বিজয়ের মাস চলছে । লাল সবুজের এই পতাকার জন্য ১৯৭১ সনে এক সাগর রক্ত দিতে হয়েছিল আমাদের। শুধু মাত্র দেশ মাতাকে মুক্ত করার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেছিল এই দেশের দামাল ছেলেরা। বাবা মা ভাই বোন স্ত্রীর ভালোবাসার টানকে উপেক্ষা করে ঝাঁপিয়ে পরেছিল যুদ্ধে।রণাঙ্গন থেকে মুক্তিযোদ্ধারা চিঠি দিয়েছেন তাঁদের প্রিয় জনকে। চিঠিতে যুদ্ধের অবস্থা , মুক্তিযোদ্ধাদের দেশের প্রতি ভালবাসা স্পর্শ করে যায় আমাদের ।

মুক্তিযোদ্ধাদের এমন চিঠি প্রকাশ করেছে প্রথম আলোর প্রকাশনী প্রথমা । সুন্দর এই ঐতিহাসিক বইটির মুল্য ৩০০ টাকা।

তারিখ : ১৬/০৪/৭১
প্রিয় ফজিলা,
জানি না কী অবস্থায় আছ। আমরা তো মরণের সঙ্গে যুদ্ধ করে এ পর্যন্ত জীবন হাতে নিয়ে বেঁচে আছি। এর পরে থাকতে পারব কি না বুঝতে পারছি না। সেলিমদের বিদায় দিয়ে আজ পর্যন্ত অশান্তির মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। আবার মনে হয় তারা যদি আর একটা দিন আমাদের এখানে থাকত তাহলে তাদের নিয়ে আমি কী করতাম। সত্যিই ফজিলা, রবিবার ১১ এপ্রিলে কথা মনে হলে আজও ভয় হয়। রাইফেল, কামান, মেশিনগান, বোমা, রকেট বোমার কী আওয়াজ আর ঘরবাড়ির আগুনের আলো দেখলে ভয় হয়। সুফিয়ার বাড়ির ওখানে ৪২ জন মরেছে। সুফিয়ার আব্বার হাতে গুলি লেগেছিল। অবশ্য তিনি বেঁচে আছেন। সুফিয়াদের বাড়ি এবং বাড়ির সব জিনিস পুড়ে গেছে। আমাদের বাড়িতে তিন-চার দিন শোয়ার মতো জায়গা পাইনি। রাহেলাদের বাড়ির সবাই, ওদের গ্রামের আরও ১৫-১৬ জন, সুফিয়ার বাড়ির পাশের বাড়ির চারজন, দুলালের বাড়ির সকলে, দুলালের ফুফুজামাই দীঘির কয়েকজন এসে বাড়িতে উঠল। তাই বলি, সেই দিন যদি আব্বা এবং সেলিমরা থাকত তাহলে কী অবস্থা হোত। এদিকে আমরাও আবার পায়খানার কাছে জঙ্গলে আশ্রয় নিলাম। কী যে ব্যাপার, থাকলে বুঝতে। বর্তমানে যে পরিস্থিতি তা আর বলার নয়, রাস্তার ধারের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই। রোজ গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি ছাড়াও যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। দুই- এক দিন পর আধা মরা অবস্থায় রাস্তার ধারে ফেলে দিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেক দিন এসব ঘটনা। বাড়িতে আগুন আর গুলি করে মানুষ মারার তো কথাই নেই। তা ছাড়া লুটতরাজ, চুরি, ডাকাতি সব সময় হচ্ছে। কয়েক দিন বৃষ্টির জন্য রাস্তাঘাটে কাদা হওয়ায় আমরা বেঁচে আছি। রাস্তাঘাট শুকনা থাকলে হয়তো আমাদের এদিকেও আসত। জানি না ভবিষ্যতে কী হবে। তবে ওরা শিক্ষিত এবং হিন্দুদের আর রাখবে না বলে বিশ্বাস। হিন্দু এবং ছাত্রদের সামনে পেলে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করছে। গত রাতে পাশের গ্রামে এক বাড়িতে ডাকাতরা এসে সেই বাড়ির মানুষদের যা মেরেছে তা আর বলার নয়। কখন যে কী হয় বলার নেই। তবু খোদা ভরসা করে বেঁচে আছি। আমাদের এদিকের ছেলেরা প্রায় সবাই বাড়ি ছেড়ে দূরে থাকে। কারণ বাড়িতে থাকা এ সময় মোটেই নিরাপদ নয়। তোমাদের দেখার জন্য চৌবাড়ি যাওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি। দুঃখের বিষয়, একটি দিনও বৃষ্টি থামেনি। অবশ্য বৃষ্টি না থামার জন্য আমাদের একটু সুবিধাই হয়েছে। তোমাদের সংবাদ জানানোর মতো কোনো পথও নেই। কীভাবে যে সংবাদ পাব ভেবে পাই না। মিঠু বোধ হয় এখন হাঁটতে শিখেছে তাই না? মিঠুকে দেখতে খুব ইচ্ছা করছে।কিন্তু পথ নেই। সান্ত্বনা এইটুকুই যে বেঁচে থাকলে একদিন দেখা হবে। কিন্তু বাঁচাটাই সমস্যা। রাতে ঘুম নেই, দিনে পালিয়ে বেড়াই। মা- বাবা তো প্রায়ই আমার জন্য কাঁদে। যাক, দোয়া করো যেন ভালো থাকতে পারি। বুবুদের যে কী অবস্থায় পাঠিয়েছি, তা মনে হলে দুঃখ লাগে। আমি সঙ্গে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সম্ভব হয়নি। অবশ্য সেদিন না পাঠালে তাদের নিয়ে দারুণ মুশকিলে পড়তে হোত। রবিবার দিন বাবলুর আম্মা মেরীগাছা এসেছিল। বাবলুরা ভালো আছে। তোমাদের সংবাদটা জানাতে পারলে জানাবে। আমার মানসিক এবং শারীরিক অবস্থা ভীষণ খারাপ। বুবু, আম্মা, দুলাভাইকে আমার সালাম এবং সেলিমদের ও মিনাদের আমার স্নেহ দেবে। সম্ভব হলে তোমাদের সংবাদটা জানাবে। আমরা তো মরেও কোন রকমে বেঁচে আছি। শেষ পর্যন্ত কী হবে জানি না।

