যা বলবো প্যাঁচাইয়া বলবো

সাতকাহন ১০ আগস্ট ২০১৫, সোমবার, ০৪:২৮:২৩পূর্বাহ্ন সাহিত্য ৬ মন্তব্য

যা বলবো প্যাঁচাইয়া বলবো, রেসকোর্সে আমীর আব্দল্লাহ খান নিয়াজী বুলেট খুলে জগজিৎ সিং অরোরার হাতে দিতেই ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বিজয় ফাইনাল হয়ে গেলো। তখন বুঝি নি এ ম্যাচের খেলোয়াড় আমরা, আম্পায়ার আন্তর্জাতিক। মনে পড়ছে, ভাগীরথী তীরের আম্রকাননে যুদ্ধের আগের রাতে মোহনলালকে সিরাজ বলেছিলেন, ‘আগামীকাল তোমরা যুদ্ধ করবে কিন্তু হুকুম দেবে মীর জাফর।’ সেই আম্পায়ারই ৭৫-এর ১৫ আগস্টের প্রথম প্রহরে ৩২ নম্বরে ওয়াকওভারে ফাইনাল খেললো। এদেশে কখন কে রান আউট হবে, কার কপালে লেগ বিফোর জুটবে, তার আঙুলি নির্দেশ করবে হোয়াইট হাউস আর তেলের আমীররা। টাইম টু টাইম এদেশে হরতাল, গণতন্ত্রের কাঁচামাল। গদি দখলে ফিনিশড গুডস্ হয়ে বলিহারি পায়। জিরো পয়েন্ট থেকে হিরো হতে হলে হরতালই গদি ডিমান্ডের টেকনিক।

আমার খারাপ লাগে, হেনরিয়েটাকে সতীন দেখে রেবেকা যখন রণে ভঙ্গ দেয়, আবার এমিলিয়া যখন বিপন্ন কবিকে ফেলে ইংলিশ পাড়ায় পাড়ি দেয়। খারাপ লাগে, মন্থরাদাসী লেডি ম্যাকবেথের কানে কেনো হিংসা ছড়ালো! জানতে ইচ্ছা করে, আওরঙ্গজেব কি লেডি ম্যাকবেথের সহোদর? সব মা কেনো মাদার তেরেসা হয় না? মনে মনে ভাবি, সমাজের যে মহল্লায় রবীন্দ্রনাথের গোরা বাস করে, তারই কোনো লেন-বাইলেনে শেক্সপীয়রের ইয়েগো ঘাপটি মেরে আছে। আলোর নিচেই আলেয়া, দশাননের ভাই বিভীষণ।

মনের বাজার মন্দা। আনন্দের রিজার্ভে মানি নেই, ফিউচারে’র ফরেন কারেন্সি শর্ট। ইচ্ছাদের অন্তরে ঘোমটা টানা ঊর্বশী নাই, বাজারের থলিতে ইনফেকশন। ঊর্বশী ইন্দ্রের ইন্দ্রিয়, চিত্রাঙ্গদা মেয়াদী যৌবনের কড়চা। এদেশে রাজনীতি আর সংস্কৃতি মেয়াদী যৌবনের জুয়া। কখনো-সখনো ইথিওপিয়ার খরা। এ সমাজে সিমি আর পূর্ণিমা সরকারেরা কবিতার পাতার মতো বাউরি বাতাসে উল্টে থাকে। দুধের সরের মতো পাতলা ওড়না কোনো নখের থাবায় খান খান হয়ে যায়। কমলার কোয়ার মতো গোলাপী লাবণ্য আরণ্যক আবলুশে আর্তনাদ করে। তখনই ভাবি, একজন বাঙালির বিপ্লবী হতে পারাটাই বিজয়ের বরকত। একটা খাটি প্রতিবাদই একটা বায়ান্ন, একজন খাটি মুক্তিযোদ্ধাই একটা একাত্তর; একটা ১৫ আগস্টের জবাব দিতে একজন বাঙালির মানুষ হওয়াটাই মাটির মান।

পলিটিক্সে তাই পলিউশান, সাহিত্যেও সীতা-সাবিত্রী নেই। রাজনীতির গডফাদারদের মতো সাহিত্যেও গডফাদারদের চেইন অব কমান্ড আছে, গ্রুপের বিরুদ্ধে গেলেই সেন্সর ক্যান্সার হয়ে ধরে। সংস্কৃতির সতীত্ব গেছে এমনটা বলছি না, তবে দেশি মসুর ডালে বিদেশি ভেচ ঢুকেছে; দলীয়করণ সাহিত্যও কাঠালের মতো আঠালো হয়ে গেছে।

