রঙধনু আকাশ (২১তম পর্ব)

ইঞ্জা ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, বুধবার, ০৩:০৯:১৭অপরাহ্ন গল্প ৩২ মন্তব্য

পরদিন ভোর ছয়টায় উঠে গেলো রুদ্ররা, দ্রুত রেডি হয়ে ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসলো, সকাল সাতটার দিকে অনিলার কাছে রুহিকে রেখে সবাই রওনা হয়ে গেলো হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।

হাসপাতালে পোঁছেই সবাই চলে এলো অপারেশন থিয়েটারের পাশের আইসিউর সামনে, নীল গ্লাসের এপাশ ফিরে শুয়ে আছে চোখ বন্ধ করে। 

ওর কি জ্ঞান ফিরেনি এখনো, উদ্বীগ্ন রেনু জিজ্ঞেস করলো। 

নিশ্চয় জ্ঞান ফিরেছে ভাবী, নাহলে এক পাশ ফিরে ঘুমাতো না, রুদ্র অভয় দিলো। 

তুই একটু গিয়ে খবর নে না বাবা। 

আচ্ছা মম আমি যাচ্ছি, অপর পাশে তখন নীল চোখ খুললো।

ঐ দেখো ভাইয়া চোখ খুলেছে, হাল্কা উচ্ছাসের সুরে রুদ্র বললো। 

সবাই ফিরে তাকাতেই দেখলো নীল হাল্কা হাত নাড়লো ওদের উদ্দেশ্যে। 

ভাইয়া চিন্তে পারছে আমাদেরকে, সুমি খুশি হয়ে বললো।

নীল আবার চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো।

তোমরা থাকো দেখি ডাক্তারের সাথে কথা বলতে পারি কিনা, বলেই রুদ্র চলে গেলো। 

আধা ঘন্টা পর ফিরে এলো সবার কাছে, মম ভাইয়ার জ্ঞান ফিরেছে ভোর রাতে, এখন সব ঠিকঠাক আছে, আগামী পরশু বেডে দেবে যদি সব ঠিকঠাক থাকে। 

 

মম একটা খারাপ খবর আছে। 

কি কি খারাপ খবর, রুদ্রর মা উদ্বীগ্ন হলেন। 

শেলি মাঝ রাতে মারা গেছে। 

হায় আল্লাহ্, বলে মুখে হাত দিলেন রুদ্রর মা। 

ওকে স্থানীয় মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছে পোস্টমর্টেম করার জন্য, ওর বাবাও গেছেন সাথে। 

ইশ মেয়েটার জন্য দুঃখ হচ্ছে। 

মম তোমরা থাকো এইখানে, আমি যায় আংকেল নিশ্চয় একা আছেন। 

আচ্ছা যা বাবা। 

কিছু খেতে চাইলে টপ ফ্লোরে ক্যান্টিন আছে, কিছু খেয়ে নিও। 

আচ্ছা তুই যা। 

রুদ্র রিসেপশন থেকে স্থানীয় মর্গের ঠিকানা নিয়ে রওনা হয়ে গেলো, আধা ঘন্টা লাগলো মর্গে পোঁছাতে, গাড়ি পার্কিংয়ে রেখে সে ভিতরে গেলো, ভিতরে অসংখ্য চেয়ার দেওয়া আছে যেখানে এক মাত্র শেলির বাবা বসে আছেন, বয়স যেন উনার একদিনেই দ্বিগুণ হয়ে গেছে। 

রুদ্র এগিয়ে গিয়ে সামনে দাঁড়ালে উনি ধীর গতিতে মাথা তুলে থাকালেন এরপর হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরলেন রুদ্রকে। 

আংকেল এইভাবে কাঁদলে হবে, যা হওয়ার তা হয়ে গেছে, প্লিজ শান্ত হোন।

আমি আমার শেষ সম্বল হারিয়ে ফেললাম বাবা, সব শেষ হয়ে গেলো আমার। 

রুদ্রর চোখেও পানি চলে এলো এই হৃদয়বিধারক ঘটনায়। 

 

সন্ধ্যার পর ফিরে এলো রুদ্র, সবাইকে ওয়েটিংরুমে পেয়ে জিজ্ঞেস করলো, তোমরা কিছু খেয়েছো কি?

আমরা খেয়েছি, তোর খবর বল, পেয়েছিলি শেলির বাবাকে? 

