যৌতুকের বলি ৩য় পর্ব

মনির হোসেন মমি ২ নভেম্বর ২০১৪, রবিবার, ০২:১৫:৫৩অপরাহ্ন গল্প ১৯ মন্তব্য

রশিদ মোল্লার ছোট ছেলে নিখোজঁ ফুলীর দেবর রমজান আলী স্হানীয় বাজারের টেলিফোন দোকানে মোবাইলে কথা বলছেন পলাতক ফুলীর স্বামী  আকমল মোল্লার সাথে।প্রায় দীর্ঘ ঘন্টা খানেক কথা বলেন তারা।লক্ষনীয় ব্যাপার হলো রমজান আলী টেলিফোনে কথা বলার সময় খুব সর্তকতা অবলম্ভন করে বার বার এ দিক সে দিক তাকান কথা শেষ করে বেশ উৎফুল্লতার সহিত দোকান থেকে বের হন।এর পর পরই সাংবাদিক রায়হান সাহেবের এক গুপ্তচর সেই টেলিফোন দোকানে মোবাইলে কথা বলবেন বলে মোবাইলটি হাতিয়ে নম্বরটি টুকে নেন নোট প্যাডে এবং কিছু ক্ষণ রায়হান সাহেবের সাথে কথা বলে বিল পরিশোধ করে দোকানীর মোবাইল নম্বরটি জেনে নিয়ে রায়হান সাহেবের সাথে দেখা করেন।
-কি খবর বলেন।
-এইতো নম্বরগুলো,তবে ফোনের কথায় যা বুঝলাম তাতে ফুলী নিখোজ নয় হয়তো তাকে ওরাই হত্যা করেছে।
-হুম!
রায়হান সাহেব একটু দূরে গিয়ে মোবাইলে কার সাথে যেন কথা বলে সংগ্রহ করা ফোন নম্বর গুলো দিলেন।কাকে কেনো ফোন নম্বর গুলো দিলেন সেই গোপনীয়তা বজায় রাখলেন রায়হান সাহেব।অত্যান্ত গোপনীয়তায় একটু একটু করে এগুচ্ছেন রায়হান সাহেব।
এ দিকে রশিদ মোল্লা গ্রামের দাপুটে মাতব্বর হিসেবে গ্রামের সব গুলো বিচারেই তাকে উপস্হিত থাকতে হয় সেই সুবাদে আজও সে বিচারের দরবারে বিচার করছেন।তবে বড় কোন কিংবা সমাজের গুরুত্ত্বপূর্ণ কোন বিচার নয় গাছের ডাব চুরির বিচার যা গ্রাম বাংলার কৈশরে ঘটে যাওয়া প্রতিনিত চিত্র।
-কে কে আমার ডাব চুরী করেছিস?
ঘটনায় মোটা মোটি যারাই ছিল তারা বিচারে এখানেও উপস্হিত হয়।বিচারের রায় হল যারা যারা এ ঘটনায় ছিল তাদের ডাব চুরির অপরাধে মাথা ন্যাড়া করে সারা গ্রাম ঘুড়ানো যাতে ভবিষৎতে এমন কাজ আর কেউ না করেন তাও রশিদ মোল্লার বাগানের ডাব গাছ।ঘটনায় উপস্হিত ছিলেন সাংবাদিক রায়হান সাহেব সহ তার সহকর্মীরা।রায়হান বিচারে রায়ে বাধা দেন।
-এটা কি করলেন মাতাব্বর সাহেব….সামান্য ডাব চুরি যা ছোট বেলায় প্রায় সবার বেলাই ঘটে থাকে।আর সে জন্য আপনার গ্রামের এই লেখা পড়া করা কোমল মতি ছেলেদের ন্যাড়া করে দিবেন এটা কোন কথা হলো?
-গ্রামটা কাদের?
-নিঃসন্দেহে আপনাদের,
-আর আপনি?
-ভিন বাসী, তাই বলে একটি ভূল বিচারের জন্য কিছু কোমল মতি চঞ্চল ছেলেরা বেকে যেতে পারে, মানে পাড়ায় তারা চলাফেরা করবে কি ভাবে?তাদের মান সম্মান কিছুই দেখবেন না।
-আমার সিদ্ধান্তই চুরান্ত,এই জব্বার,কাসেম,দুলু তোরা তোদের কাজ শুরু কর,যেই নাপতাকে ডেকে এনেছিস তাকে দিয়ে ওদের মাথা গুলো ন্যাড়া করে দে……
মজলিসে শোড়গোল লেগে গেল ছেলে গুলো এক জোট হয়ে সভায় দাড়িয়ে প্রতিবাদ জানালো।তাদের মধ্যে এক জন কথা বলে উঠেন।
-এ বিচার মানি না, আমরা কোন অপরাধ করিনি।
-তা হলে তোদের বাপেরা এসে আমার ডাবগুলো খেয়েছে নাকি?
