রঙ্ধনু আকাশ (৯ম পর্ব)

ইঞ্জা ২১ জুলাই ২০২০, মঙ্গলবার, ০৭:০৩:২১অপরাহ্ন গল্প ৩৮ মন্তব্য

রুদ্র গাড়ি স্টার্ট দিয়ে এগিয়ে চলেছে, পুরো গাড়ি জুড়ে নিস্তব্ধতা ছেয়ে রয়েছে, অনিলা এখনো কাঁপছে দেখে রুদ্র হাত বাড়িয়ে অনিলার হাত ধরে ধীরে চাপ দিলো, বুঝালো ভয় নেই।

কিছু সময় পর জিজ্ঞেস করলো, তোমার বাসা কোথায়?

অনিলা ফিরে তাকালো রুদ্রর দিকে এরপর বললো, আফতাব নগর।

রুদ্র গাড়ি ছোটালো, গুলশান এক হয়ে হাতিরঝিল হয়ে বেরুবে। 

পুরো সময় জুড়ে আর কথা হলোনা ওদের, কিছু সময় পর ওরা পোঁছে গেলো আফতাব নগর, অনিলার দেখানো পথে ওর বাসার সামনে এসে দাঁড়ালো রুদ্রর গাড়ি।

তোমার বাসার সামনে এসে পড়েছি।

ভিতরে আসেন। 

না আজ আর নয়, এছাড়া স্যার দেখলে না না প্রশ্ন করতে পারেন।

বাবা চট্টগ্রাম গেছেন, এক কাপ কফি খেয়ে যান। 

অনিচ্ছা সত্বেও রুদ্র নেমে এলো, দোতলার বাড়িটি সম্পূর্ণ অনিলাদের, ভিতরে প্রবেশ করে অনুভব করলো বেশ রুচিসম্মত এক বাড়ি এইটি, ড্রয়িংরুমের এক কোনে বড় এক গোল আসন, যেখানে সেতার রাখা আছে, ঘরের আরেক কোনে রাখা আছে পিয়ানো।

আপনি বসুন, আমি আসছি। 

রুদ্র এগিয়ে গেলো পিয়ানোর দিকে, পিয়ানোর উপরে মোজার্টের মিউজিক ইন্সট্রাকশন রাখা।

রুদ্র পিয়ানোর কিবোর্ডে হাত ভুলালো আলতো করে। 

 

বাজাতে পারেন, শব্দে ফিরে তাকালো রুদ্র, অনিলাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো, অনিলা লাল জর্জেটের শাড়ি পড়েছে, এতেই বেশ সুন্দর লাগছে।

কি বাজাতে পারেন? 

না কিন্তু এক সময় শখ ছিলো শিখবো, কিন্তু শেখা হয়নি।

আপনি চাইলে আমি শেখাতে পারি।

রুদ্র একটা মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে বললো, সে সময় এখন আর কই?

কাজের ছেলে টি টেবিলে কিছু খাবার রেখে গিয়েছে দেখে অনিলা বললো, আসুন প্লিজ।

রুদ্র উঠে গিয়ে সোফায় বসলে অনিলা পুডিং কেটে প্লেটে নিয়ে এগিয়ে দিলো রুদ্রকে, নিন এইটা আমার হাতে বানানো। 

রুদ্র চামচ কেটে মুখে দিয়ে এর স্বাদ নিয়ে বললো, এইসব বানাতে পারো?

শুধু কি এই, ঘরে থাকলে প্রায় সময় আমিই রান্না করি। 

বলো কি?

আসলে মাই আমাকে শিখিয়ে ছিলেন। 

তাই আন্টি কখন ইন্তেকাল করলেন? 

এই বছর চারেক আগে, মার ক্যান্সার ছিলো? 

ওহ, সো সরি। 

আপনাকে ধন্যবাদ? 

ধন্যবাদ কেন?

আপনি ঠিক সময়ে এসে আমাকে উদ্ধার করেছেন।

ও কিছুনা।

আপনি ফাইটিং ভালো করেন জানতাম, কিন্তু এতো দ্রুত করতে পারেন তা জানতাম না। 

ও কিছুনা, যাস্ট প্র্যাকটিসের কারণেই সম্ভব হয়েছে। 

 

আমি উঠি আজ, কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বললো রুদ্র। 

না না কি যে বলেন না, আজ খেয়েই যান প্লিজ। 

না না আজ নয়, অন্য একদিন খাওয়া যাবে। 

কেন কোনো তাড়া আছে?

