ইসলামের স্বর্ণযুগ: মহানবী (সাঃ) এর মক্কা বিজয়ের পর দৃশ্যত ইসলাম প্রচারের পথে আর কোন বাধা রইলোনা। রাসুল (সাঃ) এর সাহাবীরা ইসলামের সুমহান বানী ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে দিকে দিকে ছুটে গেলেন। কোন কোন এলাকায় ইসলামকে সাদরে গ্রহণ করা হলো। কোথাও ইসলামের বিরুদ্ধে জালিমের তরবারী শানিত হলো। ইসলামের সৈনিকগণ এক হাতে কুরআন আর অন্য হাতে তলোয়ার নিয়ে ইসলামকে বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে দিলেন। এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা সহ পৃথিবীর তাবৎ দেশে ইসলামের বিজয় ঝান্ডা উড্ডিন হলো। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইউরোপের স্পেন, ফ্রান্স, রাশিয়ার বৃহৎ অংশ, চীন, ভারতীয় উপমহাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা জুড়ে ইসলামের এক সববৃহৎ সাম্রাজ্যে গড়ে উঠেছিল।

নবী করিম (সাঃ) এবং তাহার খলিফাগণ ইসলামী শরিয়া মোতাবেক দেশ পরিচালনা করলেও পরবর্তীকালে রাজা বাদশাগণ ইসলামী শরিয়া অনুসরণ করেনণি। তারা নিজেদের মর্জি মত আইনকানুন তৈরী করতে লাগলেন। খলিফাগন সবসময় ভোগবিলাস থেকে দুরে থাকলেও রাজা বাদশারা আরাম আয়েশ ও ভোগ বিলাসে মত্ত হয়ে গেলেন। মুসলিম জাতির দুভার্গ্য ও তখন থেকে শুরু হয়। আরাম আয়েশ ও ভোগ বিলাসে মত্ত রাজা বাদশাদের উপর হামলা চালিয়ে একের পর এক তাদের রাজত্ব ছিনিয়ে নিতে থাকে অন্যরা। এভাবে একসময় বিশ্বজুড়ে রাজত্ব করতে থাকা মুসলমানরা শুধুমাত্র নিজেদের ভুলের কারণে সুবিশাল সাম্রাজ্যে হারিয়ে ফেলে।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইউরোপ মহাদেশ থেকে একসময় ইসলামের পুরো নাম নিশানাও মুছে দেয় খ্রিষ্টান ক্রুসেডাররা। এভাবে রাশিয়া ও চীনে কম্যূনিষ্ট শাষন শুরু হলে সেখানেও ইসলাম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। আফ্রিকায় ইসলামের সুবৃহৎ সাম্রাজ্যেও একসময় বিরোধীশক্তির হুমকির সম্মুখিন হয়। উপমহাদেশের কিছু কিছু অঞ্চলে ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ইসলাম থাকলেও মুলত তারা বিরোধী শক্তির সাথে আপোষকামী মনোভাব প্রকাশ করতে শুরু করে।

মুসলমানদের নৈতিক অবক্ষয় ঃ ইসলামের সোনালী যুগে মুসলমানদের নৈতিক চরিত্র সুদৃড় ছিল। মদ, মেয়েমানুষ, অর্থলোভ তাদের ছিলনা। তাদের ঈমান এতই  মজবুত ছিল তাদেরকে কোন কিছুর লোভ দেখিয়ে আকৃষ্ট করা যেতনা। কিন্তু যখন তারা ভোগবিলাসে মত্ত হলো, তখন তাদের মধ্যে অনেককে মদ, নারী ও সম্পদের লোভ দেখিয়ে বিরোধী শিবিরে টেনে স্বজাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে উদ্বুদ্ধ করা হলো। মূলত ইসলামের পরাজয়ে বিরোধীদের পাশাপাশি এইসব বিশ্বাসঘাতকরাও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