সাহিত্য বাঁচার উত্তর খোঁজে জেরুজালেমের উপত্যকায়, বসনিয়ার উদ্ভাস্তু শিবিরে আর বলিভিয়ার জঙ্গলে; বান ডাকা উপকূলে, কপালের ফাঁকা মাঠে, রিলিফের কার্ডে। যুগ জটিল; মোড়ে মোড়ে বাঁক, বাঁকে বাঁকে বক্তৃতা জ্বলন্ত গ্যাসকূপের মতো। বাতাস বিভ্রান্ত, জীবনের পালে তার ধাক্কা; ছেঁড়া পালে সহস্র ইচ্ছারা মুক্তিযোদ্ধার মতো ক্রলিং করে এগোয়, কিন্তু তৈলাক্ত বাঁশের ঊর্ণনাভের মতো প্রগতির অঙ্কে জিরো পায়। ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা উটের গ্রীবার মতো জানালার পাশে আলোর আড়াল।

আমি চোখের ক্ষুধার কথা বলতে চাই, আমার মনের বিরাণ বাগানে অন্ধবধূ’র মতো ঝরা বকুল কুড়াতে চাই। সাহিত্যের সওদা কিনতে বনলতা সেনের ডাগর চোখে নোঙর ফেলি, শিলঙ পাহাড়ে লাবণ্যের পিছু পিছু ঘুরি, হিজলির কেয়াবনে মাঘী পূর্ণিমায় কপালকুণ্ডলার সাথে ব্যতিহারে কথা বলি; আর তখনই ভাবি, জনকের মতো একটা বিত্তশালী চিত্ত দরকার সাহিত্যের গার্ডেন গড়তে। সাহিত্য জিনিসটা ভাবের সাথে শব্দের কোর্টম্যারেজ, সেখানেও বেহুলার কালরাত্রি, সেখানেও মনসার ফণা। দুঃস্বপ্নের জোছনা ভাতের মাড়ের মতো বাসী হয়ে গেছে, থাইস্যুপ সেখানে ড্রেনের জঞ্জাল। চূড়ান্ত প্রত্যয় নাই পবিত্র উত্তাপের মতো এ সমাজে। উপবাসের ক্ষুধিত সাম্রাজ্যে মন পানকৌড়ির মতো ডুবে ডুবে শেয়ার মার্কেটের বেনিফিট খোঁজে। সাহিত্যের লক্ষ্যভেদী অর্জুন, জীবনরূপী দ্রৌপদীর হাত ধরে জীবনকে এক থেকে পাঁচ হাতে বিলিয়ে দেয়, সমুদ্রের মোহনায় সাতমুখী গঙ্গার মতো। সাহিত্যে থাকে তাই দ্রৌপদীর শাড়ি, শিবের জটাবন্দী গঙ্গা; খোলা আকাশ যেন জীবনের মালভূমি।

তবুও আমি জীবনের কথা বলতে ভালোবাসি, তাই বৃত্তের ব্যাসার্ধে ঘুরপাক খাই। আমি খিড়কি ঘাটে বসে মিসেস ওনাসিসের প্রমোদতরী ক্রিস্টিনা’র কথা ভাবছি না, আমি পানসিতে বসে জলির বিলের ঢেউ শুনছি, খেয়াঘাটে কড়ি গোনার মতো। আমি রূপাই-সাজুর ছনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে সারেং বৌ নবিতুনের বুকের বোঁটার ময়েশ্চার দেখি। আমার বুকের কথাগুলো ছেঁড়া কাঁথার মতো ভাজ খুলে হোয়াইট হাউসের ছাদে আনন্দের আলোয় শুকাতে চাই। বহুব্রীহি নাটকের মামার মতো মাথা গরম হলে উল্টো গুনতে ইচ্ছে হয়। জিন্নাহর উল্টো দৌড়ে ডিপ্লোম্যাটের ম্যাজিক ভাবি। সুখটাকে জীবনের ফ্রাইপ্যানে ঝলসানো রুটির মতো উল্টে-পাল্টে সেঁকতে চাই পাঁচশালা কাশবনের কন্যার মতো। সভ্যতা যখন ইবলিশের চেহারায় সমাজ আর রাজনীতির লেন-বাইলেন ভাইরাসের মতো, জীবনের পূর্ণিমায় তখন গ্রহণ লাগে। এ সমাজের কেউ গ্রহণ করে না, গ্রহণ লাগায়।

১৫ আগস্ট ২০১০
নর্থ সার্কুলার রোড
ধানমন্ডি, ঢাকা।

৪৬০জন ৪৬০জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