যমজ কূটাভাস

আসিফ ইকবাল ৩০ মার্চ ২০১৯, শনিবার, ১২:৫০:৩৪অপরাহ্ন গল্প ১৮ মন্তব্য

যমজ দুই ভাই, তুহিন এবং তুষার, ঢাকা শহরের মোহাম্মদপুরে থাকে। দুইভাই হরিহর আত্মা। সারাক্ষণ লেগে থাকে গায়ে গায়ে। খায় একসাথে, ঘুমায় একসাথে, গোসল করে একসাথে, বাথরুমেও যায় একসাথে। তুহিনের জ্বর হলে তুষারের-ও আসে, তুহিন পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেলে তুষারের-ও পড়া চাই। মা-বাবা ছাড়া কোনটা তুহিন, আর কোনটা তুষার কেউ বুঝতে পারেনা। তবে, সব বিষয়ে তাদের মধ্যে মিল থাকলেও একটা বিষয়ে তারা কিন্তু আলাদা। তুহিনের পছন্দ পদার্থবিদ্যা, আর তুষারের অর্থনীতি। তুহিন যখন পদার্থবিদ্যার মোটামোটা বই পড়ে, তুষার তখন পড়ে অর্থনীতির বই। তুহিন যখন পড়ে থাকে Stephen Hawking নিয়ে, তুষার তখন পড়ে থাকে Milton Freidman নিয়ে।

তুহিন যথাসময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হল। তারপর পড়াশোনা শেষ করে সাতাশ বছর বয়সে, NASA-য় যোগদান করল। অপর ভাই‌ তুষার, সেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হল। তবে, অর্থনীতি বিভাগে। তুষার অর্থনীতিতে সম্মান সহ স্নাতক পাশ করে BCS দিয়ে সরকারী চাকরী নিল, সাতাশ বছর বয়সে। এর একবছর পর পদার্থবিদ ভাই NASA-র এক Rocket-এ চড়ে বসে সুদূর মহাকাশে যাত্রা করল, আটাশ বছর বয়সে। যাত্রার তারিখ পহেলা জানুয়ারী, ১৯৯০। তুহিনের গন্তব্য মঙ্গল গ্রহ। তবে, গ্রহপৃষ্টে পা রাখা প্রথম মানুষ সে হতে পারছে না। কারণ, তুহিনের মহাকাশযান মঙ্গলে নামবে না। মঙ্গলের চারদিকে চক্কর দেবে প্রায় এক সপ্তাহ। তথ্য সংগ্রহ করবে, ছবি তুলবে, তারপর ফিরে আসবে পৃথিবীতে।
যাত্রার আগের রাতে বাড়িতে ফোন করে তুহিন। উত্তেজিত গলায় বলে, “এই মহাকাশযান সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তিতে তৈরি। এই মহাকাশযানের নক্সা যারা করেছে, তাদের দলে আমিও ছিলাম। বলতে পারবি মহাকাশযানের গতি কত? NASA-র এই নতুন মহাকাশযান আলোর গতির ১০% বেগে চলতে পারে।” তারপর প্রায় চিৎকার করে জিজ্ঞেস করে, “এর অর্থ বুঝিস? আলোর গতির ১০ শতাংশ! এর অর্থ বুঝিস? মঙ্গলে যেতে আমার সময় লাগবে মাত্র একঘন্টা। ফ্লোরিডা থেকে ঢাকায় যেতে সময় লাগে ১৯ ঘন্টা। এইবার বোঝ!” কিছুক্ষণ চুপ থেকে গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলে, “আমি নতুন একটা circuit এর নক্সা করেছি। যেই circuit সক্রিয় হলে আলোর গতির ৯০% পর্যন্ত গতিবেগ উঠান সম্ভব। কিন্তু, অত গতি সহ্য করার মত ক্ষমতা এই মহাকাশযানের নেই। নতুন alloy লাগবে বুঝলি, নতুন alloy. আমি আর ত্রিস্তানা, আমি ফিরে এলে, আমরা নতুন alloy তৈরির কাজে হাত দেব।”