ইতি
আজিজ

চিঠি লেখক: শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আজিজ।

চিঠি প্রাপক: স্ত্রী ফজিলা আজিজ।

চিঠিটি পাঠিয়েছেন: মো: ফারুক জাহাঙ্গীর, গ্রাম: কুজাইল, নাটোর।

ফারুক জাহাঙ্গীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আজিজের পুত্র।

 

১৮/৪/৭১
মা,

আপনি এবং বাসার সবাইকে সালাম জানিয়ে বলছি, দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে আমি ঘরে বসে থাকতে পারি না। তাই ঢাকার আরও ২০ টা যুবকের সাথে আমিও পথ ধরেছি ওপার বাংলায়। মা, তুমি কেঁদো না, দেশের জন্য এটা খুব ন্যূনতম চেষ্টা। মা, তুমি এ দেশ স্বাধীনের জন্য দোয়া করো। চিন্তা করো না, আমি ইনশাল্লাহ বেঁচে আসব। আমি ৭ দিনের মধ্যেই ফিরে আসতে পারি কি বেশিও লাগতে পারে। তোমার চরণ মা, করিব স্মরণ। আগামীতে সবার কুশল কামনা করে খোদা হাফেজ জানাচ্ছি।
তোমারই বাকী (সাজু)