না তাড়া নেই। 

তাহলে খেয়েই যান। 

রুদ্র ক্ষনিক চিন্তা করে বললো, তাহলে এখানে নয়, তোমার আপত্তি না থাকলে বাইরে খেতে পারি। 

কেন অযথা বাইরে, আমি ভালো রান্না করি তো। 

তা আমি নিশ্চিত, এরপরেও চলো বাইরে খাই, আমি নামিয়ে দিয়ে যাবো, যাও রেডি হয়ে আসো। 

আচ্ছা আসছি, এই পাঁচ মিনিট।

পাঁচ মিনিট নয়, বিশ মিনিট পর অনিলা ফিরে এলো, অনিলাকে আবারও মুগ্ধ চোখে তাকালো রুদ্র, অনিলা মেজেন্টা কালারের এক জামদানী পড়েছে এখন, ফর্সা অনিলার কপালে ছোটো একটা টিপ যাতে ডায়মন্ডের মতো ছোটো কয়েকটা পাথর আছে। 

তুমি শাড়ি ভালোই পড় যা জানা ছিলোনা?

আসলে শাড়ি আমি সবসময় পড়িনা, কদাচিৎ পড়ি।

আচ্ছা যাওয়া যাক।

 

আধা ঘন্টার মতো লাগলো ওদের ওয়েস্টিনে পোঁছাতে, গাড়ি পার্কিংয়ে রেখে রুদ্র অনিলাকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে সোজা চলে গেলো লিফটের সামনে, লিফট এলে ওরা উঠে গেলো, বাটনে চাপ দিলো রুদ্র, কিছু সময়ের মধ্যে টেরেসের প্রেগো রেস্টুরেন্টে চলে এলো ওরা, এইটা ইটালিয়ান রেস্টুরেন্ট যেখানে বিভিন্ন ধরণের ইটালিয়ান ফুড পাওয়া যায়।

রেস্টুরেন্টের একজন এসে বললো, বনোসেরা স্যার আসুন প্লিজ। 

লোকটাকে ফলো করে রেস্টুরেন্টের কোনার এক টেবিলে বসলো ওরা। 

ওয়াও খুব সুন্দর প্লেস তো এইটা, অনিলা বললো।

হাঁ এইটা নিরিবিলি পরিবেশ পাওয়া যায়, এছাড়া এদের  ফুড গুলো অথেনটিক, রুদ্র জানালো। 

ওয়েটার এসে ওদের সামনে প্লেইন স্টাটার দিলো যা এক ধরণের ইটালিয়ান বিস্কিট।

কি খাবে বলো, ওয়েটার মেনু এগিয়ে দিতেই রুদ্র জিজ্ঞেস করলো?

আপনিই বলুন?

আচ্ছা আমরা কি সেই আপনি আপনিতে থাকবো, আমি তুমি করে বলছি আর তুমি আপনি চালাচ্ছো?

অনিলা হেসে বললো, তুমিই চয়েজ করো।

এনি ড্রিংক্স? 

আমি জুস নেবো, তুমি ড্রিংক্স নিতে পারো, অনিলা মিষ্টি হেসে বললো। 

রুদ্র ওয়েটারকে ম্যাংগো জুস এবং নিজের জন্য ওরেঞ্জ জুসের কথা বললো।

এই তুমি জুস নিচ্ছো কেন?

দেখো আমি হটাৎ ড্রিংক্স করি, তাও দেশের বাইরে গেলে, এইখানে ক্লাবে গেলে মাঝে মধ্যে খাই। 

স্মোক করো তা আমি জানি। 

হাঁ তা করি। 

 

ড্রিংক্স দিয়ে গেলে দুজনেই গ্লাস তুলে চিয়ারস করে চুমুক দিলো।

অনিলা বললো, ইটালিয়ান ভালো ককটেল কি হয়?

ট্রাই করতে চাও।

চোখ মুখ উজ্জ্বল করে অনিলা বললো, হাঁ। 

ওকে বলে রুদ্র ওয়েটারকে বললো, অর্ডার নাও, প্রথমেই আমাদেরকে Aperol Spritz ককটেল দাও, ফুড দাও Pasta Alla Norma, Bucatini all’Amatriciana,  Tagliatelle al Ragù Alla Lasagna, Spaghetti/Rigatoni Alla Carbonara দাও একটা করে।

এতো খাবার, অনিলা বলে উঠলো।

একটা করে হলে অল্পই হয়, টেস্ট করে দেখো।

ওয়েটার চলে গেলে অনিলা বললো, তুমি দেখছি ভালোই ইটালির ফুড সম্পর্কে আইডিয়া রাখো?

