মানুষ আমি আমার কেনো পাখির মত মন?

আজিজুল হক। বাড়ি বগুড়া শহরে। নিজের একটি ছোট মেশিনারির ইন্ডাস্ট্রি আছে। ইট তৈরীর জন্য অটোমেটিক মেশিন বানানো হয় তার ইন্ডাস্ট্রিতে। অটোমেটিক মেশিন বাংলাদেশে আসে প্রথমে চীন হতে। আমিও দুটো সেমি অটোমেটিক মেশিন আমদানী করেছি ইট তৈরীর জন্য। মেশিনে ছোট খাট কিছু সমস্যা দেখা দেয়ায় কিছুটা নিজের বুদ্ধিতেই তার সমাধান করি। নিজস্ব চিন্তায় এর কিছুটা রূপান্তরের ইচ্ছে জাগে। এই রূপান্তরের পরে মেশিনের কার্যকারিতা কেমন হবে তা আলোচনা করি চায়নার মেশিন বিক্রেতার সাথে। তারা আমার চিন্তাকে সমর্থন করে। তারপরেও এই রূপান্তর আসলেই কাজ করবে কিনা তা আলাপ করার জন্য দেশে লোক খুঁজতে থাকি। একসময় তা পেয়ে যাই। বগুড়া গিয়ে খুঁজে খুঁজে আজিজুল হককেই পাই।

তার ছোট কারখানা দেখে অবাক হয়ে যাই। চায়না হতে যে মেশিন আমি আমদানী করেছি, সেই একই মেশিন তিনিও প্রস্তুত করছেন। মূল্য চায়নার অর্ধেক। বগুড়া জেলা সহ উত্তর বঙ্গে তার উৎপাদিত মেশিনের চাহিদা ব্যাপক। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, মানিকগঞ্জ সহ দেশের অনেক জেলাতেই তার মেশিন নিচ্ছে ব্রীক ফিল্ড মালিকগন।

তার সাথে মেশিন নিয়ে আমার চিন্তা শেয়ার করি। আমার চিন্তা শুনে তিনিও অবাক হয়ে জানতে চান যে আমি মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার কিনা। উত্তরে না বলায় আরো অবাক হয়েছিলেন। তিনি অনুমতি নিলেন আমার কাছে যে তার পরের মেশিনগুলোতে আমার চিন্তার প্রয়োগ করলে আমার কোনো আপত্তি আছে কিনা? আমি সানন্দে তাঁকে অনুমতি দিলাম আমার উদ্ভাবিত টেকনোলজি তিনি ব্যবহার করতে পারেন।

আমার মেশিনের জন্য কিছু টুকটাক পার্টস অর্ডার দিয়ে বগুড়া থেকে বাড়ি চলে এসেছি। এরপর মাঝে মাঝে সামান্য কিছু পার্টস তার কাছ থেকে মোবাইলের মাধ্যমে অর্ডার দিয়ে আনিয়েছি। তিনি তা সঠিক ভাবেই কুরিয়ার করে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

সেই আজিজুল হক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে দুইদিন অজ্ঞান অবস্থায় ছিলেন।। হার্টে ব্লক ধরা পরেছে। ঢাকায় চিকিৎসা করাবেন। আমাকে খুব অনুরোধ করলেন আমি যেন ডাক্তার ম্যানেজ করে তার সঠিক রোগ নির্নয় করার ব্যবস্থা করি। আর আমাকে তার চিকিৎসার সময় ঢাকা অবশ্যই থাকতে হবে। তার কথা শুনে তাঁকে বললাম যে আমি আপনার খুব ছোট একজন গ্রাহক, সারাদেশে আপনার কত বড় বড় গ্রাহক আছেন, তাদের বাদ দিয়ে আমাকে কেন বলছেন?
উত্তরে বললেন ” আপনার উপর আমার আস্থা জন্মেছে, আর কারো প্রতি তেমন আস্থা জন্মেনি।”

এরপরে আর কথা থাকে না। ভায়রার মেয়ে মুনা ডাক্তার। তাকে বলে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত একজন সিনিয়র ডাক্তারের অ্যাপয়েনমেন্ট নিলাম। ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকা গেলাম। আজিজুল হক এবং তার পরিবারের সবাইকে একই হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করলাম, যে হোটেলে আমি উঠি।
বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার পরে এনজিওগ্রাম করার ফর্মে আমাকেই স্বাক্ষর করতে হলো আজিজুল হক এর স্ত্রী, ভায়রা থাকা সত্বেও। এনজিও গ্রাম চলাকালীন ডাক্তার আমাকে নিয়ে কম্পিউটারে তার হার্ট দেখালেন। মোট পাঁচটি ব্লক। দুইটার রিং পরানো একান্ত দরকার। ডাক্তার বললেন যেহেতু হাতের শিরা এখন কাটা আছে তাই এই অবস্থায়ই রিং দুটো পরাতে। আজিজুল হক আগেই বলেছিলেন, হার্টের যে কোনো অপারেশন তিনি দেবী শেঠির হাসপাতালে করাবেন। তাই এই মুহুর্তে রিং পরাবো না বলায় তিনঘন্টা পরে কেবিন থেকে রিলিজ করালাম তাঁকে। একদিন পরে কিছুটা সুস্থ হলে তারা বগুড়া চলে গেলেন, আমি বরিশাল।