অসহায় মুসলমান ঃ বতর্মান বিশ্বে যে কোন ইসলামী সংগঠনকে এক বাক্যে জংগী সংগঠন আখ্যা দেয়া হচ্ছে। খ্রিষ্টান, ইহুদী সহ ইসলামের চিরশত্রুরা ইসলামী জাগরণকে রুখতে ও তাদের কায়েমী স্বার্থকে সমুন্নত রাখতে ইসলামী যে কোন সংগঠনকে শত্রু মনে করবে এটাই স্বাভাবিক। তাই বিশ্বের যেকোন দেশের যেকোন ইসলামী সংগঠনই তাদের চোখে জংগী বলে ঘোষিত হবে। কিন্তু আমাদের মুসলিম সমাজ ও এখন তাদের সাথে তাল মিলাচ্ছে। তাদের কাছে এখন ইসলামের সুন্দর সংষ্কৃতির কোন মু্ল্যে নেই। ইসলামের চিরায়ত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ওল্ড মডেল আখ্যা দিয়ে তারা পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও চিন্তাকে নিজেদের সংস্কৃতি হিসেবে গ্রহন করে নিচ্ছে। তারা পাশ্চাত্যের পুজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে তাল মিলিয়ে ইসলামী সংগঠন গুলোকে দুনিয়ার বুক থেকে মুছে দিতে সক্রিয় রয়েছে।

ইসলাম ও অনৈসলামের মধ্যে প্রার্থক্যে কী ঃ ইসলাম আমাদের একত্ববাদের শিক্ষা দেয়, ইসলাম আমাদের শান্তির পথে চলার শিক্ষা দেয়, ইসলাম আমাদের ত্যাগের শিক্ষা দেয়, ইসলাম আমাদের নৈতিকতা শিক্ষা দেয়, ইসলাম আমাদের সকল ধর্মাবলম্বীদের সাথে সহাবস্থানের শিক্ষা দেয়, ইসলাম ধর্মে সেচ্চাচারীতার কোন স্থান নেই। ইসলাম ধর্মে আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা শিক্ষা দেয়া হয়, আদর্শ সমাজ ও অর্থনীতির নিয়ম এই ধর্মে রয়েছে। ভুমি বন্টন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে মানুষের জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল নিয়ম ও বিধান এই ধর্মে রয়েছে। এ ধর্মে জবাবদিহীতা আছে, মৃত্যুর পর বিচারের নিয়ম আছে। তাই একজন মুসলমান চাইলেই ইসলামের নিয়ম লংঘন করতে পারেনা। তাকে ইসলামের প্রদর্শিত নিয়ম মেনেই জীবন যাপন করতে হয়। অনেকের ধারণা শুধুমাত্র নিয়মমাফিক উপাসনা করলেই ইসলামের নিয়ম মানা হয়ে গেল। বাদ বাকি সময়গুলো সে যা ইচ্চা তা করে বেড়াতে পারে। ইসলামকে পূর্নাংগ ভাবে না জানার কারণেই বেশিরভাগ মুসলমান ইসলাম সম্পর্কে এই ধারণা পোষন করে থাকেন।

অপরদিকে অন্যান্য ধর্মগুলো ইসলামের মত স্বয়ংসম্পূর্ন নয়। সেখানে এত বিস্তারিত নিয়মকানুন ও নেই। নৈতিকতার শিক্ষা ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার উপকরণ অন্যান্য ধর্মে নেই।

আবার যারা ধর্ম মানেনা, কিংবা মুসলিম হিসেবে জন্মগ্রহন করেও ইসলামের বিধিবিধান অনুযায়ী চলার তাগিত অনুভব করেনা, তারা মুলত মৃত্যুর পর বিচারের বিষয়টি অস্বীকার করে কিংবা সেটা নিয়ে সন্দেহ পোষন করে। যেহেতু তারা মৃত্যুর পর পূর্নজীবনের বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত নয় সেহেতু এই দুনিয়ায় যা ইচ্চা তা করে বেড়াতে তাদের আর কোন বাধা রইলোনা। আখেরাতের শাস্তির ভয় যাদের নয় দুনিয়ার আইনের সাজা তাদের কতটুকু রোধ করতে পারে। তারা নৈতিকতা নিয়ে মাথা ঘামায়না। ছেলে মেয়ে একসাথে মেলামেশা করছে, বয় ফ্রেন্ড গার্ল ফ্রেন্ড নাম দিয়ে বিভিন্ন ক্লাবে, পার্কে, হোটেলে উদ্দাম ভাবে ব্যাভিচার করছে। ঘুষ, সুদ, দূর্নীতি, লুটতরাজ করতে তাদের সামনে কোন বাধা থাকছেনা। মুলত ইসলামী শিক্ষার অভাব ও ইসলামী শাষনব্যবস্থা না থাকার কারনেই মুসলিম পরিবারের সন্তানরা আজ পাশ্চাত্যের মত অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনে মেতে উঠছে।

