মায়ের শিক্ষা

হালিম নজরুল ১৪ মার্চ ২০২০, শনিবার, ১২:১৫:১৪পূর্বাহ্ন ছোটগল্প ১৭ মন্তব্য

মায়ের শিক্ষা
হালিম নজরুল

এই গরমের দিনেও দুপুরবেলা কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে লাবন্য। গত ক’দিন স্কুলেও যায়নি। তাই খোঁজ নিতে ছুটে এসেছে প্রিয় বান্ধবী প্রাপ্তি। বাড়িতে ঢুকতেই খুশিতে নেচে উঠলো তিতলি। হি হি করে হাসতে হাসতে বলে উঠলো “ভাল আচো ? ভাল আচো ?”

তিতলি লাবন্যর পোষা ময়না। সে অল্প অল্প কথা বলতে পারে। প্রাপ্তিকে সে ভালভাবেই চেনে। লাবন্য আর প্রাপ্তি একইসাথে পড়াশোনা করে। তাই তারা প্রায়ই একে অপরের বাড়িতে যাতায়াত করে। তিতলিও প্রাপ্তিকে খুব পছন্দ করে। আজও প্রাপ্তিকে দেখে সে খুশি হল এবং কেমন আছে জানতে চেয়ে বললো “ভাল আচো? ভাল আচো?”

কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর প্রাপ্তি বলল “নেহি, নেহি। মেরা বান্ধবী অসুস্থ হ্যায়। সো হাম নেহি আচ্ছা হ্যায়।”
তিতলি কিছুই বুঝলো না। এমন সময় সিয়াম এসে হাজির। সেও লাবণ্য, তৃপ্তির সহপাঠী। তাকে দেখেও তিতলি আবার বলে উঠলো “ভাল আচো? ভাল আচো?” এবার প্রাপ্তি একটু রেগে গিয়ে বললো, “বললাম তো ভাল নেই, আমাদের বান্ধবী অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। আর আমরা ভাল থাকি কি করে!”

প্রাপ্তির রাগ বুঝতে পেরে লাবন্য কম্বলের ভিতর থেকে মাথা বের করে বললো,
–“রাগ করছিস কেন প্রাপ্তি। তিতলি তোর কথা বুঝতে না পেরেই তো বারবার জানতে চাচ্ছে তুই কেমন আছিস।”
প্রাপ্তি বললো,
–“বুঝবে না কেন, আমি কি না বুঝার কিছু বলেছি। এখন তো এসব ভাষা সবাই বোঝে। আমরা ডোরেমন দেখে দেখে সব হিন্দি শিখে ফেলেছি।তুই ওকে এসব শেখাসনি?”
লাবন্য বললো,
–“তুই মানুষ বলে হয়তো কিছু কিছু হিন্দি শিখেছিস। তাই বলে তিতলির পক্ষে কি সবকিছু শেখা সম্ভব!”
এবার সিয়াম আলোচনায় যোগ দিল।সে বললো,
–“হোয়াই নট. আমাদের সব ধরনের ভাষা জানা উচিৎ। বহু ভাষাবিদ ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সাতটি ভাষায় কথা বলতে পারতেন।”
প্রাপ্তি এবার একটু জোর পেয়ে বললো-
–“ঠিক হ্যায়, ঠিক হ্যায়। তুম অলসো তামিল নানান ল্যাংগুয়েজ।”
সিয়াম আর প্রাপ্তির কাণ্ডকারখানা দেখে হাসতে লাগলো। হাসতে হাসতে তার জ্বর কমার উপক্রম। কিন্তু সিয়াম হাসির কোন কারণ খুঁজে পেল না। সে আবার বলে উঠলো–
–“হোয়াই ডু ইউ লাফিং? আর ইউ ডুয়িং ইয়ার্কি?”
প্রাপ্তি বললো–
–” ইয়েস ঠিক হ্যায়। তুম নেহি হাসুঙ্গে। হাসি মাত কারেঙ্গে এন্ড হামকো যুক্তি মানিয়া লঙ্গে।”
এবার লাবন্য আরও জোরে হো হো করে হেসে উঠলো।

