মামাকে দেখতে যাওয়া- শেষ পর্ব

শামীম চৌধুরী ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, রবিবার, ১২:৫০:০০অপরাহ্ন ভ্রমণ ২১ মন্তব্য

আগের পর্বের লিঙ্ক-মামাকে দেখতে যাওয়া (পর্ব-২৯)

শেষ পর্ব-

বিকাল ৪:১০ মিনিটে আমরা ১ নাম্বার জোনের ভিতর প্রবেশ করলাম। দুই ধারে পাহাড়ের কোল ঘেঁষা পথ। চারিদিকে সবুজ গাছ-পালা ও গুল্ম-লতায় যেন বনটিকে সবুজ চাঁদরে ঢেকে রেখেছে। বনটিকে এক নজর দেখলে যে কোন প্রকৃতি প্রেমিক এই বনের প্রেমে পড়ে যাবে। আর নয়নাভিরাম সৌন্দর্য ঘেরা এই পথ ধরেই আমাদের ২০ জন পর্যটক নিয়ে কেন্টার কচ্ছপ গতিতে এগিয়ে চলছে। বনের ভিতর কখনই দ্রুত গতিতে গাড়ি চলে না। এর মূল কারন দুটি।
 
প্রথমতঃ পর্যটকদের দেখার সুবিধায় গাড়ির চালক ধীর গতিতে বনের রাস্তায় গাড়ি চালায়।
 
দ্বিতীয়তঃ রাস্তার দুই ধারে বন। কোন বণ্যপ্রাণী রাস্তা পারাপারের সময় যেন, কোন অনাকাংখিত দূর্ঘটনায় কবলিত না হয়। লক্ষ্য করলাম ভারত সরকারের বন বিভাগ বনের নিয়ম-কানুন ও প্রকৃতিতে বসবাসকারী সকল জীব-জন্তুর নিরাপত্তায় খুব সজাগ। এখানেও সারিস্কা টাইগার রিজার্ভ বনের মতন মাটিতে পা স্পর্শ করা যায় না। যা আমাদের দেশে বন বিভাগের লোকজনের উদাসীনতা ছাড়া কোন নিয়মাবলীই বাস্তবায়নে আগ্রহী নয়। সুন্দরবনেও একই অবস্থা দেখেছি । শুধুমাত্র তারা অপেক্ষায় থাকে পর্যটকদের কাছ থেকে কখন কোন বাহানায় অর্থ নেয়া যায়। অথচ এখানে বখশিস পর্যন্তও তারা নেয় না।
 
জোনের ভিতর প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে মাথায় একটা প্রশ্ন জাগলো। ভাবলাম সঞ্জিত কর্মকারের কাছ থেকে জেনে নেই সর্বশেষ কবে তার নজরে বাঘ পড়েছিলো। লক্ষ্য করলাম সতীর্থদের মনে “না পাওয়ার বেদনা” সকলের চেহারায় ফুঁটে উঠেছে। আমিও সে বেদনা থেকে দূরে নই। যাত্রাকালে অসংখ্য জিপসি জীপ ও কেন্টার নজরে পড়লো। তারা সবাই জোন শেষ করে ফিরছে বা অন্য জোনে যাচ্ছে।
কেন্টারে আমি সঞ্জিতের পাশেই বসা ছিলাম। জানতে চাইলাম কত বছর ধরে সঞ্জিত এই বনে চাকুরী করছে । জবাবে বললো, আড়াই বছর হয়ে গেল। প্রশ্ন করলাম, এই সময়ে রন্থাম্ভোর বনে কি কি জীব-জন্তুর দেখা পেয়েছে? জবাবে বললো, বাঘ প্রতি সাফারীতেই তার সঙ্গে পর্যটকরা দেখেছে। তাছাড়া এপ্রিল মে মাসে বাঘিনীকে বাচ্চা সহ দেখেছে। চিতা বাঘের দেখা পেয়েছে বেশ কয়েকবার। আঙ্গুল দিয়ে একটা পাহাড়ের উপর গাছ দেখিয়ে বললো ঐ গাছে চিতা বেশী থাকে। গাছটাও লক্ষ্য করলাম বেশ উঁচু। আর চিতা বাঘের স্বভাব হচ্ছে উঁচু জায়গায় অবস্থান করবে।
তার মূল কারন দুটি।
 
