মামাকে দেখতে যাওয়া (পর্ব-২৬)

শামীম চৌধুরী ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, রবিবার, ০৫:২৯:১৪অপরাহ্ন ভ্রমণ ২২ মন্তব্য

আগের পর্বের লিঙ্ক- মামাকে দেখতে যাওয়া (পর্ব-২৫)

পর্ব-২৬

রাতের খাবার শেষে আমরা ১১টার মধ্যে যার যার রুমে ঘুমিয়ে পড়লাম। সারাদিনের পরিশ্রম ও রাতে শপিং এবং ভরতপুর শহরটা দেখার জন্য ঘুরতে যাওয়ায় সবাই ক্লান্ত ছিলাম। বিছানায় শরীর হেলিয়ে দেবার পর কখন যে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলাম বলতেই পারবো না।
 
ভোর ৬টায় আমাদের ট্যুর অপারেটর সুজিত বেরা সবাইকে ডেকে দিলেন। ঘুম থেকে উঠে সকালের কাজ সেরে যার যার মতন তৈরী হলাম। রাতে কিছু শুকনা খাবার বিস্কুট ও কেক আনা ছিল। এক কাপ কফির সঙ্গে সেগুলি খেয়ে শরীরটাকে ঝরঝরা করে নিলাম। রাতের ঘুম ভাল হওয়ায় ও ভোরে কফি পানে মনটা চাঙ্গা হয়ে গেল। সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম যে,পথে নাস্তা সেরে নিবো।
 
সকাল ৭টায় হোটেল থেকে রান্থম্ভোরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। প্রায় চার ঘন্টার পথ পাড়ি দিতে হবে। শীতের সকাল। এরই মধ্যে সূর্য্য উঠে গেছে। ঝকাঝকা রোদ। গাড়ির ভিতর থেকে শরীরে সকালের মিষ্টি রোদের স্বাদ নিতে পারলাম না। তবে অনুভব করলাম। সারিস্কা টাইগার ফরেষ্টে বাঘের দেখা না পাওয়ায় সবার মন খারাপ ছিল। কিন্তু ভরতপুরে ৮৫ প্রজাতির নতুন পাখির ছবি তুলতে পারায় সেই কষ্টটা ভুলেই ছিলাম। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল। আমরা ভরতপুরের কেওলাদেও বনে ১৫০ প্রজাতির পাখির দেখা পেয়েছিলাম।
 
যাত্রা পথে ড. আমিনুর রহমান ভাই আবারো মামার প্রসঙ্গ তুললেন। উনার কথায় বুঝতে কষ্ট হলো না কোথায় আমাদের আক্ষেপটা। সবার মনের ভিতর একই প্রশ্নের ঢেউ খেলছে যে, রন্থাম্ভোর মামার দেখা পাওয়া যাবে তো?
 
সকলের সঙ্গে আমারও মনের অবস্থা একই ছিল। আমি মনে মনে ভাবছি, এত সফলতার পর যদি মামাকে দেখতে না পাই তবে মিশনটাই যেন ব্যার্থ না হয় ? ভাবনা থেকে নিজেকে আড়াল করে নিলাম। সবাইকে উৎসাহ দিলাম। বললাম, ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফীটাই ভাগ্যের। সুতারাং ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে মামার দেখা পাবো। এই প্রসঙ্গে Black Bitern বা কালো বকের উদাহারন টানলাম। ভাগ্য সুপ্রসন্ন না থাকায় এত তল্লাশীর পরও আপনারা কেউ কালো বকের দেখা পেলেন না। তাই বলে কি বার্ড ফটোগ্রাফীর ইতি টানতে হবে? মামার দর্শন যাদি নাও পাই সমস্যা নাই। দেখবেন, অন্য কিছু মামার চেয়ে ভালও পেতে পারি। এই বনে তো চিতা বাঘও আছে। এমনও হতে পারে মামাকে না পেয়ে চিতাকে পেলাম। আমার কথাগুলি শুনে সবাই বললেন আপনি আমাদের আশার বানী শুনিয়ে সবসময় চাঙ্গা রাখেন। মনোবল ভাঙ্গতে দেন না। ভ্রমনে এটাই আপনার দারুন একটি কৌশল। আমি অট্টহাসি হাসলাম। আমার সঙ্গে সবাই হা… হা… হা… করে হেসে উঠলো।
 
