যুগল – ৫

সাবিনা ইয়াসমিন ৬ আগস্ট ২০২০, বৃহস্পতিবার, ০৪:৩৪:৪৭পূর্বাহ্ন গল্প ৩৫ মন্তব্য

ঈদের দিন থেকে তরুর মন ভার হয়ে আছে। তমালের সাথে পারতো পক্ষে সে কোনো কথাই বলছে না। তমাল নিজেও খুব একটা কথা বলেছে তাও নয়। যাও-বা কিছু কথা হয়েছে সেগুলো সব মেহমানদের সামনে,তাদেরকে নিয়েই। ঈদের দিন থেকে এই দুইদিন ঝাঁকে-ঝাঁকে মেহমান সামাল দিতে হয়েছে দুজনকেই। রোজার ঈদে লোকজন শুধু ফোনেই ঈদের শুভেচ্ছা দিয়েছে, কিন্তু এবার সবাই সশরীরে হাজির হয়েছিলো।

আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী, শুভাকাঙ্ক্ষীরা প্রায় সবাই এসেছিলো একেক করে। করোনার ভয় হয়তো কেটে গেছে মানুষের মধ্যে থেকে। তাই এবারের ঈদে ওদের ছোট্ট বাসায় লোকসমাগম ভালোই হয়েছে। তবে এতো কিছুর মাঝেও তমাল ঠিকই খেয়াল করছিলো তার প্রিয়তমা পত্নীর মন খারাপ! ঈদের ঝামেলা শেষ হতেই সে এবার তরুর দিকে মনোনিবেশ করার ফুরসত পেলো।

– তোমার কি হয়েছে বলোতো তরু? বাবার বাসায় যাওয়ার জন্য মন কাঁদছে? তাহলে চলো, কাল ঘুরে আসি।
= উহু, বাবার বাসায় ঈদের আগের দিনই গিয়ে এসেছি। মন খারাপ না।

– আমি দেখছি খারাপ, বলো কি হয়েছে?
= কেন বলবো? যদি মুখ দেখেই মনের খবর বুঝতে না পারো তাহলে বিয়ে করেছো কেন?
– রাইট!
তমাল তার চশমাটা ভালো করে মুছে চোখে দিলো। তারপর গালে হাত দিয়ে তরুর মুখের দিকে তাকিয়ে মনের খবর পড়ার (বোঝার) চেষ্টা করতে শুরু করলো।

কিন্তু তরুর মেজাজ ততোক্ষণে বিগড়ে গেছে। সে আপন মনেই ঘর ঝাড়ু দিচ্ছে আর বকবক করছে,

– উফফ ঢং। বউর মুখ দেখে বলতেই পারে না মন খারাপ কেন, আবার জিজ্ঞেস করে! আমার বয়েই গেছে তাকে বলার জন্যে। গত ঈদে জামা কাপড় কিচ্ছু কিনে দিলো না। আমাকেও মার্কেটে যেতে দিলো না। বললো দশটা না পাঁচটা না, তুমি আমার একটাই জানপাখি। এই ভাইরাসের মধ্যে শপিংয়ে যাওয়ার দরকার নেই। আগামী ঈদে দুইটা শাড়ি, অনেক গুলো চুড়ি, এক জোড়া পায়েল কিনে দিবো। আর এবার! ঈদ আসতেই বললো কিনা টাকা কম! বেতনের টাকায় এই ঈদে কুরবানী দিবো।

তমাল আর চুপ থাকতে পারলো না, সে আমতা-আমতা সুরে বলে উঠলো,
– কুরবানী করার নিয়ত কিন্তু তুমিই করেছিলে। আমি তোমার নিয়ত পুরণ করলাম, এখন আমার উপরেই ক্ষেপেছো?

= তো? সব টাকা দিয়ে কুরবানী দিতে কে বলেছে তোমাকে?

– তরু তুমি জানো না, করোনার কারণে এখন অফিস থেকে বেতনের চল্লিশ পারসেন্ট কম দিচ্ছে। তার উপর বাড়িওয়ালারা এক টাকাও বাড়ি ভাড়া কমায়নি। বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল পানির বিল, বাড়ি ভাড়া, সংসার খরচ সামলে বেতনের আর কয় টাকাই সেভিংস হয় বলো?