এরপর কেটে যায় একটি বছর। তুষার প্রতিদিন খবরের কাগজ দেখে, TV-র সংবাদের দিকে চেয়ে থাকে ব্যাকুল চোখে। আমেরিকায় ফোন করে। কবে ফিরবে তুহিনের মহাকাশযান? কেউ কিছু বলতে পারেনা অথবা বলেনা। তুহিন-তুষারের বাবা tennis খেলা ছেড়ে দিয়ে বাসায় বসে থাকেন। ঝাড়া ছয়ফুট লম্বা, সদাহাস্যময়, কালো চোখের সুদর্শন পুরুষটি পাল্টে যান রাতারাতি। কারো সাথে বেশী কথা বলেন না। সন্ধ্যা হলেই TV চালিয়ে তাকিয়ে থাকেন BBC আর CNN এর সংবাদের দিকে। ঘুমাতে যান একেবারে ভোর বেলায়, যখন চোখ আর মেলে রাথতে পারেন না।

তুহিন, তুষারের মা এক রাতে তুহিনের ছবি জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন আকুল হয়ে। তুষার আর থাকতে না পেরে শেষবারের মত ফোন করে আমেরিকায়। এইবার ফোন ধরেন এক মহিলা। তুষার তাঁকে জিজ্ঞেস করে তুহিনের কথা, তুহিনের mission এর কথা। বলতে বলতে তুষারের গলা ধরে আসে, গাল বেয়ে নেমে আসে তপ্ত অশ্রুধারা। ফোনের অপরপ্রান্তে নিরবতা। “হ্যালো, হ্যালো, ম্যাডাম আপনি কি আছেন, আপনি কি আছেন” বলে চিৎকার করে গলা ফাটায় তুষার। কিছুক্ষণ পর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ পায় তুষার। মহিলা নরম স্বরে জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কে হন তুহিনের?” “আমি ওর ভাই, ওর যমজ ভাই”, কোনরকমে উত্তর দেয় তুষার। মহিলা বলেন, “তুহিনের মহাকাশযানটা একেবারে নতুন। পরীক্ষামূলক ভাবে তৈরি করা হয়েছিল দুই বছর আগে। ওটির নিয়ন্ত্রণ ব্যাবস্থায় ত্রুটি ছিল, যেটা আমরা আগে জানতাম না।” কিছুক্ষণ থামেন তিনি, তুষারের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। এরপর মহিলা ফিসফিস করে বলেন, “উৎক্ষেপণের ২৪ ঘন্টা পরে ওটি হারিয়ে গেছে। Control Room-এর সাথে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আমি খুব দুঃখিত। আমরা খুব দুঃখিত।”

একেবারে দমে যায় তুষার। একটা একটা করে সিঁড়ি ভেঙ্গে দো’তলার ছাদে ওঠে। পেয়ারা গাছের ডালপালার পাশে রাখা একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে। হেমন্তের শীত মাখা হুহু বাতাসে সরসর করে ওঠে পেয়ারা পাতা। ওরা যখন মাত্র HSC পরীক্ষা দিয়েছে, তখন তুহিন একদিন এই গাছ কিনে আনে কোন এক বৃক্ষমেলা থেকে। তারপর নিজের হাতে লাগায় উঠনের পেছন দিকে ওদের শোবার ঘরের জানালা ঘেঁসে। সেই গাছ এখন নত হয়ে আছে পেয়ারার ভারে। মাথার পেছনে দুই হাত বেঁধে অমাবস্যার অন্ধকার আকাশের দিকে নির্নিমেষে চেয়ে থাকে তুষার। অন্যসব রাতের তুলনায় আকাশটা আজ অনেক বেশী উজ্জ্বল। লক্ষ, লক্ষ তারার মেলা বসেছে। কালপুরুষ চিনতে পারে তুষার, তারপর চোখ সরে যায় মঙ্গল গ্রহের দিকে। রোমান যুদ্ধের দেবতা mars, লাল চোখে চেয়ে আছে পৃথিবীর দিকে, নির্নিমেষ। এলোমেলো বাতাসে পেয়ারাগাছ থেকে একটা পাতা ঝরে পড়ে তুষারের কোলে।