চিতাবাঘ বেঙ্গল টাইগারের চেয়ে শিকারে বেশী পারদর্শী এবং সামনা সামনি শিকার পছন্দ করে। তাই উঁচু গাছে বসে শিকার ধরতে সুবিধে হয়। আর বাঘের দেহের মতন গড়ন নয় বলে খুব দ্রুত গতিতে দৌড়েতে পারে। এক লাফে গাছে উঠতে পারে।
 
আরেকটি কারন হলো চিতাবাঘের শিকার করা মড়ি কখনই সে মাটিতে রাখে না। দলগত ভাবে যদি শিকার করে তবে জন্তুর দেহ টুকরো টুকরো করে নিজেদের মাঝে ভাগ করে নেয়। আর সেটা অধিকাংশ সময়ে গাছেই খায়। আর একক ভাবে শিকার করলে তখন ছোট প্রানী শিকার করে। বাঘের মতন একা কোন বড় প্রানী শিকার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। তাই তাদের উঁচু গাছ পছন্দের। পাঠক বন্ধুরা অন্য কোন সময়ে চিতাবাঘ নিয়ে লিখব। তখন চিতাবাঘ সম্পর্কে সবাইতে সম্যক ধারনা দেয়া যাবে।
 
সাহস করে সঞ্জিতের কাছে জানতে চাইলাম। শেষ কবে এই বনে বাঘের দেখা পেয়েছে। প্রশ্নটা শুনে সঞ্জিত বুঝতে পারলো আমার মনের অবস্থা। বেশ কিছুক্ষন সময় সে চুপ রইলো। আমি তার কাছে আবারও জানতে চাইলাম। এবার সে নিজ থেকেই বললো। সাহেব,সত্যি বললে তোমার মন খারাপ হবে। মিথ্যা বললে তোমার সঙ্গে প্রতারনা করা হবে। সঞ্জিতের এহেন কথায় আমি যা বুঝার বুঝে গেলাম। ফিরতি প্রশ্ন করার আর কোন ইচ্ছা হলো না। নিজের থেকেই সঞ্জিত বললো, গত এক সপ্তাহ যাবত সে এই দুই জোনে বাঘের দেখা পায় নাই। তবে ৩ ও ৪ নাম্বার জোনে গতকালও বাঘ দেখেছে। যদিও আজ আমরা ৩ ও ৪ নাম্বারে সাফারী করবো না। সেই জোনে সাফারী হবে আগামীকাল ভোর ৬:৩০ থেকে সকাল ১০:৩০ পর্যন্ত।
 
স্থানীয় বন কর্মী বা রক্ষীরা গত ১ সপ্তাহে জোনের কোথাও কোন বাঘের দেখা পায় নাই। পাঠক বন্ধুরা এবার বুঝতে পারছেন আমার মনের অবস্থা সেই সময় কেমন ছিল? আমি এমন কথা শোনার পর ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মুর্ষে পড়লাম। ভাবছিলাম হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে রন্থাম্ভোর বনে আসলাম শুধু বাঘের জন্য। তবে কি বিদেশেও আমার ভাগ্যসুপ্রসন্ন নয়?
 
সঞ্জিতের সঙ্গে আমার কথপোকথন সতীর্থদের কিছুই বললাম না। তাদের মাঝে লক্ষ্য করলাম সবাই উত্তেজিত হয়ে আছে। আর উত্তেজনা বাড়ার কারনও আছে। রন্থাম্ভোর ন্যাশনাল পার্ক বাঘের জন্য খ্যাত। ৩১৩৫০ বর্গকিলোমিটার বনে ৭৬টি বাঘ আছে। সুতারাং খুব সহসাই সাফারীতে বাঘ নজরে পড়ে। এই তথ্যগুলি জেনেই রন্থাম্ভোর যাত্রার প্ল্যান করেছিলাম। ইউটিউবে এমনও দেখেছি এই বনে বাঘ মেঠো পথে জিপসী জিপের আগে আগে হাঁটছে। ফটোগ্রাফাররা ভিডিও পর্যন্ত করেছে। তাই এবারের সফর রন্থাম্ভোর বেঁছে নেবার মূল কারন ছিল।
 
