এলার্মের শব্দে ঘুম ভাংলো। দেখি সকাল ৭.৩০ বাজে। উঠে ফ্রেস হয়ে জামা-কাপড় বদলে নিলাম দুজনে। ব্রেকফাস্ট করতে হোটেল ডাইনিং এ যেতে হবে। আগেই জেনেছিলাম এরা শুধু সকালের খাবার দেবে (বুফে) আর দুপুর, রাত নিজেদের ব্যবস্থায় খেতে হবে। যাক, নেমে এলাম নীচে। ডাইনিং এর মুখেই একজন লিস্ট নিয়ে গেস্টদের নাম চেক করার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। আমরা রুম নম্বর বলার পর উনি লিস্ট দেখে সুন্দর একটা হাসি দিয়ে ওয়েলকাম করলেন। এদিকে সাউন্ড সিস্টেমে সুন্দর একটা সুর বাজছে। ভেতরে ঢুকে দেখি এর মধ্যেই অনেকে খেতে চলে এসেছে। বিভিন্ন দেশের। চেহারা দেখে মনে হলো আমেরিকান, ইউরোপিয়ান তো আছেই সব থেকে বেশি এশিয়ান। এই চোখ ছোট ফর্সা চেহারাওয়ালাই বেশি। কিছু ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানিও দেখলাম। ড্রেস এবং ভাষা শুনে মনে হলো এ কোথায় এলাম। যাই হোক প্লেট নিয়ে এগিয়ে গেলাম খাবারের ট্রে’র দিকে। ওমা প্রথম ট্রের ঢাকনা তুলেই চোখ চড়কগাছ। ভাত!!!! এই সকালে এত বড় হোটেলে এরা ভাত দিয়ে রেখেছে!! কে খাবে? আমি হেসে ফেলেছি দেখে কর্তা চোখ দিয়ে একটা ধমক দিলেন। আমি চুপচাপ তার পেছন পেছন যেতে লাগলাম। পরের ট্রেগুলোতে দেখলাম মুরগী, নুডলস, ডিম ভাজি, পাউরুটি (পাশে টোস্টার। যার যার ইচ্ছে নিজেই টোস্ট করে নিতে পারে), কর্ণ ফ্লেক্স, স্যুপ, ফল, আর দুইটা হাড়িতে জাউ ভাতের মত কি যেন চিনলাম না। আমিতো পড়ে গেলাম বিপদে। রুটি/পরোটা নাই 🙁 অনেক ভেবে একটু ভাত, নুডলস আর একটু মুরগীর তরকারী নিয়ে বসলাম। আর গ্লাসে নিলাম অরেঞ্জ জুস। আস্তে আস্তে খাচ্ছি আর সবাইকে দেখছি। দেখি এক বয়স্ক ভদ্রোলোক ঠিক টুথপিক দিয়ে নুডলস খাচ্ছে। কি তার ধৈর্য্য। একটা একটা করে নুডলস উনি শেষ করলেন। আমি একটু স্লো খাই। তাই কর্তা তারা দিতে লাগলেন। আমি শেষে ফ্রুট ট্রে থেকে কয়েক টুকরো তরমুজ এনে দ্রুত মুখে চালান করে বললাম, চলো। রুমে আসার আগে রিসিপ্সনে বলে এলাম রুম কিপিং এর লোক যেন এখনই আসে, আমরা বাইরে যাবো। রুমে এসে চেক করলাম মোবাইল, পাওয়ার ব্যাংক চার্জ হলো কি না। ও আপনাদের বলতে ভুলে গিয়েছি, সেই হোটেলের সব প্লাগ পয়েন্ট ৩ পিনের। সেগুলোতে দু’পিনের প্লাগ লাগেই না। একটা চার্জার ভাগ্যিস ছিলো ৩ পিনের, সেটা দিয়েই সব চার্জ করতে হচ্ছে। (যদিও আসবার দিন দুপুরে হোটেলের সামনেই এক বাংলাদেশী দোকানে দেখি দুনিয়ার ছোট ছোট মাল্টি প্লাগ)। বাইরে যাবার আগে আমি সামনের কোকড়া চুল একটু স্ট্রেইট করবো, দেখি সেই স্ট্রেইটনারের প্লাগও লাগে না 🙁 কি আর করা, বাচ্চাদের মত রাউন্ড ব্যান্ড মাথায় দিয়ে তৈরী হচ্ছি। এর মধ্যে দরজায় নক। খুলে দেখি রুম কিপিং এর লোক। সে সব কিছু বদলাতে লাগলো। এর মধ্যে কর্তা আমাকে জিজ্ঞেস করলো কয়টা বাজে? বলতেই ছেলেটা কর্তার মুখের দিকে ফিরে তাকালো। কর্তা বুঝলো এ বাংলাদেশি। তাকে জিজ্ঞেস করলো বাড়ি কোথায়? বলে ময়মনসিংহ। শুনেতো আমি অবাক। বললাম ময়মনসিংহের কোথায়? বলে নেত্রকোনা। যাই হোক পাশের জেলা, তবুও দেশি ভাই।দু’ একটা কথা বলে কাজ শেষ করে সে বিদায় নিলো।
১০টার আগে আগে নীচে নেমে এলাম। ড্রাইভারকে ফোন দেয়া হলো, বললো কাছাকাছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি এলে রওনা হলাম গ্যান্টিং হাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে।

