রমিজ পাগলা

হালিম নজরুল ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২০, মঙ্গলবার, ০৯:৫০:২৯পূর্বাহ্ন ছোটগল্প ২০ মন্তব্য

রমিজ পাগলা

বেশকিছু দিন হয়ে গেল স্কুলে আসে না রমিজ। আগে কখনো এভাবে অনুপস্থিত থাকেনি সে। এবার রোজা, ঈদ, ও দুর্গাপূজা পর পর হওয়ায় স্কুলে লম্বা ছুটি ছিল।তাই এই দীর্ঘ সময়ে কেউ কারো খোঁজও নিতে পারেনি।রমিজ কখনো স্কুল ফাঁকি দেয় না। একবার যখন ওর জলবসন্ত হয়েছিল তখন শুধু কয়েকদিন স্কুলে আসতে পারেনি। কিন্তু তার পর থেকে আজ অবধি আর কখনো অনুপস্থিত ছিল না। তাই সহপাঠী ও শিক্ষকরা অবাক না হয়ে পারলো না। ক্লাসের সেরা ছাত্র হলেও মাঝেমধ্যে সে হাস্যকর কিছু কাজ করে বসে। এতে অবশ্য সহপাঠীরা খুব মজাও পায়।

বরাবরের মত ছুটি হবার আগেরদিনও একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। ওদের স্কুলে সেদিন শিক্ষা অফিসার আসবার কথা। শিক্ষকদের নির্দেশে সবাই ভাল ভাল পোশাক পরে স্কুলে এসেছে। প্রতিদিনের মত সেদিনও জাতীয় পতাকা উত্তোলন হলো। এবার জাতীয় সংগীত গাওয়ার পালা। জাতীয় সংগীত শুরু হবার পূর্বমুহূর্তে শিক্ষা অফিসার এসে পৌঁছালেন। যথারীতি জাতীয় সংগীত গাওয়া হলো। এবার প্রধান শিক্ষক দুই একটি কথা বলে শিক্ষা অফিসারকে বক্তৃতার আহবান জানালেন। হঠাৎ রমিজ লাইন থেকে দৌঁড়ে শিক্ষা অফিসারের ডানদিকে থেকে কিছু একটা উঠিয়ে ভোঁ-দৌড়।

সবাই ওর দৌড় দেখে হো হো করে হেসে উঠলো। কিন্তু প্রধান শিক্ষক রাগে কটমট করছেন। ওদিকে রমিজ আবার দৌড়াতে দৌড়াতে ফিরে এলো। নিজের লাইনে আগের জায়গায় দাঁড়াতেই হেডমাস্টার চোখ রাঙা করে ওকে সামনে ডেকে নিল। সামনে গিয়ে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই আবারও ঝপাৎ করে এক লাফ দিয়ে শিক্ষা অফিসারের বামপাশে পড়লো। তারপর আবার কি যেন একটা হাতের মধ্যে নিয়েই আবার ভোঁ দৌড়। আবারও চারদিকে হাসির রোল পড়ে গেল।

সবাই হো হো করে হেসেই যাচ্ছে। আর ওদিকে প্রধান শিক্ষক রাগে ফুঁসছে। শিক্ষা অফিসার এমন আজব কর্মকান্ড দেখে হতভম্ব হয়ে গেলেন। তিনি কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না। ওদিকে রমিজ আবার হাপাতে হাপাতে দৌড়ে ফিরে এল।

প্রধান শিক্ষক ততক্ষণঅণে ছটফট করছেন। রাগে তার মুখ থেকে কোন কথাও বেরুচ্ছে না। শিক্ষা অফিসার রমিজকে বললেন ” এই ছেলে তুমি এমন বেয়াদবী করলে কেন?”
রমিজ কোনরকম বিচলিত না হয়ে বললো “কই স্যার, আমি তো কোন বেয়াদবী করিনি।”