আমি সব সময় বলে থাকি ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফী ভাগ্য। ভাগ্য সুপ্রসন্ন না হলে কিছুই করা সম্ভব নয় এই জগতে। তাই ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়ে মন খারাপ করে বসে ছিলাম। আমার ছেলে ছাড়া সবারই মনে একই জিজ্ঞাসা ছিল। বাঘের ছবি তুলতে পারবো তো? ডঃ আমিনুর রহমান ভাইকে কানে কানে বললাম গত এক সপ্তাহে এই জোনে বাঘের দেখা মিলে নাই। শুনেই তিনি হতাশ হয়ে গেলেন।
বললেন বলেন কি?
কে বলেছে?
তিনি বললেন,ভারতের বাঘ অধ্যুষিত এলাকার মধ্যে এই বনে সবচেয়ে বেশী বাঘ। যদি এমনটাই হয় তবে বিফলে ফেরত যেতে হবে। ভাগ্যকে মেনে নিতে হবে। আমি তাঁকে বললাম সতীর্থদের সঙ্গে শেয়ার করবো কিনা?
তিনি বললেন দরকার নেই। সামনে কি ঘটে তার জন্য অপেক্ষা করি।
 
বিকাল ৫:৩০মিনিট বেঁজে গেছে। আমাদের হাতে মাত্র ১ ঘন্টা সময় আছে। তাই সঞ্জিতকে বললাম এই জোনের শেষে যেতে আর কতক্ষন সময় নিবে। সে বললো ৩০ মিনিট লাগবে। জোনের শেষে বিশাল একটা হ্রদ। আর সামনে যাবার কোন সুুযোগ নেই। আমার কথাবার্তা ও চেহারায় চিন্তার ছাপ দেখে সঞ্জিত ঠিকই আঁচ করতে পারছে কোথায় আমার কষ্ট।
আমি সঞ্জিতের কাছ থেকে সরে আসলাম। আমার সতীর্থদের
কাছে বসলাম। জোনের শেষ প্রান্তে যাবার আগে উল্টো দিক থেকে আসা একটি জিপসী জিপ বিদেশীদের নিয়ে ফিরছে। জিপের চালক আমাদের কেন্টারের চালকের সামনে দাঁড়াল। সঞ্জিতের সঙ্গে কথা বললো। আমাকে ইশারায় তার কাছে যাবার ইঙ্গিত দিল। আমি যাবার পর শুনতে পেলাম বনের শেষ ভাগে তারা বাঘ দেখেছে। এমন সময় আরেকটি কেন্টার দাঁড়ালো।
তারাও বললো “আগে শের হ্যায়”
দুই দলের কাছ থেকে এমনটি শুনে আনন্দে আত্মহারা হলাম। নির্বাক হয়ে বিধাতাকে স্মরন করলাম। সতীর্থদের বললাম এই দুই গাড়ির পর্যটকরা সামনে বাঘের দেখা পেয়েছে। শুনার পর তাঁদের উত্তেজনা বেড়ে গেল। ব্যাতিক্রম শুধু ছিল আমার ছেলে। তার মধ্যে বাঘ দেখা না দেখার কোন ক্রিয়াই ছিল না। আর এটাই স্বাভাবিক। কারন সে ফটোগ্রাফার নয়। আমার সঙ্গে পর্যটক হয়ে ঘুরছে।
 
 
 
তারপরও সবার মাঝে একটা মনঃকষ্ট দেখলাম। জানতে চাইলাম তাদের মন খারাপ কেন? সবাই বললো যদি যেয়ে বাঘের দেখা না পায়। সেখানে যেতেআরো ত্রিশ মিনিট সময় লাগবে। এরই মধ্যে যদি বাঘ বনের ভিতর চলে যায়। এমন অনেক প্রশ্নই তাদের মাথায় কাজ করছিলো। তাদের কথা শুনে বললাম। আমরা বাঘের দেখা পাবো ও ছবিও তুলবো। কারন বাঘ রাতের খাবারের পর দিনের বেলায় বের হয়ে । সারাদিন সে ঘুমায়। ঘুমিয়ে খাবার হজম করে। পরে গভীর রাতে আবার মড়ির কাছে ফিরে যায়। যেহেতু বাঘের দেখা মিলেছে সুতারাং বাঘ আমরা দেখবোই। বাঘ সম্পর্কে যত লেখা-পড়া করেছি তাতে এমনটাই হবে বলে তাদের আশ্বস্ত করলাম। তারা আমার কথা বিশ্বাস করলো। চেহারায় হাসির রেখা ফুটে উঠলো। তাদের খুশীতে আামিও খুশী হলাম।
 
