সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

মীরার কথা-২

নীরা সাদীয়া ২০ জুন ২০২০, শনিবার, ০৭:০৪:২৬অপরাহ্ন গল্প ২৬ মন্তব্য

নতুন স্কুলে ভর্তি হবার পর নতুন জুতো, মুজো, ব্যাগ আরও নানা জিনিস কিনে আনা হলো। এসব দেখে মীরার আনন্দ আর ধরে না। কিভাবে জুতোর ফিতে বাঁধতে হবে, কিভাবে ব্যাগের ফিতে আটকাতে হবে, সব একে একে শিখিয়ে দিলেন বড় ভাই বোনেরা। শুরু হলো মীরার নতুন জীবন। কিন্তু তা বেশিদিন চললো না। একদিন হঠাৎ মেয়েটি চিৎকার করে বলতে লাগলো “আমার শীত লাগছে। কম্বল দাও।” গরমের দিন ভীষণ শীত লাগছে দেখে সবাই অবাক হলো। নিজের বাসার কাঁথা কম্বল দেয়ার পর পাশের বাসা থেকেও এনে দিলো। তাও শীত মানছে না। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে গেলো। পুরো শরীর নীলচে হতে লাগলো। খালি পায়ে ফুপা ফুপু তাকে কোলে নিয়ে দৌড়ালো ডাক্তার খানায়। ভর্তি হলো সি এম এইচে। পরীক্ষা করে জানা গেলো ম্যালেরিয়া হয়েছে। এখানে প্রায় ১ মাস ভর্তি থাকার পর যেদিন বাসায় ফিরলো সেদিনই জানতে পারলো পরেরদিন তার স্কুলে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা! সবাই বললো,

 

“থাক, এই পরীক্ষা দিতে হবে না। তুমি আজই হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছো। বিশ্রাম নাও। কিছুই পড়া হয়নি। তুমি পারবে না।”

 

মীরা জেদ করে বললো,

“আমি পারব। আমাকে পড়াও।”

 

ভীষণ পড়া পাগল এই মেয়ের জেদের কাছে হার মানলো তার বড় বোনরা। তাকে একরাত পড়ালো। কিভাবে যে সিলেবাস শেষ করে দিলো তাঁরা, তা মীরা টেরই পেল না।রাত দশটা পর্যন্ত পড়ে মীরা ঘুমোতে গেলো। তখন বড় ফুপু বললেন,

 

“তুমি যদি গনিতে ২৫ এ ২৫ পাও, তোমাকে একটা চকবার দিব।”

 

মীরার খুশি দেখে কে? সে খুশিমনে ঘুমোতে গেলো এবং পরদিন পরীক্ষা দিয়ে এলো।এভাবে পরীক্ষার আগের রাতে পুরো সিলেবাস শেষ করে কোনমতে ১ম সাময়িক পরীক্ষা শেষ করলো মীরা। ছবি আঁকার হাত তত দ্রুত পাকানো সম্ভব নয় বলে চুড়ি দিয়ে আপেল বানিয়ে আঁকতে শেখালো বড় দুই বোন।কিভাবে রং করতে হবে তাও শেখালো। তাদের চেষ্টার কোন ত্রুটি ছিলো না। পরীক্ষা শেষে ফলাফল পাবার পর দেখলো গনিত সহ বাকি সবগুলোতেই ২৫ করে পেয়েছে শুধু ছবি আঁকায় ২/৩ নম্বর কম৷ ফলে ২য় স্থান অধিকার করলো মীরা। সবার খুশি সাথে বড় ফুপুর উপহার-চকবার! এই মেয়েটি হয়ে উঠেছিল ফুপুর বাসার হাসি আনন্দের উৎস।

 

কিছুদিন পর আবার ভীষণভাবে অসুস্থ হলো মীরা। আবার হাসপাতালে ভর্তি। সেখান থেকে ফিরে ২য় সাময়িক পরীক্ষা দিলো। পড়ার জন্য সময় পেয়েছিলো ৭ দিন।  ২য় স্থান নিয়েই সে এগিয়ে রইলো বরাবর। কিন্তু স্কুলে কোন সাথী তৈরি হলো না। কারণ সে তো ক্লাসই করতে পারতো না। বেশিরভাগ সময় সামরিক হাসপাতালেই কাটাতে হতো। নীচতলার পিংকি আর পাশের বাসার কানন ছিলো তার খেলার সাথী। হেসেখেলে কাটছিলো দিনগুলি। এরই মাঝে বাবা বিদেশ থেকে চিঠি লিখতেন। কিভাবে চিঠির উত্তর লিখতে হয় তা শিখিয়ে দেন বড় বোনেরা। চিঠিতে বাবাকে জানায় :

 

“বাবা আমি ক্লাসে ২য় হয়েছি।”

 

বাবা আনন্দ পান। কখনো চিঠির মাঝে আম, কলা, জাতীয় পতাকা এঁকে পাঠায়। কি কি আঁকা শিখলো তা বাবাকে জানায়। কিছুতেই যেন উৎসাহের কোন কমতি নেই। ততদিনে তার ঘরে এসেছে ছোট্ট মিষ্টি একটা বোন। বোনটা আবার মীরার কোলে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। বোনকে নিয়ে আদর করে, ছবি এঁকে, খেলাধূলা করে কেটে গেলো একটি বছর। এ সময়টাতে যতটা না শাসন পেয়েছে, তারচেয়ে বেশি পেয়েছে স্নেহ। একটা ছোট বাচ্চা নিজের অজান্তেই জড়িয়ে গেলো এই পরিবারটির ভালোবাসার চাদরে। একবারের জন্যও তার মনে হলো না, এটি তার নিজের বাসা নয়, একদিন বাবা ফিরে এলে এ বাসা ছেড়ে তাদের চলে যেতে হবে।

৩৮৮জন ২২৪জন
0 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য