img_6481-320x240

আমাদের হোটেল থেকে বের হয়েই রাস্তাটা উঁচুতে উঠে যায় এমন। খুব ভালো লাগে দেখতে। আজ মন দিয়ে শহর, বিল্ডিং, রাস্তাঘাট দেখছি। একটু পর পরই উপর দিয়ে মেট্রো ট্রেন ছুটে যাচ্ছে। এগুলো দু’বগী থেকে ৫’বগী পর্যন্ত লম্বা। বিল্ডিংগুলো সব কাঁচের। আকাশছোঁয়া। একেকটা একেক ডিজাইন। একতলা কোনো বিল্ডিংই দেখলাম না। জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার করছে এরা। সব যেন লাইন মেনে প্ল্যান করে করা। একটু পর চলে এলাম শহরের বাইরে। অবাক ব্যাপার আসার থেকে দেখছি এই ঝুম বৃষ্টি, এই রোদ।

img_6988-320x240

তার জন্য গরম বা ধুলাবালি গায়ে লাগছে না। আর সব সিটি বাস, কার, ট্যাক্সি এসি করা। আমাদের দেশের নামী দামী এসি বাসগুলোর মত বাস ওদের টাউন সার্ভিস। দেখে, ভেবে মন খারাপ হয়ে যায় মাঝে মাঝে। যাহোক, শহরের বাইরে এসে অন্য চিত্র। সবুজ সবুজ পাহাড়।

img_6346-320x240

কখনো রাস্তার ধার ধরে ঝোপে ঘেরা লেক তারপর আবার রাস্তা। শহরের পাহাড়গুলো কেমন ছোট ছোট সবুজ ঘাসে ঢাকা আবার কতগুলোর গায়ে রাস্তার সাইডে সিমেন্টের আস্তরণ দেয়া। হতে পারে এগুলো হয়তো ফাড়কে ধ্বস হতে রক্ষা করে।

img_6348-320x240

প্রচন্ড গতিতে গাড়ি চলছে। ১৫০-১৮০ কিমি বেগে। ড্রাইভার বললো এই রাস্তার গতিই এমন। তারও মধ্যেও এসব গাড়ির ফাঁক ফোকড় দিয়ে চলে যাচ্ছে একেকটা বাইক।

img_6992-320x240

ভয়ই লাগছিলো এদের গতি দেখে। এভাবে চলতে চলতে হঠাৎ গাড়ির গতি কমে গেলো। আমি বললাম জ্যাম? ড্রাইভার পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে বললো এ রাস্তা কখনো জ্যাম হয় না। হলে বুঝতে হবে সামনে দুর্ঘটনা ঘটেছে।