সঞ্জিত কর্মকার কেন্টারের চালককে বললো একটু গতি বাড়িয়ে যেন হ্রদের ধারে যায়। গাড়ির চাল ধর্মবল্লব সিং দ্রুত গতিতে গাড়ি হাঁকিয়ে চললো। ১৫ মিনিটের ব্যাবধানে আরো দুই কেন্টারের গাইডরাও বললো যে, এখনও সেখানে বাঘ আছে। আমি আমার সতীর্থদের বলেছিলাম বাঘ সেখানে আরো কয়েক ঘন্টা থাকবে। কারন খাবার খেয়ে বিশ্রামে আছে। প্রায় কুঁড়ি মিনিটের ব্যাবধানে যখন সর্বশেষ কেন্টারের লোকজন বললো তারাও বাঘ দেখেছে তখন ধরে নিতে পারি তারা ফেরত আসা ও বাঘ দেখা পর্যন্ত ৪০ মিনিট সময় অতিবাহিত হয়েছে। শিকারভুক্ত বাঘ না হলে ৪০ সেকেন্ড থাকার কথা নয়। বাঘ সম্পর্কে আমি যতটুকু জেনেছি ও পড়েছে তার সত্যতা আজ প্রমান হবে।
 
সতীর্থদের মনের অবস্থা এমন হলো যে, পারে তো উড়ে চলে যায়। আমারও উত্তেজনা কম ছিল না। জীবনের প্রথম বনে ওয়াইল্ড বাঘ দেখবো। বাঘের ছবি তুলবো। এ আনন্দ আমি পাঠকদের বলে বুঝাতে পারবো না। ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফীর এক অনন্য স্বাদ ও দূস্প্রাপ্য সংগ্রহ হলো বনের বাঘ,সিংহ,হাতি,ভল্লুক ও বণ্য শুকুরের ছবি তোলা। আমাদের দেশে হাতে গুনা কয়েকজন ফটোগ্রাফার সুন্দরবন থেকে বাঘের ছবি তুলতে পেরেছেন। যদি এই বনে বাঘের দেখা পাই ও ছবি তুলতে পারি তবে আমার ১৬ বছরের ফটোগ্রাফী জীবনে এটাই হবে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ও সংগ্রহ। সব সময়ে বাঘ অধ্যুষিত বনে গেলে বিধাতার কাছে কায়োমনোবাক্যে একটি প্রার্থনা করতাম যেন বাঘের দেখা পাই। ফটোগ্রাফী জীবনে একেকটি ছবি আমার একেকটি গল্প। আর বাঘের ছবি তুলতে পারলে সেটাও হবে ক্যামেরা পিছনের গল্প।
 
ভারত সফরের সময় আমার ছেলেকে ক্যানন ৭ডি ক্যামেরা ও ৫৫-২৫০মি.মিঃ লেন্স দিয়েছিলাম। কারন আমরা সবাই ছবি তুলবো। যদিও সে কোনদিন বনের কোন পাখি বা জানোয়ারের ছবি তুলে নাই। তারপরও ক্যামেরা হাতে থাকলে নাড়াচড়া করতে পারলে বিরক্ত বা একঘেঁয়েমি বোধ করবে না। যাত্রার প্রাক্কালে কি করে ফোকাস করতে হয় শিখিয়েছিলাম। সারিস্কা ও ভরতপুরে যত ছবি তুলেছে তা একেবারে ফোকাস বিহীন ছিল না। কিছু কিছু ছবিতে এমন ফোকাস হয়েছে আমি দেখে অবাক হয়েছিলাম। তার ডেপথ অব ফিল্ড বা ডফ সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই। তাই বাঘের ছবি তোলার জন্য ক্যামেরার সেটিংসটা নিজেই করে দিলাম। সতীর্থদের বললাম যেহেতু বাঘ বড় প্রানী তাই ডফ বেশী লাগবে। নইলে ফোকাসিং এরিয়া পরিস্কার হবে বাকি দেহ ব্লার হয়ে যাবে। সবাইকে সেটিংসটা বলে দিলাম।
 
