মুইলান টান এবং আমি

রিমি রুম্মান ৩১ ডিসেম্বর ২০২০, বৃহস্পতিবার, ০৬:৫৪:২৯পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ১২ মন্তব্য

‘ আমার দেশের রাস্তার পরতে পরতে সবুজের ছোঁয়া। পরিচ্ছন্ন পথঘাট। কেউ অযথা হর্ন বাঁজায় না। ট্রাফিক আইন মেনে চলে সকলে…’ এক নাগাড়ে বলে চললেন আমার ছেলের সহপাঠী জেফারসনের মা। আমি ইতস্তত করি। আমার দেশের প্রশংসা করে কিছু তো বলতে হয়! বলি, আমার দেশের মানুষের অতিথিপরায়ণতার কথা। সহজ সরল প্রান্তিক মানুষের কথা। আমরা যখন স্কুল গেটে ছুটির সময়টাতে আমাদের সন্তানদের জন্যে অপেক্ষা করতাম, সেই সময়ে আমি তাঁর দেশ সম্পর্কে জানতে চাইলে সে এভাবেই নিজের দেশ নিয়ে বলত। আমি ফোনের স্ক্রিনে রিক্সায় বসা আমার একটি ছবি দেখিয়ে বলি, দেখো, আমার দেশের এই যানটি খুব পছন্দের। সে বলে, এমন যান আমার দেশেও আছে। তবে আরেকটু ছোট আকৃতির। তোমাদেরটায় চালক সামনের দিকে বসে, যাত্রী পিছনে। আর আমাদেরটায় যাত্রী বসে সামনের দিকে, চালক পিছনে। আমি বেশ অবাক হই। বলি, অদ্ভুত তো! সে আরো যোগ করে বলে, আমার জন্ম হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দ্বীপে। ইন্দোনেশিয়ার জাভায়।

ইতিমধ্যে স্কুল ছুটি হয়। আমাদের সন্তানরা ব্যাকপ্যাক কাঁধে ছুটে আসে। তাঁরা মা-ছেলে নিজেদের ভাষায় কথা বলে চলে অনর্গল। আমার দুর্বোধ্য ঠেকে। পথে যেতে যেতে আমি তার ভাষা জানতে চাই। বলল, এটি তাঁদের স্থানীয় মাতৃভাষা। জাভানীয় ভাষা। সে হেসে বলে, জানতো আমার দেশ প্রায় সাড়ে সাতশো ভাষার দেশ। আমি রাজ্যের বিস্ময়ে তাকাই। মুইলান টানের মুখ ভর্তি হাসি সূর্যের প্রখর রোদে মিলেমিশে উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছিল। ছোট চোখজোড়া প্রায় বুজে আসছিল। ‘মুইলান টান’ তাঁর বর্তমান নাম হলেও মুইলান নামটি বৈবাহিক সূত্রে স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া। আমার কণ্ঠস্বর অজান্তেই বলে উঠে, ‘সাড়ে সাতশো’! কোন উত্তরের প্রত্যাশা না করেই আমি আমার ভাষার গৌরবময় ইতিহাস সংক্ষেপে বলি। সে ততোধিক বিস্ময়ে আমার দিকে তাকায়। অস্ফুটে বলে উঠে, ভাষার জন্যে তোমার দেশে এত মানুষ প্রাণ দিয়েছে! আমি বলি, হুম। আমার দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলে। বৈদেশিক যোগাযোগ কিংবা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়।

অন্যদিনের কথা। স্কুল প্লে গ্রাউন্ডে অপেক্ষমান সময়ে কথা প্রসঙ্গে বলে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দ্বীপ রাষ্ট্র ১৭ হাজার দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। সে তাঁর দেশের দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতের গল্প বলে। পর্যটকদের গল্প বলে। আমি আমার দেশের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের কথা বলতে ভুলি না। বলি, আমাদের অনেক কিছুতেই দারুণ মিল। দুই দেশই মুসলিম প্রধান দেশ। ৮৬ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। শুধু আমাদের ধর্ম ভিন্ন। আমি মুসলিম, তুমি খ্রিস্টান। সে চোখ বুজে আসা হাসি হেসে শরীরের দিকে দেখিয়ে বলে, আমাদের শিরা উপশিরায় বয়ে যাওয়া রক্ত কিন্তু একই রঙের। লাল।

