মানব-উন্নয়ন (শেষ পর্ব)

দালান জাহান ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, বৃহস্পতিবার, ০৮:৩৩:১১পূর্বাহ্ন ছোটগল্প ৫ মন্তব্য

ফারুক সাহেব দেখতে পেলেন ম্যাডামের হাত ব্যাগটা নিচে পড়ে আছে। ব্যাগটার উপরে আঁকা দুটো সূর্যমুখী ফুল। ফুল দুটো ধীরে ধীরে দুটো মানুষে পরিণত হয়ে রকেটের বেগে এগিয়ে আসছে তার দিকে। যতোই এগিয়ে আসছে ততোই যেন তারা বড় হচ্ছে এতোই বড়ো যে ফারুক সাহেব অনুভব করছেন এ-র ব্যাস ব্যাসার্ধ পৃথিবীর চেয়ে বেশি হয়ে ঢুকে যাচ্ছে তার চোখে। তিনি চোখে তীব্র ব্যথা অনুভব করলেন। 

সাহেবের মনে পড়লো তার আগের বসের কথা। যিনি তিন লাখ টাকায় কেনা একটা বিলেতি কুকুরকে দৈনিক তিন কেজি মাংস খাওয়াতেন। দামি শ্যাম্পু দিয়ে নিজের হাতে গোসল করাতেন। কুকুরটার কালো-সাদা মুখটায় চুমো ও খেতেন মাঝে-মাঝে।  

অথচ তার বাবা অসুস্থ হয়ে বাসায় পড়ে ছিলেন তিমি সময়ের অভাবে বাবার চিকিৎসা করাতে পারলেন না। কাজের ছেলেকে দিয়ে  ঔষুধ আনিয়ে বাবাকে খাওয়াতেন।  কিন্তু সে সময় কুকুর অসুস্থ হলে, কুকুরকে নিয়ে তিনি হাসপাতালে গেলেন। একসময় উনার বাবা সুস্থ হয়ে জানালেন তিনি হজ্জে যাবেন। হজ্জে যাওয়া এক ধরনের ভণ্ডামি এসব আরবদের ব্যবসা বলে তাকে থামিয়ে দিলেন। 

বৃদ্ধ বাবা অনুভব করলেন , তার বউ মা ছেলে নাতিরা সবাই কুকুর-বিড়ালের সাথে সময় কাটায় আর একা নিঃসঙ্গ হয়ে বসে থাকে বৃদ্ধ বাবা তার কথা শোনার মতো কেউ নেই। একসময় বৃদ্ধ অনুভব করেন, কোন জনম সার্থক তাহলে , কুকুর জনম নাকি মানুব জনম? কিছুদিন পর বউয়ের কথায় রেখে এলেন তার বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে। এ-ই বিষয়টি নিয়ে পত্রিকায় একটা নিবন্ধ লেখার কারণে ফারুক সাহেবের চাকরি খেয়েছিলেন তার বস আদনান খুয়ারী। 

এরপর মনে পড়লো, দ্বিতীয় মালিক আব্দালের কথা। যিনি সমস্ত পশু পাখির প্রতি তার ভালোবাসা প্রকাশ করতেন। কিন্তু সাদা খরগোশ ছিলো তার খুব প্রিয়। তিনি খরগোশ নিয়ে বিকেলে ঘরের মধ্যে খেলা করতেন। 

অথচ সামান্য কাঁচের গ্লাস ভাঙার জন্য কাজের মেয়েটির স্তনে গরম শিক দিয়ে ছ্যাঁকা দেন তার স্ত্রী । বড়শিতে উঠা মাছের মতো মেয়েটির আত্মা যেন বের হয়ে নাচানাচি করছিলো। পরদিন সকালে মেয়েটির ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায় ঘরে। অতি সাধারণ আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেন আব্দাল কিন্তু এডিটেরিয়াল লিখেন ফারুক সাহেব যার জন্য আব্দাল সাহেবকেও কাঠ খড় পুড়াতে হয়। এবারও তার চাকরি চলে যায় আগের মতোই। 

ফারুক সাহেব এখন আর কিছু মনে করতে পারছেন না। তিনি জানেন না তিনি কিভাবে সূর্যমুখী ফুলের ভেতরে প্রবেশ করলেন।  তিনি দেখলেন এখানে আকাশের নক্ষত্ররা মাটিতে নেমে হেঁটে বেড়ায় কথা কয় মানুষের সাথে। মানুষেরাও খুব সুন্দর হাস্যোজ্জ্বল । মানুষেরা হাসলে বাতাসে দোলা ফুলের মতো দোলে মানুষের মাথা । জলে ভাসা পদ্মের মতো ভেসে থাকে মানুষের স্বপ্নময় চোখ। তার স্ত্রী নেহা যে কীনা ফারুক সাহেবকে লিখতে দিতে চাইতো না কখনও সে ও এখানে খুব কবিতা প্রিয়। সারাক্ষণ কবিতার বই নিয়ে বসে থাকেন ঝর্ণাতলে। পাখিগুলো ওড়ে ওড়ে এসে রোমাঞ্চমাখা শরৎ আকাশের তলে শীতল সঙ্গীত পরিবেশন করে যায়।

আধুনিক সভ্যতার সবকিছু এখানে বিরাজমান। তিনি দয়াবক্স, আদনান এবং আব্দাল সাহেবের বস এখানে। উড়ন্ত গাড়িতে চড়ে অফিস করেন ফারুক সাহেব। কিন্তু এখানে কারও সম্পদের প্রয়োজন হয় না। সবাই যা চায় সাথে সাথেই তা পেয়ে যায়। ফারুক সাহেব ভাবেন এসব কী হচ্ছে আমার সাথে। তিনি নিজের শরীরে চিমটি দিয়ে পরখ করেন কিন্তু তিনি ব্যথা অনুভব করেন।