এরপর দেবী শেঠির নারায়না হাসপাতালে তার চিকিৎসার জন্য অ্যাপয়েনমেন্ট করে দিলাম। গতকাল তিনি সস্ত্রীক সেই হাসপাতালে গিয়েছেন।

আমার প্রতি এই যে অগাধ বিশ্বাস এবং আস্থা, এর মূল্য কতো? উনি কিভাবে বুঝলেন যে আমি আমার শত ব্যস্ততাকে উপেক্ষা করে চার পাঁচদিনের জন্য তার চিকিৎসার জন্য সময় দেবো? এই বিশ্বাস এবং আস্থায় আমি যে গলে যাই, তা উনি কিভাবে জানলেন?

উপরের বর্ণনায় আমাকে মহান বানানোর একটি চেষ্টা আছে। আমি নিজের ঢোল নিজেই পেটালাম। এই ঢোল পিটানো কোনো মতেই ঠিক না। সুর্য উদয় হলে তো আলো আসবেই, চাঁদ উঠলে জোছনায় ছেয়ে যায় জগৎ। সূর্য, চন্দ্রর কোনো গুনই নেই আসলে আমার। বিশাল মস্তিষ্কের অধিকারী হলেও তা পাখির মতই মনে হয় আমার কাছে।

=============================================================
অনেক মাস পরে এই ফেব্রুয়ারীতে ঢাকা গেলাম আজিজুল হকের চিকিৎসার জন্য। উঠেছিলাম যে হোটেলে উঠি সব সময়। নয় তলায় রুম আমাদের ( লিফটের আট )। নীচ তলা থেকে উপরে উঠবো, আরো তিনজনের সাথে দাঁড়িয়ে আছি লিফটের সামনে।

ইনিও লিফটে উঠবেন, আমার পাশেই রুম তার। উনি ব্যস্ত ফেসবুক নিয়ে। লিফট আসলে মোবাইলের দিকে তাকিয়েই লিফটে উঠলেন। লিফটের মধ্যেও মোবাইলে ফেসবুক। আহা কত সুন্দর সুন্দর মেয়েদের ছবি। ওনার কোনো ছেলে ফ্রেন্ড নেই মনে হয়, ক্রল করছেন, দেখছি আমি সব মেয়েদেরই ছবি।

লিফটের তিন এ লিফট থামলো। উনি মোবাইলের দিকে তাকিয়েই অন্য একজনের সাথে নেমে গেলেন। হায়রে ফেসবুক, মানুষকে কত বেহুঁশ বানিয়ে ফেললে তুমি! উনি যাবেন লিফটের আটে, নেমে গেলেন তিন এ। আমিও অবশ্য আট এর বোতাম টিপতে ভুলে গিয়েছিলাম। উনি নামার পরে আট এর বোতাম টিপে দেই। নয় তলায় নামলাম। মাথায় দুস্ট বুদ্ধি ঘুরপাক খাচ্ছে। ডান পা লিফটের দরজার মধ্যে দিয়ে রাখলাম। দরজা আঁটকে যাচ্ছে আবার খুলে যাচ্ছে। কাঁধে ঝুলানো ব্যাগ হাতড়ে প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া একটি বলপেন বের করে দুই দরজার মধ্যে রেখে দাড়ালাম, হ্যা কাজ হচ্ছে। লিফটের দরজা আঁটকে আবার খুলে যাচ্ছে। ছোট বেলায় পড়া মাসুদ রানা বই পড়ে লিফটের দরজার এমন কৌশল শিখেছিলাম। থাকো চান্দু তুমি থার্ড ফ্লোরে কতক্ষন দাঁড়িয়ে। এরপর পায়ে হেঁটে সিড়ি দিয়ে ফেসবুক করতে করতে পাঁচ চলা হেঁটে আসো। মাত্র তো একশত ধাপ, ব্যাপার না।

করিডোর দিয়ে রুমের দিকে যেতে যেতে জোরেই গান গেয়ে উঠলাম- তাইরে নাইরে নাইরে গেলো সারাটা জীবন

 

 

১৭১জন ১৭১জন
0 Shares

১৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