ফরটি ফিফথ এভিনিউতে এসে আমাদের বাড়ি ফেরার পথ দুইদিকে বেঁকে যায়। যথারীতি সেদিনের মতো গল্পে সমাপ্তিরেখা টানি। পথে যেতে যেতে আমি মুইলান টানের কথা ভাবি। এইতো গত সপ্তাহেই বলেছিল, জানো, আমার খুব চাকুরি করতে ইচ্ছে হয়। শুধু সন্তান পালন আর স্বামী সেবা, এটা কোনো জীবন হল! আমি বলেছিলাম, করছো না কেনো ? চাকুরি তো করতেই পারো। যতটা সহজে বলে ফেললাম, আসলে তা ততটা সহজ নয়, মনে করিয়ে দিলো সে। বলল, ছোট দুটি সন্তান কার কাছে রেখে চাকুরি করবো ? আমার স্বামী একেবারেই সহযোগিতা করবে না। আমি জানতে চেয়েছিলাম, চাকুরি করে কি করতে চাইছ ? বাড়ি, গাড়ি, ভবিষ্যৎ কিংবা দেশে বাবা-মাকে ডলার পাঠানো … ? মুখে সরল এক হাসি ছড়িয়ে বলেছিল এইসব কিছু নয়। তবে ? মুখে প্রশস্ত কৌতুকপূর্ণ হাসি। বলেছিল, আমার শুধু ইচ্ছে করে অর্থ উপার্জন করব, ঘুরে বেড়াবো, বাইরে খাবো, আর যখন তখন মন ভরে শপিং করবো। আমরা দুজনেই হো হো করে হেসে উঠি।

দুই বছর আগে মুইলান পরিবার বাসা বদল করে। স্বাভাবিকভাবেই জেফারসনের স্কুল বদল হয়। আমাদের আর দেখা হয় না। মাঝে একবার জেফারসনের জন্মদিন পার্টিতে তাঁদের বাসায় নিমন্ত্রণ করেছিল। ডাকযোগে কার্ড পাঠিয়েছিল। আমাদের যাওয়া হয়নি। কিন্তু রিহান ও জেফারসন ভিডিও কলে কথা বলে, গেইমস খেলে। একদিন রিহান চোখ গোলাকৃতি করে বলে, আম্মু, জানো কি হইসে ? আমি হাতের কাজ থামিয়ে মনোযোগী হই। বলি, কি হয়েছে ? রিহান বাংলা ইংরেজির মিশেলে হরহর করে বলে চলে, জেফারসন মম এন্ড ড্যাড ফাইটিং হইসে। দ্যান, ওর মম অলমোস্ট চলে যাইছে। আমি বিস্মিত চোখে তাকাই। বলি, কই চলে যাইছে (গেছে) ? রিহান কপালে কিঞ্চিৎ ভাঁজ ফেলে বলে, মে বি ডিভোর্স অর সামথিং লাইক দ্যাট। বুঝলাম, ‘করমু না এই ছাতার সংসার’ টাইপের হুমকি দিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে উদ্যত হয়েছিল মুইলান টান। আমি নড়ে চড়ে বসি। শিশুদের সামনে পারিবারিক কলহ বিবাদ এড়িয়ে চলার বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠি। এমন ভাবনার মাঝে ফোন বেজে উঠে। মুইলান টান নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাতে ফোন করেছে।

সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা।

রিমি রুম্মান
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

২০৩জন ১০৯জন
0 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য