রক্তবর্ণ চোখের এক দক্ষ নীরব শিকারি:

শামীম চৌধুরী ২২ অক্টোবর ২০২০, বৃহস্পতিবার, ০৭:৪৯:৫২অপরাহ্ন পরিবেশ ১৮ মন্তব্য
গত মার্চ মাসের ৮ তারিখ পাখির ছবির জন্য ঘর থেকে বের হয়ে সর্বশেষ সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওড়ে গিয়েছিলাম। করোনাকালে দীর্ঘ সাত মাস পাখির ছবির জন্য কোথাও যাওয়া হয় নাই। এই ৭ মাসে আমাদের দেশে সামার ভিজিটর বেশ কিছু পাখি প্রকৃতিতে উড়ে বেড়িয়েছে। কপাল মন্দ থাকায় ওদের সঙ্গে সাক্ষাত হয়নি।
করোনার প্রভাব কিছুটা দূর্বল হওয়ায় গত ২৮ সেপ্টেম্বর’২০২০ ঢাকার পাশে উত্তরায় দিয়াবাড়ি এই প্রথম ক্যামেরা নিয়ে বের হলাম।
 
বরাবরের মতন আমার বার্ডিং ম্যাট আফজাল ভাইকে সঙ্গে নিয়ে উত্তরার ৬ নাম্বার ব্রীজ পার হয়ে আত্রাই গ্রামে চলে আসি। একটি শাখা খালের উপর নান্দনিক এস,এস পাইপের রেলিং মোড়ানো ব্রীজের উপর এসে দাঁড়ালাম। শরতের বৈকালিক মৃদু বাতাসে কাঁশফুল গুলি দুলছিলো। আমরা দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সেই নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করছিলাম। হঠাৎ খালের পূর্ব পাশে একটি বাঁশের খুঁটিতে পাখিটি এসে বসলো। পাখিটিকে দেখে চিনতে পারলাম। এর চরিত্র আমার ভাল করে জানা। তাই সময় নষ্ট না করে ব্রীজ থেকে নীচে নেমে গেলাম। দূর থেকে কয়েকটা শাটার খরচ করলাম। কারন এদের দৃষ্টি শক্তি এমনই প্রখর যে মানুষের নড়াচড়া দেখা মাত্রই উড়ে যায়। তাই নিজেকে কাশবনে আড়াল করে ধীর পায়ে বেশ কিছুটা সামনে গেলাম। এমন জায়গায় দাঁড়ালাম যেখান থেকে পাখির দূরত্ব ৫০ ফুটের মতন। আর সামনে যাবার কোন সুযোগ না থাকায় দীর্ঘ সাত মাস পার শাটার টিপলাম। করোনাকালে এটিই ছিল আমার প্রথম পখির ছবি।

কাটুয়া চিল বা কালো ডানা চিল এসিপিট্রিডে পরিবারভূক্ত চিল প্রজাতির ছোট্ট শিকারী পাখি। খোলা মাঠে ও উন্মুক্ত তৃণভিমিতেই এদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। লম্বা পাখাবিশিষ্ঠ এ পাখিটির ডানায় ধূসর অথবা সাদা রঙের সাথে কালোর এক মিশ্রণ লক্ষনীয়। বাজপাখির মতো শিকারের প্রাক্কালে পাখা মেলে নাচতে থাকে শিকারের ঠিক মাথার উপর। লক্ষ বস্তুটিকে লক করে মহুর্তে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শূন্যে আবার উঠে যায়, সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। উড়ন্ত অবস্থায় লেজ খাটো ও কিছুটা বর্গকৃতি ভাবে দৃশ্যমান। পুরুষ ও স্ত্রী এর পালকের ধরণ একই রকম।

এদের চোখ রক্তবর্ণ ও সম্মুখে অবস্থিত। পেঁচার সাথে এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে।

কালো ডানা চিল এমন এক ধরনের প্রজাতির চিল যেগুলো সাধারণতঃ উন্মুক্ত ভূমি এবং অর্ধ-মরুময় আফ্রিকা মহাদেশের উপ-সাহারাভূক্ত এলাকা এবং উষ্ণমণ্ডলীয় এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। এছাড়াও, ইউরোপের স্পেন এবং পর্তুগালেও এদের সন্ধান পাওয়া গেছে।

