মিষ্টি বিষের সৃষ্টি কবে? (১)

নীরা সাদীয়া ৪ ডিসেম্বর ২০১৯, বুধবার, ০৮:৩৯:৫৪অপরাহ্ন গল্প ৩৩ মন্তব্য

“আমাকে ভালোভাবে না জেনে না বুঝে কেন ফিরিয়ে দিচ্ছো বারবার? আমার সাথে মেশো, চেনো, জানো, তারপর কোন দোষ থাকলে তখন ফিরিয়ে দিতে পারো। আমি কিচ্ছু মনে করব না। কিন্তু… ”

টনিকে থামিয়ে দিয়ে কথা বলে ওঠে ইরা।

“তোমাকে আমার চেনার দরকার নেই। আমি এখন কোন সম্পর্কে জড়াতে চাই না। এটুকুই যথেষ্ট। এসব বিষয় নিয়ে আমাকে আর কখনো ফোন করবে না।”

“ইরা…শোন…”

ওপাশের আর কোন কথা না শুনেই লাইনটা কেটে দিলো ইরা। সে এবার একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বাবার একমাত্র মেয়ে। কলেজ দূরে হওয়ায় বাবা তাকে ফোন কিনে দিয়েছেন। এই ফোন থেকে সে যে কয়টা কল করে তারচেয়ে বেশি করে তার বান্ধবীরা। তাদের হ্যালো…হাই করার মত মানুষ আছে,কিন্তু ফোন নেই। এদিকে ইরার ফোন থাকলেও কথা বলার মত কেউ নেই। সে আত্মীয় স্বজনদের মাঝে মাঝে মিসডকল দিয়ে দুষ্টুমি করে, কথা বলে। এর বাইরে আর কেউ নেই। খুব একটা বন্ধু বান্ধব ও নেই। যারা আছে তারা হলো দুধের মাছি, ফোনের জন্য তার পাশে ঘুরঘুর করে।

একদিন কলেজ থেকে ফিরে বিশ্রাম করছিলো ইরা। এমন সময় ফোনে বেজে ওঠে। সে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো অচেনা নাম্বার! ইরা সাধারণত অচেনা নাম্বার থেকে আসা ফোন ধরে না। তবে এটা কি যেন মনে করে ধরলো। ওপাশ থেকে একটা ছেলে কন্ঠ বললো:

হ্যালো…
হ্যালো, কে বলছেন?
আপনি কে?
আপনি আমাকে ফোন দিয়ে জানতে চাইছেন আমি কে?
আপনিই তো আমাকে মিসকল দিলেন।
কই? আমি তো কোন মিসডকল দেইনি। এই নাম্বার তো আমি চিনি না।আপনি কোথা থেকে বলছেন?
এটা খুলনা। আপনি?
এটা ময়মনসিংহ।
ও তাহলে হয়ত রং নাম্বার।

এভাবেই রং নাম্বারে পরিচয় হয় টনি ও ইরার। পরিচয়ের পর থেকে প্রায়ই টনি ইরাকে ফোন দিত এবং কথা বলতে চাইতো। ইরা প্রথম প্রথম এড়িয়ে গেলেও কিছুদিন পর সেও আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারলো না। টনির সাথে কথা বলাটা তার একটা নেশায় পরিনত হলো। একদিন সন্ধ্যােবেলা বাসায় ফিরে ইরা নিজেই টনিকে ফোন দিলো এবং জানতে চাইলো:

কি করছিলে টনি?
তোমার কথাই ভাবছিলাম ইরা।
আমার কথা? কেন?
আমিতো সারাক্ষণ তোমার কথাই ভাবি।
কি বলছো এসব?
সত্যি বলছি…

সেইদিন থেকেই ইরার মনে দানা বাঁধলো জীবনের প্রথম প্রেম…মিষ্টি মিষ্টি সব অনুভূতি। অনুভূতিরা মনের আকাশ ছুঁয়ে রংধনু হয়ে রাঙাতে লাগলো ইরার সাদাকালো মনকে। মাতাল হাওয়ায় ভেসে যেতে লাগলো মনের উঠোন। সেই উঠোনে রৌদ্র ছায়ার লুকোচুরি খেলা…

“লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প
তারপর হাতছানি অল্প…
মন চায় উড়তে উড়তে…”

বাইরে প্রচন্ড ঝড়। তার মাঝে জানালা খুলে আকাশের বিদ্যুৎ চমকানো দেখছিলো ইরা। এমন সময় টনির ফোন।

: কি ভাবলে ইরা?
: কোন বিষয়ে?
: আমার বিষয়ে?
: তোমার কোন বিষয়টা?
: আরে সেদিন বললাম না?

