যৌতুকের বলি ১১তম

মনির হোসেন মমি ১ জুন ২০১৫, সোমবার, ১২:৪৩:১৬অপরাহ্ন গল্প ১৮ মন্তব্য

filtery_one_touch_20150527_005847নতুন অতিথি আসবে
মাতৃত্তের স্বাদ নিতে উদগ্রীব এক নারী
যৌতুকের অত্যাচারে অতিষ্ট,
ঘূণে ধরা সমাজের নিয়ম নিতীর বলি।
ফুলী কবিতার বই পড়ছেন নীরব শব্দে মনের কোণে আশা জাগাচ্ছেন একটু একটু করে আগত সন্তান যেন ধরণীতে প্রবেশ করাতে পারেন সহি সালামতে।লোকে বলে এ সময় গর্ভিত মহিলারা যত ভাল কাজ আর ভাল কিছু দেখবেন,পড়বেন ততই আগত সন্তানের মঙ্গল হয়।
শক্ত কাজ কিংবা ভারি কোন বস্তু বহন করা ঠিক নয় তার ফল আগত সন্তানের উপর পরবে।কিন্তু ফুলীর এমন পোড়া কপাল যে একটু বিশ্রামে গেলেই জাল-ননদী চিৎকার করে উঠেন..”বলি ও জমিদারের বেটি তোর কাজ কি ভূত এসে করবে,নাকি তোর মা বাবা এসে করে দিবে ইত্যাদি বাবা মা তুলে অকথ্য গালিগালাজ করেন প্রতিনিয়ত উঠতে বসতে খাইতে নাইতে।
প্রতিদিনের মতো আজও তাদের অত্যাচারের মাত্রা কমায়নি হঠাৎ ননদী এক বস্তা কাপড় চোপড় এনে ফুলীর সামনে ফেলে হুকুম করলেন “জলদি কাপড়গুলো ওয়াস করো।ফুলী নিরুপায় হয়ে কবিতার বইটি রেখে তা নিয়ে কলপাড়ে যায়।ঠিক সেই মুহুর্তে তার বাবা আসেন দই আর মিষ্টি নিয়ে তত ক্ষনে ফুলী কাপড়ে জল ঢেলে কাপড় কাচছেন।ফুলী বাবাকে দেখে তরিৎ উঠে পায়ের ধূলো মাথায় নেন।বাবাকে এত দিন পর দেখে তার দুচোখের কোণে কষ্টের লোনা জল জমা হয়।বাবাকে গরমের কারনে উঠোনে চেয়ারে বসতে দেয় ঠিক সেই সময় তার শশুড় মশাই ওজুঁ সেরে নামাজে যাবেন।ফুলীর বাবাকে দেখেও না দেখান ভান করে চলে যাচ্ছিলেন ফুলীর বাবা তাকে ডাক দেন।
-আসসাআলামুআলাইকুম বিয়াই….
সে ফিরে তাকালেন এবং অনেকটা বুকে তীর বিদ্ধ হওয়ার মতো ঠাট্টার সূর দেন।
-বিয়াইতো. মনে হয় চিনতে পারেননি।
-হ ঠিকই, তোমার পোষাক আষাক দেইখাতো মনে হয়ছিল …কোন ফকির টকির হবে।
-ফকির হইলেও আপনার বিয়াই….
তেমন আর কোন কথা না বাড়িয়ে তাড়া তাড়ি করে নামাজ পড়তে মসজিদে চলে গেলো সে।ফুলীর শাশুড়ী তাকে ভাল মন্দ জিজ্ঞাসা করেন ফুলীকে কিছু খেতে দিতে বললেন এবং তার মেয়েকে মিষ্টি দইগুলো ঘরে তুলে রাখতে বললেন।
-বিয়াই সাহেব আপনি বসেন ফুলীর সাথে কথা বলেন আমি রান্না ঘরে যাচ্ছি…এখনি যাবেন না কিন্তু খাওয়া দাওয়া করে তার পর যাবেন।

