মোটরসাইকেল

ফয়সাল খান ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ০৮:০৬:৩১পূর্বাহ্ন গল্প ৮ মন্তব্য

– “ভাই, প্লিজ একটু আস্তে চালাবেন?”
– “আরে ভাই, কিচ্ছু হবে না ”
– “না, আপনি একটু আস্তেই চালান, ১০ মিনিট পরে পৌঁছাইলে আমার কোন সমস্যা হবে না”

উবার ড্রাইভারকে একটু ধমক দিয়েই বললাম। ইদানীং উবারের ড্রাইভারগুলো কেমন যেন। চেহারা দেখলেই মনে হয় গতকাল থেকে মোটরসাইকেল চালায়। যাই হোক, ঐসব চিন্তা বাদ দিয়ে বাইক শক্ত করে ধরে বসলাম।

নাহ , ধমকে মনে হচ্ছে কোন কাজই হয় নি। উনি তো উনার মতই বাইক চালিয়ে যাচ্ছেন। মেজাজটা আরও খারাপ হয়ে গেল।

– “ভাই , আপনি যদি আস্তে বাইক না চালান , আমি নেমে যাব”
– “ওকে ভাই , আপনাদের আসলে উপকার করতে নাই , ১২ বছর ধরে বাইক চালাই, জীবনে একটা সাইকেল এর সাথেও লাগে নাই , আর আপনি ভয় পান ”

অনেকটা আমার দিকে মাথা ঘুরিয়েই কথাগুলো বলছিলেন লোকটা । আমিও তার কথার কোন পাত্তা দিচ্ছিলাম না। দেখলাম , বাম দিক থেকে একটা ট্রাক বের হয়ে রাস্তার মাঝ বরাবর হয়ে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করছিলো। আমি শুধু কোনোরকম চোখ বন্ধ করলাম। পিচের রাস্তার সাথে টায়ারের ঘষার বিকট আওয়াজ শুনলাম।

চোখ খুলে দেখলাম আমি রাস্তার পাশে পরে আছি , ড্রাইভার ভাই পাশেই পরে আছে। উনার মুখ রক্তে ভরে গেছে। আমার মাথাও ব্যাথায় চো চো করছিল।

– “ভাই , এইযে ভাই , আপনি ঠিক আছেন ?”
উনি আসতে আসতে চোখ খুল্লেন , আমি কোনমতে তাকে ধরে দাড়া করালাম। দেখলাম বাইকটি নেই।

হায়রে মানুষ। একটা মানুষের কাছে মানুষের কোন দাম নাই।

– “ভাই চলেন , আগে হাসপাতালে যাই , আপনার মাথা থেকে দেখি অনেক রক্ত পড়ছে ”

উনাকে ধরে ধরে সামনে একটু একটু করে আগাতে লাগলাম। রাস্তা দিয়ে একে একে গাড়ী যাচ্ছে । হাত দেখিয়ে থামানোর চেষ্টা করলাম অনেকবার। সবাই যেন দেখেও না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছে।

আমরা সামনে এগুচ্ছি । আমারও একটু পর পর চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল কিন্তু থামার উপায় ছিল না।

একটু আগেই যে লোকটার উপর আমার রাগ হচ্ছিল , এখন তার জন্য আমার অনেক মায়া হচ্ছে। লোকটার পরনের কাপড় বেশী একটা ভালো ছিল না। বোঝাই যায় উবারে বাইক চালিয়ে লোকটার হয়ত সংসার চলত। এখন তো বাইকটাও হারাল লোকটা।

ঐ তো , কুর্মিটোলা হাসপাতাল।

– ” ভাই , হাসপাতালে পোঁছে গিয়েছি আমরা, আপনার বাড়ির কারো নাম্বার থাকলে দেন, আমি ফোন দেই ”

উনি কোন কথাই বলছিল না। এখনো মনে হয় উনার শক কাটে নাই ।

উনাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে আমি ডাক্তার খুঁজতে লাগলাম। বুঝলাম না , হাসপাতালেও কারো কোন সাহায্য পাচ্ছিলাম না। আমি ইমারজেন্সির দরজা খুলে ভিতরে দেখলাম ভিতরে ডাক্তার একটা রোগী নিয়ে ব্যস্ত।

– “এইটা কি কোন হাসপাতাল? আমরা ২জন লোক ভিতরে ঢুকলাম , গায়ে রক্ত, তবুও কোন নার্স, কেউই এগিয়ে আসলো না?”

আশ্চর্য , ডাক্তার আমার কোন কথা কানে নিয়েছে বলে মনে হয় না । আমি সামনে এগিয়ে খেয়াল করলাম ডাক্তার আমারই অপারেশন করছেন। গালের দিকটা ফেটে গিয়েছে। ডাক্তার ওইটাই সেলাই করছিলো।

আমি চোখ খুলে দেখি আমি হাসপাতালের বেডে। পাশে মা বসে তসবিহ গুনছেন। হাত দিয়ে আঁচ করলাম গালে বেন্ডিজ।

মাকে, ডাক দিতে গিয়েও ডাক দিতে পারলাম না। হাত দিয়ে ইশারা করলাম। মা জায়নামাজ থেকে উঠে এসে কান্না কান্না গলায় বললেন “বাবা, তুই ঠিক আছিস?”

ডাক্তার আসলেন ।

এসে চোখে লাইট মেরে কি যেন চেক করলেন।

আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলাম আমি হাসপাতালে কিভাবে এসেছি। ডাক্তার বললেন আমাকে নাকি লোকজন নিয়ে এসেছে। ডাক্তার আরো আমি নাকি প্রানে বেঁচে গিয়েছি। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম আমি যার বাইকে ছিলাম তার কি অবস্থা?

ডাক্তার জবাবে বললেন “আসলে এইটা তো পুলিশ কেস, এখনও বডির চেহারা চেনা যায়নি, এক্সিডেন্টের সময় পিছন থেকে গাড়ী এসে বাইক ড্রাইভারের মাথা পিষে না দিলে অন্তত উনিও বেঁচে যেতেন “

১৫১জন ৮৩জন
5 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য