আমাদের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ । তাঁর সম্পর্কে জানুন । গর্বিত হোন আপনিও এমন একজন রাস্ট্রপতি আছে আমাদের ।

২০১১ সালের মার্চ মাস। কিশোরগঞ্জ জেলার এক বিচ্ছিন্ন উপজেলা মিঠামইনে এসে স্পিডবোট থেকে নামলেন তিনি। বোট থেকে নামার পর একটি রিকশা আনা হলো তাঁর জন্য। কিন্তু রিকশায় না উঠে অবলীলায় হাঁটতে শুরু করলেন সামনের দিকে। হেসে আমাদের উদ্দেশে বললেন, ‘এ উপজেলায় কোনো গাড়ি তো নেই-ই, রিকশা-মোটরসাইকেলও হাতেগোনা। এখানে পায়ে হাঁটাই আমাদের অভ্যাস। আপনাদের হাঁটতে একটু কষ্ট হবে।’ রোদের মধ্যেই সামনের দিকে হেঁটে চলছেন আর কুশল বিনিময় করছেন এলাকার মানুষের সঙ্গে। এরপর টানা প্রায় আধা কিলোমিটার হেঁটে উপজেলা অতিথিশালায় ওঠা।

আর এই মানুষটিই বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট মো. আবদুল হামিদ। ২০১১ সালের মার্চে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় এ সফরের সময় তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার। কিশোরগঞ্জের তিন উপজেলা ইটনা, মিঠামইন এবং অষ্টগ্রাম নিয়ে ছিল তাঁর নির্বাচনী এলাকা। যেখানে থেকে সাত সাতবার মানুষ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি করে জাতীয় সংসদে পাঠিয়েছেন তাঁকে। শুধু কি তা-ই! টানা দুই যুগেরও বেশি সময় তিনি ছিলেন কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। একই সঙ্গে জেলা বারের সভাপতি। স্পিকার হওয়ার সময় এ পদগুলো তাঁকে ছাড়তে হলেও এখনো তাঁর সঙ্গে আলোচনা না করে এসব সংগঠনে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর এখন তো আর তাঁর কোনো এলাকা নেই। সারা বাংলাদেশই তাঁর এলাকা। তবু রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর বঙ্গভবনে ঢোকার আগে প্রথম তিনি ছুটে গেছেন সেই এলাকায়—যেখানকার মাটি-আলো-বাতাস তাঁকে ধীরে ধীরে পরিণত করে তুলেছে আজকের আবদুল হামিদ-এ। গত মে মাসে যখন তিনি তাঁর উপজেলা মিঠামইনে নামেন তখন তাঁকে নিতে রিকশার বদলে আসে কাপড়ে মোড়ানো ভ্যানগাড়ি। কিন্তু হাঁটতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন আবদুল হামিদ। নিরাপত্তা রক্ষীদের (এসএসএফ) অনুরোধে শেষমেশ ভ্যানগাড়িতে উঠলেন রাষ্ট্রপতি। ভ্যানে চড়ে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার এ ছবি আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যমেও শিরোনাম হয়ে উঠেছিল।

‘তুইতো আমার দাদা’ : ঘটনাটি ১৯৬৯ সালের শেষ দিকের। পাকিস্তানিদের শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছে তখন বাঙালি জাতি। নির্বাচনের মাধ্যমে গণরায় নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। প্রার্থী ঠিক করা হচ্ছে, জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদের জন্য। এসময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডেকে পাঠালেন কিশোরগঞ্জের তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল হামিদকে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে ডেকে তাঁকে বললেন প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে। কিন্তু আবদুল হামিদের দাবি জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের টিকিট পাওয়া। এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমিতো জর্জ সাহেবকে কথা দিয়ে ফেলেছি। তুই এবার প্রাদেশিক পরিষদে জিতে আয়। পরে দেখবো নে।’ জর্জ সাহেব মানে সাবেক এক জজকে তিনি ওই এলাকায় জাতীয় পরিষদের নির্বাচন করার জন্য কথা দিয়েছেন।