ইউনিভার্সিটিতে আমার এক বন্ধু ছিলো, যে এইসব খাবারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো।

তা মেয়েটা কে?

রুদ্র অবাক হয়ে বললো, কোন মেয়ে?

যে তোমাকে এইসব খাবারের সাথে পরিচয় করিয়েছিলো?

আরেহ নাহ, মেয়ে নয় ছেলে বন্ধু।

তোমার তো অনেক মেয়ে বন্ধু ছিলো দেখেছিলাম। 

ওরা মেয়ে বন্ধু নয়, সব ব্যাচমেট ছিলো।

 

ককটেল আর খাবার এক সাথে সার্ভ করা হলে ককটেল গ্লাস তুলে রুদ্র অনিলার সাথে চিয়ার্স করে চুমুক দিলো।

আরেহ এতো এতো কড়াও না? 

হাঁ ককটেল কড়া হয়না। 

স্বাদটা ভালো, একটা স্মোকি ফ্লেভার আছে। 

হাঁ এর কারণ হলো এ ড্রিংক্স রেডি করার পর একে স্মোক করা হয়।

তাই, বাহ ভালোই জানো দেখছি। 

রুদ্র অনিলার প্লেটে খাবার সার্ভ করে নিজেও নিলো।

খেতে খেতে অনিলা জিজ্ঞেস করলো, তোমার কোনো গার্লফ্রেন্ড আছে? 

তাতো অবশ্যই আছে।

হটাৎ অনিলা মরমরা হয়ে গেলো, প্লেটের খাবার নাড়াচাড়া করতে করতে জিজ্ঞেস করলো, কে মেয়েটা?

রুদ্র হেসে বললো, আমার বুড়ি রুহি। 

অনিলার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো আবার, রিনঝিন হাসির সাথে বললো, ওতো আমার মা, এছাড়া আর কেউ নেই? 

রুদ্র চুপ মেরে গেলো কিছুক্ষণ।

কি বললে না? 

আসলে গার্লফ্রেন্ড নয়, ড্যাড থাকতে উনার এক বন্ধুর মেয়ের সাথে আমার এনগেজমেন্ট হয়েছিলো, এই মাসেই বিয়ে হবার কথা ছিলো। 

কথা ছিলো মানে, এখন নেই?

নাহ, ড্যাডের মৃত্যুর কয়েকদিন পর উনারা বিয়েটা ভেঙ্গে দেয়। 

 

অনিলা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, কি বলছো?

হাঁ, উনারা ভেবেছিলো ড্যাডের মৃত্যুর পর আমরা দেউলিয়া হয়ে গিয়েছি, এই জন্যই বিয়েটা ভেঙ্গে দেয়।

হায় হায়, এতো দেখছি প্রচন্ড স্বার্থপর মানুষ। 

থাক ওসব কথা, যে চলে গেছে, ওদের নিয়ে ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই।

হুম ঠিকই বলেছো।

তা ভবিষ্যতে বিয়েশাদী করার কি প্ল্যান তোমার? 

তেমন কিছু না, আমার মম যদি কাউকে পছন্দ করেন আমার জন্য, তাতে আমার অমত থাকবেনা। 

ওহ তাই?

অবশ্য মম এখনই তাড়া দিচ্ছেন কিন্তু আমি বলে দিয়েছি এখন সম্ভব না, আগে ব্যবসা সামলিয়ে নিই।

বাহ, তোমার মতো ইয়াং, এনার্জেটিক ছেলে যার পিছনে মেয়েরা ঘুরঘুর করে সবসময়, সে কিনা বিয়ে করবে মায়ের পছন্দে, ওয়ান্ডারফুল! 

আসলে উনি আমার সব পছন্দের খবর রাখেন তাই বললাম, অবশ্য বাবা যেটি রেডি করেছিলো তা মম পছন্দ না করলেও বাবার বিরুদ্ধে যাননি উনি। 

কি ব্যাপার খাওনা কেন?

খাচ্ছি তো। 

আসলে এখানে এসে তোমার সম্পর্কে অনেক কিছু জানলাম, আসলে সেদিন তোমার ফ্যামিলির সাথে মিসে মনে হয়েছিলো তোমরা সাধারণ মানুষের মতোই চলাফেরা করো, খুব সিম্পল।  

এ আমার মায়ের শিক্ষা। 

 

……. চলবে। 

ছবিঃ গুগল।

৪৮৬জন ২৮৩জন
0 Shares

৩৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