১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে যখন এদেশের (বর্তমান বাংলাদেশ) মানুষ ততকালীন পাকিস্তান সরকারের শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তির দাবিতে সংগ্রাম গড়ে তুললো। তখন পাকিস্তান সরকারের সামরিক বাহিনী আচমকা ২৫ মার্চ রাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালির ওপর। তাঁরা চারদিকে লাগিয়ে দেয় আগুন। শুরু করে দেয় অতর্কিতভাবে গুলি। তখন সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বাধ্য হয় বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা। এরপর মুক্তিযুদ্ধাদের প্রতিহত করতে এদেশের কিছু ধার্মিক মানুষ ধর্ম রক্ষার শ্লোগান দিয়ে পাকবাহিনীর সাথে হাত মিলিয়ে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস নামে সংগঠন গড়ে তুলে। নয়মাস মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকবাহিনীর চেয়ে এঁরাই বেশি অত্যাচার নির্যাতন চালায় নিরীহ বাঙালিদের। এঁরা এতটাই হিংসাত্মক ছিল যে, জীবের সেরা মানব হয়েও মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটায় স্বদেশের বিরুদ্ধে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ২৫শে মার্চ মাসের শেষদিকে যখন চারিদিকে আগুন আর মিশিগানের গুলির শব্দে কম্পিত সারাদেশ, আমি তখন আট/নয় বছরের নাবালক এক শিশু। আমি ছিলাম চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। তখন আমি মোটামুটি বুঝের হয়ে উঠেছিলাম। তাই এখনো সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ভয়াল দিনগুলোর কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে।

মনে পড়ে তখন আমার বাবা চাকরি করতেন,  নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম পাড় চিত্তরঞ্জন কটন মিলে। আর বড়দাদা চাকরি করতেন শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাড় আদর্শ কটন মিলে (বর্তমান সোহাগপুর টেক্সটাইল)। তখনকার সময়ে এই মার্চ মাস থেকেই আমরা হয়ে পড়ি বিপদগ্রস্ত। বাবার মিল বন্ধ। বাবার খবর নেই। লোকমুখে শোনা বড়দা শরণার্থী হয়ে ভারতে অবস্থান। তাও নিশ্চিত আর অনিশ্চিতের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছিল আমাদের মনে। পরবর্তীতে সঠিকভাবে জানা হলো, বড়দা ভারতেই গিয়েছে।

এদিকে আমার মা-সহ তিন বোন থাকতাম নোয়াখালী বেগমগঞ্জ থানাধীন বজরা রেলস্টেশনের পশ্চিমে মাহাতাবপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে। আমাদের পরিবারে সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে তখন কষ্টের আর শেষ ছিল না। আমাদের সংসারই চলতো বাবা বড়দা’র চাকরির বেতনে। তখন এই বঙ্গদেশে টাকার খুবই দাম ছিল। খুব অল্পসংখ্যক মানুষের কাছেই হাজার টাকা ছিল। এরমধ্যেই শুরু হয়েছে মুক্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধ!

যুদ্ধের কারণে কেউ কাউকে টাকা-পয়সা ধারকর্জও দিত না। তাই কোনদিন দুপুরে খেতাম। রাতে না খেয়ে রাত কাটাতাম। আবার কোনদিন সকালে খেতাম। দুপুরে না খেয়ে থাকতাম। কিছুদিন এভাবেই চলছিল আমাদের দিনগুলো। একদিকে দেখা যেত রাতের আকাশে আগুনের লাল রঙের সাথে কালো ধোঁয়া, সাথে গুলির বিকট শব্দ। সময় যখন এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি, তখন আমার বাবা মিলের কোনও এক সহকর্মীর কাছ থেকে কিছু টাকা ধারকর্জ করে খালি হাতে বাড়ি আসে। কিন্তু বড়দা’র খবর ছিল না। যুদ্ধ তখন পুরোদমে বাংলার চারদিকে সমানতালে চলছিল। এরইমধ্যে ভারত সরকার বাড়িয়ে দিলেন সাহায্যের হাত। সুযোগ করে দিলেন মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধ করার প্রশিক্ষণ নেওয়ার। আশ্রয় দিতে লাগলেন লক্ষলক্ষ বাঙালিদের শরণার্থী শিবিরে। দিলেন ভারতের সামরিক বাহিনী-সহ অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ।