একটা সময় পর ফারুক সাহেব ভাবেন আমার মৃত্যু হয়েছে তাই আমি স্বর্গে চলে এসেছি। তিনি তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন “তোমার কী আমাদের আগের পৃথিবীর কথা মনে আছে ? সেখানে আমাদের দু’টো সন্তান ছিলো। বছরে তিনবার আমার চাকরি চলে যেতো। তুমি রাগ করে আমায় বাসায় যেতে দিতে না “! নেহা চোখ উঁচু করে বলেন, “কী বলছো এসব আমাদের বিয়ে হলো মাত্র সাত বছর। মাত্র দুটো সন্তান হয়েছে আমাদের এ-র মধ্যে তুমি পাগল হয়ে গেলে! আমার বাকীটা জীবন কি পাগলের সাথে কাটবে!” বলে কান্না শুরু করে দিলেন।

নেহার মামা পাগলের ডাক্তার নেহা তার মামাকে ফোন করে সব জানালেন। রাতে ডাক্তার মোটা একটা ইনজেকশন পুশড করলেন ফারুক সাহেবের ডান বাহুতে। একদিন পর জেগে উঠলেন ফারুক সাহেব এবং জেগে উঠে তিনি বললেন , “দেখো আমি পাগল হইনি, আমাকে ইনজেকশন দিও না। তোমার মামা আমাদের আগের পৃথিবীতে সবজি ওয়ালা ছিলো। সে আমাকে কম টাকায় সবজি দিতো আমার সব মনে আছে। একথা শুনে নেহা আবারও কান্না শুরু করে দিলেন। নেহার মনের এ-ই  অবস্থা দেখে ফারুক সাহেব এখন আর কিছু বলেন না। তিনি এখন অনেকটা নীরব প্রতিবন্ধীর মতো হয়ে গেছেন। সারাক্ষণ ভাবনা আর ভাবনা এটা কী হচ্ছে কেমন করে হচ্ছে! 

ফারুক সাহেবের প্রতিষ্ঠানের নাম মানব উন্নয়ন। দয়াবক্স এখানে বিড়ালের ফার্মে কাজ করেন। বিড়ালের সাথে তার সম্পর্ক ভালো। কুকুরের সাথে কাজ করেন আদনান খুয়ারী। খরগোশ সাপ ব্যাঙ কুমিরের ফার্মে কাজ করেন আব্দাল। ফারুক সাহেব ইদানীং খুব বেশি ফার্ম ভিজিট করেন।

এখানে বিড়াল, কুকুর, খরগোশ নিয়ে গবেষণা করা হয় যে এদের দিয়ে কিভাবে মানব সভ্যতার উন্নয়ন করা যেতে পারে। ফারুক সাহেব আসলেই এদের তিনজন ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে যান। কিন্তু ইদানীং ফারুক সাহেব তাদের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিন্তু তাদেরকে কিছুই বলেন না। এতে তাদের ভয় আরও বেশি হচ্ছে।

এখানে কারও প্রতি তার মালিক অসন্তুষ্ট হলে তাকে সরাসরি অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়। কারও প্রতি অবিচার করা হলে তাকে হৃদয়শূন্য করে ঝুলিয়ে রাখা হয় অগুনিত বছর। 

তাই সবাই খুব সাবধানে সবার কাজ করেন, বিপদে-আপদে সহায়তা করেন। এখানেও কদাচিত ভিক্ষুকদের দেখা মিলে। ফারুক সাহেব অনুভব করেন, যারা আগের পৃথিবীতে ভিক্ষুকদের সাথে  দূর ব্যবহার করেছেন, তারা এখানে ভিক্ষুক হয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেককে আবার দীর্ঘ শাস্তির জন্য গরম জলে ডুবিয়ে রাখা হয়।

এমনই একজনকে ফারুক সাহেব চিনতে পেরেছেন, যিনি কাউকে ভিক্ষে দিতেন না কিন্তু একদিন এক ক্ষুধার্ত ছেলেকে নিজের লাঞ্চ দান করেছিলেন। গরম জলে নিক্ষেপ করার পূর্বে মাইকে ঘোষণা করা হয়, “আছে কেউ আলোচ্য ব্যক্তির ভালো কাজের সাক্ষী ? ” ফারুক সাহেব তখন হাত তোলেন। লোকটাকে ছেড়ে দেওয়া হয় আরও ভালো কাজ করার জন্য। লোকটা এবার ফারুক সাহেবের কাছে এসে বলেন আমার কী এমন ভালো কাজের সাক্ষী আপনি ?  ফারুক সাহেব মনে মনে হাসতে থাকেন।

ফারুক সাহেবকে এখন ট্রেচারে করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। তার এ-ই অদ্ভুত হাসি দেখে নার্স ভয়ে দৌড়ে পালালেন। ডাক্তার এসে দ্রুত ইনজেকশন পুশড করতে চাইলেই ফারুক সাহেব চোখ মেলে তাকালেন। মূহুর্তটা তার কাছে আবার উলটপালট হয়ে গেলো। তিনি ডাঃ কে জিজ্ঞেস করলেন আপনি কী নেহার মামা? ডাঃ বললেন না চুপ করুন আপনাকে ইনজেকশন দিতে হবে।

১৮৬জন ৬২জন
0 Shares

৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য