কি আর করা, বঙ্গবন্ধুর কথা মানে তো নির্দেশ। এলাকায় ফিরে গেলেন হামিদ প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনের টিকিট নিয়ে। এর অল্প কয়েকদিন পরেই আবার বঙ্গবন্ধু কিশোরগঞ্জ থেকে জরুরি তলব করলেন আবদুল হামিদকে। হামিদ ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বাসায় এসে দেখেন বঙ্গবন্ধু লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে লনে হাঁটছেন। আবদুল হামিদকে একনজর দেখার পরে তিনি জোরে হেসে উঠলেন। রাষ্ট্রপতি হামিদের ভাষায়, ‘বঙ্গবন্ধু আমাকে দেখে প্রায় এক মিনিট জোরে হাসছিলেন। আর আমি ভয়ে জামা-প্যান্ট ঠিক আছে কিনা সেদিকে খেয়াল করছিলাম। কিন্তু হাসির কারণ বুঝতে পারিনি। হাসি থামিয়ে এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বললেন, তুইতো আমার দাদারে। তোকে আমি জোর করে জাতীয় পারিষদে না দিয়ে প্রাদেশিক পরিষদে দিলাম। আর জাতীয় পরিষদে যাকে দিলাম, সেই জাজ সাহেবতো মারা গেলেন। এখনতো তোর প্রস্তাবমতোই জাতীয় পরিষদে তোকে প্রার্থী করতে হবে।’ এরপর নির্বাচন হলো। ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত হয়ে এলেন আবদুল হামিদ।

এক ঘরোয়া আড্ডায় ওই সময়ের স্পিকার, বর্তমান রাষ্ট্রপতির গল্পটা এখানেই শেষ হয়নি। মজা করে তিনি বলছিলেন, ‘এ ঘটনা নিয়ে পরে একবার আমাকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছিল। কারণ এ বিষয়টি যে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জানেন সেটা আমার জানা ছিল না।’

রাষ্ট্রপতির ভাষায়, ‘১৯৭০-এর পর চলে গেছে অনেক দিন, অনেক বছর এবং কয়েক যুগ। ১৯৯৬ সালে ৫ম বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ওই সময়ের সরকারি দল আওয়ামী লীগ আমাকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করে। স্পিকার নির্বাচিত করা হয় সাবেক মন্ত্রী হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীকে। ২০০১ সালের ১০ আগস্ট স্পিকার থাকাকালেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি। এরপর ৭ম জাতীয় সংসদের বাকি সময়টা স্পিকারের দায়িত্ব পালন করতে হয়।

এরপর ২০০১ সালে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংসদে বিরোধী দলে যায়। বিরোধী দলীয় নেত্রী হন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিরোধী দলীয় উপ নেতা কাকে করা হবে—এ আলোচনায় এ পর্যায়ে আমাকে ডেকে পাঠান তিনি। হেসে ওই সময়ের বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা বললেন, হামিদ সাহেব, আপনাকে বিরোধী দলের উপনেতা করলে তো আমি ঝুঁকিতে পড়ে যাই। কারণ আপনার ওপর কাউকে দিলে তো সে শেষ পর্যন্ত বাঁচে না। কিন্তু বিরোধী দলের উপনেতা তো আপনাকেই করতে চাই। এখন কী হবে। প্রধানমন্ত্রী এবার উদাহরণ দিয়ে ১৯৭০-এর নির্বাচনের প্রার্থী এবং মরহুম স্পিকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর নাম বললেন। বিব্রতকর পরিস্থিতি সামলে কোনো মতে জবাব দিলাম—কাকতালীয়ভাবে দুটি ঘটনা ঘটলেও এবার আর ঘটবে না। কারণ আপনি না থাকলে তো আমিও নেই।’
লেখাটি বেশ বড় হওয়ায় বাকী অংশ ১ নং মন্তব্যে দেয়া হলোঃ

এটি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়েছে ৫ আগস্ট ২০১৩ সংখ্যায় । লিখেছেনঃ আশিস সৈকত

২১৮জন ২১৮জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

  • প্রজন্ম ৭১

    তাই রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বঙ্গভবন তাঁকে খুব একটা টানেনি। সংসদ ভবনের স্পিকারের বাসা ছেড়ে বঙ্গভবনে উঠতে তাই সময় লেগেছে প্রায় তিন মাস। স্বাধীনতা পদক পাওয়া ও রাষ্ট্রপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নাম ঘোষণার পর সংসদ এবং সংসদ সচিবালয় থেকে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধিত করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠেন নবনিযুক্ত রাষ্ট্রপতি। এক পর্যায়ে রুমাল দিয়ে চোখের পানি মুছে তিনি বলেন, ‘আমি জানি আমার জীবনে হয়তো আর সংসদ ভবনে ওইভাবে আসতে পারব না। কিন্তু এ সংসদ ভবন, সংসদ চত্বর আমাকে সবচেয়ে কাছে টানে। জীবনের সবচেয়ে বেশি সময় তো কাটিয়ে দিলাম এখানেই। তাই সংসদ ভবন এলাকা ছাড়তে হবে ভাবতেই বিষাদে মনটা ভরে যায়। তবে রাষ্ট্রপতি হলে অধিবেশন চলাকালে ঘন ঘন এখানে আসব। বসে বসে দেখব সংসদ অধিবেশনের কার্যক্রম।’