এদিকে পাকবাহিনীর সাথে যোগ হয় রাজাকার, আল-বদর আল-শামস নামের শয়তানগুলো। ওঁদের কাজ ছিল কার বাড়িতে ক’জন যুবতী মেয়ে আছে। কার বাড়ি থেকে ক’জন মুক্তিবাহিনীতে নাম দিয়েছে, সেই খবর পাকবাহিনীর কাছে পৌঁছে দেওয়া। শুরু হয়ে গেল যুদ্ধের মাঝে মা-বোনদের ইজ্জত লুটিয়ে নেওয়ার হিড়িক। মুক্তিবাহিনী সন্দেহে মোটাতাজা মানুষ মেরে ফেলার মহোৎসব। আর হিন্দুদের ঘরবাড়ি পুড়ে ফেলার। চারিদিকে যখন শোনা যেত মানুষ মেরে ফেলার খবর, আর ঘর থেকে যুবতী মা- বোনদের টেনেহিঁচড়ে আগানে-বাগানে নিয়ে যাবার খবর! তখন আমার মা হয়ে গেলেন দিশেহারা এক আধপাগলের মতো। কারণ আমার বড় তিন বোনের তখন প্রায়ই বিয়ের উপযুক্ত বয়স।

আমার মায়ের একদিকে ছিল বোনদের চিন্তা, অন্যদিকে ঘরে খাবার জোগাড়ের চিন্তা। বাবা বাড়িতে এসেও বেকার। কোথাও কোনও কাজকর্মও নেই। কারোর বাড়িতে দিনমজুরের কাজও করার সুযোগ নেই। আমার বাবার আরও দুই ভাই ছিল। এক ভাই থাকতো বাড়িতেই। তিনিও মুড়ি বিক্রি করে সংসার চালাতেন। কাকার সংসার ছিল আলাদা। মেজো কাকা থাকতো বাড়ি থেকে দূরে চাঁদপুর উনার শ্বশুরবাড়িতে। আমার বাবার খুড়তুতো ভাই আরও দুইজন ছিল। বাড়ি ছিল একই বাড়ি। সংসার আলাদা আলাদাভাবে। তাই সে সময়ে কারোর কাছে টাকাপয়সা থাকলেও, কেউ কাউকে দুই টাকা ধারকর্জ দিতো না। তাই কোনদিন আমাদের আহার জুটতো, কোনদিন তিনবেলার মধ্যে একবেলা জুটতো কোনরকমভাবে। তারপর যেকোনো এক উপায়ে পাশের বাড়ির এক মুসলমান ব্যক্তির কাছ থেকে কিছু টাকা সংগ্রহ করে বাবা যুদ্ধের সময় মুড়ির ব্যবসা শুরু করে। এভাবে দিন যাচ্ছিলো কোনরকমভাবে। যুদ্ধও চলছে। পাকবাহিনী আর রাজাকারদের উৎপাত বেড়েই চলছে। জাগায় জাগায় যুবতী মা-বোনদের ইজ্জত নিয়ে কাড়াকাড়ি চলছে।

একসময় আমার মা খাবারের চিন্তা বাদ দিয়ে আমার তিন বোনের চিন্তায় অস্থির হয়ে গেল। তিন বোনের ইজ্জতের কথা মাথায় রেখে আমার মা-বাবা আমার কাকা এবং আমার  দুইজন জেঠা মশাই’র বুদ্ধি নিলেন, কীভাবে উপযুক্ত মেয়েদের ইজ্জত রক্ষা করা যায়! কাকা আর জেঠারা বুদ্ধি দিলেন, মেয়েদের ইজ্জত রক্ষা করতে হলে প্রতি রাতে তাঁদেরকে বাড়ির বাইরে রাখতে হবে। বাইরে আর কারোর বাড়িতে নয়, রাখতে হবে মাটির গর্তের ভেতরে। আমার মা বাবা দুইজন মিলে কাকা জেঠাদের বুদ্ধিমত বাড়ির সাথে থাকা এক সুপারি বাগানের মাঝখানে মাটি খুড়ো বড় ব্যাংকারের মতো এক গর্ত করলেন। যাতে তিনজন মানুষ একসাথে ঘুমানো যায়। সন্ধ্যার হবার সাথে সাথে বিয়ের উপযুক্ত বড় তিন বোনকে সুপারি বাগানের মধ্যখানে খোড়া মাটির সেই গর্তে নিয়ে যেতেন।

