আজকের এই লেখার শুরুতে আমি কৃতজ্ঞচিত্তে শ্রদ্ধা-সহকারে যাঁদের স্মরণ করছি, তাঁরা হলেন আমার লেখালেখির উৎসাহদাতা। আমার লেখালেখির শুরুতে প্রথম উৎসাহ ও সাহায্য সহযোগিতা করেছিলেন, যাঁদের চাকরি করি তাঁরই।  একজন হলেন, মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন(মনা), তিনি একজন ফুটবল হিসেবে এলাকার সবার কাছে পরিচিত। আরেকজন হলেন, মোহাম্মদ ইসলাম মিয়া, তিনিও একজন ফুটবলার এবং টেইলার মাস্টার হিসেবে এলাকায় সুপরিচিত।

এই দুইজন ব্যক্তি ছাড়াও আমার লেখালেখির শুরু থেকে উৎসাহদাতা বেশ কয়েকজন সম্মানিত লেখকও আছেন। তাঁরা এখনো আমার সমস্ত লেখার পেছনে ছায়া হয়ে আছে। তাঁরা সবসময়ই আমার লেখা পড়ে এবং আমার লেখার প্রতি সু-দৃষ্টিও রাখেন। ভুল হলে সংশোধন করার পরামর্শ-সহ আরও সুন্দরভাবে লিখতে উৎসাহ অনুপ্রেরণা দিয়ে থাকেন। এখনও আমি লেখালেখির জন্য যেকোনো সময় ফোনে, নাহয় ফেসবুক মেসেঞ্জারে তাঁদের স্মরণ করলে সাড়া পেয়ে থাকি। আর আমার দুইজন বস তো সবসময় আমার পাশে থাকেই। তাই আজকে তাঁদের নিয়ে  এই লেখাটা সোনেলা দিনলিপিতে স্মৃতি করে রাখলাম।

২০১১ইং সালের কথা। আমার একমাত্র ছেলেটা মারা যাবার পর শোকাহত হয়ে আহার নিদ্রা বাদ দিয়ে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতাম! চাকরিও নেই! পকেটে টাকা নেই! ঘরে খাবার নেই! তখন আমার এমন অবস্থাই চলছিলো। ভাবছিলাম আবার কামড়ে গামছা বেঁধে শহরের ব্যাস্ত সড়কে নেমে পড়ি! গিন্নীর নিষেধাজ্ঞার কারণে কোমড়ে গামছা আর বাধলাম না, চাকরির খোঁজেই থাকলাম! কিন্তু চাকরি আর কোথাও মেলাতে পারিনি। বেকার হয়েই ঘোরাফেরা করতে লাগলাম! কিন্তু একটা পুরুষ মানুষের দৈনন্দিন জীবন চলার মাঝে তাঁর পকেট খালি থাকলে আর চলে না। কিছু-না-কিছু টাকাকড়ি পকেটে থাকা চাই! কিন্তু সেসময়ে আমার পকেট সবসময়ই খালিই থাকতো। চা-পান-সিগারেট কেনার টাকাও সাথে থাকতো না। পকেট খালি থাকার কারণে অনেক সময় মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো। কিন্তু কারোর কাছে কিছুই বলতাম না। পকেট খরচ নামের খরচটা না করেই সময় পার করে দিতাম, মনে কষ্ট নিয়ে।

বাসার সামনে লক্ষ্মীনারায়ণ বাজার। বাজারের এক কোণে পরিচিত চেনা-জানা এক কামারের দোকান। কামারের কাজ করেন যিনি, তাঁর নাম মোহাম্মদ রওশন আলি। তিনি ছিলেন আমার খুবই ঘনিষ্ঠ পরিচিত। চাকরির ধান্দায় ঘোরাফেরা করে বিকালবেলা রওশন আলির দোকানে বসে আড্ডা দিতাম! যতক্ষণ রওশন আলির দোকানে বসে থাকতাম, চা-পান-সিগারেটের যত ঝামেলা রওশন আলির উপর দিয়েই বয়ে যেতো। আবার অনেকসময় পকেট খরচের জন্য রওশন আলির কাছ থেকে কিছু টাকাও ধারকর্জ নিতাম। চাওয়ামাত্র তিনি রওশন আলি সাথে সাথে দিয়ে দিতেন। এরজন্য রওশন আলি কোনদিনই মনখারাপ করতো না, বরং তিনি সবসময় খুশিই থাকতো। রওশন আলি দাদার এই ঋণ কখনো আমি কোনদিনই শোধ করতে পারবো না। তাই আমি তাঁর কাছে আমি চিরদিন ঋণী হয়েই থাকলাম।