রমিজের ঔদ্ধত্য দেখে প্রধান শিক্ষক আরও ক্ষেপে গেলেন।
–“হারামজাদা, আবার তর্ক করছিস”
বলেই রমিজের গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন। অফিসার বললেন–
–“হেডমাষ্টার সাহেব, আপনার স্কুলে এমন বেয়াদব ছেলেকে জায়গা দেন কেন?”
রমিজ কিছু একটা বলতে চাইলো। কিন্তু প্রধান শিক্ষক তাকে কোনরকম সুযোগ দিল না। রমিজকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বললো–
“যা শয়তান, তোকে যেন আর এই স্কুলে না দেখি।”

রমিজ কাঁদতে কাঁদতে বই খাতা নিয়ে স্কুল বেরিয়ে গেল। পরদিন থেকেই স্কুলে দেড় মাসের ছুটি। গত কয়েকদিন হলো স্কুল খুলেছে। কিন্তু রমিজের দেখা নেই। তাই নানা রকম কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে। কেউ কেউ বলছে ওইদিন হেডস্যারের কথায় কষ্ট পেয়েই আর আসে না রমিজ। কেউ কেউ বলছে স্কুলের বেতন দিতে পারছেনা বলেই আসেনা সে। তবে যে কারণেই না আসুক, প্রধান শিক্ষকের মনটা খারাপ হয়ে গেল। কেননা আর যাই হোক রমিজ স্কুলের সেরা ছাত্র। তার মত ছাত্র স্কুলে থাকার দরকার আছে। তাই তিনি অন্যান্যদের সাথে আলাপ করে রমিজদের বাড়ি যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন।

পরদিন প্রধান শিক্ষক একজন সহকারী শিক্ষককে সাথে নিয়ে চণ্ডীপুর গ্রামের দিকে রওনা হলেন। মাইল তিনেক দূরের গ্রামটিতে যেতে হলে প্রথমে কিছুটা হাঁটতে হয়। তারপর বাকী পথটুকু বাসেই যাওয়া যায়। বাসে উঠেই শিক্ষকের ছোখ ছানাবড়া! বাসের হাতল ধরে যে ছেলেটি চিৎকার করে যাত্রী ডাকছে সেই তো রমিজ! গায়ে একটা ছেড়াকাটা ময়লা জামা। চুলগুলো উস্কোখুস্কো। অথচ ওর কি সুন্দর চেহারা! আহা রে যে ছেলেটির এখন স্কুলে থাকবার কথা, সে কি না বাসের হেলপারি করছে! কষ্টে তার বুকের ভেতর মুষড়ে উঠলো। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে রমিজকে কাছে ডাকলেন। তারপর বললেন—
–“এ কি রমিজ তুমি লেখাপড়া বাদ দিয়ে বাসের হেলপারি করছো! আমি না হয় তোমাকে সেদিন দুটো কড়া কথা বলেছি, তাই বলে তুমি স্কুল বন্ধ করে দেবে!”
রমিজ বললো—
–“না স্যার, আমি ওই জন্য স্কুল যাওয়া বন্ধ করিনি।”
–তাহলে তুমি স্কুলে যাও না কেন?
–সে অনেক কথা স্যার। আমার আর কখনোই স্কুলে যাওয়া হবে না স্যার। আপনারা হয়তো জানেন ঈদের দুদিন আগে চণ্ডীপুর ব্রীজের ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা হয়েছে। ঐ দিন শত শত মানুষ আহত ও পঙ্গু হয়েছিল। আর যে দুই শতাধকি লোক মারা গিয়েছিল, তার মধ্যে আমার মা- বাবাও ছিল স্যার। আপনি তো জানেন স্যার, বাবা-মা ছাড়া এই দুনিয়াতে আমার আর কেউ ছিল না। তাই বাবা-মা মারা যাবার পর আর আমার স্কুলে যাওয়া হয়নি। আমারও খুব ইচ্ছে ছিল আমিও একজন প্রকৃত মানুষের মত মানুষ হবো। কিন্তু পারলাম না স্যার। উনারা মারা যাবার পর আমার কাছে কোন টাকা পয়সাও ছিল না। তাই রাস্তায় কদিন খোয়া ভাঙার কাজ করেছিলাম। কিন্তু আমি ছোট মানুষ বলে আমাকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিত না। একদিন পয়সা বাড়িয়ে দেবার কথা বলেছিলাম। তাই আমাকে কাজ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তারপর এই বাসের হাতল ধরেছি স্যার।

