সবাইকে রমজান মোবারক🌹🌹🌹🌹
ভাজা- পোড়া মোবারক ও বলা যায়। বেশি করে ভাজা- পোড়া খান, আর সাথে এসিডের ওষুধ রাখুন!
আমি যদিও ভীষণ গেয়ো। সামান্য ডাল, ভর্তা আর ডিমভাজি, ভাত হলেই চলে। কারও কারও আবার চলে না, আর তাই মেইনটেন করতে গিয়ে গাদা গাদা ভাজা- ভূজি রাঁধতে রাঁধুনীদের জীবন পানি।
এসব না খেলেও আবার অসামাজিক হতে হয়। আর তাই প্রথম রোজাতেই শুরু হয়ে গেছে ওয়াক, ওয়াক এসিডিটি। আশেপাশে মজা নেবার লোকের অভাব নেই। এক নম্বর তালিকায় নুরজাহান খন্দকার বড় বড় চোখে ভীষণ কনফিডেন্টলি নিজেকে এপ্রোচ করেন।

বেশ নির্ভরতায় বলেন, – তোর বয়সের বেশিতে আমি তোকে জন্ম দিয়েছি। খুব বেশি বয়স না, এটা হতেই পারে। তবে আমার বমি হয়নি!

আমার কপাল কুঁচকে যায়, এসিডিটির ট্যাবলেট খেয়ে তাকে বলি, – কেমনে সম্ভব ছিল, মা?

-কি আশ্চর্য যেমনে সম্ভব হয় তেমনে? এও কি বুঝিয়ে বলতে হবে?
-কাল তোমার মায়ের মৃত্যু বার্ষিকীতে বিরিয়ানি আর আজ ভাজা- পোড়া খেয়েছি তাই বমি। তোমার মতো এতো এনার্জি আমার নেই বুঝলে?
-কি জানি বাপু তোমাদের বুঝিনা! আমরা তো এ বয়সেও রীতিমতো পুরো যৌবনে ছিলাম!

মা আর আমি ভিন্ন জগতের দুজন মানুষ। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় কোথাও গিয়ে একা চুপচাপ বসে থাকি। কেউ থাকবে না, অল্প- স্বল্প খাবার খাবো আর ভাববো। কি ভাববো; তার কোন নির্দিষ্টতা নেই!

মা তার চল্লিশের মেয়েকে ঘন্টা খানেক না দেখলে মনে করেন নির্ঘাত আমি অসুস্থ। হয়তো এটাও অসুস্থতা, আমি বুঝিনা। মা এতো কথা বলেন যে মাথা ধরে যায়। একই ঘটনা শতবার চলছে, আর আমি শুনছি। শুনি, কারণ হয়তো এ সময় আমারও আসবে কাউকে বলতে ইচ্ছে করবে। তখন শোনার কেউ থাকবে না। মন খারাপ হবে, খারাপ লাগবে।

আমার নানীমা বেঁচে ছিলেন ১০৫ বছরেরও বেশি বছর।প্রতিবছর তাঁর বছর পালন করা হয়। সবাই হাসিমুখ, গল্প, আড্ডা। আমি তাঁর ছেলেমেয়েদের মাঝে কোথাও তাঁকে পাই না। অসংখ্য মানুষ খাইয়ে তাঁর জন্য দোয়া করা হয়। তারপর যে যার মতো মাথা ব্যথা বানিয়ে বাড়ি। আমি তিন প্রজন্ম নিয়ে ভাবি। মা কি এতোদিন বাঁচবেন? কিংবা মা যতোদিন বাঁচবেন আমি ততোদিন বাঁচবো? মন বলে, আমি বোধহয় তারাতারি বুড়িয়ে যাচ্ কারণ হঠাৎই কিছু ভালো লাগে না, নিজেকে বেশি একা লাগে। সবাই আছে, তবুও যেন চলছে অমোঘ নির্বাসন। মাকে একা লাগার ব্যাপারটি বললে, মা তাকিয়ে থাকেন। হয়তো তার এটা হয়নি কখনও। একাকিত্বতা আমাদের সময়ের পরিবর্তন।

মাঝে মাঝে খুব বেশি একা লাগলে শাড়ি পরতে ইচ্ছে করে। শাড়িতে মনে হয় কেউ একজন প্রেমিকের মতো জড়িয়ে আছে সারা শরীরময়। নিজেকে তখন আর বেশি একা লাগে না।

কোন কোন দিন শাড়ি পরবো কিন্তু ব্লাউজ খুঁজে পাই না। বাইরে যেতে দেরী হবে তাই ব্লাউজ খুঁজে আর শাড়ি পরাও হয় না। পরদিন শাড়ি পরার ইচ্ছেটা আর থাকে না।এভাবেই চলছে অনেকদিন, ইচ্ছেরা হঠাৎ আসে আবার হঠাৎই চলে যায়।

ব্লাউজ খুঁজে পাই মায়ের গায়ে। এতোদিন ভাবতাম, তিনি আমার ব্লাউজ পরতেই বেশি পছন্দ করেন। মাকে যদি ধরে বসি মা, আমার ব্লাউজ এটা। তোমার তো হবে না কারণ আমার কাট আলাদা। অযথা ইস্ত্রি নষ্ট করছো!

