মূর্তি, ভাস্কর্য এবং অন্যান্য

নাজমুল আহসান ২২ ডিসেম্বর ২০২০, মঙ্গলবার, ০৭:০০:১৬অপরাহ্ন সমসাময়িক ২২ মন্তব্য

ভূমিকা

রাজনীতি কখনোই আমার আগ্রহের বিষয় নয়। আমি সচেতনভাবে এবং ঘৃণাভরে রাজনীতি ও রাজনীতি সংশ্লিষ্ট মানুষদের থেকে দূরে থাকি। আমি সংগ্রামী মানুষ। জীবিকার জন্যে আমাকে ঘাম ঝরাতে হয়। রাজনীতি নিয়ে সময় নষ্ট করার মতো বিলাসিতা আমার মানায় না।

একজন মানুষ যখন সদর্পে ঘোষণা করেন, আমি অমুক দলের সমর্থক; চট করে সেই মানুষটা সম্পর্কে, তাঁর চিন্তাধারা সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণা চলে আসে। দেশের রাজনীতির যে অবস্থা, তাতে কেউ যখন নিজেকে একটা নির্দিষ্ট দলের অনুসারী বলেন, তখন তাঁর বিবেকবোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক বৈকি। সেটা আওয়ামীলীগ থেকে বিএনপি, জামাত থেকে হেফাজত – সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

বলা-ই বাহুল্য, বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলো অন্তঃসারশূন্য। রাজনৈতিক আদর্শ বলে যে একটা কথা ছিল, সেটা এখন কাজির গরু – কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই।
আমার এক পরিচিতজন, যিনি একটা রাজনৈতিক দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতা, তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, একজন মানুষ অন্য দল না করে আপনাদের দল কেন করবে? অন্যদের সাথে আপনাদের পার্থক্য কী? তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি। শুধু বললেন, আমাদের আদর্শের জন্যে! খুবই হাস্যকর উত্তর। কোনো দলের আদর্শই চুরি করতে বা খারাপ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে না।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, কোনো রাজনীতিবিদই আমার এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না।

আচ্ছা, মূর্তি-ভাস্কর্য নিয়ে আলোচনা করতে এসে রাজনীতির প্যাঁচাল কেন শুরু করলাম!? করলাম, কারণ এ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক যে উত্তেজনা, সেটা যতোটা না ধর্মীয়, তারচেয়ে বহুগুণ বেশি রাজনৈতিক। ব্যাখ্যা করছি।

যাঁরা বলছেন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বানানো যাবে না, ভাস্কর্য বানানো ধর্মে নিষিদ্ধ; তাঁরা কি কখনো মাজার নিয়ে কথা বলেছেন? কখনো পীর-ভন্ডদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন? দেননি। এমনকি দেশে যে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তির শতশত ভাস্কর্য আছে, সেগুলো নিয়েও তো বলতে দেখলাম না! তাহলে বঙ্গবন্ধু ইস্যুতে তাঁরা এতো উত্তেজিত কেন? কারণ, যেকোনো উপায়ে আওয়ামীলীগ সরকারের বিরোধিতা করতে হবে। এখানে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব।

আবার যাঁরা বলছেন, ভাস্কর্য বানানো যাবে, তাঁরা কি ধর্মের বিধিনিষেধ জেনে তারপর বলছেন? দুই লাইন কুরআন-হাদিস পড়েছেন? এঁদের অধিকাংশই কোনো হাদিস গ্রন্থ চোখেই দেখেননি। তাহলে কেন বলছেন? কারণ, হুজুররা ভালো-মন্দ যা-ই বলবে সেটার বিরোধিতা করাই হচ্ছে সেক্যুলারিজম, স্মার্টনেস। এটাও রাজনৈতিক স্বার্থের বিষয়।

ইসলামে মূর্তি বানানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আছে -খুব সম্ভবত এ ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই। দ্বিমত হচ্ছে, মূর্তি বনাম ভাস্কর্য নিয়ে। ভাস্কর্য বানানো যাবে কিনা, আরও সূক্ষ্ম করে বললে- ভাস্কর্য আর মূর্তি একই বিষয় কিনা?

মূর্তি কী?

মূর্তি শব্দটির উৎস হচ্ছে- মূর্ত (√ মূর্ছ + ত)। খুবই পরিচিত শব্দ। মূর্ত অর্থ প্রত্যক্ষ বা স্পষ্ট হওয়া। কাছাকাছি আরেকটি অর্থ হচ্ছে, আকার ধারণ করা যেটাকে ইংরেজিতে বলা হয়েছে embody (এমবডি)। আপনারা “মূর্ত প্রতীক” কথাটা অবশ্যই শুনে থাকবেন।

আর মূর্তি হল সেই বস্তু, যা মূর্ত হয়েছে বা মূর্ত করা হয়েছে। মূর্তি শব্দের অর্থ- আকৃতি, দেহ, চেহারা, আকার, প্রতিমা। (শেষের অর্থটা খেয়াল করুন, এখানেই গোলমালটা লেগেছে!) ইংরেজিতে- Shape, form, figure, body, image, idol.