তরু মনে মনে একটা হোচট খেলো। আসলেই তো, এভাবে সে ভাবে নি। গত পাঁচ মাস ধরে তমালের বেতনের বেশির ভাগটাই চলে যাচ্ছে বাড়ি ভাড়া দিতে। তার উপর বাড়তি খরচ হিসেবে যোগ হয়েছে স্বাস্থ্য সরঞ্জাম। স্যানিটাইজার, মাস্ক, ঘর বাড়ি পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার জিনিস গুলো কিনে আনতে এখন এক্সট্রা টাকা খরচ করতে হচ্ছে প্রতিমাসেই। অফিসে যেতেও তমালের গাড়িভাড়ার খরচ বেড়েছে। আগে লোকাল বাসে/উবার-পাঠাও ভাড়া করে কোনো রকমে অফিসে যাওয়া আসা করতো। এখন বেচারী পাব্লিক পরিবহনে চড়তে ভয় পায়। মাত্র দুজনের সংসার ওদের, তাতেই সাংসারিক খরচ সামাল দিতে হিমসিম খাচ্ছে। তাহলে যাদের পরিবার বড়ো তাদের কেমন যাচ্ছে মহামারীর দিনগুলো! এসব ভাবতে-ভাবতেই তরু আনমনা হয়ে গেলো।

তমাল তরুর মন খারাপ ভাব একেবারেই সহ্য করতে পারে না। সে রাগী-রাগী তরুকেই বেশি করে চায়। তরু কাজ সেরে বিছানায় এসে বসতেই, তরুকে এক কাপ চা বানিয়ে আনতে বলে ল্যাপটপ নিয়ে বসলো তমাল।

– এতো রাতে চা খাবে? ঘুমাবে কখন শুনি? একটু অপেক্ষা করো, হাতের শেষ করে আনছি।
বলে রাগে গজগজ করতে করতে চা বানাতে কিচেনে গেলো।

মিনিট দশেক পরেই আবার ডাক,
– তরু,চা বানাতে হবে না। তোমাকে পদ্মানদী দেখাতে নিয়ে যাবো, বুড়িগঙ্গা দেখিয়ে আনবো। মাওয়া ঘাটে নিয়ে তাজা ইলিশ মাছ ভাজা খাওয়াবো। তারাতাড়ি ঘুমাতে এসো।

তরু অবাক! ব্যাপার কি! হঠাৎ এতো জায়গায় ঘোরার প্লান করছে কেন পতীদেব! রুমে এসে দেখে, তমাল নিজেই ল্যাপটপ অফ করে মশারী টানিয়ে, মোবাইল হাতে শুয়ে আছে। সেও খুশি খুশি মনে বিছানায় গিয়ে তমালের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লো। তরুর মুখে হাসি! তমাল তাকে জড়িয়ে ধরে বললো,

– আমি জানতাম, বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা শুনলেই তোমার মন ভালো হয়ে যাবে।

= তাই? কখন যাবো বেড়াতে?

– এই তো, এখনই

= মানে? এতো রাতে!
= হু, সোনা। বললাম না, তোমাকে পদ্মানদী, বুড়িগঙ্গা দেখাবো? এই দেখো, সব গুলো নদীর ছবি ডাউনলোড করেছি। দেখলে তুমি মুগ্ধ হয়ে যাবে..

– তমাল, তুমি ছবিতে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলেছো এতোক্ষণ ধরে? আর,আর কি খুঁজছো?
= জানুউউউ, তাজা ইলিশের ছবি গুলো পাচ্ছি না। ঐ গুলো যে কোন ফোল্ডারে সেইভ করলাম, ভুলে গেছি!

লাইট অফ , ওদের ঘর থেকে এখন ভীষণ ভাংচুরের শব্দ আসছে। মোবাইল ভাঙার সশব্দ আওয়াজ পাওয়া গেছে, আর কী কী ভাঙছে কে জানে! বেচারা তমাল, রাগী তরুকেই কেন যে সে ভালোবেসে বউ বানালো!..

★ছবি- নেট থেকে নেয়া 🙂

৪৭৮জন ১২জন
0 Shares

৩৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য