আমি কিন্তু ও সব খাই না। খাবে খাবে সব-ই খাবে এবার থেকে। হি হি। বল কী!! রানী-জিকে কিন্তু নালিশ দেব তোমার নামে। কিছু না হতেই নালিশ-ফালিশ শুরু হয়ে গেল। এই যে এত্ত দিন ধরে কত্ত গপশপ শ্মশান-বেড়ানো সব মুছে গেল?

ফ্রানৎস কাফকা’র অনুবাদক মাসরুর আরেফিন, এই প্রথম এই লেখককে জানলাম, যদিও এর পূর্বে তার একটি মাত্র প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থ: ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউনের গল্প (২০০১)। বইটি সে বছর প্রথম আলোর নির্বাচিত বইয়ের তালিকায় মনোনীত হয়েছিলো। পড়িনি এখনো ও।
চার খণ্ডে প্রকাশিত গল্পগুচ্ছ, আলাদা আলাদা নামে, এক অনশন শিল্পী, ধেয়ান, এক গ্রাম্য ডাক্তার, পুত্রেরা,
এক অজানা কারণে ২০১৩ এর বই মেলায় দেখা মাত্র পছন্দ হয়ে গেল, অবশ্যই বোকার মত, কিছুই না জেনে কিনে ফেললাম। আরও অবাক, এই চার খণ্ড আবার এক খণ্ডে ও আছে, সেটিও কিনলাম। নাহ্‌ কোন বিজ্ঞাপন না, যা হয়েছে তাই-ই বলা। পড়ি আর পড়ি, কী পড়ি কী বুঝি জানি না, কেন পড়ি তাও জানি না। এক্ষণ-ও পড়ি।

“অনুবাদ-অযোগ্য কাফকা, মাসরুর আরেফিন,
ফ্রানৎস কাফকা অনুবাদ কোনো দিনই সহজ না। নিচের এই বিখ্যাত কাফকা-প্রবচনটার কথাই ধরা যাক। কাফকা বলছেন: ‘আপনি নিজেকে এ পৃথিবীর জ্বালা-যন্ত্রণা থেকে প্রত্যাহার করে নিতে পারেন, সেই সম্ভাবনা আপনার জন্য খোলা আছে এবং তা আপনার মানব-স্বভাবের সঙ্গে যায়ও, কিন্তু সম্ভবত এই প্রত্যাহার করে নেওয়াটাই একমাত্র জ্বালা-যন্ত্রণা, যা আপনি এড়াতে পারতেন।’ এটাই এই প্রবচনের আক্ষরিক অনুবাদ, যেহেতু আমি মোট পাঁচটা ইংরেজি অনুবাদ দেখে নিয়ে তারপর এটার মূল জার্মান শব্দগুলো বুঝে মোটামুটি এ সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছি যে এটাই আক্ষরিক।”

ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে গল গল করে চোখে মুখে কথা বলছিল ডাইনিটি, বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হওয়ার মত করে দূরে ছিটকে পড়ল ভয়ার্ত চোখে। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে থাকলাম। কিছুই বলতে চায় না। অনেক পরে বলল, ডাইনী রানী নিজে সব কিছু লক্ষ্য রাখছিল এতক্ষণ, এই ঘনিষ্ঠতা তাঁর পছন্দ নয়।

যদিও ক্ষীনাঙ্গি নয় শরীরী সীমায়
গহন-দুপুর আর নিশীথ অন্ধকার,
গোধূলির রঙিন মুহূর্তে নিঃস্পৃহতার চোখ
মেলে-বুজে থাকা;
জরি ঝলসানো রোদ, তেজি দুপুরের দুরন্তপনা
স্মৃতিচারী ছায়া-ম্লান বিকেল,ঝড় ভরপুর তারুণ্য উদ্দাম
আলগোছে সাজানো অগোছালো এই যে
আপনাপনতার স্বভাবী প্রশ্রয়ে বর্ণনা নিপুণ
মিলনোন্মুখ উদ্দাম-উচ্ছ্বসিত প্রেমিকার মত;