গায়ে ব্লাউজ লাগছে না তারপরও তিনি একটুও বিচলিত হননা। বরং তারাতারি অস্বীকার করেন এবং বলেন তার বড় মেয়ে কিংবা ছেলে বানিয়ে দিয়েছে কিংবা আগের ছিল।
আমি আঁৎকে উঠি। বয়স হলে আমিও কি এমন হবো। সব ভুলে যাবো, অস্বীকার করবো কিংবা প্রখর আত্নসম্মান বোধ কাজ করবে? যা এ বয়সে বেমানান!

শিক্ষকের ব্যাগে সবচেয়ে বেশি থাকে কলম আর আমার ব্যাগে থাকে ব্রাশ। রীতিমতো লুকিয়ে রাখতে হয় কারণ মা সামনে যেটা ব্রাশ পান সেটা দিয়েই ব্রাশ করে ফেলেন। কোন কোনদিন রাগ হয় ভীষন!
-মা, এমন করো কেন? তোমার ব্রাশ রেখে আমার ব্রাশ নাও। বমি পায় আমার।
মা খোঁচা দেন- তোর তো আসল বমি পায় না। যেখানে সেখানে ফেলে রাখলে আমি কি করবো। ভুল হয়।
মেয়েকে বিচার দেন, একটা ব্রাশের দাম আর কতো? তারজন্য কতো কথা। অথচ মা আমার গা ঘসা দিয়ে নির্দ্বিধায় তার প্রিয় কাপ পরিস্কার করেন। ব্রাশ দিয়ে কাপের হ্যান্ডেলে লেগে থাকা লুকানো দাগ ঘসে তোলেন। রুমে পরার স্যান্ডেল পরিস্কার করেন! আবার ধুয়ে রাখেন আর আমি না জেনেই কিংবা উপায় না পেয়ে তা দিয়েই ব্রাশ করি। অবশ্য মাস্ক পরাতে সামান্য সুবিধা হয়েছে। কুলকুচি মেরে চলে যাওয়া যায়। কিন্তু ভুলেও মাস্ক খুলে ফেলা যাবে না তাহলে সামনের জন অজ্ঞান!!

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ মাইনুদ্দিনকে মায়ের ভীষণ পছন্দ। এই মোটা ডাক্তার এর কোন বিশেষত্ব আমি খুঁজে পাইনা। অথচ মা সামান্য কাশিতেই তার কাছে যেতে চান। ডাক্তার এবং ওষুধের কেমন যেন নেশা হয়েছে। বয়স হলেই হয়ত হয়! মাঝে মাঝে অনেক ওষুধ খেয়ে ফেলেন। আবার তার ছোট্ট ডিসপেনসারি একটু খালি হলেই চিৎকার দেন, আমি তার খেয়াল রাখি না। এভাবে ওষুধ না খেয়ে কতোদিন বাঁচবেন তিনি। হঠাৎ একদিন ওষুধের অভাবে মারা যাবেন। তারমানে তিনি মরতে চান না বলেই এতো ওষুধ খান। তার ধারনা এ বয়সে ওষুধ তার জন্য ভীষণ জরুরী।

বেশি ওষুধের কথা বললেই মন খারাপ করেন।অনেকসময় চুপচাপ থাকেন, তখন আমি ভয় পেতে থাকি। মা কথা বলেন না, আমি ভয় পেতে থাকি। কষ্ট হয়, সাথে নিজের ছবিটাও ভেসে ওঠে। রাতে রাতে বুড়িয়ে যেতে থাকি। মনে হয় সকাল বেলা উঠে দেখবো সব চুলে পাক ধরেছে। আমিও মায়ের মতো কোমর বাঁকিয়ে হাঁটছি আর ভুলভাল বকছি অনবরত!!!

মায়েরা এমনি হয়। আমি সারাক্ষন মায়ের কথায় বিরক্ত হই। অসহ্য লাগে কিন্তু ছেড়ে থাকতে পারি না। মা অন্য কারও কাছে যাবার কথা বললেই নিজেকে অসম্পূর্ণ মনে হয়। তাই ঠিক করেছি পুরো রমজানে তাকে সমস্ত এসিডিক খাবার বানিয়ে দেব, নিজেও খাবো আর বমি করবো।আপনারাও মা থাকলে তার যত্ন করুন; খেয়াল রাখুন। মায়ের পায়ের নিচেই বেহেশত!!!

ছবি- প্রতিকী।

১৮৭জন ৩৭জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য