পৃথিবীতে জন্ম নেয়ার পর থেকেই মানুষ নানারুপ সম্পর্কে জড়িয়ে থাকে। রক্ত, আত্মা, পারিবারিক, সামাজিক, কর্ম, ধর্ম সব ক্ষেত্রেই গড়ে উঠে নানাবিধ সম্পর্ক। কিছু সম্পর্ক চিরস্থায়ী। কিছু সম্পর্ক হয় ক্ষণিকের। মৃত্যু পর্যন্ত সম্পর্কের ধারা চলমান থাকে। সব সম্পর্ক নিজে নিজে গড়া যায়না। আবার সব সম্পর্ক একা একা গড়ে উঠেনা। সম্পর্ক যেভাবেই গড়ুক, এটা সুন্দর সুষ্ঠ ভাবে পরিচালনা করতে হয় নিজেকেই।
মোটামুটি ভাবে সম্পর্ক ধরে রাখার ফর্মুলা যদি জানা থাকে তাহলে জীবন যাপন সহজ করা যায়। আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা দিয়ে যা বুঝেছি তা থেকেই লিখছি।

* বাবা-মা : সৃষ্টিকর্তার পর মানুষের জীবন গঠনে সবচেয়ে বড় ভুমিকায় থাকেন বাবা, মা। এদের অবদানের কাছে জগতের সবটাই তুচ্ছ। তাই বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা, বাধ্যতা, শ্রদ্ধা শতভাগ রাখতে হবে। তাদের মনে কোনোরূপ কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। আমাদের জীবদ্দশায় যাদের বাবা-মা বার্ধক্যে পরিনত হন, তাদের যত্ন দিয়ে সেবা দিয়ে আগলে রাখতে হবে। যেমন করে আপনি আপনার সন্তানকে লালনপালন করেন তেমনি করেই তাদের করুন। আপনারটা দেখে আপনার সন্তানরা শিখবে। আজ আপনার বাবা-মায়ের সাথে আপনি যা করবেন, ভবিষ্যতে আপনার সন্তানও আপনার সাথে তদ্রুপ করবে।

* ভাই-বোন : ভাই-বোনের সম্পর্ক হলো পৃথিবীর যাবতীয় সম্পর্কের মাঝে সব থেকে পবিত্র। এই সম্পর্ক হয় রক্ত থেকে রক্তের, আত্মার, বন্ধুত্বের। যার একটি বা একাধিক ভাই থাকে তার বাইরের বন্ধুর প্রয়োজন হয়না। তেমনি বোনদের বেলায়ও। বোনের সাথে বোনের যত মিল থাকে তা আর কারো মাঝে হয় না। বড় ভাই-বোন মা-বাবার সমতুল্য, তেমনি ছোট-ভাইবোনরা হয় সন্তানের সমতুল্য। এদের যত্ন নিতে হবে , সম্মান করতে হবে। বড় ভাই-বোনদের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে হবে। আদর স্নেহ, আস্থা দিয়ে ছোট ভাই-বোনদের মনেও নিজের অবস্থান গড়ে নিতে হবে। তাহলেই সম্পর্কটা সুন্দর থাকবে আজীবন।

