মেঘের আড়ালে আকাশ

খাদিজাতুল কুবরা ১৩ মে ২০২২, শুক্রবার, ০১:১৩:২৩পূর্বাহ্ন গল্প ৪ মন্তব্য

সে নেই আজ এক বছর সতেরো দিন।সে না থাকলেও দুর্বিষহ স্মৃতিরা আমার সাথে আঠার মত লেপ্টে আছে। ওদের জন্য জেগে থাকলে সুখী হতে পারিনা, ছোট বড় কোন প্রাপ্তিকে অনুভব করতে পারিনা। আর ঘুমুতে গেলে আমার চেয়ে অসহায় কেউ নেই। আমার বন্ধ চোখের পাতায় ট্রাজিক সিনেমার মত ঘটনাগুলো হেঁটে বেড়ায়। আমার বর্তমানকে কুয়াশাচ্ছন্ন করে রাখে। আমি জেগে থাকি রাতের পর রাত। এ আমার গত এক বছরের প্রায় নৈমিত্তিক বিষয়। কিন্তু আজ আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন। চোখটা যেই লেগে এসেছে অমনি আমি তাকে দেখতে পেলাম, আমার শিয়রের কাছে দাঁড়িয়ে! আমি জেগে উঠি আর তাকে হাতড়াতে থাকি, চোখ ঘুরিয়ে তাকে খুঁজি। মনে পড়ে, আমি শম্পা, তাঁর বিধবা স্ত্রী। সে মারা গেছে, মৃতরা ফিরে আসতে পারেনা। এ মুহূর্তে  মন চিৎকার করছে, তাকে চাইছে। বলছে, পাশের রুমে যেভাবে আগে ঘুমাত সেভাবেই আবার ঘুমাক, তবুও মানুষটা দিনশেষে ঘরে ফিরুক। মানুষটা থাকুক আমার আশেপাশে। আমাকে মূল্যায়ন না করুক, যন্ত্রণা দিক, বকা দিক, তবুও সে থাকুক। তার না থাকা আমাকে তিলেতিলে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। আজ বুঝতে পারছি এত অত্যাচার করার পরও কেন মানুষটাকে ছেড়ে যেতে পারিনি। আমি জেনে গেছি আমার অবচেতন মন তাকে ভালোবেসেছিল। একদিনের ঘটনা বেশি মনে পড়ে, ভোর চারটায় ফোন করে বলল আমি এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছেছি। কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় আসছি। গোসল করব, গরম পানি দাও চুলায়। আমি তাকে ভয় পেতাম। ঘুম চোখে, হন্তদন্ত হয়ে তার সবকিছু রেডি করলাম। বিছানা বালিশ সবকিছু ঝকঝকে তকতকে চাই তার। কলিং শুনে দৌড়ে দরজা খুলি। দেরি হলে আমার খবর আছে। সদ্য ওমরা হজ্জ্ব পালন করে এসেছেন তাই তাঁকে কদমবুসি করলাম। আগেরবার করিনি বলে বেজায় রাগ করেছিলেন। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে দুগালে চুমু খেলেন উপুর্যুপরি। ফিসফিস করে বললেন তোমাকে খুব মনে পড়েছিল। আমার খাওয়া দাওয়া খুব অনিয়ম হয়েছে। ডায়াবেটিস বেড়েছে অনেক। আমি হতভম্ব! এর আগেও তিনি দেশের বাইরে থেকে ফিরেছেন বহুবার, কখনো এমন আবেগ দেখাননি আমার প্রতি। তিনিত কাম অনুভূতি ছাড়া কখনো আমায় জড়িয়ে ধরেননি। যা-ই হোক আমি সেদিন স্বর্গীয় সুখের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। তখন ঘুনাক্ষরে ও জানতে পারিনি সে আর কোনদিন আমাকে জড়িয়ে ধরবেনা চুমু খাবেনা। পরের সপ্তাহেই তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী ( প্রথম প্রেম) ফিরে আসে এবং তাঁরা আবারও বিয়ে করে নেয় তাদের সন্তানদের ঐকান্তিক চেষ্টা সফল হয়। আমে দুধে মিশে যায় তারা আর আমি আঁটি ভাগাড়ে গড়াগড়ি খাই। আমার মূল দুর্গতির শুরু সেদিন থেকে। দেখতে না পারলে চলন বাঁকা প্রবাদটির সত্যতা দেখলাম প্রতিটি মুহুর্তে। সে আমার দোষ ছাড়া গুণ আর কখনো দেখতে পায়নি। কারণে অকারণে আগেও বকেছে, রাগ পড়ে গেলে আবার আদরও করেছে। যদি ও আমার যতদূর মনে পড়ে কামাসক্তি ছাড়া সে আমায় কাছে টানতোনা। এমনকি আমার বাবার মৃত্যুর দিন ও আমাকে সে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দেয়নি। আমাদের দুই সন্তান, দীপ আর শিখা। ওরা উনার কলিজার টুকরা যেন। তাই আমাকে ছেড়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। নিজ মুখে বলেছেন, আরও বলেছেন তাঁর স্ত্রীর উপর রাগ করে আমাকে বিয়ে করেছেন। আমি আসলে তার জীবনে কোন অর্থ বহন করিনা। শুনে সেদিন পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছিল সবার অলক্ষ্যে। চিৎকার করে কৈফিয়ত চেয়েছিলাম, “আমার জীবনটা নষ্ট করেছিস কেন?” দুটো বাচ্চা না থাকলে এক্ষুনি ছাদে উঠে সবকিছুর ইতি টানতাম বুঝেছিস তুই?  অপদার্থ, অমানুষ, নিষ্ঠুর! আরো কতকি বলেছি আজ আর মনে নেই। সে সেদিন শুধু আমার দিকে তাকিয়েছিল যেন এই আমাকে সে চেনেনা। সারারাত ঘুমাতে পারিনি, মূলত এরপর আর একটি রাতও পুরোপুরি ঘুমুতে পারিনি আজ অব্ধি। পরদিন সকালে কালবৈশাখী থেমে যাওয়া সূর্যোদয়ের মতই নিজের মধ্যে আবিষ্কার করলাম মনে মনে বরণ করে নেওয়া এক সদ্য বিধবা দুটো মাসুম শিশুর মাকে। যে আর কখনো কৈফিয়ত চাইবেনা নিজের বঞ্চনার জন্য।

