মরণ বন্ধুর বাড়ি যাবো

নিতাই বাবু ৩০ জুন ২০২০, মঙ্গলবার, ০৫:০৯:৫৭পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২৩ মন্তব্য

আমার একজন বন্ধু আছে। বন্ধুর নামটা মা-বাবার মুখে অনেকবার শুনেছিলাম। নামটা নাহয় পরেই বলি! আগে আমাদের সুসম্পর্কের কথাগুলো একটু বেলে নিই! এই বন্ধুটির সাথে আমার সুসম্পর্ক জন্মসূত্রে। এই বন্ধু ছাড়া আমি আমার দৈনন্দিন জীবনের দিনে-রাতে ২৪ ঘন্টার মধ্যে এক সেকেন্ডও থাকতে পারি না। সবসময়ই আমার বন্ধুকে আমি কাছে ডাকি। কিন্তু সে আসে না। দেখাও করে না। আমি যেমন তাঁকে ছাড়া থাকতে পারি না, বন্ধুটিও আমাকে ছাড়া থাকতে পারে কি-না, তাও বন্ধুটির কাছ থেকে কোনদিন জানতে চাইনি। হয়তো আমার বন্ধুও আমাকে ছাড়া থাকতে পারে না। যদিও এখন সামনা-সামনি হয় না, তবুও সে হয়তো আগে-পিছে সবসময়ই আমার খবরাখবর রাখে। আমার আশেপাশেই থাকে।

তবে হ্যাঁ, একবার আমাকে এই ঘনিষ্ঠ বন্ধুটি তাঁর বাড়ি নিয়ে যেতে চেয়েছিল। তখন আমি নাকি খুবই ছোট ছিলাম। শুনেছিলাম আমার মায়ের মুখে। বাবার মুখে। ভাই-বোনদের মুখে। সেসময় আমার বন্ধু আমাকে তাঁর বাড়িতে নেওয়া জন্য প্রায় চারমাস পর্যন্ত টানাটানি করে ছিল। সেসময় আমার মা-বাবা, ভাই-বোন কেউ বন্ধুর বাড়ি যেতে দেয়নি। সেসময় আমার খুব অসুখ ছিল। মানে আমি খুবই অসুস্থ ছিলাম। তিনমাস অসুস্থ থাকার পর, কোনও ওঝা বৈদ্য কবিরাজ যখন সুস্থ করতে পারছিল না; তখন চার মাসের মাথায় আমার বন্ধু তাঁর বাড়িতে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তখন আমার মা-বাবা, ভাই-বোন কেউ আমার বন্ধুর সাথে তাঁর বাড়ি যেতে দেয়নি। সবার অনুরোধ বিপত্তি থাকার কারণে আমাকে আর তাঁর বাড়ি নেয়নি। সেই থেকে আমার এই ঘনিষ্ঠ বন্ধুটি আজ পর্যন্ত আমার সামনা-সামনি হয়নি। হয়তো আমার উপর অভিমান করে বসে আছে।

বর্তমানে আমি অনেকের কাছে আমার এই বন্ধুর কথা জিজ্ঞেস করি। কোথাও কেউ আমার প্রিয় বন্ধুটিকে দেখেছে কিনা। অনেকেই বলে, “এইতো ক’দিন আগেও আপনার বড়দাদা যেই বাড়িতে ভাড়া থাকে সেই বাড়িতে দেখেছিলাম”। যাঁর বাড়িতে আমার বন্ধুটিকে দেখেছে, সেই বাড়ি থেকে আমার বাসা অল্প একটু দূরে। বড়দাদা জীবিত থাকতে আমি ঐ বাড়িতে আসাযাওয়া করতাম। বড় দাদার মৃত্যুর পর সেই বাড়িতে মোটেও যাওয়া হয় না। আবার অনেকেই বলে এইতো সেদিনও শুনেছিলাম, অমুকের বাড়ি এসে একজনকে সাথে করে তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেছে। আমি নিজেও সময়সময় শুনি, বন্ধু আমার পাশের বাড়িতে এসেছে। দৌড়ে গিয়ে দেখি সে ঐ বাড়ির একজনকে সাথে করে তাঁর বাড়ি নিয়ে গেছে। এই যে আমার আশপাশ দিয়ে সে আসাযাওয়া করে, অথচ আমার সাথে সে একদিনও দেখা করে না।  কেন যে আমার সাথে বন্ধুটি দেখা করে না, তা আমার জানা নেই! হয়তো দেখা করার সময় হয়নি। সময়মতো ঠিকই দেখা করবে।