হাঁ মম, শেলির পোস্টমর্টেম শেষ হয়েছে, ওকে মর্গেই রাখা হয়েছে, আমি হেল্প করলাম সব কাগজপত্র বের করতে, ডেডবডি নিয়ে যাবেন দেশে।

ওর হাসবেন্ড কি ধরা পড়েছে? 

হাঁ, মেক্সিকো সিমান্তে ধরা পড়েছে আজ মধ্যরাতে, ওকে ফেডারেল পুলিশের কাস্টডিতে রাখা হয়েছে। 

যাক তাহলে মেয়েটার আত্মা শান্তি পাবে। 

ভাইয়া কেমন আছে? 

শুনলাম ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে ওকে। 

আচ্ছা আমি যাই দেখে আসি, তারপর ফিরবো। 

রুদ্র আইসিউইউর সামনে গিয়ে দেখলো নীল ঘুমে অচেতন, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলো ভাইকে, এরপর দীর্ঘ  এক নিশ্বাস ফেলে ফিরে চললো ওয়েটিংরুমের দিকে।

সবাইকে নিয়ে গাড়ি পার্কিংয়ে এসে সবাই গাড়িতে উঠে বসলে রুদ্র গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বাসার দিকে রওনা দিলো। 

সবাই চুপচাপ গাড়িতে, শুধু আসেপাশের ছুটন্ত গাড়ির সাঁই করে যাওয়ার শব্দ হচ্ছে।

আধা ঘন্টার মধ্যে ওরা বাসার সামনে পোঁছে গেলো।

 

কলিংবেলের শব্দ শুনে অনিলা এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে ধরে জিজ্ঞেস করলো, ভাইয়া কেমন আছে এখন?

ভাইয়ার জ্ঞান ফিরেছে, ওরা ঘুমের ঔষধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে, রুদ্র জবাবে বললো। 

আচ্ছা আমি সবার রুমের গিজার অন করে রেখেছি, রু তুমি কি গোসল করবে? 

না এমনে ফ্রেস হয়ে আসছি, রুদ্র দরজা বন্ধ করে জবাব দিলো। 

কিছুক্ষণ পর সবাই ড্রয়িংরুমে এসে জড়ো হলো, ইতিমধ্যে রুদ্র অনিলাকে শেলির ব্যাপারে জানিয়েছে, অনিলা সবাইকে কফি আর স্ন্যানক্স দিলো। 

আমি যাই রান্না করে নিই, কফি শেষ করে রেনু বললো। 

ভাবী আপনি বসুন, আমি অলরেডি রান্না করে ফেলেছি, অনিলা বললো।

আরেহ কি বলছো, তুমি কষ্ট করলে কেন? 

কি যে বলেন না ভাবী, আমি করা মানেই তো আপনি করা। 

আচ্ছা ভালো করেছো, কফিটা একটু অন্যরকম মনে হচ্ছে আজ, রুদ্র জিজ্ঞেস করলো।

এইটা অনিলা মিক্স। 

মানে? 

আমি বানিয়েছি তো, এ জন্যই অন্য রকম লাগছে, বলেই অনিলা খিল খিল করে হাসতে লাগলো, সাথে সবাইও সে হাসিতে যোগ দিলো। 

 

ডিনার রেডি বলে রেনু সবাইকে ডাক দিলে ঘরের সবাই একে একে চলে এলো, খেতে বসলে সবাই অবাক হলো, অনিলা কালা ভুনা, কষা মাংস, পায়া করেছে।

রুদ্র জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে বললো, এইসব তো রেস্টুরেন্টে খেতাম ঢাকাতে, যতদূর জানি চট্টগ্রামের স্পেসিয়ালিটি, তুমি এইসব রান্না করতে পারো জানতাম না? 

অনিলা হেসে বললো, ভুলে গেছো আমি যে চট্টগ্রামের মেয়ে, আসলে এইসব আমার মা শিখিয়েছিলেন। 

ওহ তাই বলো, মম আজ জম্পেশ খাওয়া হবে, শুরু করো।

রুদ্রর মা হেসে সবার পাতে খাবার দেওয়া শুরু করলেন, সবাই খেতে খেতে অনিলার রান্নার তারিফ করতে লাগলো। 

খাওয়া শেষে রুদ্র উঠে গিয়ে টিভি দেখছিলো তখন সেলফোনে রিং হচ্ছে শুনে রুদ্র কল রিসিভ করে হ্যালো বললো। 

অপর প্রান্ত থেকে জিএম সাহেব সালাম দিয়ে বললো, নীল স্যারের কি অপারেশন হয়েছে। 

হাঁ গতকাল হয়েছে, যদিও আইসিইউতে আছে, এরপরেও আশা করছি আগামীকাল নাহয় পরশু বেডে দেবে। 

আলহামদুলিল্লাহ। 

স্যার কবে আসবেন? 