রওশন আলির দোকানের পাশেই ছিল একটা দর্জি দোকান। দর্জি বা টেইলার্স মাস্টার হলেন, মোহাম্মদ ইসলাম মিয়া। তিনি আমাকে খুবই ভালো জানতেন। তিনি (দর্জি) ইসলাম ভাই আমাকে একটা চাকরি দিবেন বলে রওশন আলির কাছে বললেন। চাকরিটা হলো, মাল্টিপারপাস  (বহুমুখী সমবায় সমিতি) ব্যবসা দেখাশোনা করা। মানে ঋণদান সমিতির হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করা। তবে ইসলাম ভাই একা নয়। উনার সাথে আরও একজন পার্টনার থাকবে বলে জানিয়েছিলেন। সম্মানিত ইসলাম ভাইয়ের পার্টনার হিসেবে থাকবেন এলাকার সম্মানিত মনোয়ার হোসেন (মনা) নামে। এই মনোয়ার হোসেন (মনা)-ও আমার খুবই পরিচিত, তা আরও অনেক আগে থেকেই। যেহেতু আমি অত্র এলাকায় অনেকদিন থেকে বসবাস করে আসছি, তাই।

একদিন সম্মানিত ইসলাম ভাই রওশন আলিকে বললেন, ‘যদি নিতাই বাবু রাজি থাকে তাহলে সেই ব্যবসার হিসাবরক্ষক হিসেবে আমরা নিতাই বাবুকে রাখতে চাই!  আমরা দুইজন এব্যাপারে নিতাই বাবুকে আরও অনেক আগে থেকেই সিলেক্ট করে রেখেছি’। এরপর রওশন আলি সম্মানিত ইসলাম ভাইয়ের মনের ইচ্ছা আমাকে জানালেন। আমি তখন রওশন আলি দাদা’র সু-বুদ্ধি কামনা করে বলেছিলাম, ‘আপনি যদি বলেন তাহলে আমি রাজি আছি’। তিনি রওশন আলি দাদা বললেন, ‘এতে ভালোই হবে বলে আশা করি’। আমি বেকারত্ব থেকে রেহাই পেতে রওশন আলি দাদার কথায় রাজি হয়ে গেলাম।

এরপর সম্মানিত ইসলাম ভাই ও সম্মানিত মনোয়ার হোসেন (মনা)’র সাথে তিন বছরের জন্য একটা চুক্তিনামা করা হলো। চুক্তিনামায় তিন বছরে চাকরির করণীয় সবকিছু লিপিবদ্ধ করা হলো। বেতন ধার্য্য করা হলো মাসিক ৬,০০০/= টাকা। প্রতিবছর চলতি বেতনের সাথে ১,০০০/= টাকা করে বাড়বে। আমি সেই চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করলাম। সাক্ষী হিসেবে ছিলেন, একমাত্র রওশন আলি দাদা। এরপর থেকে শুরু হলো তাঁদের ব্যবসা, আর আমার চাকরির শুভসূচন। সময়টা তখন ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাস।

এরপর থেকে ডিউটির ফাঁকে ফাঁকে চলতে থাকলো, অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন সাইটে রাতদিন আমার  আনাগোনা। হাতের ব্যবহারিক মোবাইলটা ছিল মৃত ছেলের রেখে যাওয়া Nokia c-3। তখনকার সেই মোবাইল দিয়েই একসময় একটা ব্লগে রেজিষ্ট্রেশন করলাম। লেখা জমা দিলাম। সেই ছোট্ট একটা লেখা জমা দিয়ে সেই ব্লগে বছরখানেক লগইন করে দেখিনি। কারণ, লেখাটির শিরোনাম দেওয়া ছিল ইংরেজিতে। কারণ, যেই মোবাইল দিয়ে লিখেছিলাম, সেই মোবাইলে বাংলা লেখার কোনও সিস্টেম ছিল না বিধায়, লেখা লিখেছিলাম ইংরেজি অক্ষরে। লেখার শিরোনামও দিয়েছিলাম ইংরেজিতে। তারপর আবারও প্রায় বছরখানেক সেই ব্লগে অনুপস্থিত থেকে গেলাম।

এরপর হঠাৎ একদিন ঐ ব্লগে লগইন করে দেখি, সম্মানিত ব্লগপোষক’র উপদেশ! উপদেশ হলো,”সম্মানিত ব্লগার, “আপনার লেখার শিরোনাম বাংলায় লিখুন!”

