সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

মাধবীলতা – প্রথম অংশ

মাহবুবুল আলম ২৩ নভেম্বর ২০১৯, শনিবার, ১২:০০:৫৪অপরাহ্ন গল্প ১৩ মন্তব্য

পূর্ব বাংলার মানুষের ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের কালোমেঘ জমাট বাঁধছে ক্রমশঃ। সারা পূর্ববাংলায় কেমন ভয়ঙ্কর থমথমে অবস্থা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী অত্যাচার নির্যাতনের মাধ্যমে বাঙালিদের স্বাধীকারের স্বপ্নকে ধূলোয় মিশিয়ে দিতে বেছে নিয়েছে অত্যাচার নির্যাতনের পথ। সত্তরের নির্বাচনে বাঙালিদের নেতা শেখ সাহেবের আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগড়িষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকেরা শেখ সাহেবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে নানা ছলচাতুরী ও টালবাহানা শুরু করেছে। যতই দিন যেতে থাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দৃশ্যপট পাল্টে যেতে থাকে দ্রুত। বাঙালিদের ইস্পাত কঠিন আন্দোলনে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির ভাঙনের শব্দ শোনা যাচ্ছে সর্বত্র।
নেতার ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের শাসনকাঠানো ভেঙে পড়েছে। স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় আদালত সব কিছুই বন্ধ। চারিদিকে ফিসফাস। ষড়যন্ত্রের গন্ধ। সবাই বলাবলি করছে যে কোনো সময় খানসেনারা বাঙালিদের ওপর চুড়ান্ত আক্রমন চালাতে পারে। জাহাজে ও বিমানে করে লক্ষ লক্ষ অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ করছে এনে পূর্ব পাকিস্তানে।
রাজধানীর মানুষ যে যেভাবে পারছে গ্রামের বাড়ি অথবা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে। ঢাকাতে আসার পর এমন ভয়ঙ্কর স্তব্দতা আর কখনো দেখেনি শামীম। কিছুটা ভয়, কিছুটা সংশয় নিয়ে শামীমও চলে এসেছে বাড়িতে।
বাড়িতে এসে গরমে অতিষ্ঠ হয়ে গেলেও পুরনো বন্ধুবান্ধব সবাইকে এক সাথে পেয়ে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মাঝেও মোটামুটি আনন্দেই কেটে যাচ্ছে শামীমের সময়। তবে মনের মধ্যে কেমন একটা ভয়, একটা অচেনা আতঙ্ক সব সময় ওতঃ পেতে থাকে। গ্রামের পরিবেশ অন্যরকম হলেও তারা রাজনৈতিক ভয়ঙ্কর আগুনের উত্তাপ অনুভব করতে পারছে এখান থেকেও।
এখানে যান্ত্রিক ব্যস্ততা নেই। আছে অন্য রকম প্রাণের টান ও সতেজ সজিবতা। বাবাকে ভয় পেলেও মা’কে ম্যানেজ করেই শামীমের সব কিছু চলে। কালও মাকে ম্যানেজ করেই জেলে ডেকে এনে জাল ফেলেছে দিঘিতে। বন্ধুদের নিয়ে হইহুল্লোর করে দীঘি থেকে মাছ ধরেছে। সব কিছুই আনন্দে আনন্দে চললেও খারাপ লাগছে কেবল গরমটা । আর সব সময় ভাবনায় নিমগ্ন রাখছে দেশের অবস্থা।
সন্ধ্যা হলেই গ্রামের মানুষ জড়ো হয় শামীমদের উঠোনে। কেননা, সারা গ্রামের এ বাড়িতেই একটি থ্রি-ব্যান্ড ট্রানজিস্টার রেডিও আছে। সুধীর বাবুরও একটা দুই ব্যান্ডে রেডিও আছে। তবে সেখানে কেউ খবর শুনতে যায়না। সন্ধ্যার পর পর সুধীর বাবুও চলে আসেন বারেক মাস্টারের বাড়িতে। এখানে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে সবাই বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার খবর শুনে। দেশের অবস্থা জানতে মানুষকে এতটা উন্মুখ দেখা যায়নি আগে কখনো।
বারেক মাস্টার ও সুধীর রায় মাস্টার দুই বন্ধু দাবার পোকা। স্কুল থাকলে ¯কুল থেকে ফিরে, খেয়ে-দেয়ে একটু ঘুমিয়ে নিয়ে খেলায় বসলে ক্রেন দিয়েও দু’জনকে টেনে তুলতে পারেনা কেউ। কিন্তু কয়েকদিন যাবত খেলায় কিছুতেই মনোসংযোগ ঘটাতে পারছে দু’জন। সঙ্গত কারণেই জমছেনা খেলা। সবার চোখে-মুখেই অতঙ্ক ও উত্তেজনার ছাপ।
