১৯৭২ – ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধুর সময়ে :
১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ শহীদদের পরিবারবর্গের পক্ষ থেকে পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ঢাকার রাজপথে মিছিল বের হয়। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু জাতির উদ্দেশে দেয়া বেতার ও টিভি ভাষণে পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গটি আবার সামনে নিয়ে আসেন। পাক প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানে আটকে পড়া পাঁচলাখ বাঙ্গালীকে ফেরত দেয়ার বিষয়টি পাক যুদ্ধবন্ধীদের মুক্তির সঙ্গে শর্তযুক্ত করায় শেখ মুজিবুর রহমান এ ভাষণে বলেন, ‘তাদেরকে (পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙ্গালী) ফিরিয়ে দেয়া হোক। এ ইস্যুকে কোনোক্রমে যুদ্ধবন্দীদের সমপর্যায়ে ভাবা চলবে না। কারণ তাদের (পাক যুদ্ধবন্ধীদের) মধ্যে এমন অনেক আছেন যারা শতাব্দীর নৃশংসতম হত্যার অপরাধে অপরাধী। তারা মানবিকতাকে লঙ্ঘন করেছে এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার ভিত্তিতে বিচার হবে।’

১৯৭২ সালের ১৬ মে বঙ্গবন্ধু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে পাক হানাদার বাহিনীর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্দেশ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্ডিন্যান্স প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে কলাবরেটের ( দালাল আইন ) আইনের অধীনে কলাবরেটর-দালালদের বিচারের কাজ শুরু হয়ে গেছে।’

 দালাল আইনে বিভিন্ন বিচার ও সাজা 

এই আইনে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিভিন্ন অপরাধের কারনে গ্রেফতার হয় ৩৭ হাজার ৪৭১ জন। বিচারের পরে প্রায় প্রতিদিনই ঐ সময়ের দৈনিক পত্রিকায় বিভিন্ন দালাল/রাজাকারদের শাস্তির খবর প্রচার হতে থাকে।

*দালাল মন্ত্রী ইসহাক এর যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়। ইসহাক বিএনপি সমর্থিত জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের একাংশের আমির মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক । ইসহাক ১৯৭১ এ পাকিস্থান মালিক মন্ত্রী ছিল। ঐ মন্ত্রী সভায় জামায়াত ইসলামীর ২ জন সদস্য ছিল। দলের বর্তমান জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা আবুল কালাম মোহাম্মদ ইউসুফ অর্থমন্ত্রী এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত আমির আব্বাস আলী খান শিক্ষামন্ত্রী । আবুল কালাম ইউসুফ রাজাকার বাহিনী গঠন করে ।

*কুষ্টিয়া সেশন জজ-৩-এর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কুষ্টিয়া শান্তি কমিটির সদস্য সা’দ আহমদকে পাক বাহিনীকে সহযোগিতা, অপহরণ ও নরহত্যার অভিযোগে এবং কুষ্টিয়া-১১ আসনে সাজানো উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার কারণে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছেন। রায়ে আদালত বলেন, ‘অভিযুক্তের আরও বেশি শাস্তি দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এই জেলার একজন সফল আইনজীবী হিসেবে অতীতের কাজের জন্য তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হলো।’

*কুষ্টিয়ার দায়রা জজ ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল  ৮ জুন ১৯৭২ , রাজাকার চিকন আলীকে মৃত্যু দন্ড দেন । কুষ্টিয়ার মিরপুর গ্রামের চিকন আলীর বিরুদ্ধে ’৭১ সালের ১৯ অক্টোবর একই গ্রামের ইয়াজউদ্দিনকে গুলি করে মারার অভিযোগ ছিল।

* প্রখ্যাত শিক্ষক অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ হত্যার অভিযোগে ১৯৭২ এর ৫ অক্টোবর ঢাকার বিশেষ ট্রাইব্যুনালের জজ আইয়ুব আলী, মকবুল হোসেন ও যোবায়ের নামের তিন আলবদর সদস্যকে মৃত্যুদন্ড দেন। ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর আজিমপুরের দায়রা শরিফের বাসভবন থেকে ড. আজাদকে অপহরণ করে আলবদররা।