কিন্তু হায়! আমার কাছে যেই মোবাইলটা ছিল, তাতে তো  বাংলা লেখার কোনও সিস্টেম নেই বা ছিলও না। ভাবতে লাগলাম, কী কা যায়! সেই ভাবনা থেকে আমার সম্মানিত দুইজন বস’র কাছ থেকে কিছু টাকা অগ্রীম নিয়ে একটা Symphony W82 অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল কিনি। এরপর ঐ ব্লগে জমা দেওয়া লেখার শিরোনাম বাংলায় লিখলাম, “আমিও মানুষ”। পোস্টের লেখা ইংরেজিতে লিখলেও, সম্মানিত ব্লগপোষক মহোদয় লেখার ইংরেজি শব্দগুলো  বাংলায় করে দিয়েছিল।

লেখা প্রকাশ হলো। ব্লগের আরও সম্মানিত ব্লগার/লেখকেরা মন্তব্য করতে শুরু করলো। কিন্তু আমি আবারও ব্লগে অনুপস্থিত! আবার কয়েকদিন পর ব্লগে চুপি দিলাম। সময়টা তখন ২০১৫ খ্রীস্টাব্দের মাঝামাঝি।চুপি দিয়ে দেখি, আমার ঐ নগন্য লেখায় কয়েকজন সম্মানিত লেখকের মন্তব্য। সেই মন্তব্যগুলোর উত্তর দিলাম। মন্তব্যের প্রত্যুত্তরে আরও ভালভাবে লেখার অনুপ্রেরণা পেলাম, পরামর্শ পেলাম, উৎসাহ পেলাম। তারপর থেকে ওই ব্লগে দীর্ঘদিন লিখেছিলাম। সে-সময়  ব্লগে লিখতে গিয়ে আমার লেখায় বানানো অনেক ভুল হতো। আমি যাঁদের এখনো গুরু, মহাগুরু, শিক্ষক হিসেবে মনে ধারণ করে আছি, তাঁরা আমার বানান ভুল শোধরাবার পরামর্শ-সহ শুদ্ধ বাবান রপ্ত করার জন্য অনেক বইপুস্তকও দান করেছিলেন। সেই বইগুলো কেউ দিয়েছেন হাতেহাতে। কেউ পাঠিয়েছেন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে। কেউ পাঠিয়েছেন ডাকযোগে।

এছাড়াও যেই ব্লগে আমি দীর্ঘদিন লেখালেখির মাঝে ছিলাম, সেই ব্লগের একজন সম্মানিত ব্লগার/লেখক আমার জন্য মালয়েশিয়া থেকে একটা ল্যাপটপ এনেছিলেন। সেই হৃদয়বান মানুষটির নাম, ‘সুকান্ত সাহা’। উনি সম্মানিত সুকান্ত সাহা আমার লেখাগুলো খুবই পছন্দ করতেন এবং লেখা আরও সুন্দর সহজ প্রাঞ্জল ভাষায় লিখতে উপদেশ দিতেন। এইজন্যই তিনি মালয়েশিয়া থেকে আসার সময় আমার জন্য ল্যাপটপ কিনে এনেছিলেন।

যেদিন সম্মানিত সুকান্ত দাদা আমার কাছে ল্যাপটপ পাঠিয়েছিলেন, সেদিন সুকান্ত সাহা দাদা নিজে আসেনি। ল্যাপটপ নিয়ে এসেছেন সেই ব্লগেরই দুইজন সম্মানিত লেখক। সেই দুইজনই আমার লেখালেখির গুরু মহাগুরু ছিলেন। তাই সম্মানিত সুকান্ত দাদা এই দুইজন ব্যক্তিকে দিয়ে ল্যাপটপ পাঠিয়েছিলেন। সম্মানিত সুকান্ত দাদা’র দেওয়া ল্যাপটপ যেদিন গুরু মহাগুরু আমার কর্মক্ষেত্র অফিসে নিয়ে এসেছিল, সে-দিনের ঘটনা আজও আমার মনে পড়ে!