এই ঘটনার প্রায় একমাস পর তুহিন-তুষারদের বাসার ফোন বেজে ওঠে। তখন সন্ধ্যাবেলা। তুষার ছুটে গিয়ে ফোন ধরে। ওপাশ থেকে এক মহিলা বলে ওঠেন ইংরেজীতে, “আপনি তুষার বলছেন, ঠিক আছে, তুহিনের যমজ ভাই?” উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলেন, “আপনার সাথে আমার কথা হয়েছিল, প্রায় একমাস আগে। আপনি ফোন করেছিলেন। আমি ত্রিস্তানা। তুহিনের গবেষণা সহকারী।” এরপর কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। চুপ করে থাকে তুষার-ও। এরপর ত্রিস্তানা জানালেন যে, উনি ঢাকায় আসবেন, পরের সপ্তাহে। তুহিন যাবার আগে একটা packet রেখে গেছে, packet-এর ওপরে তুষারের নাম লেখা। উনি সেই packet-টি তুষারের কাছে পৌঁছাতে চান।

পরের শনিবার বিকেল বেলা ত্রিস্তানা আসেন। তুষার তখন ছাদে, পেয়ারা গাছের পাশে বসে ছিল। ত্রিস্তানা সরাসরি সেখানেই চলে আসেন। তুষার অবাক হয়ে উঠে দাঁড়ায়। পড়ন্ত বিকেলের মোলায়েম আলো ত্রিস্তানার সোনালী চুলে যেন আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। আকাশের নীল আর ত্রিস্তানার চোখের নীল যেন মিলেমিশে একাকার। ত্রিস্তানা হেঁটে আসেন হতবুদ্ধি তুষারের খুব কাছে। তুষারের বাহুতে হাত রেখে বিড়বিড় করেন, “হা যীশু! একদম তুহিনের মত।”

সেই বিকেলের পর কেটে যায় আরো সহস্র বিকেল। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা নদী দিয়ে অনেক জল বয়ে যায়। দোতলা বাড়িটা ছয়তলা হয়। রাস্তার উলটো পাশের ফাঁকা মাঠ, যেখানে তুহিন আর তুষার একদা ফুটবল খেলত, সেখানে গাড়ীর গ্যারেজ তৈরি হয়। দিনমান হাতুড়ি দিয়ে ইস্পাত পেটানোর শব্দ, Welding এর আলোর ঝলক, রঙের কড়া গন্ধ। তারপর গ্যারেজ উঠে যায় একদিন। সরকার এসে কলোনী বসায়। ৪ তলা করে ৫টি ভবন। হলুদ রঙের। দুপুর বেলা বারান্দায় বারান্দায় ভেজা কাপড় শুকায়, বিকেলে ছাদের ওপর ছেলেদের আড্ডা। সেই কলোনি-ও থাকেনা একসময়। কলোনির জীর্ণ হয়ে আসা ভবনগুলো ভেঙ্গে ফেলে ২০ তলা উঁচু দুটো ভবন বানানো হয়।

শুধু একটা জিনিষ পাল্টায় না। তুষার পাল্টাতে দেয়না। ওদের বাসায় land-phone number. মোবাইল চলে আসার পর থেকে তেমন একটা ব্যাবহৃত হয়না সেই ফোন। তুষার যত্ন করে নীল একটা তোয়ালে দিয়ে ঢেকে রাখে। মাসে মাসে বিল দিতে থাকে নিয়মিত।

একদিন গভীর রাতে বেজে ওঠে সেই ফোন। ছাদের ওপর বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে সিগারেট টানছিল এক যুবক। অবাক, বিস্ময়ে বলে ওঠে, ‘আরে!” সিগারেট ফেলে দিয়ে দৌড়ে এসে ফোন ধরে।