আকমল মনের আনন্দে বাড়ী ফিরে শশুড় মশাইকে দেখে কদমুছি করেন।তার পর শশুড়ের সাথে তার বিদেশ যাবার ব্যাপারে কথা বার্তার এক পর্যায়ে শশুড় কোমড়ের বাইট্টা বের করে জামাইয়ের হাতে দেন।
-এখানে ফুলীর মায়ের জমানো কিছু টাকা আছে,এটা রাখো….আমি বাবা পারলে তোমাকে কম দিতাম না।
-কি যে কন আব্বা, আমি কি চেয়েছি নাকি?কে বলছে টাকা দিতে….নিশ্চয় ফুলী?
-না না ফুলীও বলেনি তবে বিদেশ যাওয়ার মনঃস্থির করেছো তা বলেছিল।তাই ভাবলাম যদি কিছু উপকারে আসে।
নামাজ শেষ করে ফুলীর শশুড় বাড়ীর উঠোনে প্রবেশ করেন এবং টাকা দেবার বিষয়টি প্রত্যাক্ষ করেন।তাদের কাছা কাছি এসে টাকার থলেটা হঠাং চিলের মতো ছোঁ মেরে আকমলের শশুড়ের হাত হতে নিয়ে নেন।
-না করার কি আছে বেটা,সবাই মিলে মিশেতো সমস্যার সমাধান করতে হয়।
সুখের কথাগুলোর মাঝে বিষ ছিল আলমাছ মিয়া কখনো তা ভাবেননি তাইতো বিয়াইয়ের রসিকতার সাথে এই প্রথম গাল ফুলে হেসেছিল তার অন্তর।মোড়ল টাকার থলেটিকে হাতে নিয়ে নাড়া চাড়া করে আরো কিছু মুখ থেকে  কথার রস ছাড়লেন।
-এতো ভারি কে?মনে হয় মেলা টাকা!
এবার সে থলের মুখটি খোলেন এবং এক এক করে টাকাগুলো বের করতে থাকেন আর মিট মিট করে শয়তানের হাসি হাসেন।
-এটা কত টাকার নোট?৫০০ টাকার,বেশ বেশ…আর আর এটা ১০০টাকার……
এবার সে থলের ভিতরেই নাড়া চাড়া করছেন আর অত্যান্ত বিচক্ষনতায় মুখ কচলাতেছেন।তারপর!
-ও মা এতো দেখছি সব পাচ টাকা দশ টাকা আর কত গুলা পয়সার ঝুড়ি!
মোড়ল তার চোখে মুখে রাগের অগ্নিমূর্তি ধারন করে থলেটাকে ঢিল দিয়ে ছুড়ে দিল ফুলীর পিতার মুখ মন্ডলের দিকে ঠিক সেই সময় ঘর হতে দই মিষ্টি গুলো ট্রেতে সাজিয়ে আনছিলেন ফুলী তাদের আপ্যায়নে।পিতার সাথে শশুড়ের এমন করুন দৃশ্য দেখে তার হস্তদ্বয় কম্পনে তা পড়ে ছিটকে ছড়িয়ে গেল বাড়ীর উঠোনে যেন সুখের অনুগুলো দ্রুত মিশে যাচ্ছে মাটির সাথে।
-এ তো ফকিন্নির চেয়েও অধম রে…যে ভিক্ষা করে বেড়ায় সেও জামাইকে বিদেশ যেতে এর চেয়ে বেশী দেয়।যত্ত সব ফইকরা গোষ্টি…বলে সে সেখান থেকে প্রস্থান নেন।

