সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

মেহেদি রঙে রাঙা

বন্যা লিপি ২৮ জুলাই ২০২১, বুধবার, ০১:১৪:৫৪পূর্বাহ্ন স্মৃতিকথা ৩৬ মন্তব্য

শোনা কাহিনীঃ

একজন পরহেজগার আউলিয়া একবার জিদ ধরলেন, পৃথিবীতে সঞ্জীবনী কিছু আছে কিনা জানার জন্য। অর্থাৎ, মৃতসঞ্জীবনী। যা সেবন করে অনন্তকাল পৃথিবীতে বেঁচে থাকা যায়। তাঁকে বুজুর্গ পীর বলে দিলেন, পৃথিবীর অভ্যন্তরে কোনো এক বনে রয়েছে এমন একটি গাছ, যার পাতায় রয়েছে এই সঞ্জীবনী নির্যাস। তবে শর্ত একটাই তোমাকে তা নিজগুণে চিনে নিতে হবে।চেনার পরে এ খবর কাউকে প্রকাশ করতে পারবে না। তাহলে এই গাছ তার গুণাগুণ হারিয়ে ফেলবে। সঞ্জীবনী সন্ধানী লোক হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করলো এই অমৃত নির্যাসের পাতার গাছ। খুঁজে খুঁজে একদিন সেই গাছের কাছেই এসে ক্লান্তিতে বিশ্রাম নিতে বসলেন। এক পথিক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন,  কেন এবং কোথা থেকে এ পথিক এসেছেন? অবচেতনে পুরো কাহিনী অমৃত সন্ধানী সব বলে দিলেন। বললেন,এমন কোনো গাছের খোঁজ কেউ জান কিনা! যার পাতার রঙ লাল? আগত পথিক বললো, আপনি তো সে গাছের ছায়াতেই বসে আছেন!’ তৎক্ষনাত গাছের পাতা লাল থেকে সবুজ হয়ে গেলো। অমৃত সঞ্জীবনী সন্ধানী মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন আবারো। ততক্ষনে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন তিনি। কাউকে কিছু বলা বারন ছিলো।নিজেই চিনে নেবার শর্তে হেরে গেলেন সঞ্জীবনী সন্ধানী।

এই সেই গাছ যা এখন আমরা মেহেদি গাছ নামে চিনি। এ কাহিনীর সত্যতা সম্পর্কে আমার সত্য জ্ঞান নাই। তা না থাকলেও আমার ভালো লাগলো বলে কাহিনীটা সবার সাথে শেয়ার করার ইচ্ছে হলো বলে ঘটনাটা বর্ননা করলাম।

শৈশব প্রতিটা মানুষের কাছে এক হারানো সোনালী দিন। ভাবনাহীন প্রজাপতির মত উড়ে ঘুরে বেড়ানো শৈশব পিছু ছাড়েনা একদণ্ড। মাঝ বয়স এসে যখন দরজায় জোরেসোরে কড়া নেড়ে বলে! ‘ তেমার এখন অনেককিছু বলতে মানা, অনেককিছু করতে বারন! বুকের কাছে দীর্ঘশ্বাস আরো আরো দীর্ঘ হয়। চোখের সামনে এসে ছোটাছুটি করে ফ্রক পরা, চুল ওড়ানো সেই শিশু কিশোর বেলার নানারঙের দিনগুলো……

কেন হারাচ্ছে সব, বাড়াচ্ছে ভিড়
হারানোর তালিকায় ?!
আজ কে যে কোথায় আছি
কোন খবর নেইত কারো !
অথচ তোর ওই-দুঃখ গুলোতে
অংশ ছিল আমারও !

এই চলতি জীবন ঘটনাবহূল
দু-এক ইঞ্চি ফাঁকে,
তুইতো পাবিনা আমায়- আর
আমিও খুঁজিনা তোকে !

