সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

মেঘের রোদ্দুর

রোকসানা খন্দকার রুকু ২ জুন ২০২১, বুধবার, ০১:০১:১২অপরাহ্ন গল্প ২৩ মন্তব্য

আজ একটা চূড়ান্ত হিসেব না হওয়া পর্যন্ত এই ছেলেকে ছাড়বো না। এই করোনাকালেও আধা ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। সে সবসময় ওয়েট করায়। কতগুলো ছেলে হালুম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কেউ বলছে, আহারে! কেউ আসবো নাকি সোনা? কেউ নেই নাকি? কি নিষ্ঠুরের প্রেমে পড়েছে।

অথচ রোদ্দুরকে ফোন দিলেই বলছে, “এই আসছি মেঘ, একটু দাঁড়াও।

সবসময়ই দেরিতে এসে নানা অজুহাতে কানে ধরে আর কমন ডায়ালগ “ভালো জিনিসের কদর বেশি। ভালো প্রেমিক পেতে হলে এরকম অপেক্ষা ব্যাপার না, সয়ে নিতে হবে।”

এই ভালোতে মনে পড়ে গেল, আমার জীবনের সব ভালো এমন কেন? তাদের পেছনে ছুটে ছুটে আমার বেহাল দশা।

মিঠু, আমার দর্জি। ভদ্র, অমায়িক, অসাধারন ছেলে। জামা- কাপড় সব আমাদের বাসায় এসেই নিয়ে যায় আবার দিয়েও যায়। একদম পারফেক্টলি সব বানায়।আমি মহা খুশি এতোদিন কত জামা- কাপড়ই না নষ্ট হলো, এখন রক্ষা। প্রথম প্রথম ঠিক চললেও হঠাৎ এক ঈদের আগে ফোন অফ। দোকানে গেলাম তাও নেই। মহা ঝামেলা ঈদ পুরাই নষ্ট।

ঈদের দিন দশেক বাদে হাসিমুখে এসে হাজির, “আপু সরি, ভীষন জ্বর ছিলো?”

ডাহা মিথ্যা কথা কারণ তার জ্বরের ছিঁটেফোঁটা লক্ষন শরীরে নেই। নির্ঘাত কোথাও ঘুরতে গিয়েছিলো। গা জ্বলে গেলো কিন্তু তার বলার ভঙ্গি কাবু করে ফেললো। কিছু মানুষের সাথে কেন যেন রাগ করা যায় না? আবার সব ভুলে গিয়ে তাকেই কাপড় বানাতে দিলাম। এরপর কম হলেও দশবার সে এই কাজ করেছে। আর আমি তার ফিটিং আর কাটে পাগল হয়ে ছাড়তে পারিনা। সম্প্রতি সে আবারও সে ফোন ধরছে না এবং উধাও।

অফিসে যাবার আগে চরম তারাহুরো লেগে যায়। পরিচিত এক রিক্সা চাচার নাম্বার নিয়ে রেখেছি। তিনি ভীষন ভালো মানুষ। কিন্তু তাড়াহুরোর দিনই তার রিকসার পাম চলে যায়। প্রতিদিনই কথা দেন এরপর চেক করে আনবেন। আনেন কিনা জানিনা তবুও তার রিক্সাই আমার চাই।

শহিদুল ভাই, ফার্নিচার এক্সপার্ট। ভালো মানের কাঠ ও লেটেষ্ট ডিজাইনের সমস্ত সমাহার যেন তার কাছেই। চাকুরীর প্রথম বেতন দিয়ে তার কাছে দিলাম খাট বানাতে। ডেলিভারীর কদিন আগে সে উধাও। তার নাকি অনেক দেনা হয়েছে সেজন্য পালিয়েছে। সে বহু ইতিহাসের পর কিছু টাকা নতুন করে গচ্ছা দিয়ে অবশেষে খাটটি উদ্ধার হলো।

ছ’ মাস সে ইন্ডিয়া না কোথা থেকে এসে বাসায় হাজির। -“আপু পালানোর ছেলে আমি না, সমস্যা হতেই পারে।বাকি যা যা বানানোর কথা ছিলো তার অর্ডার দেন।”

মন চাইলো পুলিশে দেই। কিন্তু ডিজাইনে মন ভরে গেলো, ভুলে গেলাম সব।

এতসব ভেবে ফেললাম অথচ এখনও রোদ্দুর নেই। আজ ভীষন রেগে আছি। ব্রেকআপ তো হবেই সাথে হিসেব নিকেশ সব চুকে ফেলবো। তুমুল ঝগড়া করতে নির্বিঘ্ন , নিরিবিলি পরিবেশ লাগে। ভাগ্যভালো এ সময়টা ফাঁকা। তুমুল ঝগড়া চলছে দুজনের মাঝে। রোদ্দুর নাকি আমার উপর অনেক ইনভেস্ট করেছে। মেজাজ খারাপ হলো। কারণ ব্রেকআপের পর ছেলেরা এ দূর্নামটাই আগে রটায়। তাই এ ব্যাপারে আমি যথেষ্ঠ সচেতন ছিলাম। আমি এ যুগের ছেলে ভাঙ্গানো মেয়ে না। খাবারের বিল, রিক্সা ভাড়া, গিফট সব প্রায় সমান সমান দিয়েছি। রোদ্দুর কিছুতেই আটকাতে না পেরে হাঁসফাঁস করতে লাগলো।

