মামাকে দেখতে যাওয়া পর্ব (৭)

শামীম চৌধুরী ২৯ মে ২০২০, শুক্রবার, ০১:০৪:৩৭পূর্বাহ্ন ভ্রমণ ২৪ মন্তব্য
ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সারিস্কা টাইগার রিজার্ভ ফরেষ্ট থেকে যখন জয়পুর শহরে আসছি তখন ভাবছি শুধুমাত্র বাঘের ছবি তুলতে না পারায় এত মন খারাপ কেন? জীবনে বেঁচে থাকলে বাঘের ছবি একদিন না একদিন তোলা হবেই হবে। আসলে প্রাপ্তির বঞ্চিত থেকে মনকে সান্তনা দেবার প্রয়াস মাত্র। আমার ভ্রমন সঙ্গীরাও হতাশায় চুপ করে বসে আছে।
 
রাত্রি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশার চাদরে ডেকে গেল আলওয়াল শহরের রাস্তা। দুই লেন রাস্তার উভয় পাশে দাঁড়িয়ে আছে লাইটপোষ্ট। ফিঁকে আলো ছড়াচ্ছে রাস্তার উপর। লাইটপোষ্টের আলোর ঝলাকনিতে মনে হলো আমার সঙ্গে মুচকি হেঁসে মশকরা করছে। এমনিতে না পাওয়ার বেদনা। অপরদিকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বসে বসে রাতের দৃশ্য বলতে লাইটপোষ্টের সঙ্গে মিতালী ছাড়া আর কোন উপায় নেই। ৭ই ফেব্রুয়ারী থেকে ৮ই ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত টানা ভ্রমনের ক্লান্তি ভাল করেই শরীরকে চেপে ধরেছে। দেহের শক্তি কমে যাচ্ছে। দুই চোখে নিদ্রার নেশা ভর করেছে। এমনটি ভাবতে ভাবতে কখন যে গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছি বলতে পারবো না। হঠাৎ কানে শব্দ ভেসে উঠলো আমার ছেলের। বললো বাবা আমরা জয়পুর হোটেলে চলে এসেছি। নামতে হবে। আগে থেকেই আমাদের জন্য হোটেল ঠিক করা ছিলো। হোটেলে যখন প্রবেশ করি তখন রাত ১০টা। হোটেলের আনুষাঙ্গিকতা শেষ করে নিজ নিজ রুমে চলে গেলাম।
হোটেল হ্যারিটেজ হ্যাভেলী
রাতে গরম পানিতে গোসল সেরে নেওয়ার পর মনে একটা ফুরফুরা আমেজ চলে আসলো। সবাই এক সঙ্গে হোটেলের ক্যাফেটরীয়াতে রাতের খাবার সেরে নিলাম। খাবার টেবিলে আলাপ চলছিলো আমরা রুমে যেয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবো সারিস্কার প্রাপ্তি নিয়ে।
কিন্তু রুমে এসে বিছানায় গা ঢলে দেবার পর গল্পের নেশাটা কেটে গেল। ছেলে সহ আমি রুমের দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকাল ১০টায় ঘুম থেকে উঠে দেখি সবাই ঘুমাচ্ছেন। ৯ই ফেব্রুয়ারী যেহেতু আমাদের কোন তাড়া ছিলো না ছবি তোলার। তাই ভোরে ঘুম থেকে উঠারও কোন তাড়া নেই। যার যার মতন ঘুম থেকে উঠে সকাল ১১ টায় নাস্তা সেরে নিলাম। নাস্তায় ছিলো আলু পরেটা,পনির মাসাল্লাম, সব্জি আর সালাদ। সঙ্গে এলাচ ও আদার দুধ চা।
রাতের খাবার
সকালের নাস্তা।
দুপুর ১২টায় আমরা রওনা হলাম রাজস্থানের আরেকটি জেলা ভরতপুরে। ভরতপুর সম্পর্কে পাঠকদের একটু ধারনা দেয়া দরকার।
ভরতপুর জেলা পশ্চিম ভারতের রাজস্থান রাজ্যের একটি জেলা, এছাড়াও এটি জাট রাজ্য নামেও পরিচিত। ভরতপুর নগর হল জেলাটির সদর ও বিভাগীয় সদর দপ্তর। ভরতপুর জেলা ভারতের জাতীয় রাজধানী অঞ্চলের অংশ। যখন ভারতপুর একটি দেশীয় রাজ্য ছিল, তখন এটি ছিল একমাত্র রাজনৈতিক সংস্থা, যার চার্টের রঙের পতাকা ছিল। প্রথম ব্যক্তি হিসাবে রাজ্য বোর্ডের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি এবং জেলাটি থেকে প্রথম আইএএস কর্মকর্তা ছিলেন উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারের ১৯৮৫ ব্যাচের দীপক ত্রিবেদী।