নানাবাড়ি যাবার জন্য যখন আম্মা আব্বার মধ্যে কথা শুরু হত! তখন আমার চোখ চকচক করে উঠত। আব্বা সহজে রাজি হতে চাইতেন না আমাদের নিয়ে নানাবাড়ি যাবার ব্যাপারে। তাঁর ধারনা ছিলো গেলেই বড় খালা সুযোগ পেলেই হয়ত আমার কেনো একটা ক্ষতি করে ফেলতে পারেন। আমার ওপরে আমার বড় খালার ভীষণ ক্ষোভ ছিলো যে!! কয়েক বছর আম্মা বাপের বাড়ি যাবার কথা মনেও আনেননি সেই একই কারনে।  বড় খালা খবর পেলেই হয়ত চলে আসবেন লিলার মেয়ে লিপির কোনো ক্ষতি করতে। সে কাহিনী আজ তোলা থাক।অন্যকোনোদিন সুযোগ এলে লেখা যাবে।

নানাবাড়ি যাবার কথা উঠলেই জোড় আবদারে আব্বার পা জড়িয়ে ধরে….. আব্বা নানাবাড়ি যাব বলে ঝুলে থাকা দিন গুলো এখন চোখ ভিজিয়ে দ্যায়। সেই তখন থেকেই খেয়াল করি,বাবা আমার কথা ফেলতে পারেন না কোনোভাবে। শুধু আম্মাকে শর্ত জুড়ে দেন যেন অতিরিক্ত নজরদারি রাখেন!

কয়েকঘন্টার রাস্তা। লাগে যেন কয়েকযুগ। কখন পৌঁছব? আর কতদূর সে পথ? মায়ের কোল ছেড়ে তখন আলাদা সিট নিয়ে বাসে চড়ার মজা উপভোগ করি আপনমনে।জানালার কাছেই বসতে হবে। দীর্ঘ পথটুকু প্রকৃতির গাছপালাদের সাথে আপনমনে বকবক করতে করতে একেকটা ষ্টেশন পার করা। বাস থেকে নেমে হাঁটাপথের পরিমাপ আজও জানিনা। সে অনেকটা পথ। হেঁটেই যেতে হয় শফিউদ্দন আহমেদের ( আমার নানা) বাড়ি পর্যন্ত। আমার আম্মার কথা ভাবি আজ…. কী অসীম ধৈর্য্য মহিলার!! লাগেজ ব্যাগেজ নিয়ে আমাদের ২/৩ জন ছোট ছোট ভাইবোন নিয়ে একাই চলেন বাপের বাড়ি! সামনে পেছনে দুটো বিশালাকার পুকুর। ভেতর বাড়ির পুকুর ঘাটের কাছেই বিশালাকার এক মেহেদি গাছ। তরতর করে গাছে চড়ে যাওয়া যায়, গাছের ভঙ্গিমা এমনই। মূল বাড়ির দুই দিকেই প্রধান দরজার সামনে বসার জন্য সিমেন্টের আসন। মেহেদি পাতা ছিঁড়তে দেরি নাই আর বাটনার জন্য আলাদা শীল পাটারও দরকার নেই। ওই সিমেন্টের আসনেই বসে পরি মেন্দিপাতা বাটতে। এবং নিজেই বাটি আমি। বড় খালা ততদিনে শান্ত হয়েছেন অনেকখানি। বড়খালার অনেকগুলো মেয়ে। শিরু আপা( যাকে কোনোদিন দেখিনি আমি) দিপু আপা,শিপু আপা,রেখা আপা, নিশু। নিশু আমার বয়সী বলে খুব ভাব হয়ে যায় আমার সাথে। একসাথেই মেন্দি আয়োজনে লেগে পড়ি। মেহেদি বাটতে বাটতে ডান হাতের পাঞ্জা এমনেই লাল হয়ে ওঠে…… ইশশশ্…  লিপি,তোর হাত কী লাল হইছে!! তোর হাতে অনেক রঙ হইবে। আমার খুশি লাগে তখন।সত্যিই হবে তো? গোল্লা গোল্লা করে বাঁ হাত ভরে মেহেদি পরি। নখগুলো ঢেকে দেই থাম্বা থাম্বা করে। সারাদিন ধরে আর কোনো কাজ নেই মেহেদি শুখাবার অপেক্ষা।

মেহেদি গাছ প্রিয় হয়ে উঠলো তখন থেকেই। তখন থেকেই প্রিয় হয়ে উঠল হাতে মেহেদি পরা। মেহেদি গাছ দেখলেই হলো। সংগ্রহ করতেই হবে,নিজ হাতেই পাতা পিষে হাত রাঙাতে হবে। আম্মা নিজে লাগালেন মেহেদি গাছ। তাও আমার হাত দিয়েই লাগালেন। আমার নিত্যদিন সেই গাছ চোখে চোখে রাখা। পাতাগুলো কী সুন্দর! একটু মোটা পুষ্ট পাতাগুলোতে রঙ হয় বেশি। যে পাতায় কালো কালে দাগ পড়ে!! সেই পাতায় রঙ বেশি হয়। মেহেদি পাতার গুণাগুণও অনেক। বিশেষ করে চর্মরোগের মহৌষধ। মাথার চুলের জন্যও ভীষণ উপকারি। চুল পরা রোধ করা, আবার চুল ঘন হওয়ায় কার্যকরী।  তবে কথা আছে। অনেকের ঠিকঠাক সয়না মেহেদি পাতার প্রয়োগ। ফল বিফল হয়।

