যে মায়ের সন্তানেরা

ভায়লা সালিনা লিজা ৩১ জানুয়ারী ২০১৬, রবিবার, ১২:৫৭:৫৫অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৮ মন্তব্য

আম্মাকে সবেমাত্র এন্ডোসকপি করতে ভেতরে নিয়ে গেলো। আমি আম্মাকে রেখে এসে ওয়েটিং রুমে এসে বসে পড়লাম। বসে চুপ করে বই বের করে পড়তে থাকি। দুদিন ধরে ঘুম হচ্ছে না রাতে। হয়ত ক্লান্ত বলেই বইয়ে মন বসে না। ঘরে দুজন বয়স্ক স্বামী-স্ত্রী ঢুকলেন। চোখ বন্ধ করে বসে আছি উনারাও বসে আছেন। হঠাৎ ভদ্রলোক স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন রাত্রে খাওয়া দিসিল তোমারে বউমা? মহিলা মুখ কালো করে বললেন অমন কপাল কি আমার আছে? খিদা লাগছিল পরে একটা ডিমের কুসুম ফালাইয়া ভাইজ্জা খাইছি একটা রুটি দিয়া। ভদ্রলোক জোরে নিঃশ্বাস ফেলে মন খারাপ করে বসে রইলেন। কিছুক্ষন চুপ থেকে ভদ্রমহিলা আবার বললেন আমার যদি ক্যান্সার হয় তোমার পোলারে কইয়ো না। তাইলে আমারে দেশে পাঠাইয়া দিব। স্বামী বললেন শুধু তোমারে না আমাগো বুড়া-বুড়ি দুইজনরেই পাঠায়া দিব। আমি চুপ করে উনাদের কথা শুনছিলাম। মনটা খারাপ হয়ে গেলো।

ভদ্রলোকের হাতের ফাইলটা নীচে পড়ে যেতেই আমি ফাইলটা তুলে যেতে যেতে বলি আমি উঠাচ্ছি আপনি বসুন আঙ্কেল। দুজনে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। ফাইলটা হাতে তুলে দিয়ে বসবার পর টুকটাক কথা হলো। কখনো হেসে কখনো গম্ভীর আর বিষণ্ণ হয়ে কথা বলে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন কোথায় থাকি, কি করি, এখানে কেন এসেছি। বললাম আমার আম্মাকে নিয়ে আসছি। উনি ভেতরে আছেন। ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন আল্লাহর কাছে ভালো পাবা মা। আমাদের ছেলে আমাদের তিন বছর আগে দেশ থাইকা আইনা এখন আমারে দিয়া সব করায়। তাগো পুরানা মেট্রেসে ঘুমাইতে দিসে রাইতে শুইলে উলুসে কামড়ায় বলে হাত বের করে দেখান, কোনদিন জিগায় নাই খাইছি না খাই নাই। দুইটা পয়সা হাতে দেয়না। পাশে থেকে আঙ্কেল আন্টিকে থামতে বলে বলেন এতো কথা কইয়ো না আমাগোই তো সন্তান। ভদ্রমহিলা চুপ করে গেলেন। আঙ্কেল আন্টির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন মন খারাপ কইরোনা। তোমার শরীর ভালো না হউন পর্যন্ত আমি ঘরে সব কইরা দিমু। তুমি আগে সুস্থ হও।

চুপচাপ তখনও উনাদের কথা শুনে যাই। কিছু বলবার ভাষা খুঁজে পাইনা। আমরা সন্তানরা দেশ থেকে বাবা মাকে বুড়ো বয়সে এদেশে নিয়ে আসি। প্রথম প্রথম খুব আদর যত্ন করি এরপর শুরু হয় আমাদের বাবা-মা’র প্রতি অবহেলা। বসে বসে আমার মায়ের কথা ভাবি। প্রতিবার ঈদে আম্মা পায়েস রান্না করে খুব কাঁদেন উনার দু’ছেলের জন্য। আমাকে খেতে দিয়ে বলবেন, বাদল সোহাগ আর তোর খুব পছন্দ এই পায়েস। ভয়ে বলতে পারেননা দু’ছেলের নাম পাছে আমি রেগে যাই কান্নাকাটির জন্য। আমার মা সকালে উঠে আমাকে ভাইবারে নাতি নাতনীদের দেখাতে বলেন, দুদামা ডাক শুনার অপেক্ষা করেন, অপেক্ষা করেন ভাইয়ের মুখে আম্মা ডাক শুনার। আম্মা আরো একজনের অপেক্ষা করেন! সে জানেনা বা কখনও তাকে জানতে দেয়া হবে না। আর যখন জানবে বড্ড দেরি হয়ে যাবে।

দাঁত থাকতে আমরা দাঁতের মর্যাদা দেইনা। আমাদের বাবা-মা বেঁচে আছেন তাই আমরা হয়ত তাদের সঠিক মর্যাদা দিতে পারিনা। আবার অনেকে হয়তোবা প্রয়োজনের চেয়েও বেশি মর্যাদা দেন। নার্স মেয়েটা আমাকে ডেকে বলে আপনার মা ডাকছেন। পাশে বসা ভদ্রলোক ভদ্রমহিলাকে কিছু না বলে বেরিয়ে আসবার সময় ভদ্রমহিলা আমাকে বললেন আমার লাইগা দোয়া কইরো মা ক্যান্সার যেন না ধরে; নাইলে পোলায় দেশে পাডাইয়া দিব; দেশে গেলে খামু কি মা? উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে যাই।

আম্মার ঘরে ফেরার পালা। সামনে একটা মহা অন্ধকার দূর পৃথিবী। অবারিত মানুষের সমাজ। আবার যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে দাঁড়াবেন আম্মা এবং আম্মারা। মস্ত পৃথিবীটা তাদের মায়াজালে ম্লান ঘুমিয়ে পড়ে।

৩১০জন ৩১৩জন
0 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