কবিতা নিপুণ কবিতা, হয়নি লেখা
যুগপৎ আনন্দ-নির্জনতা আর উল্লসিত উল্লসিতা;

ক্ষুণ্ণ নিটোল নির্জনতায় উপচানো পৌনঃপুনিকতায়
দৃষ্টি সখ্যতা গড়ে উঠেনি, পরম সহিষ্ণু অনড় ধৈর্যশীল
স্থানচ্যুতির প্রগলভতা-হীন নাবিকের সাহসী নোঙরে
মায়াবতীর মায়াবী কোন এক নির্জনতার শূন্য দ্বীপে।

ভোজবাজির মত সাজুগুজু ডাইনি একটি প্যাকেট মত জিনিষ বের করে সামনে রাখল। এমন প্যাকেট বা পুটুলি দেখলে ভয়ে মরি, এরা এমন করে কিছু খাবার রাখে, মনে হলে বের করে চেটে বা কড়মড় করে খায়, কুট্টি শিশুর মাথার খুলিতে ফুচকা, বা কিছু আচার বা কিছু হাড়গোড়। ভাগ্যিস আমাকে ঠেসে ধরে খাইয়ে দেয় না!! অভয় দিয়ে জানাল, এবারে অন্য কিছু!!

পরে ২০১৫ তে হোমারের ইলিয়াড অনুবাদ বের হয়, পড়ে ভাল লেগেছে, আগে পড়া ইলিয়াড থেকে।

ডাইনী রানীর পক্ষ থেকে আমাকে পাঠান হয়েছে। ইশারা করায় খুলে ফেললাম ভয়ে ভয়ে। একয় সবুজ পাতা জাতীয় কিছু একটা, তার উপর সাঙ্কেতিক ভাষায় কী যেন লেখা, আর একটি প্লাস্টিকের কৌটা ভিতর কী বুঝছি না। তবে তা ইংরেজিতে লেখা না, তাদের নিজেদের কোন ভাষা। পড়ে আমাকে বুঝিয়ে দিতে বললাম। আবার শুরু হলো হাসি, হাসি। বোকা বোকা লাগছে, তাও অপেক্ষা করি অনুবাদের। যা জানা গেল তা হলও ডাইনী রানী-জি তাঁর প্রাসাদে অবাধ যাতায়াতের অনুমতি দিয়েছেন, আর খুব তাড়াতাড়ি একটি রাজকীয় ডাইনি ভোজের তারিখ জানিয়ে দেবেন।

এবারের মেলায় ঢাউস উপন্যাস আগস্ট আবছায়া বের হওয়ার সাথে সাথে কিনে পড়ি, পড়ছি, এ যাবত এই বইটি নিয়ে ভাল/মন্দ যা আলোচনা আসছে, বলা যায় সব পড়েছি, লেখকের বেশ কটি সাক্ষাৎকার সহ। রিভিউ করার সক্ষমতা রাখি না, পুরো আমিময় একটি উপন্যাস, ১৫ আগস্টে জাতির পিতার হত্যাকাণ্ড লেখক মেনে নিতে পারেন-নি, অবশ্য সে অনুসন্ধান এখানে উপজীব্য নয়। এই উপন্যাসে ফরসি উপন্যাসিক প্রুস্ত এসেছে প্রবল ভাবে। সম্ভবত মাত্র বারো লাখ চল্লিশ হাজার শব্দের সাত খণ্ডের এই বিপুল উপন্যাস ‘আ লারেচার্চে দু তেম্পস পারদু’ (ইংরেজিতে ‘ইন সার্চ অবলস্ট টাইম’), সাত খণ্ডে প্রকাশিত তিন হাজার ২০০ পৃষ্ঠার এ উপন্যাস প্রকাশ করতে লাগে ১৪ বছর—১৯১৩ থেকে১৯২৭ সাল পর্যন্ত। অবশ্য মডার্ন লাইব্রেরির ইংরেজি অনুবাদে উপন্যাসটির অবয়ব আরও বড় হয়েছে—চার হাজার ৩০০ পৃষ্ঠা। এ উপন্যাসে আছে দুই হাজার চরিত্র। আমার জানা মতে এর বাংলা অনুবাদ হয়নি, ইংরেজিটা এখানেই পাওয়া যায়, ভাষা অজ্ঞতার জন্য সে পথে হাঁটছি না। অবশ্য এক জনের সংগ্রহ ছবি দেখে হায়-আফসোস করি।