-ওরাই যে ডাব পেরেছে তারই প্রমান কি?সন্দেহ করে কাউকে অপরাধী বানানো যায় কিন্তু বিচারের রায় দেয়া যায় না,
রায়হান সাহেব মাঝ খানে কথা বলেন।মাতাব্বরের চোখ দিয়ে রাগের অগ্নস্ফুলিঙ্গ বের হচ্ছে।ছেলেগুলোও মাথায় প্রতিবাদী গামছা বাধেন।মাতাব্বর বিচার কার্য রেখেই সভা হতে তার লোক জন নিয়ে বের হয়ে যান।
আজ খুব ভোরে উঠেন রায়হান সাহেব ফজরের নামাজ পড়েন স্হানীয় মসজিদে নামাজ শেষে এক জন অপরিচিত লোক তার সাথে কথা বলার জন্য মসজিদের বাহিরে অপেক্ষমান।রায়হান সাহেব বের হলেন লোকটি সামনে এসে যথারিতী সালাম দিলেন।
-অআলাইকুম সালাম,কি ব্যাপার কে আপনি,আপনাকেতো চিনতে পারলাম না।
-আমাকে চিনবেন না,আপনি যে বিষয়টির জন্য এখানে অবস্হান করছেন সেই বিষয়েই কিছু কথা বলব,একটু আড়ালে যেতে হবে দেয়ালেরও কান আছে।
রায়হান সাহেব বুঝতে পেড়ে একটু আড়ালে চলে গিয়ে দুজনে কথা বলেন এবং কথা শেষে লোকটি একটি প্যাকেট দেন লেখককে।কথায় ধারনার স্পষ্টতা দেখা দেয় ফুলীকে হত্যা করা হয়েছে, সে নিখোজঁ নয়।রায়হান সাহেব লোকটিকে নিরাপদে থাকার পরামর্শ দিয়ে বাসায় এসে প্রস্তুতি নিচ্ছেন এক বেলার জন্য তাকে ঢাকায় যেতে হবে,ফুলী নিখোজঁ নয় ফুলীকে হত্যা করা হয়েছে তার কিছু প্রমানীদি হাতে আছে তা প্রকাশ করতেই তার পত্রিকা অফিসের সম্মাদকের সাথে কথা বলতে হবে।পত্রিকা প্রকাশের পর হয়তো থানায় টনক নড়বে।
হঠাৎ স্কুলের ড্রেস পরিহিত কিছু ছেলে মেয়ে এবং বেশ কয়েক জন শিক্ষক তার সামনে হাজির অভিযোগ অষ্টম শ্রেনীতে পড়ুয়া তাদের এক বান্ধবীকে তার মা বাবা জোড় করে বিবাহ দিচ্ছেন সেই বিবাহটি বন্ধ করতে লেখককে অনুরোধ করেন।
-তোমাদের মাতাব্বর কি বলেন।
-সে তো তাদের সাথেই তাল মিলাচ্ছে…
-সিট্…এ গ্রামে সর্বোত্র সমস্যা,,, এক মাত্র এই গন্ড মুরোক্ষ মোড়ল গ্রামটাকে অন্ধকার করে রেখেছেন….
কোন দিকে যাবেন লেখক,ঢাকায় যাওয়াও জরুরী আবার এখানে নব সমস্যায় না গেলেও একটি কচি মনের অপমৃত্যু,অবশেষে ঘড়ির কাটা দেখে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে লেখক বেড়িয়ে পড়লেন একটি শুভ কাজের অশুভ পশুর হাত থেকে নাবালিকার সুন্দর জীবনটাকে বাচাতে।
-চলো দেখি….
গ্রামের সবুজ গাছপালা যেন তার প্রখড় রৌদ্রের তাপদহের শীতল সঙ্গী তবুও লেখকের কপাল বেয়ে ঘাম ঝড়ছে।চলার পথে সঙ্গী হন সেই দুই রিপোর্টার সহ আরো কিছু এলাকার সচেতন ব্যাক্তি।
বেশ আয়োজন,গ্রামের মধ্যবিত্ত বিয়ের মত কলা গাছে রঙ্গীন ঘুর্ড্ডির কাগজ কেটে ডিজাইন বানিয়ে বরের গেইট, বাড়ীর পুরো উঠোন জুড়ে হরেক রকম রঙ্গীন কাগজে রশি দিয়ে টাঙ্গীয়ে সাজানো বিয়ের আয়োজন।আজ তার গায়ে হলুদ আগামীকাল শুভ কাজ।তাই মেহমান বলতে তেমন লোকজন নেই মাতাব্বরের কিছু চামচা আর ঘরের আত্ত্বীয় স্বজন।তাদের বাড়ীর ভিতরে ঢুকতে দেখে মেয়ের বৃদ্ধ বাবা এগিয়ে আসেন।