* স্বামী-স্ত্রী : ভিন্ন পরিবার, (ক্ষেত্র বিশেষে দেশ-ধর্ম) আলাদা পরিবেশে বড় হয়ে উঠা একজন অপরজনের সাথে আবদ্ধ হয় বৈবাহিক বন্ধনে। অনেক ভাবেই বিয়ে হয়। কেউ বিয়ে করেন অভিভাবকদের পছন্দে, কেউ নিজেদের পছন্দে। দীর্ঘদিনের পরিণয়কে দীর্ঘস্থায়ী রুপ দিতেও বিবাহ বন্ধনকে বেছে নেন। বিয়েটা যেভাবেই হোক, মানিয়ে নেয়ার পদ্ধতি সব ক্ষেত্রেই এক। পারস্পারিক সমঝোতা, বিশ্বাস, দ্বায়বদ্ধতা, সহযোগ, সবকিছু মেইনটেইন করা আবশ্যক। এখানে দ্বায়িত্ব পালণ করা বেশি জরুরী। একজন স্বামী তার স্ত্রী সন্তানকে যতই ভালোবাসুক, সে যদি তার দ্বায়িত্ব পালণ না করেন তাহলে সম্পর্কের প্রকৃত মুল্য হারাবেন। আবার স্ত্রী যদি স্বামী ও তার পরিবারের প্রতি নিজ কর্তব্য যথাযথ ভাবে সম্পাদন না করেন, তাহলে পারিবারিক শান্তি ব্যাহত হবে। মনে রাখতে হবে একজন স্বামীর কাছে তার স্ত্রী কোন সম্পত্তি নয়। স্ত্রী প্রতিটি পুরুষের কাছে সম্পদ স্বরুপ। সম্পদের সুষ্ঠ পরিচর্যা, রক্ষণাবেক্ষণ না করলে সেই সম্পদ একদিন নষ্ট হয়ে যাবে। একজন স্ত্রীর কাছে সংসার তার স্বামীর দেয়া আমানত। যেকোনো মুল্যে আমানতের হেফাজত করতে হবে।

* সন্তান : সন্তানকে ভালোবাসে না এমন প্রানী জগতে বিরল। জীব মাত্রই সন্তান ধারণ করে, আর সেই সন্তানকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পরিচর্যা করে। পশু-পাখি, মাছ-পতঙ্গ জন্ম দেয়ার কিছুদিন পর বাচ্চাকে ত্যাগ করে। কিছু প্রানী ক্ষুদা নিবারণ করার জন্যে নিজের সন্তানকেই খেয়ে ফেলে। কিন্তু মানুষ? একমাত্র মানুষ তার সন্তানকে বক্ষে ধরে বেঁচে থাকতে চায় আজীবন। মা-বাবার চোখে তার সন্তান কখনো বড় হয় না। সন্তানের বয়স বাড়েনা। আদরে, শাষনে সন্তানকে প্রতিমুহুর্তে বুঝিয়ে দেয় বাবা-মায়ের অস্তিত্বে সন্তানের স্থান কোথায়। অতি বৃদ্ধ মা তার প্রায় বৃদ্ধ সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেয়। মাঝ বয়সি রুগ্ন ছেলের পাশে বসে রাতের পর রাত হাসপাতালে কাটিয়ে দেয় বৃদ্ধ বাবা। এমনই হয় মনুষ্য জগতে সন্তান আর মা-বাবার সম্পর্ক। সন্তানের প্রতি দ্বায়িত্বহীনতা পরবর্তিতে সন্তানকে ভুল পথে পরিচালিত করে। তার আচরন গত প্রভাব মা-বাবার উপরেও পরে। তাই সন্তানকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সামর্থ্যানুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় শিক্ষায় তাদের জীবনের ভিত গড়ে দিতে হবে। তবেই সন্তানের কাছ থেকে কাঙখিত প্রতিদান পাওয়া সম্ভব।

* প্রতিবেশি, সহযোগি : পারিবারিক গণ্ডি পেরুনোর পর আমাদের যাপিত জীবন গড়ে তুলতে হয় সমাজের সাথে। সমাজের আপামর জন সাধারনের সাথে মিলেমিশে থাকাটাই সামাজিকতা। আশেপাশে যারা থাকেন তাদেরকেই মুলত প্রতিবেশি বলা হয়। প্রতিবেশিরা আমাদের জীবনের বড় একটি অংশ। বিয়ে-শাদি, মৃত্যু-রোগ-শোক, বিপদ-আপদে প্রতিবেশিরাই সবার আগে এগিয়ে আসেন। এরা আমাদের সুখ-দুঃখের সাথী। তাই এদের সাথে আন্তরিকতা বজায় রাখতে হবে। নিজের ব্যাক্তিত্ব বজায় রেখে সবার সাথে সদ্বভাব রাখা প্রয়োজন। অহিংসা, আত্ম-অহংবোধ, বল প্রয়োগ, অর্থনৈতিক গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবেশিদের আস্থা, সম্মান আদায় করা যায়না। এখানে যে যতটুকু দিবেন বিনিময়ে সে তাই পাবেন।
এটা সহযোগিদের বেলাতেও। জরুরী নয় সহযোগিতার হাত অপর পক্ষই আগে বাড়াবেন। অনেক সময়ে নিজেকেই হাত বাড়াতে হয়। আর যিনি প্রথম সহযোগিতার হাত বাড়ান তিনিই সফল হন।