এভাবে নাছোড়বান্দা টনি রোজই তাকে প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছিলো। সব বুঝেও ইরা তাকে অসম্মতি জানাচ্ছিলো। কারন এখন তার এসব করার কথা নয়। এইচএসসিতে একটা ভালো ফল করতে হবে। একটা ভালো জায়গায় ভর্তি হতে হবে। ভালো একটা ক্যারিয়ারের স্বপ্ন তার চোখে মুখে। তাছাড়া বাবা মা কত আশা করে আছেন। তাঁদের স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। কোন মানুষের মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজেই স্বক্ষমতা অর্জন করবে। কিন্তু এখন এসব দিকে মনযোগ দিলে সেসব স্বপ্ন মাঠে মারা যাবে। তাই তার মন টানলেও কিছুই করার নেই।

এরই মাঝে হঠাৎ একদিন নেত্রকোনা থেকে বেড়াতে আসে তোয়া। তোয়া সম্পর্কে ইরার ভাগ্নী হলেও তারা সমবয়সী এবং সম্পর্ক বন্ধুর মতই। তোয়া এসেই ইরাকে জানায় গত বছর বৈশাখী মেলায় ঘুরতে গিয়ে একটা ছেলের সাথে পরিচয় হয়। ছেলেটি তাকে একটি কার্ড দেয় এবং বলে দেয় :

:তোমার ফোনের অপেক্ষায় থাকবো।

তোয়া প্রথম একমাস কোন ফোন করে না। কিন্তু হঠাৎ একদিন তার খুব একলা লাগে এবং সেই কার্ডটার কথা মনে পড়ে। সে কার্ডটা বের করে নাম্বারটাতে ফোন দেয়। ছেলেটি ফোন পেয়ে জানায়…

: আমি জানতাম তুমি ফোন দিবেই…

সেই থেকে শুরু তাদের উথাল পাতাল প্রেম। জানা যায় ছেলেটির নাম সুমন, থাকে ময়মনসিংহে। তাই নেত্রকোনা থেকে তোয়া ছুটে এসেছে সুমনের সাথে দেখা করবে বলে। এই ব্যপারে সে ইরার সাহায্য চায়। ইরা তাকে কথা দেয় সাহায্য করবে। এদিকে তার মনের খবর জানতে চায় তোয়া।

: ইরা, তোমার কাওকে পছন্দ হয়?
: না, কেন?
: সত্যি করে বলতো…
: সত্যি বলছি তেমন কেউ নেই আমার।

টনির বিষয়টি ইরা ততটা গুরুত্বের সাথে নেয়নি, তার কাছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো পড়াশোনা। যদিও টনি ফোন করলে তার মনে একটু শীতল হাওয়া দোলা দেয়, কিন্তু এসব কিছু চেপে সে আবার পড়তে বসে যায়। খুব পড়ুয়া মেয়ে ইরা। ছোট বেলা থেকেই পড়াশোনাটা করতো ভালোবেসে। জ্ঞান আহরণের তীব্র আকাঙ্খা তার মনে। তাই কোনদিন অন্য কোন দিকে তাকানো হয়নি। আর খুব কঠোর মনের ও একটু মেজাজী স্বভাবের হওয়ায় কোন ছেলে এ পর্যন্ত তাকে কিছু বলার সাহস পায়নি। দূর থেকে টুকটাক চিঠি ছুঁড়ে পালিয়েছে! ইরা সেসব খুলেও দেখেনি কোনদিন।

তোয়া এবং ইরা বিছানায় বসে গল্প করছিলো। এমন সময় টনির ফোন এলো। সে ফোনটা ধরে কয়েকটা কথা বলে রেখে দিলো। এটা খেয়াল করলো তোয়া।

: কী ইরা! ডুবে ডুবে জল কতটা খেলে?
: আরে ওসব কিছু না।
: তাহলে কি?
: এরকম বন্ধু আমার দু তিনটে আছে…
: কিন্তু টনি একটু বেশি স্পেশাল বন্ধু, তাই না?

রোজ রোজ টনিকে নিয়ে তোয়ার এসব ফাজলামো ইরার মনে একটু একটু করে দাগ কাটছিলো। কিন্তু সে এসব আবেগকে ততটা প্রশ্রয় দিতো না। এভাবেই চলছিলো। ধীরে ধীরে টনির সাথে তোয়ারও পরিচয় হয়ে গেলো। ইরাকে পটাতে না পেরে তোয়ার সাহায্য চাইলো টনি। তাকে খুব সহজে বুঝিয়ে ফেললো ছেলেটি যে সে ইরাকে কতটা ভালোবাসে। তোয়া জানতে পারলো ছেলেটি একাদশ শ্রেণিতেই পড়ে। এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছে। এখন বাকি ভবিষ্যত নাকি নির্ভর করছে ইরার ওপর। তাকে পেলেই কেবল বাকি জীবনটা পড়াশোনা করে, ভালো চাকরি নিয়ে ভালোভাবে কাটাবে। নয়ত পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে ভবঘুরে হয়ে যাবে। এসব বলে তোয়ার নরম মনে মুহূর্তের মাঝেই জায়গা করে নিলো টনি।

: দেখ ইরা, ছেলেটি ভালো ছাত্র। নেহাৎ তোমার প্রতি দূর্বল হয়ে গেছে…
: তো?
: এই ছেলেটা যদি লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে ভণ্ডামি করে, তার দায় কি তুমি নিবে?
: আমি নিতে যাব কেন?
: এমনটা হলে তা তোমার জন্যই হবে!

সারারাত দু চোখের পাতা এক করতে পারেনি ইরা। শুধু ভেবেই চলেছে লেখাপড়া নাকি প্রেম? নাকি দুটো একসাথে? কি করবে সে? ঐ টনির দিকটা ভাবার দায়িত্ব কি আসলেই তার? ভবিষ্যতে কি হতে চলেছে? কোনদিন দেখা হয়নি জানা হয়নি এমন একটা ছেলের বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত নেবে সে?

চলবে…

৪০২জন ১৬৮জন
19 Shares

৩৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