যৌতুকের বলি ১০ম পর্ব

মনির হোসেন মমি ৪ মে ২০১৫, সোমবার, ০৯:১২:২৮অপরাহ্ন গল্প ১৮ মন্তব্য

bhhbhhপৃথিবীতে এই উপ মহাদেশে বিশেষ করে আমার সোনার বাংলাদেশে নারীদের আত্ব ত্যাগ তুলনাহীন।জীবনে চলার পথে ঘাত প্রতি ঘাতের মাঝে পৃথিবীতে নারীরা কন্যা জায়া জননী রূপে আর্বিভুত হন।এই বিচিত্র রূপের অধিকারী নারী তার সাধ্যমত চেষ্টায় ঘূণে ধরা সমাজের ভিন্ন ভিন্ন স্তরে নিজেদেরকে সহজেই মানিয়ে নেন।এই মানিয়ে নিতে তাদের মাঝে কাউকে দেখা যায় অগ্নি মূর্তি এক রাক্ষুসী কেউ বা হয়ে যান কোমল মতি মায়াবতী আত্ব ত্যাগী এক বঙ্গ ললনা।
আজ চার দিন পর আকমল ঢাকা থেকে এসেছেন নিজ গৃহে ভালবাসার মানুষটিকে মনে হয়েছিল সে কত দিন ধরে দেখেন তাইতো বাড়ীতে প্রবেশ করে ফুলীকে নাম ধরে ডাকছেন।ফুলী আসবার পূর্বেই তার ছোট বোন এবং ছোট ভাতিজি তার সামনে আসেন।ভাতিজিকে কোলে তুলেন নেন আকমল।বোনকে তার ব্যাগটি তার ঘরে রাখতে বলেন ।এরই মাঝে ফুলী তার সামনে এসে তার পা ছুয়ে সালাম করেন তা দেখে তার ভাবী এবং ফুলীর ননদীরা দূর ঘরের চৌকাঠটিতে দাড়িয়ে নিঃশব্দে মুখে ভেংচি কাটেন।
ফুলি তার শাড়ীর আচঁলের ঘোমটা আজ একটু বেশী করে দিলেন যাতে তার কপাল এবং চোখ বরা বর তার শশুড়ের দেয়া আঘাতের চিহ্নটি সে বুঝতে না পারেন।স্বামীর মন স্ত্রী যতই গোপন করার চেষ্টা করুক তা ধরে ফেলবেন, স্ত্রীর মন মানষীকতার চাল চলন দেখেই।
-কি ব্যাপার তুমি আমার সামনে এত বড় ঘোমটা দিয়েছো কেনো?
-কৈ... এইতো অভ্যাস হয়ে গেছে..বলেই যেই ঘোমটার পরিধি একটু খাটো করতে যাবেন অমনি পুরো ঘোমটা মাথা হতে সড়ে যায়।আমকলের নজর পড়ে তার আঘাতের দিকে।
-কি ভাবে হলো...?
-কি?
-দেখো আমার সাথে ভনিতা করো না..আমি বলছিলাম তোমার চোখ বরাবর আঘাতটা কি পাবে পেলে?।
আশে পাশে দাড়ানো মা ভাবী ছোট বোন ছোট ভাই সবাই যেনো একটু ভয় পেয়ে গেলেন।ফুলী যদি সব বলে দেয়!তাদের দিকে ফুলী তাকাচ্ছিলেন,অদৃশ্য ভাবে কেউ হাত জোড় করে কেউ বা ইশারায় সত্য বলতে অনুরোধ করছেন।আকমল অবাক এত ক্ষন হয়ে গেলো ফুলী তার কোন উত্তর দিচ্ছেন না।
-কি বলবে না?
-না মানে...ঐ কল পাড়ে কল চাপ দিতে গিয়ে ডান্ডাটা হঠাৎ হাত পিছলে লেগে যায়।
সবাই যেনো বিপদ মুক্ত হয়ে একটি করে দীর্ঘ নিঃস্বাস ছাড়লেন।এর মধ্যে ছোট বোন দৌড়ে কাছে এসে ভাইয়ের কাছে ভাল মানুষ সাজতে ব্যাস্ত।
-আর বলো না ভাই, আমি ভাবীকে কতো করে বললাম যে দাও ভাবী আমিই পানি আনছি..... সে শুনলো না।এখন হলোতো নিজের কপালটারে ফাটালেন।
ফুলী যেনো আর কথা না বলে থাকতে পারলেন না।সে ননদীকে টিপ্পুনী কেটে বুঝিয়ে দিলেন তারা কত ভালো মানুষ।
-হ,...কপাল যাদের জন্ম লগ্নেই ফাটা সে আর যত্ন করে কি হবে।
-ঠিক আছে....ঠিক আছে একটু সাবধানে কাজ করিও.....ইস্ ...আর একটু হলেতো চোখটাও যেতো।..চলো, ভিতরে চলো।
মা সামনে আসতেই মাকে সালাম করেন আকমল।
-কেমন ছিলে মা?
মায়ের চোখে জল আকমল অবাক।
-কি ব্যাপার মা তুমি কাদছো!
মা কাপড়ের আচলে চোখ মুছতে মুছতে।