* প্রেম : শাশ্বত সুন্দর, পবিত্র এক সম্পর্কের নাম প্রেম। সৃষ্টির শুরু হয়েছিলো প্রেম দিয়ে। সৃষ্টিকর্তার যাবতীয় সৃষ্টির মাঝে প্রেম এসেছে অবিনশ্বর রুপে। আকাশ, মাটি, পানি, অরণ্য, বায়ু মন্ডল, জীব জগৎ, বস্তু জগৎ সবই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত একে অপরের সাথে। একটি ছাড়া অপরটি মুল্যহীন, অস্তিত্বহীন। প্রেম হয় সৃষ্টিকর্তার সাথে তার সৃষ্টির, বিধাতার সাথে বান্দার, ঈশ্বরের সাথে অনুগামীর, গুরুর সাথে শিষ্যের, প্রভুর সাথে ভক্তের, কবির সাথে কবিতার, প্রেমিকের প্রতি প্রেমিকার। প্রেমের অপর নাম ভালোবাসা। ভালোবাসা আছে বলেই মানুষ অনুভব করতে পারে। সুখে হাসে, দুঃখে কাঁদে। ভালোবাসা মানুষকে মানুষের মাঝে মানবতা রেখে বাঁচতে শেখায়। ভালোবাসা হীন পৃথিবী কবরস্থান বৈ অন্যকিছু নয়। প্রেমে ব্যার্থ হয়ে যত মানুষ আত্মহত্যা করে, এমন আর কোনো কারনে এতবেশি করেনা। অথচ নিজেকে শেষ করে দেয়া কোনো সমাধান নয়। প্রেমকে ধারণ করতে হয়। পবিত্রতা বজায় রাখতে হয়। নিঃস্বার্থ প্রেম কখনো ব্যার্থ হয়না। যতক্ষণ সম্পর্কে সম্মান থাকে, বিশ্বাস দৃঢ়তম থাকে ততক্ষন পর্যন্ত ঐ সম্পর্ক কিছুতেই সমাপ্ত হবে না। দেখা যায়, মানুষ যাকে ভালোবাসেন তার চরিত্রগত দিক অনেক সময় যাচাই করেন না। পরে এটাই সম্পর্ক নষ্টের প্রধান কারন হয়ে যায়। তাই সম্পর্কে জড়ানোর আগে একটু সময় নিয়ে এগোনো ভালো। অনেকেই কৃষ্ণের মত প্রেমিক চায়, নিজে হতে চায় রাধা। কৃষ্ণকে ভালোবাসলে তার একাধিক গোপীনিদেরও সহ্য করতে হবে, এটা মেনে নিয়ে যে ভালোবাসতে পারে সে-ই রাধা হতে পারে। রাধা হওয়া কিন্তু সহজ না। অসম্ভবও না। প্রেম কে যারা মর্যাদা দিতে জানে তারাই অমর হয়। প্রেমকে সব অবস্থাতেই পবিত্র রাখা জরুরী। সাথে মনকেও। মন অপবিত্র থাকলে কোনো প্রেম সার্থক হবেনা। প্রেম ঈশ্বর বা ব্যাক্তি যার সাথেই হোক, প্রকৃত সত্য ধারণ করতে না পারলে সেটা স্মৃতির জঞ্জালে পরিনত হবে।