তবে প্রচলিত ক্ষেত্রে মূর্তি দ্বারা মানুষের (বা কোনো প্রাণীর) মূর্তিই বুঝানো হয়ে থাকে। হিন্দুরীতিতে দেব-দেবী বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মূর্তিগুলো এর উদাহরণ।

ভাস্কর্য কী?

উইকিপিডিয়ার মতে-

ত্রি-মাত্রিক শিল্পকর্মকে ভাস্কর্য বলে। অর্থাৎ, জ্যামিতিশাস্ত্রের ন্যায় ভাস্কর্যকে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং গভীরতা সহ ত্রি-মাত্রিক হতে হবে। … পুতুল, মুখোশ, মাটির জিনিসপত্র ভাস্কর্যের উদাহরণ।

মূল কথা হচ্ছে, ত্রি-মাত্রা বা 3D হল ভাস্কর্যের বৈশিষ্ট্য। আপনি যখন কাগজে কারও ছবি আঁকবেন, সেটা ভাস্কর্য হবে না। যদি কাদামাটি দিয়ে অবয়ব তৈরি করেন, সেটা হবে ভাস্কর্য।

মূর্তি আর ভাস্কর্য কি একই?

জ্বি, একই জিনিস। শাব্দিক অর্থের কিছুটা পার্থক্য থাকলেও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে মূর্তি আর ভাস্কর্য একই বস্তু।

আপনি যখন কোনো মানুষের ভাস্কর্য বানাবেন, সেটা হবে মূর্তি। যদি গাছের ভাস্কর্য বানান, সেটাকে অভিধানমতে মূর্তি বলা গেলেও, পারিভাষিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূর্তি বলা হয় না।

এবং প্রতিমা

গোলমালটা লেগেছে এখানে। হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা প্রতিমার পূজা করে থাকেন। (এখানেও একটা মিসকনসেপশন আছে। হিন্দুরা আসলে প্রতিমাকে রূপক-মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে ভগবানের পূজা করেন।) আর যেহেতু প্রচলিতভাবে প্রতিমাকে মূর্তি বলা হয়, আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজ এবার ঘাবড়ে গেছেন। কীভাবে সামাল দেওয়া যায় উপায় বের করতে না পেরে মূর্তি আর ভাস্কর্যের মধ্যে পার্থক্য করে দেওয়ার একটা মিথ্যা চেষ্টা করলেন। আর আমাদের মহাশিক্ষিত হুজুররা গেলেন ক্ষেপে!

এই বিষয়টা খুবই স্পষ্ট। বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। যে মূর্তির উপাসনা করা হবে, সেটাই প্রচলিত অর্থে প্রতিমা।

তাহলে?

নাম আলাদা করে ফেললেই জিনিস আলাদা হয়ে যায় না। আমি যেটাকে ভাত বলি, এলিট শ্রেণি রেস্টুরেন্টে গেলে সেটাকে বলে রাইস। তেমনি আলাদা হয় না উদ্দেশ্যের ভিন্নতা থাকলেও। যেটা দিয়ে আপনি পশু জবাই করেন, সেটাও ছুরি। ছিনতাইকারী যেটা পেটে ঢুকিয়ে দেয়, সেটাও ছুরি।

এই সাম্প্রতিক কালে এসে ভাস্কর্য আর মূর্তি আলাদা হয়ে গেছে। কিছুদিন আগেও বুদ্ধিজীবীরা এই দুইটা শব্দ দিয়ে একই জিনিস বুঝাতেন। আগে বিভিন্ন বিশিষ্টজনদের যে মূর্তিগুলো তৈরি হতো, সেগুলোকে মূর্তিই বলা হতো।

কিছু জ্বলন্ত উদাহরণ দেই-

 

অন্যদেরটা ‘মূর্তি’ই থাকল আর বঙ্গবন্ধুরটা ‘ভাস্কর্য’ হয়ে গেল কেন, কে জানে! বঙ্গবন্ধুর মতো একজন অবিস্মরণীয়, অসামান্য মানুষকে নিয়ে আর কতো রাজনীতি করতে হবে?!

আর এরকম একটা বিষয়কে ইসলামাইজ কেন করতে হবে সেটাও বুঝি না! ভাস্কর্য ইসলামে নিষিদ্ধ প্রমাণ হলে কি সরকার বঙ্গবন্ধুর ‘ভাস্কর্য’ বানাবে না? দেশে আর কোনো ভাস্কর্য তৈরি হবে না? এদেশে কি ইসলামের বাইরে কিছু হয় না?

৩৬২জন ৬৫জন
0 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য