আগের দিন মহাগুরু ঠিক বিকালবেলা আমার মোবাইলে কল করে জানালেন, আগামীকাল তাঁরা আমার কর্মক্ষেত্র অফিসে আসবেন। যেই কথা সেই কাজ! ঠিক সকাল ১১টার সময় একটা প্রাইভেট কার নিয়ে গরু মহাগুরু আমার অফিসের সামনে এসে উপস্থিত! সাদর আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের অফিসের ভেতরে নিয়ে গেলাম। বসতে দিলাম। আমার সাথে আমার সম্মানিত দুইজ বস/মালিকও ছিলেন। অফিসে এসে আমার হাতে সুকান্ত দাদার দেওয়া একটা ল্যাপটপ বুঝিয়ে দিলেন। সবার সাথে হাত মেলালেন। ছবি ওঠালেন। তাঁদের আগমণে আমার সম্মানিত বস দুইজন খুবই খুশি হলেন!

তারপর গুরু মহাগুরুকে নিয়ে দুপুর পর্যন্ত শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে ঘোরাফেরা করে চৌধুরীবাড়ি নবাব চাইনিজ রেস্তোরাঁয় নিয়ে গেলেন। সাথে আসা প্রাইভেট কারের ড্রাইভার-সহ সবাই দুপুরের খাবার খেয়ে গুরু- মহাগুরু আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। সে-দিনের সমস্ত খরচ আমার সম্মানিত দুইজন বস বহন করেছিল। শুধু এইরকম খরচই নয়, লেখালেখির সুনাম রক্ষার্থে যেকোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য আমার পোশাকাদি যখন যা দরকার; তাঁরা আমাকে সব দিয়েছেন। এখনো দিয়ে থাকেন।

এছাড়াও ব্লগে লিখতে গিয়ে নিজের কর্মক্ষেত্রে অনেক গাফিলতিও হয়েছিলো। এখনও হয়। কিন্তু আমার সম্মানিত দুইজন বস/মালিক কখনোই আমাকে তাঁরা মুখ কালো করে কিছুই বলেননি। এখনো বলে না। বরং লেখালেখি চালিয়ে যাবার জন্য সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন। এখনো দিয়ে থাকেন। তাঁদের এই ঋণ আমি কখনোই শোধ করতে পারবো না। কখনো ভুলে যেতে পারবো না, আমার লেখালেখির জন্য উৎসাহদাতাদের। তাঁদের কাছেও আমি চির-ঋণী হয়ে থাকলাম।

শুধু যে আমার দুইজন বস-এর কাছেই ঋণী, তা কিন্তু নয়!  আমার লেখালেখির জন্য যাঁরা সবসময় সুদৃষ্টি রেখে– সবসময় আমাকে সুপরামর্শ দিয়েছেন, আমি সেসকল জ্ঞানীগুণীদের কাছেও ঋণী হয়ে থাকলাম। পরিশেষে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, মহান সৃষ্টিকর্তা যেন তাঁদের সবসময় ভালো রাখে সুস্থ রাখে এবং আমার প্রতি তাঁদের যেন সবসময় সুদৃষ্টি থাকে।

পুনশ্চঃ– লেখাটি লেখার উদ্দেশ্য হলো, বর্তমান সময়ে সারাবিশ্বে মহামারি করোনাকালে আমাদের দেশও এই প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। এই প্রাণঘাতী ভাইরাসটি যেন সারাবিশ্বে যমদূত হয়ে দেখা দিয়েছে। কখন যে কার কাঁধে ভর করে, তা বলা কঠিন! আজ ভালো আছি, আগামীকাল ভালো থাকবো কিনা তা বলা মুশকিল! তাই আমি সুস্থ এবং আনার স্ব-জ্ঞান থাকতেই, আমার লেখালেখির উৎসাহদাতাদের উৎসর্গীকৃত করে এই সোনেলা ব্লগে স্মৃতি করে রেখে গেলাম। যাতে সোনেলা ব্লগের সোনালি পাতায় তাঁরা যেন স্মৃতি হয়ে থাকে।

৩১৭জন ৩জন
0 Shares

৩০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