রমিজের কথা শুনে প্রধান শিক্ষক খুবই মর্মাহত হলেন। সেদিনের জন্য তিনি নিজেকে খুব অপরাধী মনে করতে লাগলেন। তিনি বললেন,
–” রমিজ, সেদিন তোমার সাথে আমার ওরকম আচরণের জন্য আমি দুঃখিত। অবশ্য তুমি শিক্ষা অফিসারের সামনে অমন পাগলামী না করলেও পারতে। তোমার পাগলামীর জন্যই আমার মাথা ভীষণ গরম হয়ে গিয়েছিল।” রমিজ কাঁদতে কাঁদতে বললো–
–“স্যার, আমি কিন্তু আসলে কোন পাগালামী করিনি। আপনিই আমাদেরকে শিখিয়িছেলেন জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় যে যেখানে থাকবে, সেখানেই সোজা দাঁড়িয়ে দুইহাত মুষ্টিবদ্ধ রেখে জাতীয় সংগীত গাইতে হবে। অথচ আমি খেয়াল করলাম শিক্ষা অফিসার স্যার এসে জাতীয় সংগীত শুরু হবার পর পকেট থেকে বের করে সিগারেট ধরালেন। তারপর জাতীয় সংগীত শেষে সিগারেটটা ফেলে দিলেন। তার ফেলে দেয়া আগুনটা যাতে কোন ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য ওটা কুড়িয়ে দৌঁড়ে আমি ডাষ্টবিনে ফেলে দিয়ে আসলাম। তাতে জায়গাটাও পরিষ্কার হলো। আবার আপনি যখন রাগ করে আমাকে সামনে ডাকলেন, তখন দেখি উনি একটা কলা খেয়ে বামপাশে খোসাটি ফেলে দিলেন। আমি আবার দৌঁড়ে গিয়ে সেটা ডাষ্টবিনে ফেলে আসলাম। জানেন স্যার, আমার মামা একবার কলার খোসায় পা পিছলে পড়ে মাথা ফেটে গিয়েছিল।”

রমিজের কথা শুনে প্রধান শিক্ষক হতভম্ব হয়ে গেলেন। এত অল্প বয়সে এই ছেলেটা এত জ্ঞান রাখে! তিনি বললেন—-
–” রমিজ তুমি খুব মেধাবী ছাত্র। তুমি অনেক বড় হবে। আমি চাই তুমি আবার লেখাপড়া করবে।”
রমিজ বললো–
–“সেটা কি আর সম্ভব স্যার!”
–“হ্যাঁ, সম্ভব রমিজ, কালই তুমি স্কুলে এসো।”

পরদিন রমিজ আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করলো। সে মাঝেমধ্যেই কিছু পাগলামী করে। অন্যরা এতে আনন্দ পায়, মজা করে। কিন্তু তার এই পাগলামী দেখে কেউ কেউ তাকে রমিজ পাগলা বলে ডাকে। তবে শিক্ষকরা ঠিকই বুঝতে পারে রমিজের পাগলামির মধ্যে অনেক শিক্ষনীয় বিষয় আছে।

মাসখানেক হয়ে গেছে আবার স্কুলে আসছে রমিজ। কিন্তু আজ হঠাৎই আবার অনুপস্থিত। বিষয়টি প্রধান শিক্ষকের চোখ এড়ালো না। তিনি ভাবলেন নিশ্চয়ই রমিজের কিছু একটা হয়েছে। তাই তিনি রমিজের বাড়ি যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। সাইকেল নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়লেন তিনি।