ঘড়ির কাঁটায় তখন সন্ধ্যা ৬:১০ মিনিট। আমরা হ্রদের ধারে পৌছালাম। দূর থেকে লক্ষ্য করলাম আরো অন্তত ২০টি কেন্টার ও জিপসী দাঁড়িয়ে আছে। পরিবেশ দেখে বুঝতে কষ্ট হলো না যে বাঘ সেখানে আছে। আগের থেকে অপেক্ষমান কেন্টারের পর্যটকদের ডাঃ নাজমুল ভাই জিজ্ঞাসা করলেন বাঘ দেখেছেন কিনা? তারা মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিলেন। তখনও আমরা বাঘ দেখিনি। তারপরও সঙ্গীদের চেহারা খুশীতে চাকচিক্য হয়ে উঠে। সবার মনের ভিতর তখন আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছিল। আমি পাঠক বন্ধুদের সেই আনন্দঘন মূহুর্তের বর্ননা লেখায় বুঝাতে পারবো না। আমাকে ক্ষমা করবেন।
বিদেশী পর্যটক। আমাদের সঙ্গে বাঘ দেখার আনন্দ উপভোগ করছে।
 
যে জায়গায় এসে আমাদের গাড়ি দাঁড়ালো তার একটু বর্ননা দিলে পাঠকদের বুঝতে সুবিধা হবে যে, আমাদের কাছ থেকে মামা কতটুকু দূরে ছিল। বনের ভিতরের মেঠোপথ শেষ। যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি তার সামনে বিশাল হ্রদ। আর এই হ্রদটাই বনকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। আমাদের বাঁ দিকে হ্রদ থেকে একটা খরা-স্রোতের সরু ক্যানেল বয়ে গেছে। আমরা ক্যানেলের এপারে। ক্যানেলটার প্রস্থ হবে প্রায় ৮০-৯০ফুট। ওপারে সোনালী ছনে ঢাকা মাঠ। মাঠের পিছনে ঘন বন। ঘন বনের সামনের সোনালী ছনে “মামা” বসে আছে। আমাদের থেকে মামার প্রায় ২০০ফুট।
 
গাইড সঞ্জিত কর্মকার কেন্টার আমাদের সুবিধা মতন এমন জায়গায় দাঁড় করালো যেন, আমরা সরাসরি মামাকে দেখতে পাই। সঞ্জিতের কৌশল দেখে অভিভুত হয়ে গেলাম। তারচেয়ে বেশী অভিভূত হলাম জীবনের প্রথম কোন বনের ভিতর বাঘের দেখা পেযে। এই প্রথম বাঘ দেখার অনুভূতির প্রকাশটি পাঠক বন্ধুদের লেখায় বুঝাতে পারবো না। শুধুমাত্র শখ মিটানোর জন্য হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে বাঘের দর্শন পাওয়া নয়। বাঘ সম্পর্কে এতদিন যা পড়েছি ও জেনেছি তার সবই আজ বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে ভেবে আপ্লুত হয়ে নিজের অজান্তেই চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।
 
আমরা দেখলাম, মামা সবুজ ঘাসের মাঠে মাথাটা যত সামান্য উঁচু করে আয়েশে বসে আছে। বাঘের এমন আয়েশী দৃশ্য দেখে বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, খাবার শেষে বিশ্রামে আছে। বিশ্বাস করুন, আমি নিজেই উত্তেজনায় প্রায় মিনিট খানিক স্থবির ছিলাম। কারো সঙ্গে কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছিলাম। চারিদিকে পর্যটকদের “টাইগার টাইগার” শব্দে গোটা এলাকা মুখরিত ছিলো।‍ বেঙ্গল টাইগারের রূপ ও বর্ণনা শুধুমাত্র ছবি ও বইয়ে পড়েছি। আজ নিজের চোখে দেখে বর্ননা ও ছবির সত্যতা পেলাম।। আমার ৫৯ বছরের জীবনে এটা ছিল এক অনাবিল সুখ-শান্তি ও বড় প্রাপ্তি। নিজেকে সফল মনে হচ্ছিলো একজন ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার ভেবে। কোটি টাকা প্রাপ্তির সুখের চেয়েও অনেক বড় সুখ ছিল বনের বাঘ দেখা।
 