চিঠি লেখক: শহীদ আবদুল্লাহ হিল বাকী (সাজু), বীর প্রতীক।

পিতা: এম এ বারী।

চিঠি প্রাপক: মা আমেনা বারী, ২০৩/সি বাকী ভবন, খিলগাঁও, ঢাকা।

চিঠিটি পাঠিয়েছেন: মনজুর-উর রহমান ও নাজা রাসকিন।

 

২৩/৪/৭১
মা,
দোয়া করো। তোমার ছেলে আজ তোমার সন্তানদের রক্তের প্রতিশোধ নিতে চলেছে। বর্বর পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠী আজ তোমার সন্তানদের ওপর নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। যেখানে তোমার সন্তানদের ইজ্জতের ওপর আঘাত করেছে, সেখানে তো আর তোমার সন্তানরা চুপ করে বসে থাকতে পারে না। তাই আজ তোমার হাজার হাজার বীর সন্তান বাঁচার দাবি নিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করবার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে।’ তোমার নগন্য ছেলে তাদের মধ্যে একজন।’ পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে দু’ হাত তুলে দোয়া করি তোমার সন্তানরা যেন বর্বর পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠীকে কতল করে এ দেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করতে পারে। ‘এ দেশের নাম হবে বাংলাদেশ’, সোনার বাংলাদেশ। এ দেশের জন্য তোমার কত বীর সন্তান শহীদ হয়ে গিয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। ইনশাল্লাহ্‌ শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না। দেশকে স্বাধীন করে ছাড়বই। জয় আমাদের সুনিশ্চিত। দোয়া করো যেন জয়ের গৌরব নিয়ে ফিরে আসতে পারি, নচেৎ- বিদায়।
ইতি
তোমার হতভাগ্য ছেলে খোরশেদ

চিঠি লেখক: মো. খোরশেদ আলম। মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর ২, বর্তমান ঠিকানা : ১-ই-৭/৪ মিরপুর, ঢাকা ১২১৬।

চিঠি প্রাপক : মা রাহেলা খাতুন।

চিঠিটি পাঠিয়েছেন : লেখক নিজেই।
 

৬.৫.৭১
প্রিয় মোয়াজ্জেম সাহেব,
তসলিম। আশাকরি খোদার রহমতে কুশলে আছেন। কোনোমতে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে (মুরগি যেমন তার ছানাগুলো ডানার তলে রাখে) বেঁচে আছি। পত্রবাহক আপনার পূর্বে দেওয়া আশ্বাস অনুযায়ী আপনার কাছেই যাচ্ছে। শ্বাপদসংকুল ভরা এ দুনিয়ার পথ। নিজের হেফাজতে যদি রাখতে পারেন তবে খুবই ভালো- নতুবা নিরাপদ স্থানে (চিতলমারীর অভ্যন্তরে কোন গ্রামে) পৌছানোর দায়িত্ব আপনার। বিশেষ লেখার কিছু দরকার মনে করি না। মানুষকে মানুষে হত্যা করে আর মানুষের সেবা মানুষেই করে। হায়রে মানুষ! আমার অনুরোধ আপনি রাখবেন জানি – তা সত্ত্বেও অনুরোধ থাকল।
ইতি আপনাদের
আ.হা.চৌধুরী

চিঠি লেখক: আবদুল হাসিব চৌধুরী। ১৯৭১ সালে তাঁর ঠিকানা: আমিনা প্রেস, কোর্ট মসজিদ রোড, বাগেরহাট।

চিঠি প্রাপক : মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মো. মোয়াজ্জেম হোসেন। বাগেরহাট পি.সি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর তিনি শত্রুপক্ষের গুলিতে শহীদ হন। অর্থনীতি বিষয়ে তাঁর বেশ কিছু বই বিভিন্ন কলেজে পাঠ্য হয়েছে।

চিঠিটি পাঠিয়েছে : মোয়াজ্জেম হোসেন ফাউন্ডেশন, বাগেরহাট।

২০৩জন ২০৩জন
0 Shares

১৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য