লাবন্যর হাসি দেখে প্রাপ্তি রাগে ফুঁসতে লাগলো। সিয়াম বললো, চল, এখানে আর নয়। দু’জন চলে যাওয়ার মুহূর্তে লাবন্যর মা এগিয়ে এলো। তিনি দুই হাত দিয়ে দু’জনকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন–
–“বন্ধুর কথায় রাগ করতে নেই সোনা, এসো, চলো তোমরা কিছু খাবে এখন।”
দুইজনকে মাদুরে বসতে দিয়ে তিনি কিছু মুড়ি-মুড়কি, এক গ্লাস দুধ আর কয়েকটা আম নিয়ে এলেন। লাবন্য বিছানা থেকে উঠে ওদের পাশে গিয়ে বসলো। লাবন্যর মা তিনজনকে খুব আদর করে খাওয়াতে লাগলেন। এই সময় তিনি ওদেরকে বোঝাতে লাগলেন। বললেন–
–” মায়ের মত আপন যেমন কেউ নেই, তেমনি মাতৃভাষার চেয়ে প্রিয় কোন ভাষা নেই। এই ভাষার জন্যই ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিকরা প্রাণ দিয়েছিল। তাই সবার উচিৎ নিজের মাতৃভাষাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসা। অন্যান্য ভাষা জানলে ভাল। তবে সবার আগে নিজের ভাষা ভালভাবে জানা উচিৎ। আবার অন্য ভাষাও ভাল মত না জেনে বলা উচিত নয়। তোমরা অবশ্যই পৃথিবীর সব দেশ, সব জাতি ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে জানবে। কিন্তু সবার আগে নিজের মা, মাটি ও মানুষকে ভালবাসবে।”

লাবন্যর মায়ের আদর, ভালবাসা আর সুন্দর সুন্দর কথায় প্রাপ্তি আর সিয়ামের ভুল ভেঙে গেল। তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হেসে উঠলো। এমন সময় লাবন্যর ভাইয়া স্কুল থেকে ফিরে বাড়িতে ঢুকলো। কিন্তু তার মন ভাল না। মা কিছুটা বুঝতে পারলেন । তিনি বললেন–
–” কি রে, আজ তোর পরীক্ষার ফলাফল দেবার কথা ছিল। কি খবর তোর?”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো- “ভাল না।”
ছেলের কথা শুনে মা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি শান্ত্বনা দিয়ে বললেন—
–” হতাশ হোসনে বাবা, এবার খারাপ হয়েছে। আগামীবার অবশ্যই ভাল হবে। তবে সে জন্য তোর চেষ্টা ও দৃঢ় সংকল্প প্রয়োজন। তুই সারাদিন যেভাবে মোবাইল গেম খেলে সময় নষ্ট করিস, তাতে ফলাফল ভাল হবার কোন সম্ভাবনা নেই। কোন কাজ মনোযোগ দিয়ে না করলে ভাল ফলাফল আশা করা যায় না।”
এবার মায়ের সাথে কন্ঠ মিলিয়ে বললো—
–” তুমি ঠিক বলেছো মা। এই দ্যাখো’ একটা সুন্দর ভিডিও। এটা দেখলেও অনেককিছু শেখা যায়।”
লাবন্যর কথা শুনে সবাই মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রইল। মোবাইলে একটি ভিডিও চালু হলে সবাই সেটা চুপচাপ দেখতে লাগলো। ভিডিওতে একটা ছোট্ট শিশুকে তার মা পাশে বসিয়ে ফিডার দিয়ে দুধ খাওয়াচ্ছে। তার ডান হাতে মোবাইল, বাম হাতে ফিডার। বামে হাতটি শিশুটির সামনে ধরে রেখেছে। বাচ্চাটি দুধ খাচ্ছে আর ছাড়ছে। কিন্তু মায়ের সব খেয়াল ডানহাতের মোবাইলের দিকে। সে গভীর মনোযোগে গেম খেলায় ব্যস্ত। পাশ থেকে কখন বাচ্চাটি হামাগুড়ি দিতে দিতে সরে গেছে খেয়ালই করেনি। ওদিকে একটা ছাগলের বাচ্চা এসে ফিডার থেকে দুধ খেয়ে যাচ্ছে। বাচ্চাটি হামাগুড়ি দিতে দিতে একটা ছোট গর্তের মধ্যে পড়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে লাগলো। কান্না শুনে মায়ের হুশ ফিরে এলো। পাশে তাকিয়ে দেখে ছাগলের বাচ্চা দুধ খাচ্ছে, আর বাচ্চাটি গর্তের মধ্যে চিৎকার করে কাঁদছে। এই দেখে সে সব ফেলে বাচ্চার দিকে দৌড় দিল।

ভিডিওটি দেখে সবাই হো হো করে হাসতে লাগলো। লাবন্যর মা বললো—-
–” ভিডিওটি হাসির খোরাক যোগালেও অনেক বেশি শিক্ষণীয়। তোমরা অবশ্যই তোমাদের নিজের কাজ মনোযোগ দিয়ে করবে। তাহলে অবশ্যই ভাল ফল পাবে। অন্যথায় জীবনে সফল হতে পারবে না।”

১৩৫জন ১৭জন
3 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য