আমার বিশ্বাস ছিল বাঘটির দেখা পাবোই। কারন বাঘ অলস প্রানী। ক্ষুধার সময় শিকার ধরে। সেই শিকার সপ্তাহের অধিক সময় ধরে ভক্ষন করে। পেট পুরে খাবার খেতে পারলে অন্ততঃ তিন মাস শিকার থেকে বিরত থাকে। সেই সময়ে শুধু ঘুম ও তার নির্ধারিত এলাকায় অন্য পশুরা যেন আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে তার মহড়া দেয়া ছাড়া অন্য কাজে ব্যাস্ত হয় না। পৃথিবীতে বাঘের মতন অলস প্রাণী আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিশ্বে যত ধরনের বাঘ আছে তার মধ্যে আমাদের সুন্দরবন ও ভারতের বেঙ্গল টাইগার সবচেয়ে সুন্দর, দীর্ঘাদেহী ও শিকারে পারদর্শী। পৃথিবীর কোথাও এই বেঙ্গল টাইগারের দেখা পাওয়া যাবে না।
 
বাঘটি প্রায় তিন ফুট উচ্চতা হবে। দৈর্ঘ্য হবে‍ আনুমানিক আট ফুট। দেখে বুঝতে পারলাম পূর্ন বয়স্কের একটি বাঘ। মুখের গড়ন ও গায়ের ডোরা কাটা দাগ যে কোন দর্শনার্থীকে আকর্ষন করার মতন। চোখ দুটি আগুনের মতন জ্বল জ্বল করছিলো। মাঝে মাঝে চিৎ হয়ে শুয়ে গড়াগড়ি করছিলো। ছবি দেখে পাঠক বন্ধুরা বুঝতে পারবেন কেমন রাজকীয় আয়েশী ভঙ্গিমায় বিশ্রাম করছিলো। নিজেকে সামলে নিয়ে শাটার চাপা শুরু করলাম। প্রায় দেড় জিবি বা ৩০০ ছবি তুলার পরও মনের শখ পূরন হচ্ছিলো না। আমরা সবাই বিভিন্ন ভঙ্গিমায় মামার ছবি তুললাম। ছেলেও আমার দেয়া সেটিংসে তার মতন করে ছবি তুললো। সবার চেহারায় ও মনে যে আনন্দের বন্যা বয়ে যেতে দেখালাম তাতে মনে হলো আমরা আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়েছি। বিধাতার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মামা থেকে যখন বিদায় নিলাম তখন সময় ৬:৩০ মিনিট। আমাদেরও সাফারীর সময়ের শেষ ঘন্টা বেঁজে গেছে। চিরাচরিত সেই প্রবাদ বাক্যটি মনে পড়লো।
“সব ভালো তার
শেষ ভালো যার”।
আমাদের শেষটা সফল হওয়ায় সবাই আপ্লুত হলাম। এখন বন ছেঁড়ে হোটেলে ফেরার সময় হলো।
ক্যামেরা থেকে স্কীন শট নেয়া। কেউ যদি চ্যালেঞ্জ করে বন থেকে ক্যামেরায় ছবি তোলা হয়নি তার প্রমান স্বরূপ বণ্যপ্রাণী ফটোগ্রাফারদের এমন স্কীন শট রাখতে হয়।
স্বপ্নের বাঘ। যার জন্য আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিলো দীর্ঘ ১৬টি বছর। আজ স্বপ্ন হলো পূরন।
বেঙ্গল টাইগার।
এমন আয়েশী ভঙ্গিমায় প্রমান করে মামা খাবার শেষে রাজকীয় বিশ্রামে ছিলো। আমার জানার
সত্যতা প্রমান হলো।
ছবিটি আমার সফর সঙ্গী নাজিমের তোলা। তার অনুরোধে ছবিটি ব্লগের পাঠকদের কাছে শেয়ার করলাম।
ছবিটি আমার ছেলের তোলা।
আমার জন্য যা ছিলো ১৬ বছরের প্রতিক্ষা। ছেলের শুরুই হলো বাঘের ছবি দিয়ে। এখানেও আমি গর্বিত পিতা।
 
বাঘের ছবি তুলে মনে হলো বিশ্ব জয় করলাম। আনন্দে ও হাসি-খুশীতে কেন্টারে বাঘ নিয়েই আমরা গল্পে মত্ত ছিলাম। আমার ধারনা সত্য প্রমানিত হওয়ায় সবাই আমাকে জড়িয়ে ধরলো। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো। তাদের এমন ভালোবাসায় আমি মুর্ছে গেলাম। সঞ্জিত কর্মকারেরও সাত দিন পর বাঘ দেখার রেকর্ড ভাঙ্গলো। । তাঁর ভিতরও লক্ষ্য করলাম আনন্দ বন্যা। সঞ্জিতকে ধন্যবাদ দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশে আমরা হোটেলে প্রবেশ করলাম।
 