ফুলী দৌড়ে পিতার পাশে এসে দাড়ায় কিছু ক্ষণ পর আকমলও শশুড়ের পাশে দাড়ায়।পিতার চোখের জল মুছে দেন ফুলী।আকমল শশুড়কে শান্তনা দেবার ব্যার্থ চেষ্টা করেন।শাশুড়ী তার কাছে এসে কর জোড়ে ক্ষমা চাচ্ছেন।
-বিয়াই….কিছু মনে করবেন না আসলে উনি এমনি শুধু শুধু……যে কাউকেই যা তা বলেন।
-না না না মনে করার কি আছে,গরীবের চেতবেত কিছু মনে করার থাকতে নেই…হয়তো বিয়াই সাহেব বুঝতে পারেননি।
চোখে কষ্টের লোনা জলগুলো মুছে থলেটার ভিতরে হাত দিয়ে আলমাছ সাহেব একটি ব্যাংক চেক বের করলেন।আকমল অবাক! অবাক তার মা।এক লক্ষ টাকার একটি চেক।ফুলীর মায়ের সারা জীবনের বিক্রীত মুঠ্ঠি চাউলের জমানো টাকা।আর ফুলীর ছোট ভাইয়ের মাটির ব্যাংকে জমানো খুচরা টাকা পয়সাগুলো নিয়ে বড় আশা করে এসেছিলেন ফুলীর শশুড়বাড়ীতে তার জামাইয়ের বিদেশ যাবার টাকায় শেয়ার বসাতে।শখের সেই শেয়ারটি আজ চোখের জলে ভাসিয়ে দিল।
-যাকগে…তা কোন তারিখ দিয়েছেন,কবে যাবে?
-বাবায়তো সে কথা বলার সুযোগই দিল না।আজ রাতেই ফ্লাইট…মধ্য রাতে ১২টায় ফ্লাইট।
-বলো কি আমি আজ না এলেতো তোমাকে দেখতেই পেতাম না।
-না..মানে বন্ধুকে নিয়ে আজ অফিসে টাকা জমা দিতে গেলে.. ওরা হঠাই ফ্লাইট দিলো,চেষ্টা করেও সময় নিতে পারলাম না।
কথা শুনে আকমলের মা বোন ভাই ভাবী এমন কি ছোট ভাতিজীও অবাক হন।
-চাচ্চু তুমি আজ রাতই চলে যাবে…?
আকমল ভাতিজিকে কোলে নিয়ে চোখের জল ছেড়ে দেন।
-হ্যারে মা,আজই…..(চোখের জল মুছে দেয় ভাতিজি)বিদেশ থেকে তোমার জন্য লাল টুকটুকে একটি পুতুল জামাই নিয়ে আসব… কেমন?
-আমার কিচ্ছু লাগবে না…তুমি তাড়াতাড়ি ফিরে এসো তবে তুমি চলে গেলে আমাকে আদর করবে কে?
-কেনো তোমার চাচ্চি আছে না….
-চাচ্চীতো সারা দিন কাজ নিয়াই থাকে…।
ফুলী এসে ভাতিজিকে কোলে নেন।এবং বিশেষ এক আক্ষেপ নিয়ে আকমলের দিকে তাকায়।আকমলের হঠাৎ বিদায়ের কথা শুনে সবাই কেমন যেন আনমনা হয়ে উদাসী উদাসী।ঐ দিকে ঘরের ভেতর হতে মোড়লের ডাক যেন কারো কানেই যাচ্ছে না অগত্যা মোড়ল তাদের কাছে এসে যেন অগ্নিশর্মা বনে গেলেন।
-কি ব্যাপার তোমাদের হলোটা কি!আমি এত জোরে জোরে ডাকছি, কারো কোন সারাই নেই!!!!।
-আকমল আজ রাতেই চলে যাবে।
আকমলের মায়ের এমন কথা শুনে মোড়ল আশ্চর্য্য হবেন তো দূরের কথা শান্তনা কিংবা পিতৃ স্নেহের অনুভূতির বিন্দুমাত্র লেশ নেই তার হৃদয়ে।এমন পাষান্ড পিতা ইহ জগতে কমই জন্মায়।
-তাতে কি হয়েছে,চলে যেতে হলে চলে যাবে, এতে এমন মুখ গোমড়া করে রাখার কি আছে!
পিতার এমন কঠিন হৃদয়হীন কথা শুনে মায়ের চোখে পানি এসে যায়।মাতৃত্তের আবেগকে শেষ পর্যন্ত সে কন্ট্রোল করতে পারলেন না।দীর্ঘ সংসার জীবনের ইতিহাসে মা হয়তো এই প্রথম বাবার মুখের উপর শক্ত করে কথা বললেন।
-আপনি মানুষ না আর কিছু…ছেলেডা দূর দেশে চলে যাচ্চে আর আপনি পাষানের মতো কথা বলছেন…আপনার মনে কি একটু দয়া মায়া মমতাও নাই…।
মা ঝর্না ধারার ন্যায় চোখের জলে মুখে আচলঁ চিবে আবেগকে প্রসুমিত করতে দৌড়ে ঘরে চলে গেলেন।
মোড়ল এদিক সে দিক তাকিয়ে ফুলীকে ওজুর জল দিতে বললেন।ফুলীর বাবা কিছু ক্ষন চুপ চাপ থেকে চলে যাবার প্রস্তুতি নিয়ে জামাইয়ের মাথায় কি যেন পড়ে ফু দিলেন।
-আমি চলে যাচ্ছি…তয় বাবা তুমি চলে গেলে ফুলীকে আমি নিয়ে যাবো।আমার বাড়ীতে কিছু দিন থেকে আসবে।
ফুলীর কাছ হতে তার শশুড় ওজুর পানির বদনাটা নিতেই ফুলীর বাবার এমন কথা শুনে কর্কস ভাষায় আরো কিছু অপ্রত্যাশিত কথা বললেন।যা ফুলীর পিতার হৃদয়ে দ্বিতীয় বার তীরের মতো আঘাত করল।
-কেন?আমার বাড়ী কি বন্যায় ভেসে গেছে নাকি?নাকি আমি ফকির যে পোলার বউকে খাওয়াতে পারব না?
-না না বিয়াই আমি দু এক দিন রেখেই নিয়ে আসব।
-নাঃ !!!এক মুহুর্তের জন্যও না….।
-ঠিক আছে আপনার যেমন মর্জি……..
ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ফুলীর পিতা আলমাছ মিয়া তার শশুড় বাড়ী থেকে প্রস্থান নেন।খাবার খেয়ে যেতে বললে সে অন্য অজুহাত দেখিয়ে চলে আসেন।
মাগরীবের আযান শুনা যাচ্ছে মসজিদে মসজিদে।কিছুক্ষণের মধ্যেই পৃথিবী নিষ্ঠুরতার আধারের নিয়ে যাবে পৃথিবীর আলোকিত মানুষগুলোকে।জগতের সব সুখ দুঃখগুলোকে হৃদয়ে হৃদয়ে ভাগ বাটোয়ারে ব্যাস্ততায় কপত কপোতিরা নিদ্রায় যাপিত হবেন।