-সালামুআলাইকুম স্যার, আপনি আইছেন গরীবের দুয়ারে, আহেন আহেন বহেন….ঐ সলিম মিয়া সাবের লাইগ্গা চেয়ারতা ঘর থেইক্কা বায়ির কর।
-না না চাচা, এত ব্যাস্ত হবেন না…আমার বসার সময় নেই শুধু আপনার মেয়েকে দেখে আপনাকে ক’টা কথা বলে চলে যাবো।
-তা তো অবে…ঐ জেসমিন কইরে মা এ দিগে আয় তোরে তোর বান্ধবীরা ডাকছে।
মেয়েটিকে গায়ে হলুদ দিচ্ছিল ঘরে মা চাচিরা যেন মেয়েটির মনে কোন আনন্দ নেই, কেননা যা বয়স তার, সে বয়সে বিবাহ কিংবা স্বামী কি সেটা তার বুঝবার জ্ঞান এখনো হয়নি তবে সে এই টুকু বুঝতে পেরেছে হয়তো কালকেই তার পিতৃ গৃহে নিষিদ্ধের ঘোষনা আসবে তাই নয়নে জল যেন ঝরনা, পাহাড়ের বুক চিড়ে কান্নার জল যেন ঝড়নার স্রোতধারা,বার বার চোখের জল মুছতে ব্যাস্ত মেয়েটি, বাবার ডাক শুনে বাহিরে গায়ে হলুদ সহ বেড়িয়ে লেখকের সামনে আসে।
-কি ব্যাপার মেয়ে তুমি কাদছঁ কেনো, আজতো তোমার বিয়ে তুমিতো হাসবে শুধু…..
-বিয়ে হলে কি হয়, স্যার?
বাচ্চা মেয়ের জবাবে কি বলবেন লেখক,বলার কিছুই নেই তার অবুঝ হৃদয়ে সমাজের তথাকথিত মাতাব্বরদের অজ্ঞতা কিংবা হিংস্রতায় জীবনের ক্ষয় বহে আনেন তাতে পুরো জাতিইকেই শর্মিলা করে যায়।মেয়েটিকে মাথায় হাত দিয়ে আদরে নিজের সহানুভুনিতা প্রকাশ করেন।ততক্ষণে মেয়ের বাবা মা সহ উঠোনে লোকজনে ভরে যায়।
-কি ভাবছেন চাচা,মেয়ের কথার উত্তর দিন,মেয়েকে বলুন বিয়ে হলে কি হয়!যে মেয়ে বিয়ের মর্ম বুঝে না তাকে আপনারা বিয়ে দেন কোন জ্ঞানে?
-আমি নিরুপায় বাবা,পূব গায়ের মন্নান আমার কাছে কিছু টাহা পেত হেই টাহা দিতে না পারায় রশিদ মাতবর এই বিয়ার রায় দিছেন।আমি কেমনে মাতবরের কথা অমান্য করি বলেন,
-তাই বলে মেয়ের জীবনকে নষ্ট করে দিবেন?জানেন এর জন্য আপনি আইনত অপরাধী আপনাকে বর্তমান আইনে ৫০ হাজার টাকা জরিপানা এবং দুই বছর জেল হতে পারে?এ ছাড়াও বাল্য বিয়েতে প্রথম শিকার হয় শিশু, দ্বিতীয় শিকার হয় নারী এবং তৃতীয় শিকার হয় সমাজ।এর সুদূর প্রসারী ফল প্রকারান্তরে সমগ্র জাতির উপর গিয়ে পড়ে।
এছাড়া নারীর সঠিক সামাজিকী করণের মাধ্যমে বেড়ে ওঠা এবং পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর সিধান্ত গ্রহণের অধিকার অর্জনে বাধা গ্রহস্ত হন।
-সবই বুঝি বাবা কিন্তু মাতবরতো আমারে ছাড়বে না।
-মাতাব্বরের বিষয়টি আমি দেখব, আপনি এ বিয়ে এক্ষুনি বন্ধ করুন নতুবা এই ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা ভিগড়ে যাবে……
বলার সাথে হৈ করে সব ছোট ছোট স্কুল পড়ুয়া ছেলে মেয়েরা বিয়ে বাড়ীর সাজগোছ ছিড়ে ফেলে বান্ধবীকে ধরাধরি করে কল পাড়ে নিয়ে গায়ের হলুদ সাবান দিয়ে পরিস্কার করে।মাতাব্বরের লোকজন এত লোকজন দেখে নীরবে কেটে পড়েন।এ খবরটি নিউজ হয় স্হানীয় লোকাল পত্রিকায় এ পর হতে সবার নজরে আসেন লেখক সাংবাদিক রায়হান আহম্মেদ।

যৌতুকের বলি ২য় পর্ব দেখুন

0 Shares

১৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