img_6507-320x240

তখন সে গুগল ম্যাপ চেক করে বলে ৬ মিনিট ড্রাইভ সামনে এক্সিডেন্ট হয়েছে। মন খারাপ হয়ে গেলো। এই রাস্তায় এক্সিডেন্ট মানে ভয়াবহ অবস্থা হবার কথা। গাড়ি আস্তে আস্তে পৌছলো সে জায়গায়। দেখলাম মোটর বাইক আর কার এক্সিডেন্ট। বাইকে সামনের চাকা আর কার একদিকে আর বাইকের বাকি বডি আরেকদিকে। পুলিশ জায়গাটা ঘিরে রেখেছে তাই বাইক চালক বা কাউকে দেখতে পেলাম না।

img_6510-320x240

আবার স্পীড বাড়লো গাড়ির। যেতে যেতে দেখি বাটু কেভের সামনের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি আমরা। ভাবলাম বাটু কেভে কিছুক্ষন থাকি। ড্রাইভার বললো সে আজ শুধু গেন্টিং হাইল্যান্ডেই যেতে পারবে, অন্য স্পটে পার্মিশন নেই।

img_6488-320x240

কি আর করা। কর্তার কানের কাছে গ্যান ঘ্যান করতে লাগলাম। সে বিরক্ত হয়ে রাজি হলো একদিন নিয়ে যাবে। 🙂 প্রায় ১ ঘন্টা ড্রাইভের পর উঁচু নীচু সাপের মত আঁকা-বাকা পথ বেয়ে উঠতে উঠতে অবশেষে পৌছলাম গেন্টিং হাইল্যান্ড কেবল কার স্টেশনে।

img_6499-320x240

ড্রাইভার আমাদের নামিয়ে দিয়ে ব্রিফিং শেষে চলে গেলো পার্কিং এ। আমরা সেই স্টেশনের লোকেদের জিজ্ঞেস করে করে সম্ভবত ৫ তলা উঁচুতে উঠলাম। মালয়েশিয়ায় সব থেকে মজার ব্যাপার হলো বাটু কেভ ছাড়া সব জায়গায়ই এস্কেলেটর লাগানো। কষ্ট করে কাউকে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় না।

img_7374-320x240

এভাবে পৌছে গেলাম একদম টিকিট কাউন্টারের সামনে। টিকিট কেটে কেবল কারের একটা খালি কম্পার্টমেন্ট দেখি চড়ে বসলাম। যেইনা বসেছি, হুট করে এক ছেলে ক্যামেরা নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে বলে “স্মাইল”। বলেই ছবি তুলে নিলো। ঘটনা কিছুই বুঝলাম না। তারপর খেয়াল করলাম সে অন্য কম্পার্টমেন্টের যাত্রীদেরও ছবি তুলছে। ভাবলাম কিজানি, হয়তো সিকিউরিটির জন্য ছবি তুলে রাখে। কর্তাকে জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যাপার? তার উত্তর আরো এক কাঠি বাড়া। বলে, “মনে করো কোনো এক্সিডেন্ট হলো। মরে গেলাম। চেহারা বুঝা যাবে না এত উঁচু থেকে পড়লে। তখন যাতে ছবি দিতে পারে মিডিয়ায় সেজন্য।” উত্তর শুনে রাগে গা জ্বলে গেলো। যাই হোক, কেবল কার চলা শুরু করলো। আমরা আস্তে আস্তে উপরে উঠছি।

img_6607-320x240

নিচে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ছোট হয়ে যেতে লাগলো। গাড়িগুলো যেন খেলনা গাড়ি। এগিয়ে যেতে যেতে পাহাড়ের উপর দিয়ে যেতে লাগলাম। নিচে খাদ। হালকা হালকা মেঘ ভাসছে আশে-পাশে।

img_6600-320x240

আমি দেখছি আর ছবি তুলছি। ভিডিও করছি। হঠাত সাদা মেঘ এসে আমাদের ঘিরে ধরলো। চারপাশ সাদা। যেন আমরা অন্য কোনো জগতে।

img_7361-320x240

যাহোক এভাবে যেতে যেতে আবার মেঘ সরে গেলো। আবার উঠতে লাগলাম উপরে। যেতে যেতে হুট করে কেবল কার থেমে গেলো। ওই উঁচুতে খোলা আকাশের মাঝে দুলতে লাগলো কার। কর্তা দেখি এবার ভয় পেয়েছে। বলে, “কি হলো? থেমে গেলো কেন?” আমি নির্বিকারভাবে উত্তর দলাম, যেন আমি জানি, “আরে এটা ওরা ইচ্ছে করে থামিয়েছে। একটু থ্রিলিং ভাব আনার জন্য।” বলতেই দেখি কার আবার চলা শুরু করেছে। 🙂