-কৈ...ঐতো রান্না ঘর থেকে এসেছি...চুলার ধুয়ায় হয়তো.....ঠিক আছে চল..হাত পা ধূয়ে নে।বৌমা ওর জন্য ভাত বেড়ে দাও।
খাবার শেষ করে আকমল বাহিরে তার বন্ধুদের সাথে কথা বলে অনুমানিক রাত আটটায় বাড়ী ফিরে সে।খুব খুশির খবর নিয়ে এসেছে সে তাই চমকে দিতে ঘরে প্রবেশ করেন অত্যান্ত গোপনীয়তায়।ঘরের দরজাটা আবজানো পেয়ে খুবই সর্তকতায় ভিতরে ঢুকে লক্ষ্য করলেন তার প্রিয়তমা খাটে বসে ছোট সাইজের কাথাঁ মানে ছোট শিশু বাচ্চাদের উপরে দেয়ার জন্য কাপড় দিয়ে তৈরী করছেন লেপ বিশেষ আরামদায়ক বস্ত্র।
আকমলের হাতে একটি লাল গোলাপ নিয়ে ফুলীর পিছন থেকে হঠাং তার পৃষ্ঠ দেশে ডান হাতের তালুতে হালকা থাপ্পরের মতো স্পর্শ পেতে ফুলী চিৎকার করে উঠেন।আকমল অবাক হন সে তো তেমন জোরে আঘাত করেননি তবে ফুলী কেনো সামন্য আঘাতে এতোটা জোরে চিৎকার করে উঠলো!।ফুলী আকমলকে দেখে নিজেকে কন্ট্রোল করে নিজ কাজে ব্যাস্ত আকমল তার সামনে মুখ বরাবর বসেন।ফুলী আকমলের চোখ বরাবর একবার তাকিয়ে তৎক্ষনাত চোখ ফিরিয়ে নেন।ফুলী যেনো বুঝতে পারেন এ আকমলের চোখ যেনো ভয়ংকর কোন প্রশ্নের উত্তরের মুখোমুখী তাকে দাড় করাবেন।
-তোমার ব্লাউজটা খোলও।
ফুলী অবাক হন এমন প্রশ্ন শুনে সেও রসিকতা করেন আকমলের সাথে।
-এখনো তেমন রাত হয়নি...সবাই জেগে আছে।
-তাতে কি, বউকে কি কেবল গভীর রাতেই আদর করতে হবে...বিবাহিত জীবনে এমন কোন ধরা বাধা নিয়ম আছে নাকি?
বলে আকমল আবারো পিঠের মাঝা মাঝি হাত দিতেই ফুলী ইস্ করে উঠেন।আকমল বুঝতে পারেন এখানে কিছু একটা কারন আছে কিন্তু সরল মনা ফুলী যেন তাকে এড়িয়েই যাচ্ছেন।ঐ দিকে তার ছোট বোন,ভাবী বাহিরে আড় পেতে শুনছিলেন তাদের কথপোকতন।
-কি হলো যা বলছি তা করছো না কেনো?তাহলে কি আমি জোর করেই......।
আকমলের এমন জোর আবদার যে ফুলী তৎক্ষনাত হাতের কাজ রেখে তার পায়ে গিয়ে পড়েন।চোখের জল গড়িয়ে পড়ে মাটিতে।
-আপনি আর বাধ্য কইরেন না কিছু বলতে আমি তা পারব না...আমারে ক্ষমা করে দেন।
সংযত হয়ে আকমল তার পায়ে পড়া ফুলীকে আগলে তুলেন এবং কিছুটা আশ্চর্য্যও হন।
-উঠো..ঠিক আছে, উঠো তুমি বলতে না চাইলে,.... তাই হবে।
ফুলীকে খাটে বসাল আকমল এবং আবারো তার চোখে চোখ রাখতেই ফুলী চোখ ফিরিয়ে নেন।আকমল আবারো কিছু প্রশ্ন করে যার উত্তরে সে বুঝতে পারেন কি হয়েছিল তার পৃষ্ঠ দেশে।
-আমি তোমার কে?
-স্বামী,
-তুমি আমার কে জানো,,,, অর্ধাঙ্গিনী,এর মানে বুঝো?তুমি না লেখা পড়া করেছো?তুমিতো আমার চেয়েও ভালো জানবে স্বামী-স্ত্রীর মূল অর্থটা কি।
-জানি,সবই জানি তবে এর মাঝে পরিবারের শান্তি রক্ষার্থে অনেক বিষয় থাকে যা স্বামীকে বললে সংসারে অশান্তি আসবে আর সেই অশান্তির কারন হতে কোন বাঙ্গালী রমণীই তা চায় না, আমিতো তাদেরই প্রতিনিধি।
-কাদের জন্য তুমি ত্যাগ স্বীকার করবে যারা তোমার ক্ষতি করতে সব সময় উদগ্রীব!তাদের?।
-ত্যাগহীন জীবনে কোন সফলতাও আসে না।