পাঠক বন্ধুরা,
আমরা যে বনে যাচ্ছি তার একটা পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন মনে করলাম। কারন বনটা সম্পর্কে নুন্যতম একটা ধারনা থাকলে পাঠক বন্ধুদের অনেক কিছুই জানা হবে। এমনও হতে পারে অনেক পাঠক হয়তো রান্থম্ভোর ন্যাশনাল পার্কের নামই শুনেন নাই।
চলুন, এক নজরে রান্থম্ভোর সম্পর্কে জেনে নেই। আমি রান্থম্ভোর পৌছার পর কিছু ছবি তুলেছিলাম সেগুলি পাঠক বন্ধুদের কাছে উপস্থাপন করিলাম
মানসিংয়ের দূর্গ। বর্তমানে ওয়াচ টাওয়ার।
রান্থম্ভোর জাতীয় উদ্যান উত্তর ভারতের একটি জাতীয় উদ্যান প্রাথমিকভাবে ২৮২ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে ছিল। ১৯৫৫ সালে ভারত সরকার মধপুর শাওয়াই খেলার অভয়ারণ্য (Sawai Madhopur Game Sanctuary) হিসাবে রান্থম্ভোর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
১৯৭৩ সালে বাঘের অন্যতম সংরক্ষণাগার প্রকল্প হিসাবে ঘোষিত হয়। ১৯৮৪ সালে সওয়াই মানসিং অভয়ারণ্য এবং কেলাদেবী অভয়ারণ্য বন হিসেবে ঘোষিত হয়। ১৯৮৮ সালে রান্থম্ভোরকে একটি জাতীয় উদ্যানে পরিণত করা হয়।
১৯৯২ সালে, টাইগার রিজার্ভটি সম্প্রসারিত করা হয়েছিল উত্তরের কেলাদেবী অভয়ারণ্য এবং দক্ষিণে সওয়াই মানসিংহ অভয়ারণ্যকে অন্যান্য বনাঞ্চলের সাথে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে ভারত সরকার দূর্গম পাহাড় ও বিশাল বনাঞ্চল এলাকা জুড়ে
বণ্যপ্রানীর অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তুলে। বর্তমানে আজ এটি ১৩৩৪ বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে বণ্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে খ্যাত। বণ্যপ্রাণীর প্রতি ভালোবাসা ও সংরক্ষনের দিকটা মাথায় রেখে প্রায় ১১০০ বর্গ মিটার এলাকা প্রশস্ত করে ভারত সরকার রাজস্ব আয়ের একটি বিরাট অংশ হিসেবে গড়ে তুলেছে। এই বন থেকেই ভারত সরকার তার রাজস্ব আয়ের প্রায় ১৫ শতাংশ এখান থেকে আসে।
দূর্গম পাহাড়ে রাজা মানসিংয়ের প্রাসাদ। বর্তমানে বনের হেরিট্যাজ।
পার্কে অবস্থিত বহু হ্রদের মধ্যে পদম তালাও এটি বৃহত্তম। হ্রদের প্রান্তে একটি লাল বেলেপাথর জোগি মহল পাওয়া যাবে। ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম হিসাবে বিবেচিত একটি বিশাল বন্য গাছও হ্রদের কাছে রয়েছে।
পদম তালাও হ্রদ।
রণথাম্ভোর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটি বাঘের জন্য পরিচিত। এই প্রাণীগুলিকে তাদের প্রাকৃতিক জঙ্গলের আবাসে দেখতে হলে এই ন্যাশনাল পার্ক একটি জনপ্রিয় স্থান। দিনের বেলাতেও বাঘ সহজেই দেখা যায়। রান্থম্ভোর জাতীয় উদ্যানের বাঘ দেখার জন্য সেরা সময়টি নভেম্বর এবং মে মাসে বলে মনে করা হয়। পার্কের পাতলা বনগুলি মধ্য ভারতে পাওয়া জঙ্গলের বৈশিষ্ট্যযুক্ত উদাহরণ। অন্যান্য জীবজন্তুর মধ্যে রয়েছে চিতাবাঘ, নীলগাই, বুনো শুয়োর, সম্বর, ডোরাকাটা হায়েনা, স্লট ভালুক, দক্ষিন সমভূমি ধূসর ল্যাঙ্গুর, রেসাস মাকাক, কুমির কুমির এবং চিতল। এই অভয়ারণ্যটিতে বিভিন্ন ধরণের গাছ, গাছপালা, পাখি এবং সরীসৃপের পাশাপাশি ভারতের বৃহত্তম বটবৃক্ষ রয়েছে। এই বটবৃক্ষের বয়স তিনশত বছরের অধিক বলে জনশ্রুতি আছে।
 