অদ্ভুত শান্ত হয়ে পড়েছিলাম আমি আর সে হয়ে উঠল আরো বন্য, বদরাগী, নিষ্ঠুর ও  নির্মম। সপ্তাহে দুদিন থাকত আমাদের সাথে। বাচ্চাদের সাথে সময় কাটাত। সে-তো আগে থেকেই আলাদা ঘুমাত। আমার ডাক পড়েনি আর কোনদিন তার চৌকাঠে। আমার ও ইচ্ছে ছিলোনা, ঘেন্না লাগত। তার সেবাযত্ন করতাম, বাচ্চাদের কথা ভেবে। আমার উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য যদি ওদেরকে পৈতৃক সম্পদ থেকে বঞ্চিত করে এই ভয়ে তাঁর যত্ন নিতাম। তাছাড়া যদি ওরা পিতৃস্নেহ বঞ্চিত হয় আমারই কারণে তাহলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবোনা। রাতে জানালার গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম, আকাশ দেখতাম, থেকে থেকে মেঘ এসে ঢেকে দিত সুন্দর ধূসর আকাশটাকে। যেমন ঢেকে গেছি আমি দাম্পত্য গল্পের নেপথ্যে। আকাশের মেঘ বাতাসে ভেসে সরে যায়, কিন্তু আমার জীবনের রাহু আর কাটেনি। আমি অপেক্ষায় থাকতাম তবুও….গানের কলির মত “যদি আসে কোনদিন সেই সুখপাখি”। হাহাকারের আবহ আমার চোখদুটোকে ভাসায় আর ডোবায় কয়েক বছরের নিরন্তর অবহেলার আবর্তে। চোখের সামনে ভেসে উঠে নিদারুণ দিনগুলো।

