রক্তিম গোলাপ

শবনম মোস্তারী ২৭ মে ২০১৯, সোমবার, ০১:১৮:১৯অপরাহ্ন গল্প ২৬ মন্তব্য

সজল আর নীপা বিয়ে করেছে আজ তিন বছর হলো। সজল খুব ভালো ছেলে – উদ্যমী পরিশ্রমী। সে সেই সকালে অফিসে বেড়িয়ে যায় আর একদম সন্ধ্যায় ফেরে বাসায়।
নীপা ভাবে তাদের সুখের সংসারে একদিন আলোকিত করে একটি ফুটফুটে বাবু আসবে। কিন্তু সজল এখন আর আগের মত রোমান্টিক হয়না, অফিস থেকে ফিরে সেই খুনসুটিও তার মাঝে নেই। ছুটির দিনেও আগের মত বেড়ানো হয়না তাদের, কোথায় যেন একটা পরিবর্তন এসেছে দু’জনার মাঝেই।
আজ সজলের অফিসে মন বসছেনা কিছুতেই। হাতের কাজ সেরে একটু তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে নীপাকে নিয়ে বেড়ানোর চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেকদিন পর নীপাকে সারপ্রাইজ দেয়া আরকি!
আজ সে ভেবে রেখেছে নীপাকে একতোড়া লাল গোলাপ কিনে দেবে, সঙ্গে কিছু চকলেট। চাইনিজও খাওয়া যেতে পারে।
স্যার বস ডাকছে!!
পিয়নের কথায় ভাবনার বেড়াজাল থেকে টপ করে নীচে পড়ে যায় সজল।
আসছি বলেই টেবিল তাড়াহুড়ো গুছিয়ে রাখা শুরু করে সে। মনে মনে ভাবে বসের রুমে গিয়ে আজ একটু তাড়াতাড়ি ছুটি নেয়ার কথা বলবে।
একফাঁকে নীপাকে ফোন করে বলে
নীপা আজ বিকেলে রেডি থেকো, বাইরে যাব কেমন? নীপাকে আর কিছু না বলে ফোন রেখে দেয় সে।
নিপা ভাবে আজ কি হলো সজলের? হঠাত বাইরে কোথায় যাওয়ার কথা বললো সে!
কোন বিপদ? নাকি অন্যকিছু?
আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি তোমায়, দেখতে আমি পাইনি…
গুন গুন করতে করতে বসের রুমের দিকে এগিয়ে যায় সজল।
সজল?
জ্বী বস।
কেমন আছ?
এইতো আছি বস।
আসলে তুমি খুব এফিসিয়েন্ট ছেলে, আই লাইক ইউ সজল।
থ্যাংক ইউ বস।
আচ্ছা সজল হাতের কাজ কি শেষ?? মানে জরুরি কিছু পেন্ডিং নেইতো?
না বস।
গুড,ভেরী গুড।
সজল ভাবে বস আজ খোশ মেজাজে আছে যখন এখুনি ছুটির কথাটি বলে নেয়াই ভালো। বলা যায়না বসের মুড চেঞ্জ হলে ছুটিটা ফসকে যেতে পারে।
বস একটা রিকোয়েস্ট ছিলো।
আরে সব শুনবো, তার আগে আমার কিছু কথা শুনো।
রাত প্রায় একটা। সজল আস্তে করে নিজের চাবি দিয়ে মেইন গেট খুলে নিজের রুমে প্রবেশ করে। বেড ল্যাম্পের হালকা আলোতে নীপার ঘুমন্ত মুখটা খুব মায়াবী লাগছে। তার কপালে একটা চুমু খেতে বড্ড ইচ্ছে করলো সজলের। কিন্তু নীপার ঘুম ভেংগে যেতে পারে ভেবে সে ইচ্ছেটাকে দমন করে কোন শব্দ না করে জামা কাপড় ছেড়ে আস্তে করে সে নীপার পাশে শুয়ে সারাদিনের কথা ভাবতে থাকে।
অফিসে বসের এক জরুরী বিজনেস ডিলের জন্য সজলকেই যেতে হয়েছিলো। না হলে নাকি তার বিরাট লোকসান গুনতে হবে। আর এ কাজে সজল ছাড়া অন্য কারো উপর সে আস্থা রাখতে পারছিলো না। তাই তার সম্মান বাঁচাতে আজ সজলকে নীপার জন্য অকৃতিম ভালোবাসা আর সারপ্রাইজকে দূরে ঠেলে রেখে যেতে হয়েছিল সেখানে। আর এখন ফিরতে ফিরতে মধ্যরাত। পাশে তাকিয়ে দেখে বেচারি নীপা সেই বিকেলের সাজ নিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। অবশ্য সন্ধ্যায় সে এসএমএস করে জানিয়েছিল একটা জরুরি মিটিং এ হোটেল সুন্দরবনে যাচ্ছে সে, ফিরতে একটু দেরী হবে। না হলে নীপা খুব টেনশনে করবে। তারপর মোবাইল সাইলেন্স করে রেখেছিলো। কখন যে চার্জ শেষ হয়েছে তা খেয়ালই করা হয়নি। হয়তো না খেয়েই তার অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়েছে সে।