হঠাৎ বলে বসলো, একটা জিনিসে আমি এগিয়ে আছি সেটা শোধ না হওয়া পর্যন্ত তুমি যেতে পারবা না।

ওকে, ডান! বলো? শোধ বোধ হয়েই ব্রেকআপ হবে। শুনে কান লাল হয়ে গেলো কিন্তু জবান যখন দিয়েছি তাই শোধ তো দিতেই হবে। ঋণ রেখে মরাও ঠিক না। খুউব রেগে আছি তবুও তার ঠোঁটের দিকে এগিয়ে গেলাম। সন্ধ্যার পাখিরা সমস্বরে বলে উঠলো, “চুপ পৃথিবী, শ্রেষ্ঠ প্রেমিক যুগল এখন ভালোবাসা-বাসীতে ব্যস্ত!”

তার ঠোঁটে কতক্ষন আছি, ছিলাম এসবের হিসেব হারিয়ে গেলো। আর রেগে যে ছিলাম সে দুনিয়া ছেড়েছে। আর আমার শুধুই মনে হলো এই মানুষটাকে ছাড়া কোনভাবেই চলবে না?  দুহাতে রোদ্দুরকে শক্ত করে জডিয়ে আছি, সেও আমাকে। কিছুতেই যেন ছাড়তে ইচ্ছে করছে না? এরপরের ডেটেও আমাকে আবার দাঁড় করিয়ে রাখবে এটা জানার পরও মনে হলো জ্বালাক না একটু, আমারি তো মানুষটা।

তবুও রাগের ভান করে ছুঁড়ে দিলাম। ও মা গো মা বলে কি জানেন? এখনও একটা বিষয় শোধবোধ বাকি।

আবার কি?

“ তুমি যতগুলো দিন আমার জন্য অপেক্ষা করেছ আমিও ঠিক ততোদিনই অপেক্ষা করবো তারপর ব্রেকআপ হবে।”

নেক্সট  টাইম ঠিক হলো সে সারে চারটায় আসবে। আমি পাচটায় গিয়ে তাকে কোথাও পেলাম না। মিনিট পাঁচেক পরে এলো সেই হাসিতে, কপালের চুল সরিয়ে এক্কিউজ রিক্সা পাওয়া যায়নি। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আর ডেট নয় বাসায় কথা বলো বিয়ে করবো। বয়স তো কম হলো না।

অনারম্বর বিয়ের পর বাসর ঘরে সে আমায় আসছি বলে গেল। রাত তিনটে বাজে, আমি অপেক্ষায় না থেকে ঘুমিয়ে পড়েছি। সকাল দশটায় সে এলো একগোছা ফুলহাতে।

-মেঘ, চুরি করে আনলাম তোমার জন্য।

কপালের চুল সরিয়ে নির্বিকার উত্তর, টুটুলদের ছাদবাগানে রাতে অনেক জোনাকি আসে। তোমার পছন্দ  তাই আনতে গিয়ে ধরতে ধরতে কখন ঘুমিয়ে গেছি মনে নেই। সুন্দর না জেনাকিগুলো? তুমি কি অনেক রাগ করেছ মেঘ?

আমি তখন রেগে না গিয়ে দেখছি, তার চুল কেন এতসুন্দর করে বাতাসে ওডে? চিকন ঠোঁটের কোনায় দুষ্টুমি ভরা হাসিতে এতসুন্দর করে কথা কেমনে বলে? ফুলগুলো  চুরি করে আনতে তার কতটা কষ্ট হয়েছে?জোনাক ধরতে সে কতটা কষ্ট পেয়েছে? অনুভব করছি, আমাকে খুশি করতে এ মানুষটার করা বারবার ভুল গুলোকে।

একঝাঁক পাখি কলকলিয়ে উড়ে গেল! কি সুন্দর স্বচ্ছ নীল আকাশ আর আমার ঘরে সোনালী রোদ্দুর। সে বকবক করেই যাচ্ছে, ভাবছে আমি অনেক রেগে আছি। আমি একটুও রাগিনি, ফুল ও জোনাক আমার ভীষন পছন্দ হয়েছে। রাতে তার সাথে জোনাকগুলোকে ছেড়ে দিয়ে আলো জ্বলা দেখবো।

“অপেক্ষা মধুরতর হয়, যখন প্রিয় কারও জন্য করা হয়। আমি এই মানুষটার জন্য এমন মধুর অপেক্ষা সারাজীবন করতে চাই!”

জীবন এতো সুন্দর কেন? এই পাগল মানুষটার জন্যই কি????

ছবি- নেটের

২৬৬জন ৫৬জন
0 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য