যে রকম নাটকীয়ভাবে হারিয়ে গিয়েছিল তুহিনের মহাকাশযান, সেইরকম নাটকীয় ভাবেই ফিরে আসে একদিন।মহাকাশ ভ্রমণ শেষ করে তুহিন পৃথিবীতে ফিরে এল পহেলা জানুয়ারী ২০৪০ সালে, অর্থাৎ রওনা হবার ৫০ বছর পর। তুহিনের একান্ত অনুরোধে মহাকাশযান Floridar-র Cape Canaveral-এ অবতরণ না করে সোজা এসে নামল ঢাকা বিমানবন্দরে।

অবতরণের সাথে সাথে তুহিন মহাকাশযানের দরজা খুলে উল্কার গতিতে বের হয়ে আসে। বত্রিশ-তেত্রিশ বছরের শক্ত-সমর্থ, পেশীবহুল যুবক। ঝাড়া ছয়ফুট লম্বা। মহাকাশে ব্যায়াম করেছে নিয়মিত। Tube থেকে টিপে টিপে খেয়েছে পুষ্টিকর, আধা তরল যত খাবার। কিন্তু আহা! কতদিন সে নীলাকাশ দেখে না। পৃথিবীর আলো মাখে না গায়ে, শ্বাস নেয়না পৃথিবীর মিষ্টি বাতাসে। পড়ি কি মরি করে তুহিন নেমে আসে মাটিতে, খরগোশের মত লাফাতে লাফাতে। মাথাভর্তি ঝাঁকড়া কালো চুল দুইহাতে পেছনে সরিয়ে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আবেগে কেঁদে ফেলে, ফুঁপিয়ে উঠে বুক ভরে শ্বাস নেয় পৃথিবীর বাতাসে। পঞ্চাশ বছর পরে।

হঠাৎ করে কে যেন তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দুইহাতে। কান্নার আওয়াজ পায় তুহিন। চেয়ে দেখে তার অশীতিপর বৃদ্ধ বাবা, চুল তার যে কয়টা আছে, পেকে সাদা, শরতের কাশফুলের মত। মাথার মাঝখানটা তো একেবারেই ফাঁকা হয়ে গেছে। চকচক করছে। তবে চুলের দিকে ভাল করে তাকালে বোঝা যায়, এককালে তুহিনের চুলের মতই ঘন আর ঝাঁকড়া ছিল সেই চুল। আজ তিনি বয়সের ভারে নুব্জ। বলিরেখা ভর্তি মুখ। প্রাণপণে জড়িয়ে ধরেছেন তুহিনকে, পাশেই দাঁড়িয়ে তুষার। বাইশ বছরের তরতাজা যুবক, চোখের রঙ ঘন নীল। তার চোখেও পানি। কিন্তু, বাইশ বছর? ঘন নীল চোখ?

চীৎকার করে কাঁদতে থাকেন তুহিনের পিতা, “ওরে তুহিন, ওরে আমার ভাই। তোকে এই জীবনে আর দেখতে পাব বলে ভাবিনি।” এইবার ভয়ঙ্কর চমকে ওঠে তুহিন। একবার তাকায় পিতার মুখের দিকে, আরেকবার তাকায় তুষারের দিকে। তুষার এইবার ডুকরে কেঁদে ওঠে, “চাচা, কত শুনেছি তোমার গল্প । মায়ের কাছে, বাবার কাছে, রাতের পর রাত। আজ তুমি সত্যি সত্যি দাঁড়িয়ে আছ আমাদের সামনে, বিশ্বাস হয়না।”
এইবার সব বুঝতে পারে তুহিন। তার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়তে থাকে। ‘বাবা, বাবা” বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। তুষারকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে, “বাবার কবরে একবার নিয়ে যাবি আমাকে?”

২৬২জন ১০৩জন
4 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য