ইউরোপের দক্ষিণাংশ এবং সম্ভবতঃ পশ্চিম এশিয়ায় এ পাখিটির আবাস উপযোগী পরিবেশ বিদ্যমান।

সমভূমিতে এদেরকে দেখা গেলেও অনেক উঁচু এলাকা হিসেবে স্বীকৃত সিকিমের ৩৬৫০ মিটার উঁচুতেও এদের আবাসস্থল রয়েছে।২৬৭০ মিটার উঁচুতে দোদ্দাবেত্তা, নীলগিড়ি এবং ২০২০ মিটার উঁচু এলাকা নাগাল্যান্ডেও এ পাখিটি দেখা যায়।
পশ্চিম ঘাটের কিছু এলাকায় শীতকালীন পরিযায়ী পাখি হিসেবেও এ পাখিকে দেখা যায় বলে কেউ কেউ বলে থাকেন।

অবস্থানভেদে কালো ডানা চিল বছরের বিভিন্ন সময়ে বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে। এদের বাসাগুলো বছরের সমসময়ই দেখা মেললেও এপ্রিল এবং মে মাসে ডিম পাড়তে দেখা যায় না। আওয়াজ সহকারে পাখি জোড়ায় জোড়ায় অবস্থান করে। একবার জুটি গড়লেই সাধারণতঃ তা দীর্ঘস্থায়িত্ব অর্জন করে।

এদের বাসা সাধারণতঃ ঢিলেঢালা প্রকৃতির হয় এবং স্ত্রীজাতীয় কালো ডানা চিল গড়পড়তা ৩ থেকে ৪টি ডিম পাড়ে। পুরুষের তুলনায় স্ত্রী পাখিটি অত্যন্ত যত্নসহকারে বাসা তৈরীর চেষ্টা চালায়। ফ্যাকাসে সাদা রঙের ডিমে ঘন লালচে রঙের ছিটে থাকে। উভয় পাখিই ডিম ফোটানো পর্যন্ত পালাক্রমে তা দেয়। ছানা জন্মানোর পর পুরুষটি অধিক সময় বাইরে কাটায়। সাধারণতঃ বাচ্চাদের খাদ্যের যোগান দেয় স্ত্রীপ্রজাতিটি। কখনোবা স্ত্রী পাখিটি ছানাদের জন্যেও খাদ্য সংগ্রহে নিয়োজিত থাকে। বাসার কাছাকাছি এলাকা থেকে শিকার করে। প্রায় ৮০ দিন ছানাগুলো তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে খাদ্য গ্রহণ করে। এরপরই অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখিগুলো নিজেরাই খাদ্য সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং শূন্যে ভেসে বেড়ায়।

এদের শিকারের তালিকায় রয়েছে ঘাসফড়িং, ঝিঝিজাতীয় পোকা এবং অন্যান্য বৃহদাকৃতির পোকা, টিকটিকি ও ইঁদুরজাতীয় প্রাণী। আঘাতপ্রাপ্ত পাখি, ছোট ছোট সাপ এবং ব্যাঙ শিকার করতেও দেখা যায়।উড়ন্ত অবস্থায় কদাচিৎ এদেরকে শিকার করতে দেখা যায়।পাখার পালকের ঝাপটায় এর শিকার করে এবং খাবার খায়। কিন্তু মাটিতে বসেও এরা শিকার করে থাকে।

এ প্রজাতির পাখি দলবদ্ধ হয়ে থাকতে ভালবাসে। ১৫ থেকে ৩৫টি পাখি খুবই বড় বৃক্ষের পাতাযুক্ত আবরিত স্থানে একত্রে থাকে। এরা খুবই নীরব থাকে এবং নমনীয় শব্দে মত বিনিময় করে।তবে প্রজনন মৌসুমে এদের ডাকার ভঙ্গীমা ভিন্নতর ও ঔচ্চস্বরে হয়ে থাকে।

বাংলা নামঃ কালো ডানা চিল / কাটুয়া চিল

ইংরেজী নামঃ Black-shouldered kite / Black-winged kite

বৈজ্ঞানিক নামঃ Elanus caeruleus

ছবিগুলি উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে তোলা।

১৫১জন ৩৮জন
0 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য