আমি ভাইয়াকে বাসায় নিয়ে আসলেই চলে আসবো।

স্যার একটা সমস্যা হয়েছে। 

কি সমস্যা? 

আমাদের স্টিল মিলে একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে গতকাল, তিনজন মারা গেছে। 

হোয়াট, কি বলেন? 

 

ঘরের সবাই রুদ্রের দিকে ফিরে তাকালো। 

স্যার। 

কিভাবে হলো এই ঘটনা? 

স্যার চুল্লিটা ফেঁটে এই ঘটনা হয়েছে, লাঞ্চের সময় হওয়াতে ক্ষতি কম হয়েছে, নাহলে আরও বেশি ক্ষতি হতে পারতো। 

তাহলে এক কাজ করুন, নিহতদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। 

স্যার আরেকটা সমস্যা হয়েছে। 

আরও কি সমস্যা? 

স্যার আপনার নামে পুলিশ কেইস হয়েছে। 

কেন? 

কারণ আপনিই এমডি।  

ওহ গড, তাহলে এখন কি করতে হবে বলুন। 

স্যার আপনাকে কোর্টে সারেন্ডার করতে হবে, অবশ্য সাথে সাথেই বেইল পাওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে। 

আচ্ছা আমি মমের সাথে কথা বলে জানাচ্ছি। 

জ্বি স্যার। 

ওকে রাখছি। 

সালাম স্যার। 

ফোন ডিস্কানেক্ট করে চিন্তিত রুদ্র তাকালো ওর মার দিকে।

কি হয়েছে রুদ্র, উদ্বীগ্ন হলেন রুদ্রর মা। 

মম আমাদের স্টিল মিলে বিস্ফোরণ হয়ে তিনজন শ্রমিক মারা গেছে। 

হায় হায়। 

ঘরের সবাই রুদ্রের সামনে এসে দাঁড়ালো, সবাই উদ্বীগ্ন হয়ে উঠেছে। 

কিভাবে হলো? 

রুদ্র সবাইকে সব খুলে বললো, সাথে এও বললো যে ওর নামে পুলিশ কেইস হয়েছে।

রুদ্রর মা ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন। 

রুদ্র দ্রুত ওর মার হাত ধরে বললো, মম তুমি চিন্তা করছো কেন, এতো স্বাভাবিক ব্যাপার। 

 

একটু ধাতস্থ হয়ে রুদ্রের মা বললেন, এখন কি করবি? 

কি করবো বুঝতে পারছিনা, ভাইয়াকে বাসায় এনে দিয়েই তারপর ফিরবো। 

কি বলছো তুমি, তোমার তো দ্রুতই ফিরে যাওয়া উচিত, রেনু বললো। 

ভাবী কিভাবে যায়, ভাইয়া এখনো আইসিইউতে।

আমরা আছিনা। 

এক কাজ কর বাবা, তুই অনিলাকে নিয়ে চলে যা, আমি থাকছি।

অনিলাও থাকুক মম। 

না, তুই দেশে গেলে অনিলাও যাবে। 

রুদ্র এখনো সময় আছে, তুমি গিয়ে টিকেট কনফার্ম করে আসো। 

ভাবী তুমি বলছো? 

দেখো তুমি চিন্তা করোনা, আমরা আছি, তুমি অনিলাকে নিয়ে যাও।

তুই যা চেইঞ্জ করে বের হ। 

আচ্ছা মম, অনিলা আসো আমাকে পাসপোর্ট আর টিকেট গুলো দাও। 

কিছুক্ষণের মধ্যে রুদ্র বেরিয়ে গেলো।

বিপদের উপর বিপদ আসছে, কি যে হলো, রুদ্রর মা চিন্তিত স্বরে বললেন। 

মম আপনি চিন্তা করবেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে, অনিলা স্বান্তনা দিলো। 

 

——– চলবে।

ছবিঃ গুগল।

২২০জন ২৫জন
0 Shares

৩২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