মনে পড়ে,বিয়ের ছয়মাস পরই বুঝতে পারছিলাম সে আমার কাছে পুত্র সন্তান চায়। মাসে দু’একবার শারীরিক সম্পর্কের প্রতিদান মেলেনি কোন মাসেই। তাকে সুসংবাদ শোনাতে পারিনা কেন? তাই একদিন বলেই ফেললেন “তোমার যা একহারা গড়ন মা হওয়ার মত সক্ষমতা আছে বলে মনে হয়না”। আমার ভেতর ও ততদিনে মাতৃত্বের হাহাকার জন্ম নিয়েছে। সত্যি বলতে সন্তান প্রাপ্তির চেয়ে সংসার হারানোর ভয় আমাকে পেয়ে বসেছিল। এভাবে আড়াই বছর পার হল আমি কাঙ্ক্ষিত প্রাণের স্পন্দন টের পেলাম না। ডাক্তারের পরামর্শ নিলাম। তিনি খুব উৎসাহ এবং প্রয়োজনীয় মেডিসিন লিখে দিলেন। চারমাস পর আমি ক্রমশঃ দুর্বল অনুভব করছি, খাবার বিস্বাদ, হালকা মাথা ঘোরে, বমিবমি ভাব লাগছে।এদিকে পিরিয়ডের ডেট পার হয়ে একসপ্তাহ। চলে গেলাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ শুনে আনন্দে আমি আত্মহারা। বাসের সিটে বসেই তাকে ফোন করে জানালাম। সে যথারীতি পুরনো সুরে বলল, দ্যাখো পৃথিবীর আলো দেখাতে পার কিনা। তোমার শরীরের যা….।আমি ফোন রেখে চোখ মুছলাম আর সৃষ্টিকর্তাকে বলেছিলাম, আমার সন্তানের মুখ না দেখিয়ে আমাকে নিয়ে যেওনা। পেটের ভিতর বাবুসোনার তখন পঞ্চম মাস। একরাতে বাসায় শুধু আমি আর সে। আমার সাথে বোন থাকত। কোন কারণে সেদিন সে ছিলোনা। তাঁর সম্ভবত শুচিবাই ছিল এটা আমি এখন বুঝতে পারি। কিন্তু তখন তেইশ বছর বয়সে প্রথম সন্তান পেটে আমার কচি আবেগী মন অনেক কষ্ট পেয়েছিল। আমরা ছয় ভাইবোন। বাড়িতে বোনেরা সবাই একসাথে ঘুমাতাম। আমি বরাবরই একা ঘুমাতে ভয় পাই। সাধারণ ভয় নয় বাঘের মত ভয়! তাই তাকে অনুরোধ করলাম আজ রাতটা আমার খাটে শুতে। কিন্তু সে শোয়নি, কারণ সে কারো সাথে বিছানা শেয়ার করলে তাঁর ঘুম আসবেনা।

আমি সারারাত বসে ছিলাম লাইট জ্বালিয়ে। তাঁর কাছে ভালোবাসা দূরে থাক সহানুভূতি পাইনি কখনো। একটা করুণা সে করেছিল আমাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়নি। শুধু পাঁচমিনিটের উত্তেজনা নিবারণের জন্যই আমাকে তার বাহুবন্ধি করতেন। আমি মাটি কামড়ে পড়ে ছিলাম, আমার যাওয়ার জায়গা ছিলোনা বলে। এ সমাজ ডিভোর্সির জন্য অনুকূল নয়। বিবাহ যোগ্য ছোটবোন থাকায় বাবার বাড়ি ফিরে যাওয়া ও খুব সুখকর হতোনা। অগত্যা অবহেলার সাথেই সংসারকে ঢেলে সাজিয়েছিলাম মনের মাধুরি মিশিয়ে। ছেলে মেয়ে নিয়ে আমার স্বর্গ সুখ রচনা করলাম ছোট্ট পরিসরে। আমাকে ভালো না বাসলেও বাচ্চাদেরকে খুব ভালোবাসতো সে। তাই তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলাম। সে তাঁর মত আমি ও তাঁর মত চলছিলাম বেশ হাসিখুশিতেই। সেই সুখ ও সইলোনা বেশি দিন। দশবছর তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ও তাঁর সংসারে সন্তানদের মা হয়ে গৃহকর্ত্রীর রোলটি আমি নিঁখুতভাবে প্লে করেছি। একদিন যমদূত এসে কড়া নাড়লেন আমাদের বদ্ধ ঘরের দরজা জানালায়। শুনেছি মনে না টানলে যমে টানে। আমি অতীষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম শেষের দিকে। তাই হয়তো যমদূত আমাকে সবসময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন করে দিলেন।

আমি কেন যেন আজকাল আর আকাশ দেখিনা। রাতের জোছনা, চাঁদ, তারা কিছুই আমাকে আর টানেনা। কেবলই মনে হয় সে-ই আমার আকাশ ছিল। শুধু গ্রহণ লেগে মেঘে ঢেকে ছিলো বলে দেখতে পাইনি। ঘনঘোর অমানিশা ছেয়ে গেছে আমার তিথীগুলো। একটি মৃত্য তাকে দূরে নিয়ে গেছে, আরেকটি চিরায়ত প্রয়াণ হয়তো আমাদেরকে এক আকাশে পাশাপাশি নক্ষত্র করে দিবে।

অপেক্ষায় আছি আমি সেদিনের….

শুনতে পাচ্ছ তুমি?  আমার মেঘের আড়ালের আকাশ?

২০৫জন ১২জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য