* দালাল আইনে সবচেয়ে বেশি কারাদন্ড হয় কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ গ্রামের দালাল আবদুল হাফিজের। হত্যা, লুট ও দালালি মামলায় বিভিন্ন ধারায় তাঁকে আদালত ৪১ বছরের দন্ড দেন। ৭১-এর ১৫ অক্টোবর রাতে আবদুল হাফিজ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে নিজ গ্রামের ইয়াসিন মিয়ার বাড়িতে ঢুকে তাঁর ভাগ্নে শাহ আলমকে হত্যা এবং ইয়াসিন মিয়ার বাবাকে অপহরণ করেন। ইয়াসিন মিয়া বাড়ির পেছন দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরে দুই হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাঁর বাবাকে মুক্ত করেন তিনি।

* ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে বগুড়ার ধুনট উপজেলার কালেরপাড়া ইউনিয়নের সরুগ্রামের আয়েজ মন্ডলের তিন ছেলেকে দন্ড দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে মফিজুর রহমান ওরফে চান মিয়াকে মৃত্যুদন্ড, মোখলেছুর রহমান ওরফে খোকা মিয়া ও মশিউর রহমান ওরফে লাল মিয়াকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। ধুনট উপজেলার নান্দিয়ারপাড়া গ্রামের নুরুল ইসলাম তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। *দৈনিক বাংলার ৭ ডিসেম্বর ১৯৭৩ সংখ্যায় প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, ঢাকার বিশেষ আদালত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তিন সহযোগী ময়মনসিংহের মকবুল হোসেন, আইয়ুব আলী ও ঢাকার আতিয়ার রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন। ’৭১-এর ১৫ ডিসেম্বর অভিযুক্ত এই তিনজন ঢাকার আজিমপুর থেকে ধরে নিয়ে মন্টুকে হত্যা করেন।

*১৯৭৩ সালের ১৪ এপ্রিল তৎকালীন পূর্বদেশ পত্রিকায় একটি খবর ছিল, পাক বাহিনীর সঙ্গে যোগসাজশ এবং তিন পল্লীবধুর শ্লীলতাহানির অভিযোগে মৌলভীবাজারের দীরুল আজীর আসিফ আলীকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়।

* ১৯৭৩ সালের ২০ এপ্রিল দৈনিক সংবাদ-এর একটি খবরে দেখা যায়, কুমিল্লায় বিশেষ আদালত আবদুল হামিদ ও আজিজউল্লাহ্ নামের দুই দালালকে সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছেন। রফিক উদ্দিন নামের এক মুক্তিযোদ্ধাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে ধরিয়ে দেওয়ার অপরাধে তাঁদের সাজা দেন আদালত।

বিচারাধীন আসামীদের মধ্যে সর্বমোট ৭৫২ জনের সাজা হয় । এদের মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যুদন্ড হয়েছিল। বাকিদের যাবজ্জীবন কারাদন্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড হয়েছিল।

সাধারন ক্ষমা
১৯৭৩ সালের ৩০ নবেম্বর দালাল আইনে আটক যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীদের সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই তাদের জন্য ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। 
এ ঘোষণার পর দালাল আইনে আটক ৩৭ হাজারের অধিক ব্যক্তির ভেতর থেকে ২৫ হাজার ৭১৯ জন আসামি ছাড়া পায় ।

সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ৫ নং ধারায় বলা হয়, ‘যারা বর্ণিত আদেশের নিচের বর্ণিত ধারাসমূহে শাস্তিযোগ্য অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত অথবা যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে অথবা যাদের বিরুদ্ধে নিম্নোক্ত ধারা মোতাবেক কোনটি অথবা সব ক’টি অভিযোগ থাকবে।

ধারাগুলো হলো:
১২১ (বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো অথবা চালানোর চেষ্টা),
১২১ ক (বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর ষড়যন্ত্র),
১২৮ ক (রাষ্ট্রদ্রোহিতা),
৩০২ (হত্যা),
৩০৪ (হত্যার চেষ্টা),
৩৬৩ (অপহরণ),
৩৬৪ (হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ)
৩৬৫ (আটক রাখার উদ্দেশ্যে অপহরণ),
৩৬৮ (অপহৃত ব্যক্তিকে গুম ও আটক রাখা),
৩৭৬ (ধর্ষণ),
৩৯২ (দস্যুবৃত্তি),
৩৯৪ (দস্যুবৃত্তিকালে আঘাত),
৩৯৫ (ডাকাতি),
৩৯৬ (খুনসহ ডাকাতি),
৩৯৭ (হত্যা অথবা মারাত্মক আঘাতসহ দস্যুবৃত্তি অথবা ডাকাতি),
৪৩৫ (আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্যের সাহায্যে ক্ষতিসাধন),
৪৩৬ (বাড়িঘর ধ্বংসের উদ্দেশ্যে আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার), ফৌজদারি দণ্ডবিধির
৪৩৬ (আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্যের সাহায্যে কোন জলযানের ক্ষতিসাধন) অথবা এসব কাজে উৎসাহ দান।
এসব অপরাধী কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য নন।’