আসলে বুঝতে পারছিলাম না, কী হতে যাচ্ছে, জানতে চাইলে সে কিচ্ছু ই বলতে চাইল না, তবে সব সে জানে এমন-ও না। রানীর কাছাকাছি তাদের যাওয়ার হুকুম নেই। অনেক ধরাধরি করে যা জানলাম তা হল রানিজি নূতন এক ডাইনী এনেছেন, থাকে তার সাথে সাথেই , শুনেছি এই ডাইনি নাকি কবি!! এবারে সত্যি সত্যি ভয় পেয়েছি। পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে। ভয় চেপে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এই! ডাইনিদের প্রেম হয়!!

এই আমিময় উপন্যাস লিখে লেখক যে পারিবারিক হ্যাপায় ভুগছেন তা লক্ষ্য করুন।
“মাসরুর বলেন…… আমার ওয়াইফ আমাকে জিজ্ঞেস করে কে এই মেহেরনাজ? কারণ এত বিশ্বস্ত ভাবে বলা, এমনকি কোন চরিত্র এখন কে কোথায় তাও বলা। তো, কে এই সুরভি ছেত্রী?”
আর একটি জায়গায় খুঁজে পেলাম, সম্ভবত এরকম, তার স্ত্রীকে বোঝাতে গিয়ে যা করতে হয়েছে তা নিয়েও একটি উপন্যাস লেখা যেতেই পারে। হায়, বড় মানুষদের আমিময়তা-ও অনেক দামে কিনতে হয়।

“মাসরুর আরেফিন বলেন……… প্রুস্তের সঙ্গে (তার গদ্যের ও প্রকৃতি বর্ণনার সঙ্গে) কী যে মিল পাবেন জীবনানন্দের! Swann‘s Way-র “কুমব্রে” অনু-উপন্যাসটা পুরোই আমার বরিশাল।”

হাসি না কান্না তা বুজতে পারলাম না, শুধু বলল, তোমাদের মত প্রেম আমাদের নেই।

রম্ভোরু মেলে মিথুন বিলাস! কাম কলার কেলি-উল্লাস!!
নেই সেখানে লম্পট সুখের রতি-বিলাপ!
দেহাতীত ক্রন্দন মিলে মিশে থাকে, শ্মশান নিঃশ্বাসে।

আর এ তোমরা বুঝবেও না। হঠাৎ চঞ্চলতা দেখা দিল, জানাল এখুনি শ্মশানে যেতে হবে কাজ আছে। আমিও সাথে যেতে চাইলাম, অনেকদিন শ্মশানে যাই না। রাজি হলো না, এখন থেকে অনুমতি ছাড়া সাথে নিতে পারব না। মন খারাপ হলো আমার-ও, কত গল্প কত হাসি এই শ্মশানে!! নিচু চোখে গা-ঘেঁসে একটু দাঁড়ানোর অনুমতি চাইলে আমি বলে উঠি স্ব-উল্লাসে; আজিব তো!!

স্বগতোক্তিতে একটি শব্দ-ই বেড়িয়ে আসে………কাফকায়েস্ক!!

আকাশী আলোর ঝালর
কবিতার ঐশ্বর্য হয়ে ফিরে আসে না,
দূর-ভাসা গন্ধ-ফুলের স্রোতে;
স্বপ্ন-চেরা-চোখ
ঝলমল-প্রাণ-হাতছানিতে
আয়না হয়ে হাসে না,
চোখ-ঠারে শুধুই হাসে প্রশ্রয়ের
অনাবিল হাসি।

৯১৮জন ৬২২জন
31 Shares

৪৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