11147856_1423611931286600_6353615929003992374_nগ্রাম্য রজনী সাধারনতঃ এশার আযানের পর পরই ঘুম রাজ্যের আগমন ঘটে, প্রায় প্রতিটি মানবের উপর।সারা গ্রামে জগৎকুল গভীর ঘূমে মগ্ন শুধু তন্দ্রা হারা যেন আকমল-ফুলী।সেই রাতে তাদের বাড়ী আরো যারা জেগে ছিল তারাও যেন অর্ধ ঘূমন্ত।বেশ ঘন্টা খানেক নিশ্চুপে আকমল দম্পত্তি।আকমল রিপুর তারনায় আধো ঘুমে ছটফট করছেন কিছুতেই দুচোখের পাতা এক করতে পারছেন না।ফুলী আকমলের মাথা বরাবর হাটু গেড়ে বসে তাল পাখা হাতে নিয়ে বাতাস করছেন যেন স্বামী সেবা ব্রত পাকা এক বঙ্গ রমণী।কয়েক বছর পূর্বেও যে মেয়েটি রান্না-ভারা ঘর সংসারী কিছুই বুঝতো না সে আজ পাকা ঘরণী।হয়তো বিধাতা নারীদের মাঝে সাংসারিক হবার একটি বিশেষ গুণ দিয়েছেন যাতে নারীরা যে কোন পরিস্থিথিতিতে পুরুষের সহযোগিতা করতে পারেন।
-আপনার ঘুম আসছে না?….মাথায় হাত বুলিয়ে দেই……।
ঘরে দক্ষিনা জানালা খোলা তা দিয়ে পূর্ণিমার স্নিগ্ধ চাদেঁ মিষ্টি আলো আকমলের চোখেঁ পড়ে।ফুলীর কথার উত্তর মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলেন।ফুলী তার মাথায় হাত বুলাচ্ছেন আকমল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন যৌবনবতী চন্দ্রিমার দিকে।
আকমল এবার ঘুম থেকে উঠে ফুলীর সম্মুখ বরাবর বসেন।
-কি ব্যাপার আপনি উঠছেন কেনো?
-হুম!ঘুম আসছে না…..আচ্ছা এইতো আর কয়েকটা ঘন্টা পর হয়তো আল্লাহ চাহে তো দূর দেশে চলে যাবো…চলে যাবার আগে তোমার মুখে অন্তত এক বার আমাকে তুমি বলে ডাকবে…আমার সাথে কথা বলবে তুমি সম্মোধনে।
-হায় হায় কয় কি!অমন কথা কইবেন না, তাতে আল্লাহ বেরাজ হবেন।
-তুমিতো দেখছি পাকা গাও গেরামের বউগোর মতো কথা কও,….ভাবো।
-না ভাবলে কি চলে, বলো?যতই শিক্ষিত হই আমাদের কালচারতো আমাদের মানতে হয়।
আকমল হঠাৎ হাসছেন তা দেখে ফুলী অবাক হয়ে প্রশ্ন করে নিজেই নিজের কাছে ধরা পড়ে যান।
-আপনি হাসছেন কেনো?
হাসি লেগেই আছে আকমলের মুখে।
-তুমি বুঝতে পারোনি?
-নাতো!
-ঐ যে বললে,না ভাবলে কি চলে….বলো।
ফুলী বুঝতে পেরে লজ্জাবতী পাতার মতো লজ্জায় ঘোমটা দেন মাথায় আর মনের গহীনে লোকায়িত সুখের অনুভূতিগুলো প্রকাশ পায় তার চেহারার মাঝে।মনের আনন্দে হাসির মাঝে কখন যে আকমল ফুলীর ঠোট কামড়ে ধরলেন বুঝতে পারেননি যখন রোমান্টিজমের তীব্রতা অনুভূত হয় তার হৃদয়ে তখন ফুলীর মুখ হতে বেরিয়ে আসে একটি শব্দই “যাহ!দুষ্ট….।
চলবে…

যৌতুকের বলি ১০তম পর্ব

৩৯৫জন ৩৯৫জন
0 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