মায়া (৩)

ইঞ্জা ১৮ অক্টোবর ২০১৯, শুক্রবার, ০৭:২৭:১৯অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২১ মন্তব্য

মায়া সবচাইতে আনন্দ পেতো যখন আমি স্কুল থেকে ফিরে ওর দুই কান ধীরে ধীরে টানতাম, মাথায় হাত ভুলাতাম।

এক সময় ও চিত হয়ে শুয়ে পড়তো আর আমি ওর পেটে হাত ভুলাতাম, ঢলতাম, এ ওর খুব পছন্দের ছিলো।
ও ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলো, পাঁচ ছয় মাস পর থেকে আব্বা ওর জন্য স্পেসাল মাংস রান্না করানো শুরু করালেন ভাত দিয়ে, অনেকটা বিরানি টাইপের।
এই মজাদার রান্না ওর বেশ প্রিয়, একেবারে চেটেপুটে খায় সে।

এখন প্রতি রাতে গেইট বন্ধ করার পর ওকে ছেড়ে দেওয়া হয়, ও পুরা বাড়ি দৌড়াদৌড়ি করে পা্ড়া দেয়, ওর কারণে ইঁদুর বিড়াল সহ কিছুই আমাদের বাড়ির আঙ্গিনায় আসতে পারেনা।
এক রাতে গেইটে ধাক্কাধাক্কি আর মায়ার চিৎকার শুনে আব্বা বাইরের বারান্দায় বের হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কে ধাক্কায় গেইট?
ওপাশ থেকে জবাব দিলো একজন, আমাদের এক আত্মীয় এসেছেন দাওয়াত দিতে, রাত প্রায় সাড়ে বারোটা হবে হয়ত।

আব্বা গেইট খুলে দিতেই মায়া শুরু করলো তার স্বরে চিৎকার আর চোখ রাঙ্গানী, এতেই আত্মীয়র আত্মারাম খাঁচাছাড়া।
আব্বা মায়াকে বললেন, এই চুপ কর, ভাগ এইখান থেকে।
সাথে সাথেই মায়া কুঁই কুঁই করে ওর স্থানে গিয়ে চুপ।
আত্মীয় দ্রুত দাওয়াত দিয়ে চলে গেলেই আবার তার শুরু হলো তার দাঁপানি।

ছোটবেলা থেকেই আমাদের অভ্যাস করানো হয়েছিলো, আব্বা যখন সকালে অফিসে যায় আর সন্ধ্যায় ফিরে আসেন, তখন আমরা ভাই বোনরা আব্বাকে কদমবুচি করতাম আর এইটি মায়া লক্ষ করতো।
যেহেতু ও তখন চেইনে বাঁধা থাকতো, এই জন্যই সে ওখানে তার স্বরে চিৎকার শুরু করতো ঘেউ ঘেউ করে, সাথে লাফাতে থাকতো আসার জন্য, এই দেখে আমার আব্বা ওর সামনে গেলে ওর সামনের পা দুটি দিয়ে আমার আব্বার পা ছুঁয়ে দিতো, মানে তিনিও সালাম করবেন এবং করছেন।
এ কদমবুচি করা যেমন আমাদের রুটিন ছিলো, তেমনি ওরও রুটিন ছিলো।

কয়েকদিন ধরে সবাই খেয়াল করছিলো, মধ্যরাতে ও প্রচন্ড চিৎকার চেঁচামেচি করা শুরু করতো মায়া, এইভাবে অনেকক্ষণ চলতো।
আব্বা বুঝতে পারলেন হয়ত চোর বা ডাকাত দেওয়াল পেরিয়ে আসার চেষ্টা করে এইখানে আর মায়া তাদের দেখেই চিৎকার শুরু করে, এইভাবে কয়েকদিন হওয়ার পর আব্বা একজন দারোয়ান রেখে দিলেন, এতে মায়ারও চিৎকার করা বন্ধ হলো।

ওর যত আনন্দ ছিলো আমাদেরকে ঘিরে, সারাদিন আমাদের সাথে খেলতো, আদর দিতো আর নিতো।
আমার আব্বার নিষেধ ছিলো যেন ওকে কোন ধরণের তৈলাক্ত খাবার, ঘি জাতীয় খাবার না দিই, ও এইসব খেলে অসুস্থ হয়ে পড়বে।
আমরা ওকে নিয়েই মক্ত থাকতাম বেশির ভাগ সময়, ওর আরেক ভীষণ পছন্দের ওক বিষয় ছিলো, ওকে ছাড়া রাখা অবস্থায় গেইট খোলা পেলেই দিতো এক দৌড় গেইটের বাইরে আর পাড়ার লোকজন, বাচ্চা পোলাপাইনদের শাসিয়ে আসতো বেশ করে, ওর শরীরটা বেশ মোটাতাজা ছিলো বলেই বেশ বড়সড় লাগতো অন্যান্য দেশি কুকুরের তুলনায়।

ওর শাসানি, মোটা গলায় ঘেউ ঘেউ শব্দ সাধারণ যে কাউকেই ভয় পাইয়ে দিতো, আর এই ভয় পাইয়ে দেওয়াটাই ওর পছন্দের খেলা ছিলো।
এ ওর খেলা থাকলে কি হবে, পাড়ার লোকজন প্রচন্ড ভয় পেতো ওকে, এই জন্যই প্রায় সময়ই আব্বা, আম্মার কাছে বিচার আসতো মায়ার বিরুদ্ধে, অথচ ও কাউকে কখনো কামড়ে দিয়েছে এই রেকর্ড নেই আর দিলেও অসুবিধা ছিলোনা।
আব্বা নিয়ম করে ওকে ডাক্তার দেখাতো, ইঞ্জেকশন দেওয়াতো, আমরা ওর নক সবসময় কেটে দিতাম।

দারোয়ান চাচার মাধ্যমে যেনে ছিলাম, ও প্রথম কয়েকদিন উনার পিছে পিছে রাতে ডিউটি দিলেও, পরে পরে সে দারোয়ান চাচা যেদিকে যেতো সে তার উল্টো পথে গিয়ে পাহারা দিতো।

……. চলবে।
ছবিঃ গুগল।

১৫৯জন ২৪জন
43 Shares

২১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য