চণ্ডিপুর গ্রামে ঢুকতেই রাস্তায় শত শত লোকের ভীড়। সবার মুখে মুখে রমিজ পাগলার নাম। সে বিশাল একটা কাজ করে ফেলেছে। তাই শহর থেকে মন্ত্রী, এমপি, ডিসি, এসপি, সাংবাদিকসহ বহু লোক দেখতে এসেছে তাকে। প্রধান শিক্ষক প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরে রমিজের কৃতিত্বের কথা জানতে পারলেন। একটা ভয়াবহ ট্রেন দুঘর্টনা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে রমিজ।
মন্ত্রী, এমপি, ডিসি, এসপি, সাংবাদিকরা সব ঘিরে ধরেছে রমিজকে। সকলের প্রশ্ন কিভাবে সে এমন মহৎ কাজটি করে ফেললো?

রমিজ ট্রেনটিকে কিভাবে দুর্ঘটনা থেকে বাঁচালো তার বর্ণনা দিয়ে চলেছে। গতকাল আছরের নামাজ শেষে সে কবরস্থানে গিয়েছিল বাবা-মা’র কবর জিয়ারত করতে। হঠাৎ খেয়াল করলো পাশের বাগানে কিছু লোক শলা- পরামর্শ করছে। যদিও সন্ধ্যা নেমে আসছে, কিছুটা কৌতুহলবশত সে একটা ঝোপের পাশে বসে পড়লো।
তাদের আলাপ আলোচনা শুনে বুঝতে পারলো তারা আসলে একদল ডাকাত। কিছুক্ষণ পরই যে ট্রেনটি আসবে সেটিতে ডাকাতির প্রস্ততি নিচ্ছে। ব্রীজের ওখানে রেললাইন কেটে রেখেছে তারা। ওখানে আসামাত্রই ট্রেনটি দুর্ঘটনায় পড়বে। আর সেই সুযোগে যাত্রীদের সবকিছু নিয়ে পালাবে তারা।

ডাকাতদের পরিকল্পনা জানতে পেরে সে লুকিয়ে এক দৌড়ে চলে গেল মদন মাঝির দোকানে। অনেক অনুনয় বিনয় করে মদন মাঝির কাছ থেকে মোবাইলটি নিয়ে সে পুলিশের কাছে ফোন করলো। আগে থেকেই সে জানতো ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে গোপণ খবর জানানো যায়। ফোনে দ্রুত কথা শেষ করেই সে আবার মাঠের দিকে দৌড় দিল।

দৌড়াতে দৌড়াতে প্রায় রেললাইনের কাছাকাছি এসে পড়েছে রমিজ। এমন সময় দেখলো ট্রেনটা চণ্ডীপুরের দিকে এগিয়ে আসছে। কিন্তু এখন উপায়? হঠাৎ খেয়াল হলো তার গায়ে লাল রঙের জামা আছে। ট্রেনের ড্রাইভার লাল কাপড় দেখলে ট্রেন থামিয়ে দেয়। ততক্ষণাৎ সে লাল জামাটিকে একটা পাটকাঠির মাথায় আটকিয়ে উঁচু করে নাড়াতে লাগলো। ট্রেনটি রমিজের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে পড়লো। ওদিকে ততক্ষণে একদল পুলিশ এসে হাজির। তারা চণ্ডীপুর ব্রীজের আশপাশ এলাকা ঘিরে ফেললো এবং ডাকাত দলকে পাকড়াও করলো।

আজ সবাই রমিজকে বাহবা দিচ্ছে। কিন্তু রমিজের দুই চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে এলো। সে বুঝতে পারলো আগেরবার এখানে এমনি এক ট্রেন দুর্ঘটনায় তার মা-বাবাসহ বহু লোক নিহত হয়েছিল।

১৯৫জন ৬৪জন
4 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য