আমার মেহেদি পরা শুরু এভাবেই। আমি ফ্রিকি( এই ফ্রিকি শব্দের যথাযথ বাংলায় বললে ততটা আমেজ আসে না বলে বাংলিশ চালিয়ে গেলাম) হয়ে পরলাম। মেহেদির রঙ ফিকে হতে না হতেই আবার পাতা ছিড়ি, আবার বাটি,আবার নকশা আঁকি হাতের তালুতে। পাড়াপড়শি চোখ ট্যারা করে। আবোল তাবোল বলে….. কাম নাই কাইজ নাই খালি হাত ভইর্রা মেন্দি দেয়। আব্বার ধমক একদিন- ‘ তোর কি বিয়া?  পড়াশুনা নাই? কাল কী পরীক্ষা? আমি: বাংলা, সব পারি তো!

মেন্দিই তো দিই! তাতে এত কথা বলার কি আছে? শবই বরাত আসে। মেহেদি পরার উপলক্ষ। লাভলি, ঈরানী,বনানী,হ্যাপী ফুপু,মুক্তি,পলি ফুপু সবাই একযোগে মেহেদি তুলি। যার যার বাসায় বাটনা বাটি। যার যার হাতে মেহেদি পরিও নিজে নিজে। তারপর দেখতে বেরই কে কতটা সুন্দর ডিজাইন এঁকেছে। তারপর রং পাকা করতে কে কতটা কায়দা আয়ত্ত করছে। মেহেদি শুকিয়ে গেলে পানি লাগানো যাবেনা কয়েকঘন্টার মধ্যে। সর্ষের তেল মেখে সারারাত রাখতে হবে।সকালে উঠে চোখের সামনে আগেই মেহেদি পরা হাত নিয়ে দেখি, সকালের আলোর মত চোখমুখ জ্বল জ্বল করে ওঠে রং দেখে। আমার থেকে ওদের হাতে যদি বেশি রং হয়! ম্লান হয় মুখের হাসি। ধরন বদলাই মেহেদি দেয়ার। ততদিনে তো কৈশোর পেরিয়ে গেছি! মেহেদির রং তো আগেরই মত রয়ে গেছে!! বদলেছে আঁকার ধরন। বদলেছে অনেককিছু। মেহেদি পরার পাগলামি বদলায়না আমার। আমি হাত খুঁজি পরিয়ে দেব বলে। মুক্তি ( আমার ছোট ফুপি+ বান্ধবি) অনেক জ্বালিয়েছি এই মেহেদি পরানো নিয়ে। এত ধমকেছি ওকে!! এখনো বলে ও ওর মেয়ের কাছে- ‘ অনু, তোর বুজি’র ধাবার(ধমক) খাইতে খাইতে আমি শ্যাষ।খালি ওর ধারে মেন্দি দিতে বইলে হইছিলো!!

