মোদের গরব মোদের আশা আ’মরি বাংলা ভাষা

খসড়া ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫, বুধবার, ০২:১৬:২৭অপরাহ্ন বিবিধ ১৯ মন্তব্য

আগের পোস্ট > শোণিত ধারায় শানিত চেতনা

এমনিভাবে বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতে এ অঞ্চলের জাতিত্ববোধ বিবর্তন লাভ করেছিল তখন জাতিসত্বা তথা সভ্যতার অন্যতম বাহন ভাষার ক্ষেত্রে চলছিল ভাঙ্গা গড়ার আরেক খেলা। আমাদের আদি অধিবাসীদের ভাষা ছিল অষ্ট্রিক। কুড়ি, পন, গণ্ডা, গুটি ইত্যাদি শব্দ যার উদাহরন।এদিকে আর্য ভাষার আদি পরিশিলীত রূপ সংস্কৃতি তখন সাধারণ জনগোষ্ঠীর ব্যাবহারে ভেঙ্গে গিয়ে বিভিন্ন প্রকৃতির ভাষার রূপ পেয়েছে।যেমন শৌরসেনি, মাগধী,আধমাগধী, পৈশাচী ইত্যাদি। এদেরই মাগধী প্রকৃত ভাষা আদি অস্ট্রীক ভাষার সঙ্গে মিশে যখন কেবল বাংলা ভাষার রূপ নিচ্ছিল অখনই অপরিনত নবজাতক বাঙলা শব্দ নিয়ে আমাদের সাহিত্যের প্রথম প্রথিকৃত কিছু বৌদ্ধ বাউল সাধক আজ থেকে হাজার বছর আগে রচনা করে বসলেন চর্যাপদনামে কিছু অসাধারন গীতি কবিতা। বাঙলা সাহিত্যের প্রথম স্রষ্টারা যেমন তাদের দরিদ্র সমাজে অবহেলিত তেমনি তাদের কবিতাগুলিও ছিল ব্যাতিক্রমি। রাজভাষা সংস্কৃত তখন রাজকিয় পৃষ্ঠপোষকতায়তৎকালীন রাজা ও দেবদেবীদের গুনকীর্তনে ব্যাস্ত।আর নিঃস্ব বাউলের ঘরে জন্মলাভকারী বাংলা সাহিত্য প্রথমেই বলল মাটি, মানুষ আর প্রকৃতির কথা।
“টালত মোর ঘর নাই পড়বেশ
হাড়িত খাত নাহি নিতি আবেশী
বেঙ্গ সংসার বঢিল জাঅ
দুধ কি বেন্টে সামায়।“
অর্থাৎ “ টিলার উপর আমার ঘর। আমার কোন প্রতিবেশী নেই। হারিতে আমার ভাত নেই,আমি প্রতিদিন উপবাসী থাকি। ব্যাঙের মত প্রতিদিন আমার সংসার বেড়েই চলেছে, যে দুধ দোহানো হয়েছে তা আবার ফিরে যাচ্ছে গাভির বাটে।“ দারিদ্রের কি করুন চিত্র।
“উঁচা উঁচা পাবত তাই বসই শবরী বালী,
মোরঙ্গা পীচ্চ পরহিন শবরীগিবত গঞ্জরী মালী
উমত সবর পাগল নাকর গুলি গুহাড়া তৌহোরী
নিভঘরণী নামে সহজ সুন্দরী
নানা উরুবর মৌনলরে গঅনত লাগেলী ডালী।”
কবি নিজের স্ত্রী সম্পর্কে বলেছেন “উঁচু উঁচু যেখনে পাহাড়, সেখানে বাস করে শবরী বালিকা। তার পরনে মইয়ূরের বহু বর্ণ গুঞ্জা ফুলের মালা।“ আর নিজের উদ্দ্যেশে কবি বলেছেন” হে অস্থির পাগল শবর, তুমি গোল বাঁধিও না, এ তোমার স্ত্রী, এর নাম সহজ সুন্দরী। অসংখ্য গাছে ফুল ধরেছে আর আকাশে ছেয়ে গেছে তাদের ডাল।“ প্রকৃতি আর প্রেমের কি চমৎকার বর্ননা।
কিন্তু বাংলা ভাষার এই প্রচন্ড সম্ভাবনাকে মেনে নেয়নি তৎকালীন প্রতাপশালী অভিজাত সংস্কৃত ভাষা ভাষীরা। বাঙলা ভাষায় সাহিত্য রচনা তো দুরের কথা কোন প্রকার লিখনীও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল তখন। বাঙলা ভাষা বিকাশের ধারায় এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে বার বার। পরবর্তিতে তাই দেখে মোঘল আমলে ফরাসী, ইংরেজী আমলে ইংরেজি আর পাকিস্তান আমলে উর্দুভাষার চোখ রাঙ্গানির ফলে বাঙলা কখন্ব শাসক বা অভিজাত শ্রেনির ভাষা হতে পারেনি।
কুঁড়ে ঘরে জন্ম নেয়া বাঙলা ভাষা এদেশের লক্ষকোটি সাধারন মানুষের ভাষা হিসেবেই রয়ে গেছে যুগের পর যুগ। তবে ইতিহাস সাক্ষি, সেই সংস্কৃত যেমন আজ বেঁচে নেই, তেমনি অপরাপর তাবৎ তাথাকথিত রাজকীয় ভাষাও টিকে নেই এদেশের মাটিতে। টিকে আছে এদেশের মাটি ও মানুষের হৃদয় থেকে আবহমান কালের উৎসারিত ভাষা বাংলা। বলা বাহুল্য এর কারন একটি আর তা হল এদেশের মাটিতে হাজার বছরের প্রবাহিত শণিতধারা থেকে জন্ম নিয়েছে বাংলা ভাষা আর অন্যগুলি ভিনদেশী শাসকচক্রের ভিনদেশী ভাষা।
বস্তুতঃ বাংলাদেশ, বাঙালিজাতি ও বংলা ভাষার উপর যুগে যুগে বৈদেশিক আক্রমনের মুখেও আমাদের টিকে থাকবার ইতিহাস। একটি জাতীসত্বার বিশ্লেষনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নৃতাত্তিক, ভাষাভিত্তিক ও ভৌগোলিক।আমরা যেমন বিভিন্ন ঘাতপ্রতিঘাতে বাঙ্গালী জাতি ও বাংলা ভাষার ক্রমাগত সংগ্রাম ও সমৃদ্ধ লক্ষ করি তেমনি ভৌগোলিক দিক থেকেও বাংলাকে এক নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রামী জননীর ভূমিকায় প্রত্যক্ষ করি।

৬০৮জন ৬০৮জন
0 Shares

১৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