জেলার মোট আয়োতন ৫,০৬৬ বর্গ কিমি। সীমানা: উত্তরে হরিয়ানার এনইউএল জেলা, পূর্বে উত্তরপ্রদেশের মথুরা ও আগ্রা জেলা, দক্ষিণে ধৌলপুর জেলা, দক্ষিণ-পশ্চিমে কারৌলি, পশ্চিমে দৌসা এবং উত্তর-পশ্চিমে আলওয়ার জেলা।

তিনটি নদী, বন গঙ্গা, রূপারেল ও গম্ভীর জেলার পার্শ্ববর্তী। জয়পুর জেলায় বন গঙ্গা উৎপন্ন হয়ে উত্তরাঞ্চলীয় যমুনা নদীতে মিলিত হয় দাউসা ও ভারতপুর জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে। গাম্ভীরা নদী কারাউলী জেলার পচানা বাঁধ থেকে শুরু হয় এবং বায়ানা তহসিলের বন গঙ্গার সাথে মিলিত হয়। রূপারেল নদী আলয়ার জেলার পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে ভরতপুর জেলার কামান তহসিলের প্রবেশ করে।

ভারতপুর জেলার দশটি রাজস্ব উপবিভাগ এবং ১১ টি তেহসিল রয়েছে। ৯ টি রাজস্ব উপবিভাগ ও তেহসিলের নাম ও সীমানা একই রয়েছে, তবে কেবলমাত্র উইর উপবিভাগটি উইর তহসিল ও ভূসওয়ার তহসিলে বিভক্ত। অন্যান্য দশটি তেহসিলগুলি হল: বায়ানা, ভরতপুর, দেগ, কামান, কুমার, নাদবাই, নগর, পাহাড়ী, উচচেন এবং রূপওয়াস (রূপবাস)।

ভারত সরকার গঠনের পূর্বে ভরতপুর এক সময় রাজাদের নিয়ন্ত্রনে ছিলো। পর্যায়ক্রমে রাজাদের নাম ও মেয়াদকাল দেয়া হল।

মহারাজা সূর্য মাল (ফেব্রুয়ারি ১৭০৭ – ২৫ ডিসেম্বর ১৭৬৩) ভারতপুরের জাট শাসক ছিলেন।
আচার্য রাজেন্দ্রাসুরি (১৮২৬-১৯০৫), জৈন সংস্কারক জন্মতপুরে জন্মগ্রহণ করেন।
নাটওয়ার সিং (জন্ম ১৯৩১), প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
জগন্নাথ পাহাড়ীয়া (জন্ম ১৯৩২), রাজস্থানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও হরিয়ানার সাবেক গভর্নর।

এই হল ভরতপুরের মোটামোটি ইতিহসা। আমরা ভরতপুরের কিওলাদিও ন্যাশনাল পার্কে যাচ্ছি । এশিয়া মহাদেশে সবচেয়ে বড় পাখির অভয়ারণ্য হল এই কিওলাদিও ন্যাশনাল পার্ক। এখানে নভেম্বর থেকে জানুয়ারী মাস পর্যন্ত প্রায় ৩৫০ প্রজাতির পাখি পরিযায়ী হয়ে আসে। এরা ৪ মাসের অধিক অবস্থান করে। গ্রীষ্মের  শুরুতে নিজ নিজ দেশে পাখিগুলি আবার ফিরে যায়। সারাদেশের হাওড়-বিল,নদী-নালা. বন-জঙ্গলে ঘুরে যত পাখি না সংগ্রহ করেছি তার সব পাখিই এক সঙ্গে এখানে পাওয়া যায়। তবে এখানেও ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকতে হবে।

ভরতপুর জেলার কেন্দ্রে কিওলাদিও ন্যাশনাল পার্ক। জয়পুর থেকে ভরতপুর যাবার পথে আমরা বেশ কয়েকটি দর্শনীয় ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন করি। তারমধ্যে ছিলো-

গঙ্গা মন্দির।

লোহাগড় কেল্লা।

ধলপুর প্যালেস।

 দিঘী ফোর্ট অন্যতম।
ঐতিহাসিক স্থানগুলি দেখতে দেখতে সন্ধ্যা গড়িয়ে আসে। লক্ষন মন্দির থেকে সরাসরি আমরা হোটেলে যখন পৌছি তখন রাত ৮টা। হোটেলের রুমে বিশ্রাম নিয়ে রাতে খাবার খাই। পরদনি ভোর ৬ টায় কিওলাদিও ন্যাশনাল পার্কে যাব বলে ক্যামেরা ও ব্যাটারীতে চার্জ
 দিয়ে রাত ১০টায় ঘুমিয়ে পড়ি।
হোটেল পার্ক ভরতপুর।
চলবে-
১৫৬জন ৩২জন
0 Shares

২৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য