আমার এই বন্ধুকে যাঁরা চেনেন জানেন তাঁদের জিজ্ঞেস করি আমার বন্ধুটি কেমন! অনেকেই বলে আমার এই বন্ধুটি নাকি নিষ্ঠুর। তাঁর মনে কোনও মায়া নেই। দয়া নেই। প্রেম নেই। ভালোবাসা নেই। কিন্তু বেঈমান না।অথচ আমি জানি আমার বন্ধুটি আমার মতো আরও অনেকের সাথেই বন্ধুত্ব করেছে। বন্ধুটি সময়মতো তাঁদের সাথে দেখাসাক্ষাৎ করে। সময় সময় অনেক মানুষকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়। আবার অনেককে আমার বন্ধুর বাড়িতে নিয়েও যায়। এই বন্ধুটির বাড়িতে আমার মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজনেরাও গিয়েছে। একদিন আমাকে আর আমার সহধর্মিণীকে না জানিয়ে আমার ছেলেকেও তাঁর বাড়িতে নিয়েছে। কিন্তু এই বন্ধুর সাথে আমার সুসম্পর্ক জন্ম থেকে অদ্য পর্যন্ত। আমার বর্তমান বয়স প্রায় ৫৭ বছর গত হতে চললো। আমাকে কোনও সময় বললো-ও-না আমার বাড়িতে চলো।

তাই আমিও আমার এই ঘনিষ্ঠ বন্ধুটির সাথে তাঁর বাড়িতে ইচ্ছে করে যেতে চাই না। একা একাই কয়েকবার বন্ধুর বাড়িতে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি আমার এই বন্ধুটির বাড়ির ঠিকানা জানি না। তাই আর একা একা যাওয়া হয়নি। যাঁরা আমার এই বন্ধুটির বাড়িতে গিয়েছে তাঁদের আত্মীয় স্বজনদের কাছে শুনেছি, আমার বন্ধুটি নাকি এক পুরীতে থাকে। একদিন নাকি ঠিকই আমার সাথে সে দেখা করবে।

কিন্তু আমার যে আর দেরি সহ্য হচ্ছে না। তাই বন্ধুটি সাথে তাঁদের বাড়িতে না নেওয়ার কারণে অনেকের কাছে দুঃখপ্রকাশ করি। আমার দুঃখের কথা শুনে অনেকেই বলেছে, “দুঃখ করবে না! দেখবে একদিন সময়মত তোমার এই বন্ধু তোমার কাছে এসে হাজির হয়ে গেছে। তোমার এই বন্ধুটি আমাদের মতো বেঈমান না। তোমার জীবনের শেষ সময়ে হলেও, একদিন তোমার সাথে সাক্ষাৎ করবেই করবে। সেদিন তুমি তোমার বন্ধুর সাথে অভিমান করে তুমি যদি কোনোএক পাথরের মধ্যেও লুকিয়ে থাক, তোমার এই বন্ধু সেই পাথরের ভেতরে ঢুকে তোমার সাথে দেখা করবে। তুমি তাঁর বাড়ি না যেতে চাইলেও, তোমাকে জোর করে টেনেহিঁচড়ে তাঁর বাড়ি নিয়ে যাবে। এ-বিষয়ে তুমি শতভাগ নিশ্চিত থাকতে পার।” এসব কথা আমার মা-বাবা, বড়দাদাও আমাকে অনেকবার বলেছিল।

আমার মা-বাবা বলেছিল, “তোর বন্ধুর বাড়ি মৃত্যুপুর। আর তোর বন্ধুর নামটি হলো মরণ। তোর এই মরণ বন্ধু হলো মৃত্যুপুরীর যমরাজ। একদিন দেখবি তোর অজান্তেই তোর বন্ধু তোর ঘরের দুয়ারে এসে হাজির হয়ে গেছে।” আমার মা-বাবার কথা যদি সত্যি হয়, আর আমি যদি সত্যিকারের জীবন হয়ে থাকি; যদি সে আমার বন্ধু মরণ হয়ে থাকে; তাহলে আর ভাবনা কিসের? একদিন-না-একদিন আমার বন্ধু মরণ যমরাজার বেশে তো আমার দুয়ারে এসে হাজির হবেই হবে। সেদিন আমি আমার বন্ধু মরণের সাথে তাঁর বাড়ি মৃত্যুপুরীতে চলে যাবো। সেদিন আর আমাকে ছোটবেলার মতো কেউ টেনে ধরে রাখতে পারবে না। আমি সেদিন মৃত্যুপুরীতে চলেই যাবো।

 

ছবি সংগ্রহ গুগল থেকে।

১৫৭জন ২জন
0 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য