img_6579-320x240

আমি এবার বেশ ভাব নিলাম। এভাবে প্রায় ১৫-২০ মিনিট চলার পর আমরা শেষ স্টেশনে পৌছলাম। আমরা নামলাম। আসলে নেমে কি করবো বুঝতে পারলাম না। বললাম চলো ফেরৎ যাই। তখন ওখানকার একজন বললো নিচে খাবার দোকান, শপিং মল আছে ঘুরে আসতে। ওখান থেকে ১ তলা নামতেই দেখি কি সুন্দর শপিং মল।

img_6582-320x240

খাবারের দোকানও প্রচুর। অবশ্য আমরা কিছু কিনলামও না, খেলামও না। ঘুরে ঘুরে দেখছি। হঠাৎ এক বিদেশি ভদ্রলোক, ওইযে চাইনিজ টাইপ এসে দাঁত সব বের করে বললেন, “আর ইউ বাঙালীয়া?” আমিতো “বাঙালীয়া” শুনে কি বলবো ভাবছি। হেসে বললাম, “বাঙালী :)” এক্সুয়ালী আই আম বাংলাদেশী।” সে “ওয়াও, ভেরি গুদ ভেরি গুদ” বলে হেসে বিদায় নিলো।

img_7358-320x240

যাহোক সেখানে কিছুক্ষণ ঘুরে ফিরে আবার ফিরতি কেবল কারে চড়ে রওনা হয়ে গেলাম স্টার্টিং পয়েন্টের দিকে।

img_7364-320x240

পাহাড়, খাঁদ, ঝিড়ি, হাইওয়ে, বিল্ডিং সবকিছুর উপর দিয়ে ভেসে চলতে লাগলো কেবল কার। একসময় এসে পৌছলাম সেই স্টেশনে। ঠাস করে কেবল কারের দরজা খুলে গেলে বের হয়ে এলাম আমরা। বের হয়েই দেখি সেই তখন তোলা আমাদের ছবিটা প্রিন্ট করে সেই ক্যামেরাম্যান দাঁড়িয়ে আছে। হাসিমুখে বিক্রি করতে চাচ্ছে ছবিটা। আমিতো মুগ্ধ। কিন্ত দাম শুনেই কেনার ইচ্ছে উবে গেলো। বুঝলাম ছবি তোলাটাও এক ধরণের ব্যবসা? বরের দিকে তাকিয়ে বললাম তোমার ছবি তোলার কারণের সাথে কিছুই তো মিললো না। সে হাসে। সেখান থেকে বের হয়ে গাড়িতে রওনা হলাম হোটেলের উদ্দেশ্যে। ড্রাইভারে সংগে কথা বললাম যে এখানে আর কি কি দেখার আছে কাছাকাছি। বার্ড পার্ক, একুয়ারিয়াম এগুলো কতদুর? সব শুনে সিদ্ধান্ত নিলাম টুইন টাওয়ারের কাছেই বিশাল একুয়ারিয়ামে যাবো বিকেলে সাথে টুইন টাওয়ারের পেছনের ফোয়ারার নাচও নাহয় দেখবো। তবে এখন যেহেতু সময় আছে হাতে কোথায় যাওয়া যায়? ড্রাইভার আমাদের বললো ইন্ডিয়া মার্কেট, মাইদিন মার্কেট আর চায়না টাউন ঘুরে আসতে পারি। ঠিক হলো হোটেলে ফিরবো না। যাই দেখে আসি মার্কেট প্লেস।

চলবে…..

আগের পর্বগুলো পড়ুনঃ
মালয়েশিয়া ভ্রমণ কাহিনী ১মালয়েশিয়াতে কয়েকদিন -১  

মালয়েশিয়া ভ্রম্ণ কাহিনী ২ /  মালয়েশিয়াতে কয়েকদিন ২

৬৬৬জন ৬৬৬জন
0 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