এর শেষ কোথায় ঃ একজন তরুন হিসেবে সমাজের বিভিন্ন স্থরের লোকের সাথে আমার মিশতে হয়। বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়। মুসলমানদের নৈতিক অবক্ষয়ের বিষয়টি আমার নিজের চোখেই দেখা। যেমন কক্সবাজারের হোটেল গুলোতে দেখা যায়, প্রায়শই স্বামী স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে রাত কাটাচ্ছে বিভিন্ন স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা। দেশের বিভিন্ন হোটেলগুলোর এই অবস্থা। ঢাকায় যারা থাকেন তারা জানেন ঢাকার পার্কগুলোতে সন্ধ্যার পর কি চলে? বিভিন্ন এ্যমিউজমেন্ট সেন্টারগুলোতে বিনোদনের নামে চলে অশ্লীলতা ও দেহ প্রদর্শনী। এভাবে তরুন সমাজের মনে যৌনতা উস্কে দেয়া হচ্ছে। তারা মেতে উঠছে ধর্ষনের মতো জঘন্য পাপাচারে। এছাড়া নৈতিকতার মত কোন বাধা না থাকায় যে কোন নারী পুরুষের যেকোন ধরণের অন্যায় ও পাপকাজ করতে কার্য্যত কোন বাধা আর রইলনা।

আমার অনেক বোনেরা বলেন, আমি পর্দা করবো কি করবোনা সেটা আমার স্বাধীনতা, কিন্তু পুরুষরা কেন আমাদের খারাপ নজরে দেখবে কিংবা আমাদের উপর হামলে পড়বে?

ঐ বোনদের উদ্দেশ্যে করে বলতে চাই, শুধু পর্দা মেনে চলা আপনার দায়িত্ব নয়, অন্য পুরুষের যৌনতা উস্কে না দেয়ার দায়িত্বও কিন্তু আপনার। আপনার পরিচ্ছদের কারণে অন্য পুরুষ উত্তেজিত হচ্ছে, এবং সমাজের এইসব অনাচার বৃদ্ধির পেছনে আপনিই মুলত প্রত্যক্ষ ভুমিকা রাখছেন।

বিশ্বে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা বলতে মুলত এখন কিছুই নেই। (ইরান ব্যতীত) বিশ্বের কোন দেশ এখন ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করছেনা। আমাদের মুসলমান সমাজ এখন পাশ্চাত্যের পুজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থাকেই গ্রহণ করে নিয়েছে। পাশ্চাত্যের নোংরা সংস্কৃতিকেই নিজেদের সংস্কৃতি হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। শুধুমাত্র নামাজ রোজা পালনকালে তারা ইসলামকে অনুসরণ করে কিন্তু নিজের জীবন, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তারা ইসলামকে অনুসরণ করেনা। ইসলামের এই পতনের জন্য দায়ী আমরা নিজেরাই। এমন একটা সময় আসবে যখন মুসলমান পরিচয় দিতেও আমরা লজ্জা বোধ করবো, খ্রিষ্টানদের মত করে নিজেদের গড়ে তুলবো।
খুব দ্রুতই এই পর্ব লেখা শেষ করলাম। এই পর্বের আরো অনেক কিছু সংযোজিত হতে পারে। আপনারাও চাইলে এই পর্বে প্রয়োজনীয় সংযোজন বিয়োজন করতে পারেন।

২১৪জন ২১৪জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