গর্তের ভেতরে দিনের বেলাই রাতে শোবার জন্য বিছানাপত্র ঠিকঠাক করে রাখা হতো। মা তিন বোনকে গর্তে ঢুকিয়ে তাঁদের সাথে দিতেন এক পাতিল আগুন, আর কিছু দিয়াশলাই। আমার তিন বোন সারারাতের জন্য সেই মাটির গর্তেই মরা লাশের মতো শুয়ে থাকতেন। গর্তের উপরে থাকতো বাঁশের মাচা। তার উপরে কিছু ছোট গাছ-গাছালি, লতা-পাতা। যাতে কেউ কিছু বুঝতে না পারে। গর্তের ভেতরে আগুন আর দিয়াশলাই(গন্ধক নামের একপ্রকার দ্রব্য কিনে এনে তা আগুনে গালিয়ে টুকরো টুকরো চিকন পাটখড়ির দুই মাথায় লাগিয়ে দিয়াশলাই বানানো হতো। এগুলো আগুনের ছোঁয়া পেলেই জ্বলে ওঠে) দেওয়া হতো এই কারণে যে, যাতে ভূতপ্রেতের ভয় পেলে দিয়াশলাই জ্বালিয়ে কিছুটা ভয় দূর করতে পারে। বেশি ভয় পেলে জোরে চিৎকার করলে তো আমার মা বাবা-সহ বাড়ির সবাই দৌড়ে তাঁদের সামনে যাবেই।

তারপরও মায়ের মন বলে কথা। আমার মা বাবার সাথে আমাকে ঘরের ভেতরে রেখে সারারাত দুই মেয়ের জন্য হারিকেন জ্বালিয়ে ঘরের দরজা হালকাভাবে লাগিয়ে রেখে বারান্দায় মরা মানুষের মতো শুয়ে থাকতো। আবার খানিক পরপর হারিকেন জ্বালিয়ে বাবাকে ডেকে নিয়ে সুপারি বাগানে গর্তের সামনে গিয়ে দেখতেন। আমি ছোট, তাই অনেক ভয় পেতাম। রাতে মা-বাবা যখন বড় বোনদের দেখতে সুপারি বাগানে যেতেন, আমি তখন সজাগ থাকলে মা বাবার সাথেই যেতাম। সময় সময় সারারাত মায়ের সাথেই বারান্দায় শুয়ে থাকতাম।

একসময় আমাদের বাড়িতে প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা থেকে অনেক রাত পর্যন্ত কয়েকজন হৃদয়বান মুক্তিযুদ্ধাদের আড্ডা শুরু হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত মুক্তিবাহিনী আমাদের বাড়িতে থাকতো, ততক্ষণ পর্যন্ত আমারা নিরাপদে থাকতাম ঠিকই, কিন্তু মুক্তিবাহিনী আমাদের বাড়ি থেকে চলে যাবার পরপর আবার আমার তিন বোনকে ঘর ছেড়ে যেতে হতো মাটির তৈরি ব্যাংকারের মতো গর্তের ভেতরে। এভাবেই ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় পাকবাহিনী আর রাজাকারদের ভয়ে আমার তিন বোন মাটির তৈরি গর্তেই রাত যাপন করতো। এভাবে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের একসময়ে চারিদিকে বিজয়ের জয়ধ্বনি শোনা গেল। ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ইং মহান স্বাধীনতা দেখা মিললো।

৩২৭জন ২০৫জন
5 Shares

২৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