দেশ ছেড়ে যারা ভিনদেশে পাড়ি জমিয়েছে উন্নত জীবনের সন্ধানে, জীবনকে নতুন করে সাজাবে বলে, শুরুর দিকে তাদের প্রায় সকলেরই ‘যে কোন একটি কাজ হলেই চলবে’ এমন ইতিবাচক মানসিকতা থাকে। সেই অনুযায়ী যে কোন একটি কাজ জুটিয়েও নেয় অনেকে। শুরু হয় জীবন যুদ্ধ। ধিরে ধিরে একটি সহনীয় অবস্থানে এলে অনেকেই দেশ থেকে মস্তিষ্কে বহন করে নিয়ে আসা মানসিকতায় পারিবারিক কিংবা সামাজিক মর্যাদার কথা ভাবনা করেন। পুরনো কাজটি করতে সংকোচ বোধ করেন। পেশাগত পরিচয় সংকটে ভোগেন। যদিও উন্নত দেশগুলোয় যে কোন কাজকেই মর্যাদার এবং সম্মানের চোখে দেখা হয়, তবুও দ্বিধা, সংকোচ থেকে অনেকেই তাদের পূর্ববর্তী চাকুরীটি নিয়ে গর্ববোধ করতে পারেন না।

দেশ থেকে নতুন আসা এক আত্মীয় চাকুরি খুঁজছিল। তাকে নিয়ে গিয়েছিলাম বাসার পাশেই অবস্থিত ডানকিন ডোনাটস স্টোরে। সেখানে কর্মরত এক বাংলাদেশি ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কীভাবে সেখানে চাকুরির ব্যপারে আবেদন করতে হবে। তিনি কপাল কুঁচকে তাকালেন। কে চাকুরি করবে জানতে চাইলেন। আমি পাশে থাকা আত্মীয়ের দিকে ইংগিত করে দেখাতেই বেশ বিস্ময় নিয়ে বললেন, ‘ আপনের বয়স কম, কিত্তেন ইয়ানে কাম খুঁজতে আইছেন, এইডা একটা কাম হইলো  (কেন এখানে কাজ খুঁজতে এসেছেন, এটা একটা কাজ হোল ?) ?’ অতঃপর উনি যা বুঝালেন তার সারমর্ম হোল, অন্য কোন কাজ কিংবা সুযোগ পেলে তিনি কোনভাবেই সেখানে কাজ করতেন না। আমার তখন কেবলই ছোটবেলায় পড়া পিথাগোরাসের উক্তিটি মনে পড়ছিল। উক্তিটি ছিল, ‘ আমাদের জীবন আমাদের ইচ্ছার উপর নয়, আমাদের কর্মের উপর দণ্ডায়মান ‘। আবার আমার খুব কাছের কিছু বন্ধু আছেন যারা দীর্ঘদিন যাবত ট্যাক্সি চালনা পেশার সাথে জড়িত। শুরুর দিকে বেশ ভালোভাবেই পেশাটিকে গ্রহণ করেছিলেন। কেননা এটি একটি স্বাধীন পেশা। মালিকের কিংবা বসের তাগাদা থাকে না। কর্মস্থলে দেরি হলে চাকুরিচ্যুতির ভয় থাকে না। আবার অর্থ আয়ের দিক থেকেও বেশ মানসিক সন্তুষ্টি থাকে এতে। এমন অনেকগুলো ইতিবাচক কারণ জড়িয়ে আছে পেশাটির সাথে। তবুও ‘ট্যাক্সি চালক’ শব্দটি তাদের প্রচণ্ডভাবে বিব্রত করে। তারা নিজেদের ক্যাব চালক পরিচয় দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন, হীনমন্যতায় ভোগেন। অনেকদিন যাবতই অন্য পেশায় সম্পৃক্ত হবার সুযোগ খুঁজছিলেন। অতঃপর একদিন জানলাম তারা চার বন্ধু মিলে ম্যানহাঁটনের ব্যস্ততম এলাকায় ফাস্টফুড রেস্তোরাঁ দিয়েছেন। এবার তাদের পেশাগত পরিচয় হয়ে উঠে ব্যবসায়ী নামে। তাদের স্ত্রীরা এতে সম্মানিত বোধ করেন। আমরা মাঝে মাঝেই মধ্যরাতে সেখানে যেতাম। গল্প আড্ডা চলতো। রাতের শিফটে চেনা জানা বন্ধুদের যারা ক্যাব চালাত, তারাও রাতের খাবার খেতে সেখানে আসতো। ক্ষণিক আড্ডা দিয়ে ফুরফুরে মেজাজে আবার কাজে নেমে যেতো। বছর দুয়েক ব্যবসাটি চলমান ছিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, চার তরুণের উদ্দাম, সততা এবং আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও তেমন একটা লাভবান হতে পারেনি তারা। ব্যবসা গুটিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও পূর্ববর্তী পেশায় ফিরে যেতে হয়েছে সকলকে। কেননা অন্য অনেক পেশার চেয়ে এতে আয় রোজগার তুলনামূলক ভালো এবং নিরাপদ।