-বুঝি না তোমার তত্ত্ব কথা,....তবে কথা দিচ্ছি....এই তোমার মাথা স্পর্শ করে বলছি তুমি শুধু তোমার পিঠটি দেখাও আমি দেখতে চাই সেখানে কি এমন হয়েছে যার জন্য আমি সামন্য স্পর্শ করাতে তুমি এতোটা আঘাত পাও।কথা দিচ্ছি প্লিজ, নতুবা আমার মন শান্তি পাবে না শুধু এক বার একটি নজর দেখবো।
দু'জনের মনের গহীনে জ্বলছে ভালবাসার আগুনের তীব্রতার প্রতিযোগিতা।কে কতটা আগুনে পুড়ে কষ্টের কষ্টি পাথরে যাচাই করে ভালবাসার গাঢ় বন্ধন সৃষ্টি করতে পারবে।ফুলী তার পৃষ্ঠদেশটি ধীরে ধীরে উম্মুক্ত করেন,আকমল তার দৃষ্টিকে বিলিয়ে দেয় তার আঘাতে ক্ষত চিহ্নের দিকে।
...ইস্ কতটা অমানুষ হলে এমন ভাবে কেউ কাউকে বেত্রাঘাত করে!বেতে প্রতিটি আঘাত যেনো দু পাড়ের মাঝে তীব্রতার চিহ্নের নদী প্রবাহিত হয়ে সারা পিঠে একে বেকে ক্রসের আঘাত মানচিত্রের ন্যায় রেখা একেঁ স্পষ্ট  যায়।
মুখের ভাষা যেনো ক্ষণিকের তরে দুজনের কন্ঠ হতে বিরতী নিয়েছে শুধু অঝোর ধারায় ঝড়ছে চোখের জল।সে বুঝতে পারেন এই আঘাতের বেতটি কার ছিলো,জম্মদাতা পিতা না হলে আজ সে কোন বাধাই মানতো এর উচিত শিক্ষা সে দিয়ে দিতো।
বেশ দীর্ঘ সময় তাদের মাঝে নীরবতায় আকমলের মনে জাগে ঘৃণা ক্রোধ আর ত্যাগের মহিমার দৃষ্টান্ত এক বঙ্গ রমণীর নিঃস্বার্থ পারিবারিক বন্ধনের কথা।
ফুলী নিজেকে গুছিয়ে নেন এবার নিজেই তার প্রিয়ার চোখে চোখ রাখেন "জল টল টলের মাঝে গড়িয়ে পড়া চোখের অশ্রু, অগ্নিমূর্তি ভাবার্থ লাল দুটি চোখ ফুলীকে নীরবেই জানিয়ে দেয়, সেই তোমার প্রকৃত গন্তব্যস্থান যেখানে আছে অফুরান খাটি ভালবাসা পাবার গ্যারান্টি"।
তখন কিছুক্ষনের জন্য একে অপরকে জড়িয়ে ধরে জীবনের পরম তৃপ্তি লাভে সচেষ্ট হন।তা দেখে ননদী ভাবী প্রস্তান নেন এবং মনে মনে ভাবেন যাক বাচা গেলো।তারপর..
-আপনার ঢাকার কি খবর?
-ভালো,সব কিছুই রেডি হয়তো দু চার দিনের মধ্যেই আমাকে ফ্লাইট দিবে।আজ সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম বন্ধুটির কাছে সেই কথা বলে কনফার্ম করলো।কিন্তু আমি ভাবছি তোমার কথা......আমি চলে গেলে তুমিতো একা হয়ে যাবে।
-যাদের স্বামীরা মাসের পর মাস বছরের পর বছর বিদেশ থাকে তারা কি সব মরে যায়!নাকি স্বামী ঘর থেকে পালিয়ে যায়।
এবার একটু মুচকি হেসে স্বামীর শার্টের বুতার খোলতে খোলতে বলতে থাকেন কতো বুঝধার কথা।আকমল অবাক হন হায়রে রমণী তুমি এতো গুণি,কতোটা সহজেই যে কোন পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নাও।এর মাঝে আকমলের চোখ পড়ে ফুলীর সেই আধা হাতের কাজ কাথার দিকে....সে সেটি হাতে নেন।
-বাহ্ খুব সুন্দর তো....এতো ছোট কাথা কার জন্য?
-কারো জন্য নয়।
-তবে!
uyfufফুলী মাতৃত্ত্বের তৃপ্তি হাসিটা দিয়ে ইশারায় উদরে আসা নতুন অতিথীকে ঈঙ্গিত করতেই আকমল খুশিতে ফুলীকে দু'বাহুতে জড়িয়ে উপড়ে তুলে অট্ট্রো হাসিতে ফেটে পড়েন।ফুলী বার বার বলছেন...এই ছাড়ুন কি করছেন..পড়ে যাবতো!আর এতো রাতে সবাই কি ভাববেন বলেন তো!।

চলবে...

যৌতুকের বলি ৯ম পর্ব পড়ুন

0 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