হোটেলে প্রবেশের পর সবাই ক্যামেরার “র” ফাইল কপি করে ফেসবুকে কে কত আগে পোষ্ট দেবে তার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়লো। আমি তাদের এমন কর্ম-কান্ডে খুব আনন্দ পেলাম। ভাবলাম আজ যদি মামার দেখা না হতো তবে এই আনন্দের পরিবর্তে সবাই নিরানন্দনে হোটেলের রুমে মুষড়ে পড়তো। সতীর্থদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে আমিও তাদের সঙ্গে মিশে গেলাম।
 
পরদিন ভোর ৬:৩০ মিনিট হতে সকাল ১০:৩০ মিনিট পর্যন্ত আমাদের ৩ ও ৪ নাম্বার জোনে সাফারী। ‍আজকে বাঘের দেখা ও ছবি তুলতে পারায় সবাই সিদ্ধান্ত নিলো আগামীকাল সাফারী করবে না। সকলের সঙ্গে আমিও একমত হলাম। আমাদের ট্যুর অপারেটর সুজিতকে সকলের সিদ্ধান্ত জানালাম। সুজিত জানালো, যদি সাফারী না করি তবে শুধুমাত্র টিকিটের টাকা সেফ হবে। বনের অনুমতির টাকা ও ভাড়া করা জিপসী জিপের টাকা দিতে হবে। কারন সেগুলি আগেই পরিশোধ করেছেন হোটেলের ম্যানেজার। তাতে আমাদের খুব অল্প পরিমানের টাকা সাশ্রয় হবে। আমরা বাধ্য হয়ে পরের দিনের সাফারীর জন্য রাজি হতে হলো। রাতে খাবার খেয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম।
 
ভোর ৫টায় হোটেল বয় আমাদের ঘুম থেকে ডেকে তুললো। ভোর ৬টার মধ্যে জিপসী হোটেলের সামনে থাকবে। তাই সবাইকে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে তৈরী হতে বলে গেল। আমরা নিজ নিজ কাজ শেষ করে তৈরী হলাম। ৫:৪৫ মিনিটে হোটেলের সামনে জিপ গাড়ী চলে আসলো। আমাদের নিয়ে জিপসি বনের দিকে রওনা হলো। আজকে আমাদের গাইড হিমাংশু উপাধ্যয়া। গুজরাটের লোক। হিন্দি ছাড়া কিছুই বলতে পারে না। ইংরেজী ভাঙ্গা ভাঙ্গা বলতে পারে।
 
আমরা হিমাংশুকে বললাম লেপার্ড বা চিতাবাঘ দেখা যাবে কিনা। এখন আমাদের কারো মাঝেই বাঘ দেখার আর নেশা নেই। হা হা হা…। হিমাংশু জানালো এই জোনে চিতাবাঘ নেই। চিতাবাঘের জোনে গতকাল আমরা সাফারী করেছি। মূলতঃ ভোরে চিতার দেখা নাকি পাওয়া যায়। তাই চিতাবাঘের আশা ছেড়ে দিলাম।
গাড়ির চালক নিজের মনে চলছে। প্রচন্ড শীতে আমার হাত নাক বরফের মতন জমে যাচ্ছিলো। বনের ভিতর শীত মৌসুমে তাপমাত্রা ৪-৫ ডিগ্রী থাকে। সুতারাং বুঝতেই পারছেন আমার অবস্থা কেমন ছিলো। নাকের উপর মাস্ক লাগিয়ে কোন ভাবে ঠান্ডা থেকে বাঁচার বিকল্প ব্যাবস্থা করলাম। কাঠের পুতুলের মতন বসে রইলাম।
 
৩ নাম্বার জোনের মাঝামাঝি আসার পর অন্য গাড়ির গাইড বললো ৪ নাম্বারে বাঘ দেখা গেছে। আমরা হিমাংশুকে বললাম ৪ নাম্বারে যেতে। হিমাংশু আমাদের চাহিদানুযায়ী গাড়ির চালককে ৪ নাম্বারে যেতে বললো। সেখানে পৌছার পর দেখলাম কম করে হলেও ২০টি কেন্টার ও জীপ দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের গাড়ি দাঁড়ালো। হিমাংশু তার সতীর্থদের কাছ থেকে বাঘের অবস্থান জেনে নিলো। আমাদের ইশারায় দেখালো বাঘের অবস্থান। আমরা যেখানে ছিলাম তার পাশেই ছিল একটা পুরাতন একতলা দালান। আমি হিমাংশুকে বললাম এত মানুষের ভীড়ে ছবি তুলা যাবে না। তুমি কি আমাদের অনুমতি দিবে এই দালানের ছাদের উপর যেতে। হিমাংশু কিছুক্ষন চুপ থেকে বললো-
“ম্যারে সাত চলিয়ে”।
 