আমার এখনো মনে আছে এই ভিনদেশে বসবাসের শুরুর দিকের দিনগুলোতে একটি যে কোন চাকুরির জন্যে হন্যে হয়ে নানান যায়গায় ঘুরেছিলাম। তখন অর্থাৎ সেই দুই যুগ আগে এখনকার মতো এত অধিক সংখ্যক বাংলাদেশিও ছিল না যে, কেউ একজন স্বদেশীর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে কোন একটি চাকুরির সন্ধান দিবে, কিংবা ব্যবস্থা করে দিবে। চাকুরির জন্যে তখন মাধ্যমটা জরুরি ছিল। অনেকগুলো দিন, মাস অপেক্ষা শেষে একদিন পাশের রুমের এক বড়ভাই নিয়ে গেলেন তার কর্মস্থল ‘ জাপানিজ ফুড কর্পোরেশন ‘ এ। তিনি সেখানকার সুপারভাইজার ছিলেন, বিধায় জাপানিজ বসকে বলে কয়ে চাকুরির ব্যবস্থা করে দেন। শুরু হয় সংগ্রামী এক জীবন। ভোর পাঁচটায় ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাসা থেকে বের হতে হতো কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে। জাপানিজ জনপ্রিয় খাবার ‘সুসি’ তৈরি এবং প্যাকেটিং এর কাজ চলতো দিনভর। ফিরতে হতো সন্ধ্যার আঁধার ঘনালে। দিনের আলো দেখা হতো না পুরো শীতকাল জুড়ে। খানিকটা ইংরেজিতে পারদর্শী হতেই ছুটির দুটো দিন ম্যাকডোনাল্ডসে পার্ট টাইম কাজ জুটিয়ে নেই। সেই সময়টাতে যে কোন কর্মস্থলে নবাগতদের একটু বেশীই শ্রম দিতে হতো অন্যদের তুলনায়। যেমন, গারবেজ ফেলা, ফ্লোর পরিষ্কার করা, টয়লেট পরিষ্কার করা, টেবিল মোছা থেকে শুরু করে বেইজমেন্ট থেকে আইস বহন করে নিয়ে আসা সহ যাবতীয় কাজ করতে হতো। একটু পুরনো হলে ক্যাশ রেজিস্টারে কাজ করার সুযোগ দেয়া হতো। এমন সব কাজ দেশে কখনোই করা হয়নি যদিও, তবুও বলতে দ্বিধা নেই যে, কাজগুলো করতে আমার ভেতরে কখনোই সংকোচ কাজ করেনি। কেননা, আমি নিশ্চিতভাবে জানতাম, যে কাজ করে আমি জীবিকা নির্বাহ করছি, সে কাজের প্রতি সম্মান এবং ভালোবাসা না থাকলে জীবনে সামনে এগিয়ে যেতে পারবো না। আমার প্রায় সময়ই মনে হতো এ পি যে আব্দুল কালামের একটি উক্তি, ” যদি তুমি তোমার কাজকে স্যালুট কর, দেখো তোমায় আর কাউকে স্যালুট করতে হবে না। কিন্তু তুমি যদি তোমার কাজকে অসম্মান কর, অমর্যাদা কর, ফাঁকি দাও, তাহলে তোমায় সবাইকে স্যালুট করতে হবে। ”

চেনা আরেকজনের সাথে গল্প হচ্ছিল কাজ এবং কর্মস্থল নিয়ে। তিনি যে রেস্টুরেন্টে চাকুরি করতেন, সেখানে তাকে দুটি কাজের যে কোন একটি বেছে নিতে বলা হয়েছিল। এক, সারাদিন রেস্টুরেন্টের বেইজমেন্টে যে গারবেজ জমা হবে সেগুলো সেখান থেকে টেনে উপরে তুলে দিতে হবে। দুই, সেইসব ময়লার ব্যাগগুলো রাস্তার পাশে নিয়ে জমা করতে হবে। তিনি বেছে নিয়েছিলেন প্রথমটি। যদিও রেস্টুরেন্টের বিশালাকৃতির ভারী ভারী গারবেজ ব্যগগুলো টেনে উপরে তোলা তুলনামূলক বেশি কষ্টের এবং পরিশ্রমের তবুও তিনি তা-ই বেছে নিলেন। এ বিষয়ে তার যুক্তি, নিচ থেকে সেইসব উপরে তুলে দিলে কেউ তাকে দেখবে না। কিন্তু রাস্তায় সেগুলো টেনে নিয়ে গেলে চেনা কেউ যদি দেখে ফেলে সেই শঙ্কা কাজ করছিল ভেতরে। এই যে ‘ পাছে লোকে কী ভাববে ‘  ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি, এটি আমাদের প্রতিনিয়ত অনেক ভালো কাজ করা থেকে বিরত রাখে। সুতরাং ভালো-মন্দ বিচারে নিজের বিবেকের চেয়ে বিশ্বস্ত আর কে হতে পারে ? মনে রাখতে হবে, এমন দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক মানসিকতারই প্রতিনিধিত্ব করে।

রিমি রুম্মান

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

৭৫৭জন ৬২৭জন
1 Shares

২৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