    সত্যি গত বাজেট অধিবেশনে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট পেশের সময় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সংসদে এসেছিলেন। সংসদে সাংবাদিক লাউঞ্জে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আড্ডা মারতে একবারের জন্যও ভোলেননি তিনি। রাষ্ট্রপতির বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর (এসএসএফ) সদস্যরা হতচকিত হয়ে যান রাষ্ট্রপতির সাংবাদিক গ্যালারিতে বসে এ আড্ডা মারা দেখে। সম্ভবত তিনিই বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি যিনি সাংবাদিক লাউঞ্জে ঢুকে সাংবাদিকদের খোঁজ নিলেন। ব্যক্তিগত পর্যায়েও খোঁজ-খবর নিলেন অনেকের। সাংবাদিকদের বঙ্গভবনে দাওয়াত দিতেও ভোলেননি তিনি।

    এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারানো সাংবাদিক নিখিল ভদ্রের খোঁজ নিতেও ভোলেননি আবদুল হামিদ। নিখিল ভদ্র এখন কৃত্রিম পা লাগিয়ে পেশায় ফিরে এসেছেন। সংসদ কাভার করছেন আগের মতোই। নিখিলের দুর্ঘটনার পর সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতেন তিনি। এমনকি অনেক সময় আবদুল হামিদের ব্যক্তিগত গাড়ি দিয়েও নিখিলকে সংসদে আনা-নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন আবদুল হামিদ।

    আবদুল হামিদের স্বপ্ন : রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের একটা স্বপ্ন আছে। তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকার তিন উপজেলা ইটনা, মিঠামইন এবং অষ্টগ্রাম থেকেই বাসে করে ঢাকায় আসতে চান। সেখানে বাসের হেলপাররা যাত্রীদের দৃষ্টি কাড়তে চিত্কার করে ডাকবেন—’ডাইরেক্ট ঢাকা, ডাইরেক্ট ঢাকা।’ মৃত্যুর আগে আর কিছু চাওয়ার নেই তাঁর। তাঁর স্বপ্নের এ কথাটি তিনি অবশ্য বলেছিলেন রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে স্পিকার থাকা অবস্থায়।

    কিশোরগঞ্জের অবহেলিত হাওর এলাকা থেকে ১৯৭০ সাল থেকে টানা নির্বাচিত সাংসদ আবদুল হামিদ এভাবেই ‘ইত্তেফাক’কে বলেন তাঁর স্বপ্নের কথা। বিস্তীর্ণ ওই এলাকা সরেজিমন ঘুরে বোঝা গেছে যে, আসলে ওটা স্বপ্নই। ওই তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-৪ নির্বাচনী এলাকার মিঠামইনে স্পিকারের বাড়ি। ওই উপজেলায় শুকনা মৌসুমে চলাচলের জন্য কোনো যানবাহন নেই। ট্রলার, স্পিডবোড কিংবা নৌকায় করে উপজেলার ঘাটে নামার পর হেঁটেই চলতে হয়। হাওর এলাকার অন্য উপজেলাগুলোতেও গাড়ি চলাচল নেই বললেই চলে।

    কিশোরগঞ্জ শহর থেকে বাসে এক ঘণ্টা লাগে চামড়াঘাট যেতে। সেখান থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় প্রায় তিন ঘণ্টার পথ মিঠামইন। শস্য আর মাছের ভান্ডার হিসেবে খ্যাত হাওর অঞ্চলের সবচেয়ে ছোট উপজেলা এটি। চারদিকে বাঁধ দিয়ে উপজেলা সদর তৈরি করা হয়েছে। বাঁধের পাশে সারি সারি নারিকেল গাছ। শুকনা মৌসুমে যতদূর চোখ যায় ফসলভরা মাঠ। ধান, আলু, বাদাম, কী হয় না এখানে। আর বর্ষাকালে এটি অথৈ সাগর। গ্রাম-জনপদগুলো যেন খেলনার মতো পানির মধ্যে ভাসতে থাকে। হাওরে তখন প্রচুর মাছ মেলে। বর্ষা শেষে ধান ফলে দেশের অন্য যেকোনো এলাকার চেয়ে বেশি।

    সেই মাটি থেকেই উঠে এসেছেন আবদুল হামিদ। ১৯৪৪ সালের জানুয়ারি মাসে মিঠামইনের কামালপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া সেই শিশুটিই আজকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি। কিন্তু গায়ে হাওরের সেই পানি-কাদা। হাওরের পলি মাটিতে বেড়ে ওঠা আবদুল হামিদের ঠিকানা এখন বঙ্গভবন।

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য