আমরা ছাদে উঠে পরিস্কার বাঘ দেখতে পেলাম। এই মামাও শিকার করে আয়েশী মুডে বসে আছে। তবে প্রথম দিনের থেকে মামা বেশ দূরে। আমাদের থেকে প্রায় ৫০০ ফুট দূরত্বে হবে। আমরা সবাই দ্বিতীয় বারের মতন মামার ছবি তুললাম। এ যেন ছিল মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। বা বাড়তি বোনাস।
উপরের ছবি দুটি রন্থাম্ভোর বনের ৪ নাম্বার জোন থেকে তোলা।
বাঘের ছবি তোলার পর কখন যে সময় পার হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। আমাদের ফেরার সময় হলো। হোটেল মুখে গাড়ি চলতে শুরু করলে। পথে বেশ কিছু বন্যপ্রানীর ছবি তুললাম। বন থেকে বের হবার সময় Painted Fowl বা চিত্রিত বনমুরগী ও Rofous Treepie বা খয়রা হাঁড়িচাচার
দেখা পেলাম। সবাই চিত্রিত বনমুরগী ও হাঁড়িচাচার ছবি তুললাম। যেহেতু আমি জীবনের প্রথম এই বনমুরগীর দেখা পেলাম তাই আমার পাঠক বন্ধুদের দেখার জন্য ছবিটি শেয়ার করলাম।
Painted Fowl বা চিত্রিত বনমুরগী।
Rofous Treepie বা খয়রা হাঁড়িচাচা।
আমরা সকাল ১১টায় হোটেলে প্রবেশ করলাম। স্নান শেষ করে সকালের নাস্তা সেরে বেলা ১২:০০টায় তাজমহল দেখার উদ্দেশ্যে আগ্রার পথে যাত্রা করলাম।
 
পাঠক বন্ধুরা, আগ্রার তাজমহল সম্পর্কে কারো অজানা নেই। তাজমহল নিয়ে কিছু লিখতে চাচ্ছি না। তাই রন্থাম্ভোরেই
“মামাকে দেখতে যাওয়া” শিরোনামের ভ্রমন গল্পটির ইতি টানতে চাচ্ছি।
 
আবারো সেই প্রবাদ বাক্যটি টানছি-
“সব ভাল তার
শেষ ভাল যার”।
 
সারিস্কা দিয়ে শুরুটা ভাল না হলেও রন্থাম্ভোর দিয়ে শেষটা ভাল হওয়ায় আমরা ধন্য। আমরা কৃতজ্ঞ সৃষ্টিকর্তার কাছে। তিনি যদি আমাদের ভাগ্যসুপ্র্রসন্ন না করে দিতেন তবে পর পর দুই দিন মামার দেখা পেতাম না।
তাই আবারো বলছি বন্যপ্রানী ফটোগ্রাফী ভাগ্যের উপর নির্ভরশীল।
লকডাউন শুরু না হলে এপ্রিল মাসে আমার কেনিয়ায় যাবার সব বন্দোবস্ত ছিল। কিন্তু এখানেও ভাগ্যসুপ্রসন্ন না হওয়ায় বৈশ্বিক করোনা থমকে দিল।
 
পরবতীতে কোথাও ছবির জন্য ভ্রমনে গেলে নতুন জায়গা ও নতুন নতুন পশু-পাখি নিয়ে আবারও আপনাদের সামনে হাজির হবো। এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে এখানেই ভ্রমন কাহিনীটি শেষ করলাম।
 
সেই পর্যন্ত আপনারা সবাই ভাল থাকুন।
প্রকৃতির সঙ্গে থাকুন।
প্রকৃতিকে ভালোবাসুন।
প্রকৃতিতে বসবাসকারী পশু-পাখিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলুন।
দেখবেন, ওরাও ভাল থাকবে আর আপনিও মনের ভিতর খুঁজে পাবেন প্রচুর প্রশান্তি।
সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।
(শেষ)

 

১৪২জন ২০জন
0 Shares

২১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য