এটি দক্ষিণ-পূর্ব রাজস্থানের সাওয়াই মধপুর জেলায় অবস্থিত।। এই পার্কটি কোটা রেলস্টেশনের খুব কাছেই। রণথাম্বোর জাতীয় উদ্যানটি মালভূমির প্রান্তে অবস্থিত এবং উত্তর দিকে বনাস নদী এবং দক্ষিণে চম্বল নদী দ্বারা আবদ্ধ। পার্কের ভিতরে রাজা মানসিংয়ের একটি দূর্গ আছে। যার নাম রাণথাম্ভোর দূর্গ। পার্কের মধ্যে অবস্থিত ঐতিহাসিক রাণথাম্ভোর দুর্গের নামে এই পার্কটির নাম রাণথাম্ভোর ন্যাশনাল পার্ক রাখা হয়েছে।
 
রণথাম্বোর বিশাল বাঘের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য পর্যটন খ্যাত। ভারত সরকার ১৯৭৩ সালে বাঘের প্রকল্প হিসেবে কাজ শুরু করে এবং পার্কের ভিতরে ৬০ মাইল আয়তনের একটি বাঘের অভয়ারণ্য অঞ্চল হিসাবে বরাদ্দ দেয়। এই অঞ্চলটি পরবর্তীতে রণথাম্ভোর জাতীয় উদ্যানের আকারে পরিণত হয়।
দূর্গম পাহাড়ের কোল ঘেষে বন।
২০০৫ সালে,পার্কে ২৬ টি বাঘ থাকত। এটি ১৯৮২ সালে রিজার্ভের রেকর্ড হওয়া বাঘের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কম ছিল, যা ৪৪ এ দাঁড়িয়েছিল। বেসরকারী সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালে রান্থম্ভোর জাতীয় উদ্যানে ৩৪ প্রাপ্তবয়স্ক বাঘ ছিল এবং ১৪ শাবকেরও বেশি ছিল। এই বৃদ্ধি মূলত পঞ্চাঞ্চল নিয়ন্ত্রণে বন কর্মকর্তাদের টেকসই প্রচেষ্টার জন্য দায়ী করা হয়েছিল। এই অঞ্চলের গ্রামবাসীদের পার্কের বাইরে থাকার জন্য উৎসাহ দেওয়া হচ্ছিল, এবং নজরদারি ক্যামেরাও রিজার্ভ জুড়ে লাগানো হয়েছিল। এই প্রচেষ্টাগুলির জন্য ভারত সরকার ১৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়ে খরচ করে।
পরবর্তীতে রান্থম্ভোরকে সরিস্কা টাইগার রিজার্ভ স্থানান্তর কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার যোগ্য করে তুলতে তারা যথেষ্ট সফল হয়েছিল। পুরুষ বাঘের প্রথম আকাশে স্থানান্তরিতকর রান্থম্ভোর থেকে সরিস্কায় যাওয়া, উইং কমান্ডার বিমল রাজ একটি এমআই -১ হেলিকপ্টার ব্যবহার করে ২৮ জুন ২০০৮ সালে সম্পন্ন করেছিলেন।দুর্ভাগ্যক্রমে, এই অনূদিত বাঘটি বিষাক্ততার কারণে ১৫ নভেম্বর ২০১০-এ মারা গিয়েছিল।
 
পার্কের অঞ্চলটি শুকনো পাতলা বন এবং খোলা ঘাসের জমিগুলি মধ্যে বেষ্টিত। পার্কে ৫৩৯ প্রজাতির উদ্ভিদ ও ফুলের গাছ রয়েছে।
 
(তথ্যসূত্রঃ সংগ্রহ)
 
(চলবে)
১১০জন ৮জন
0 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য