সজলের চোখে ঘুম আসছেনা। নীপার কথা ভেবে খুব খারাপ লাগছে। নীপা খুব ভালো মনের মেয়ে। কিছু মেয়ে আছে যারা খুব ছোটো খাটো বিষয়ে অল্পতেই অনেক খুশি হয়, আবার অতি তুচ্ছ বিষয়ে মনে খুব কষ্টও পায় কিন্তু কাউকে বুঝতে দেয়না নীপা হচ্ছে সেই সব মেয়েদের মত। সে কত আশা নিয়ে আজ সেজেছিল অনেকদিন পর। সামান্য আশাটুকুও আজ পুরন হলোনা তার। সজল ভাবে বিয়ের পর সব কিছুই হয়তো বদলে যায় আর এই বদলে যাওয়াটাই এক সময় খুব প্রকট হয়ে ধরা দেয় চোখে। আশাহত হয় দুজনেই।
কিন্তু এটাই নিয়ম, এটা অবশ্যম্ভাবী, এটাই হয়, সবার ক্ষেত্রেই হয়। সজল ভাবে বিয়ের আগে প্রেমের মুহূর্তগুলো কাটতো তাদের স্বপ্নে স্বপ্নে, বিয়ের পর সেই স্বপ্নটা ফিকে হতে থাকে। আসলে – বিয়ের আগে তীব্র একটা চাওয়া থাকে দুজন দুজনকে কাছে পাবার। যতবার দেখা হত, সুন্দর পোষাকে সেজে গুজে আসতো দুজনেই।
নিজেদের ছোটখাটো দোষ ত্রুটি গুলো
লুকিয়েই রাখতো তারা। ছোট ছোট উপহারে
একে অন্যকে চমকে দিতে পছন্দ করতো।
আর বিয়ের পর সকালে জেগে উঠে ঘুমুতে যাওয়া পর্যন্ত মানুষ দুটো থাকে এক সাথে ঠিকই কিন্তু ক্রমে ক্রমে কমে আসে ভালবাসার সেই তীব্রতা। জন্ম হয় আজীবন পাশে থাকার, নির্ভরতার, বিশ্বাসের একটা নতুন অধ্যায়। তারমানে এই নয় যে নীপা বা তার একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ফিকে হয়ে এসেছে। না তাতো নয়, হয়ত ভালোবাসার রুপটা পরিবর্তন হয়েছে।
ছেলেরা চিন্তা চেতনায় আর দৈনন্দিন জীবনে ব্যস্ত হয়ে যায় সংসার চালানোর খরচ যোগাতে, আর মেয়েরা তখন হয়ে ওঠে পুরোদস্তর গৃহিনী।
সকালে নাস্তা কি দিয়ে হবে, বাজার থেকে কি
আনতে হবে, কি রান্না হবে, এসব প্র্যাক্টিকাল
বিষয় গুলো প্রাধান্য পেতে থাকে জীবনে। ফলে ভালবাসার সময়ের সেই কপোত কপোতী ভাবটা আগের মত আর নেই। একটা সময় দুজনেই খেয়াল করে, তাদের জীবনটা কোথায় যেন থেমে গেছে। দুজনেই অনুভব করে – ভালবাসাটা আর আগের মত নেই। শুরু হয় অভিযোগ, জন্ম নেয় অভিমান। আসলে বদলে গেছে দুজনেই। নিজের পরিবর্তনটা চোখে পড়েনা কারওই।
এসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ে সজল। তার স্পর্শ পেয়ে নীপা কোমল হাতে জড়িয়ে ধরে ঘুমের ঘোরেই।
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে চোখ মেলেই নীপা বালিশের পাশে একটা লাল গোলাপ দেখে চমৎকৃত হয়। কতদিন পর সজল তার জন্য গোলাপ নিয়ে এসেছে। মুহুর্তেই গতরাতের সব অভিমান ভেঙে যায়। পাশ ফিরে সজলের কপালে আলতো করে চুমু খায় যাতে বেচারার ঘুম ভেঙে না যায়। আজ সকালে সজলকে অনেক কথা শুনাবে বলে রাতে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে রাগ করে। একটি মাত্র গোলাপেই সে রাগ পানি হয়ে গিয়ে সজলের জন্য অনেক মায়া জন্মালো তার মনে। ভাবছে ছিঃ! আমি ঘুমিয়ে গিয়েছি আর বেচারা হয়তো রাতে না খেয়েই শুয়ে পড়েছে। তার ঘুম ভেঙে যাবে বলেই যে সজল তাকে ডাকেনি এটা সে নিশ্চিত।
কিন্তু নীপা এটা কখনো জানবেনা, একতোড়া গোলাপ গতকাল দিতে পারেনি বলে শুধু তার জন্যই সজল গোলাপটি নিয়ে এসেছে হোটেলের কনফারেন্স রুমের ফ্লাওয়ার ভাস থেকে। গোলাপটি সে কাউকে না বলে টুপ করে কোটের পকেটে সজতনে রেখেছিলো শুধু নীপার মুখে একচিলতে হাসি দেখবে বলে।

৩১০জন ৯৬জন
37 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য