বিয়ের পরে শশুর বাড়িতেও পেয়ে গেলাম বিশাল মেহেদি গাছ। আমার শশুড় বাড়িতে থাকা হয়না বেশি। সর্বোচ্চ ১৫/১৬ দিন! তাও সেই বিয়ের প্রথম দিকে। তারপর আমি মা হলাম। মেয়েটা বড় হতে হতে ওর হাতে পরাতে শুরু করলাম।  নিজেও পরি,মেয়েকেও পরিয়ে দিই। আমার আর্ট দেখে অনেকেই পছন্দ করতে লাগলো। বলা যায় আমার মেহেদি পরা/ পরানোর চর্চটা চলছিলো বলেই হয়ত! মেয়ের হাতেও রং উঠে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা, তারপর আবার আমিই দিয়ে দেই। কাছের আত্মিয় স্বজন আমার কাছে আসে মেহেদি দিতে। কোনো বিয়ের কনেকেও দিতে শুরু করেছি সেই নিজের বিয়ের আগে থেকেই। এ আমার আনন্দ। এক আলাদা আনন্দ।আমার আরেক নেশা মেহেদি। মেয়েটা ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠলো। ক্লাশ ফাইভে আইডিয়াল স্কুল& কলেজের বনশ্রী শাখায় ভর্তি করালাম। প্রায়ই মেয়ের হাতে মেহেদি থাকে বলে বান্ধবিরা জানতে চায়,  তুমি দিয়েছ? মেয়ে মায়ের কথা বলে। যে ফ্লাটে ভাড়া থাকি, পাশের ফ্লাটের প্রায় সবাই উৎসব গুলোতে হাজির হতে শুরু করলো। একে তো পরিশ্রম, তারওপর সময়। তবুও আমার ক্লান্তি বা বিরক্তি কোনোটাই নেই। আমি কোনো আর্ট দেখে দেখেই হাতে এঁকে দেই মেহেদির নকশা। ২০০৭ এ আমি সার্ভিক্যাল সমস্যায় পরলাম।অস্টিওপরোসিস।  ডান হাতে সমস্যা শুরু হলো। মেহেদির কোন চেপে ধরে ডিজাইন আঁকা তো দূর, স্বাভাবিক কাজকর্মে আমি বিরতি দিয়েছি অনেক কাজ। মেহেদি পরানোও ছাড়লাম,নিজেও অব্যাহতিতে চলে গেলাম কিছুদিন। আমার কন্যা যখন কিন্ডারগার্টেনে পড়ে, তখনই মেয়ে আমার ছবি আঁকায় বেশ পটু। ড্রইংএ সে দ্বিতীয় হয় সবসময়। প্রথম হওয়ার জন্য ওকে আমি কোনো আর্ট স্কুলে দিতে পারিনি কখনো। আমি নিজে ঘরে যতটুকু পারতাম দেখিয়ে দেবার চেষ্টা করতাম। ওই শিক্ষাটুকু পরবর্তিতে কাজে লাগালো শিফা(আমার মেয়ের নাম) মেহেদির ডিজাইনে। আমার বিপরীতে এরপর থেকে শিফার কাছে সবাই আসতে শুরু করলো মেহেদি পরতে। ক্লাশের বান্ধবিরা ভীড় করে ওর কাছে। ফ্লাটের সবাই এবং ভাড়াটে প্রতিবেশির আত্মিয়রাও।  মেয়ে আমার বড় হিসেবি হয়ে গেলো শেষাবধি। -‘ আমার কষ্ট হয়না এতজনকে মেহেদি দিতে? আমি কী ফ্রিতে দেব নাকি? এরপর থেকে আমি দাম নির্ধারন করব’ আমি বললাম: দেখবি এরপর আর কেউ আসবে না।

শিফা- না আসুক। তাও আমি এত কষ্ট করে ফ্রিতে ফ্রিতে দিয়ে দেবনা মেহেদি।  দেয়ওনি আর। স্কুলের বিজ্ঞান মেলায় তিন বান্ধবি মিলে স্টল নিয়ে বসলো ২০০৯ এ। ওরা তিনজনে একদিনের কয়েকঘন্টায় আয় করলো প্রায় খরচ বাদ দিয়ে ১২০০ টাকার মত। ওরা উৎসাহ পেয়ে গেলো এভাবেই। ঈদ বা বৈশাখের উৎসবে ওরা বসতে শুরু করলো মেহেদির স্টল নিয়ে। বাড়তে বাড়তে পরিসর আরো বাড়লো। এরই মধ্যে স্কুল বন্ধুদের সাথেও যোগাযোগ ছিন্ন হলো। তবু থেমে যায়নি শিফার মেহেদি ব্যাবসা। পার্টনার পেয়ে গেলো আরেকজন স্কুল বান্ধবি। তাঁকে নিয়েই পূর্ণ উদ্যোমে চালু হলো মেহেদির কাজ। ঈদুল ফিতর কিংবা ঈদুল আযহা, অথবা বৈশাখী পার্বণ! কারুকা” মেহেদি নামে অনলাইন ভিত্তিক পেজও খুললো। বেশ চলছিলো এই মেহেদি পাগলামি।  কেভিড-১৯ এলে বিশ্বে।এরপর সব থমকে গ্যাছে…….

পুনশ্চঃ গত  দুদিন আগে ব্লগার সাবিনা ইয়াসমিন এবং আজ জিসান শা ইকরামের মেহেদি নিয়ে গ্রুপে পোষ্ট দেখে ইচ্ছে হলো আমিও আমার মেহেদির গল্প শোনাই।  অনেকদিন পরে কিছু লেখার চেষ্টা…..।  জানি এও মনমোতাবেক কিছু হয়নি। তবুও…..

২১৩জন ৩৫জন
0 Shares

৩৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য