এই ক্ষমাকে বিএনপি এবং রাজাকাররা সাধারন ক্ষমা হিসেবে প্রচার করে এবং দীর্ঘ বছর এই মিথ্যে প্রচারটি প্রাচারিত হতে থাকায় এটি প্রায় গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়। ক্ষমা ঘোষণার পরেও ১১ হাজার আসামী যাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ ছিল , তাদের মামলা গুলো চলতে থাকে । তাদের দ্রুত বিচারের জন্য সরকার সারা দেশে ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। ’৭৩-এর অক্টোবর পর্যন্ত ২৮৮৪টি মামলা নিস্পত্তি হয়।

১৯৭৫ এর পর জিয়া যা করেছেন ।
সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পরও ১১ হাজারের বেশি ব্যক্তি এ সকল অপরাধের দায়ে কারাগারে আটক ছিল এবং তাদের বিচার কার্যক্রম চলতে ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৯৭৫ এর ৩১ ডিসেম্বর জেনারেল জিয়া সামরিক অধ্যাদেশ জারী করে দালাল আইন বাতিল করেন। থেমে যায় যুদ্ধাপরাধের বিচার কার্যক্রম।

মুক্তি দিয়ে দেয়া হয় জেলে আটক সাজাপ্রাপ্ত এবং বিচারাধীন সব আসামিকে । এমনকি আদলত থেকে যে সব আসামির মামলা চলছিল তার সব নথি গায়েব করে দেয়া হয়।  বঙ্গবন্ধু  সরকারের জারী করা আইনগুলো একের পর এক অধ্যাদেশ জারীর মধ্য দিয়ে রহিত করা হয়। ১৯৭৬ সালে ‘Second proclamation order no. 2 of 1976’ জারী করে ধর্ম-ভিত্তিক রাজনীতি করার লক্ষ্যে সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাদি তুলে দেয়া হয়। ১৯৭৬ এর ১৮ জানুয়ারী নাগরিকত্ব ফিরে পাবার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে আবেদন করতে বলা হয় সবচেয়ে আলোচিত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমকে। এছাড়াও ‘proclamation order no. 1 of 1977’ দ্বারা সংবিধানের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ তুলে দেয়া হয়। মার্শল ল’র আওতায় এসব অধ্যাদেশ জারী করে জেনারেল জিয়ার সরকার। এসব অধ্যাদেশে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম।

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের  প্রশ্নটি সামনে চলে আসে আবার ১৯৯১ এর পরে। গন আদালত গঠন করে ১৯৭১ এর ঘাতক দালালদের ফাঁসীর আদেশ দেয়া হয়। আর একারনেই শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সহ এই গণআদালতের নেতৃস্থানিয় সবাইকে ( তৎকালীন খালেদা জিয়া সরকার ) রাস্ট্রদ্রহি মামলার আসামী করা হয়। জাহানারা ইমাম এই রাস্ট্রদ্রহি মামলার আসামী হিসেবেই মৃত্যুবরণ করেন ।

শেখ হাসিনার নির্বাচনের পূর্বে দেয়া প্রতিশ্রুতি
বর্তমান সরকারের প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল এই সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা। মুলত এই বিচারের প্রশ্নে নতুন প্রজন্ম আওয়ামী লীগকে বিপুল সমর্থন প্রদান করে এবং শেখ হাসিনা সমর্থিত জোট নির্বাচনে বিশাল বিজয় অর্জন করেন। বিভিন্ন ধাপ অনুসরণ করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই সরকারের সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের প্রথম রায় হয় বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে। মৃত্যু দন্ড হয় রায়ে। এরপরে গত ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লার রায় ঘোষিত হয়। রায়ে যাবজ্জীবন দন্ড দিলে অনলাইন এক্টিভেটরসদের উদ্দ্যেগে এই রায়ের বিরুদ্ধে শাহাবাগের প্রজন্ম স্কয়ারে ব্যাপক গন বিস্ফোরণ হয় , যা এখন সাড়া দেশে ছড়িয়ে পরেছে। দিনরাত বিরামহীন ভাবে চলা লাখো সাধারন মানুষ ‘ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসীর ‘ দাবীতে অবস্থান বজায় রেখে চলছেন একটানা ।

২৩৮জন ২৩৮জন
0 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য