মার্চ ৬ ১৯৭১
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান হঠাৎ করেই ৬ মার্চ জাতির উদ্দেশে এক বেতার ভাষণে ২৫ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেন। ভাষণে তিনি আন্দোলনকারীদের প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘যতক্ষণ তিনি প্রেসিডেন্ট, ততক্ষণ কেউ পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিরংকুশ অখণ্ডতার বিরুদ্ধে বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে পারবে না। কোন অরাজকতা তিনি বরদাশত করবেন না।’

ইয়াহিয়ার এ ঘোষণার বিরুদ্ধে ক্রোধে গোটা জাতি বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে শহরে নিরীহ ছাত্র-যুবক, শ্রমিক-জনতা দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সারাদেশে আধাবেলা হরতাল ও অসহযোগ আন্দোলনের ফলে ১ মার্চ থেকে টানা পঞ্চম দিনের মতো গোটা দেশ অচল হয়ে পড়ে। সারা পূর্ববাংলা তথা বাংলাদেশের প্রশাসন, রাজনীতি ও আন্দোলনরত বাঙালি চলতে থাকে বঙ্গবন্ধুর আদেশ-নির্দেশ ও পরামর্শে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় ইয়াহিয়া সরকার। রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র ও পাকিস্তান টিভির ঢাকা কেন্দ্রের সব বাঙালি শিল্পী, ঘোষক-ঘোষিকা, কলাকুশলী অনুষ্ঠান বর্জন শুরু করেন। কেন্দ্রীয় কারাগারেও প্রচণ্ড বিক্ষোভ দেখা দেয়। কারাবন্দি ছাত্র-যুবকের সঙ্গে কারারক্ষীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহত হন ৭ জন এবং গুলিবিদ্ধ হন আরও ৩০ জন। এর মধ্যে একজন পুলিশ সার্জেন্টসহ আহত হন ৭ কারারক্ষী। জেল অভ্যন্তরে ও বাইরে তুমুল সংঘর্ষের সময় কারাগারের ফটক ভেঙে ৩৪১ জন কারাবন্দি বের হয়ে এসে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। কারাবন্দিদের বেরিয়ে আসার খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা দেখা দেয় চারদিকে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে স্টেট ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংক আজকের দিনে বেলা আড়াইটা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত খোলা রাখা হয়। সরকারি কর্মচারীরা এ সময় বেতন তুলে নেন ও ব্যাংকও টাকা-পয়সা লেনদেন করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্বিচারে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ও স্বাধিকার আন্দোলনের সমর্থনে এদিন রাস্তায় নেমে আসেন শিক্ষাবিদ, শিল্পী, কবি-সাহিত্যিক ও নারী-পুরুষসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ।

ন্যাপ (মোজাফফর), ন্যাপ (ওয়ালী), পাকিস্তান ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টস, পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষক সমিতি, মহিলা সমিতি, শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলসহ অন্যান্য দল ও সংগঠনের নেতারা পৃথক বিবৃতিতে গণহত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সমর্থন জানান। জাতীয় লীগ নেতা অলি আহাদ স্বাধিকার আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ঘোষণা করার জন্য জনসভা থেকে শেখ মুজিবের প্রতি আহ্বান জানান। ওদিকে পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আওয়ামী লীগের ছয় দফার ব্যাপারে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করতে আগ্রহী। পূর্ববাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদিন মধ্যরাত পর্যন্ত দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা ও সমমনা বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে ৭ মার্চের জনসভার প্রস্তুতি এবং পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করে দিকনির্দেশনা দেন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আসম আবদুর রব, জিএস আবদুল কুদ্দুস মাখন এবং ছাত্রলীগ সভাপতি নুরে আলম সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ এক যুক্ত বিবৃতিতে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার জন্য দেশের ছাত্র-জনতার প্রতি আহ্বান জানান।

লেখাটি নেয়া হয়েছে দৈনিক যুগান্তরের এই লিংক থেকে 

মার্চ ১৯৭১ – আগুন ঝরা সেই দিনগুলো-২

২১০জন ২১০জন
0 Shares

৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

️️ 🍂️️ 💝 ️️ 🌟 🌺 💐 💥 🌻 🍄 🌹 💐 ⭐️ 🎉 🎊