* পরকিয়া : অনৈতিক সম্পর্কের এক বিশেষ নাম পরকিয়া। যদিও এটাকে প্রেম বলা হয়, কিন্তু এটা আদৌ প্রেম নয়। এটা এক ধরনের নিষিদ্ধ আকর্ষন। এই আকর্ষন হঠাৎ করে শুরু হয়ে, আকস্মিক ভাবে শেষ হয়ে যায়। প্রাচীন কাল থেকে যুগে যুগে মানুষ এই সম্পর্কে জড়িয়েছে/ জড়াচ্ছে। কিছু কালজয়ী প্রেমের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সেগুলোর মুলে এই পরকিয়া ছিলো। আবার অনেক কলংকিত ইতিহাস তৈরি হয়েছে এই পরকিয়া সম্পর্কের জের ধরেই। তাই এই সম্পর্কের অস্তিত্ব নিয়ে গবেষণার কিছু নেই। মানুষ গঠন প্রক্রিয়ার, মৌল উপাদানে নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষিত হওয়ার ফর্মুলা থাকায় এটা সাভাবিক আচরন হিসেবে গৌণ করা হয়। যারা পরকিয়ায় জড়িয়ে যায়, তাদের মধ্যে একটা বৈশিষ্ট্য খুব লক্ষণীয়। তারা তাদের বৈধ সঙ্গী/ সঙ্গীনিকে ধোঁকা দিলেও, কোনো অবস্থাতেই অবৈধ প্রেমিক/প্রেমিকাকে হারাতে চান না। পূর্ণ বিশ্বস্ততায় সম্পর্ক ধরে রাখতে চান। যেটা এই সম্পর্কের বেলায় বেমানান। সম্পর্কই যদি অবৈধ হয়, তাহলে সেখানে বৈধ বিশ্বাস কামনা করা যুক্তিহীন। পরকিয়ার প্রভাবে ব্যাক্তির সাময়িক জীবন হয়তো আনন্দময় হয়, কিন্তু তার চারপাশে ঘিরে থাকা মানুষদের জীবনে ছন্দপতন ডেকে আনে। তাই পরকিয়া প্রেম যেন সীমা লঙ্ঘন না করে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রেম হোক মনে, মননে। কারো ক্ষতি না করে, নির্দিষ্ট সঙ্গী / সঙ্গীনির অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে যদি প্রেম করা সম্ভব হয়, তবে এটা খারাপ নয়। মানসিক সুস্থতা সংসার, সমাজ, দেশ সব খানেই কল্যানকর।

* বন্ধুত্ব : এর সংজ্ঞা ব্যাপক, বিস্তৃত। বন্ধুত্ব তৈরি করা যেমন সহজ নয়, এর চলমান ধারা অব্যাহত রাখা আরো দুষ্কর। মুহুর্তের ভুল-ক্রুটি থেকে বন্ধুত্ব পরিনত হয়ে যায় চিরস্থায়ী শত্রুতায়। তাই বন্ধুত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সচেতন হতে হয়। সুখে, দুঃখে, বিপদে, আপদে, বিশ্বাসে, আস্থায়, আশ্রয়ে, প্রশ্রয়ে বন্ধুত্বের দাবী সবার উপরে থাকে। তাই বন্ধু নির্বাচন–ধিরে সুস্থে সময়ের সাথে সাথে করা ভালো। হাত বাড়ালেই সবাই বন্ধু হতে পারেনা, ভুল মানুষের সাথে বন্ধুত্ব গড়া আত্মহত্যার সামিল।

বেঁচে থাকার প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মানুষের সাথে বিভিন্ন সম্পর্ক গড়ে উঠে। তাই সম্পর্ক গুলো সুন্দর রেখে এর পরিচর্যা করতে হয়। জীবনকে স্বচ্ছ, সুন্দর আর সম্মৃদ্ধ করতে নিজেকে স্বচ্ছ রাখা খুব দরকার। ভালো থাকুক সব সম্পর্ক গুলো নিজ নিজ স্বকীয়তা নিয়ে।

২৫৫জন ৩জন
114 Shares

৩৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য