গ্রীষ্মের দাবদাহে পুড়ে মাঠ-ঘাট সব ফেটে চৌচির। খাল-বিল-জলাশয়ের কোথাও পানি নেই। চারদিক পানিশূন্য। হাহাকার। এটাই গ্রামের এক কঠিন বাস্তবতা। গ্রামের এমন ঝাঁ ঝাঁ রোদ, পানিশন্য পরিবেশে বাস করে অভ্যস্ত গ্রামের মানুষ। শামীমদের গ্রামে কয়েক হাজার মানুষের বসবাস হলেও, এখানে তেমন বড় কোন পুকুর বা দীঘি নেই। ছোট ছোট পুকুর-ডোবা যা ছিল; তা ও শুকিয়ে গেছে বেশ আগেই। এখন বারেক মাস্টার ও সুধীর রায় মাস্টারের দীঘি দু’টিই একমাত্র ভরসা গ্রামের মানুষের।
তবে অনেকে আবার গোমতি নদীতে গিয়েও গোসলের কাজটা সেরে আসে, প্রায় আধামাইল দূরের নদী থেকে গোসল সেরে ফিরতে ফেরতে ঘেমে নেয়ে আবার গোসলের পূর্বাবস্থা হয়ে যায়। তাই উঠতি বয়সের ছেলেদের কেউ কেউ নদীতে গোসল করতে গেলেও মহিলাদের পক্ষে নদীতে গিয়ে গোসল করা কখনো সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাদের একমাত্র ভরসা বারেক মাষ্টার ও সুধির রায় মাস্টারের জোড়াদীঘি। গ্রামের মানুষের কথা বিবেচনা করেই দুইটি দীঘিতেই দুইটি করে ঘটলা পাকা করে দেয়া হয়েছে। একটি নিজেদের অন্যটি গ্রামের সবার জন্য। তবে যেহেতু দিঘির মাছের ওপরই সারা বছরের নির্ভরতা তাই, শর্ত আছে দীঘিতে সাবান মেখে, কাপড় কাচা যাবেনা। সবাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে সে শর্ত। দু’টি দিঘির চারটি পাড়েই বিভিন্ন ধরনের বনজ ও ফলধ গাছে ঠেসে আছে।
ঝাঁ ঝাঁ রোদের তপ্ত আগুনে যেন সব কিছু পুড়ে যাবে। চোখ মেলে তাকানো যাচ্ছে না উঠোনের দিকে। ঘরের ভেতর ও হামাগুড়ি দিয়ে ঢুছে তপ্তগরম। তাই বাড়ি ছেড়ে শামীম ও রমজান চলে এসেছে শামীমদের দীঘির পারে। দীঘির পশ্চিম পার্শ্বে বড় আমগাছ দু’টির নিচে এসে দাঁড়াতেই হালকা একটা বাতাসের শীতল পরশ এসে আছড়ে পড়ে শরীরে। গরমে যেখানের ঘরে-বাইরে কোথাও টেকা যাচ্ছে না এমন পরিস্থিতিতেও কৃষকেরা পুড়ে পুড়ে মাঠে কাজ করে যাচ্ছে। তা দেখে শামীম অবাক হয়। শামীম ও রমজান চারিদিকে শাখা বিস্তার করা পুরনো আমগাছে ওঠে বসে।
রমজান শামীমের চেয়ে বছর দুয়েকের বড় হলেও একই ক্লাসে লেখাপড়া এবং একই সাথে চলাফেরার কারণে দু’জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। এই ভরদুপুরে দুটো দিঘিতেই গোসলের জন্য যেন মানষের জ্যাম লেগে আছে। গাছের ওপর বসে বসে বিষয়টি উপভোগ করে শামীম।
রমজান এ গায়েরই ছেলে। শামীমের বাল্য বন্ধু এবং প্রতিবেশী। তার বাবা গ্রামের সম্পন্ন কৃষক। পাঁচ ভাই তিন বোনের কেউই স‹ুলমুখো হয়নি। একদম শৈশব থেকে শামীমের সাথে চলাফেরার কারণে রমজানই তাদের পরিবারের একমাত্র শিক্ষিত সদস্য। অন্য চার ভাই কৃষিকাজ ও টুকটাক এটা সেটা করে। তবে মা ছাড়া তার পরিবারের কোন সদস্যই চায় না সে লেখাপড়া করুক। তাদের কথা, লেখাপড়া করে জজ ব্যারিস্টার হতে হতে বুড়ো হয়ে গেলে আর রোজগার করবে কখন? তখন কি আর রোজগারের বয়স থাকে। তাই রজমানের লেখাপড়ার প্রতি ভাই ভাবীদের বিরাগের শেষ নেই। তাদের সবার এক কথা ‘লেখাপড়ার দরকার নাই’। এ কারণে মাঝে মাঝে তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যেত। আবার বারেক মাস্টার রমজানের বাবাকে বলে কয়ে স্কুলে যাবার ব্যবস্থা করতো। এভাবে দুইজন পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়লেও শামীম চলে যাওয়ার কারণে এ স্কুল ওই স্কুল করতে করতে লেখা পড়ায় পিছিয়ে পড়ে। কিন্তু একেবারে লেখাপড়া ছেড়ে দেয়নি সে। শামীমের কারণে লেখাপড়া ছেড়ে দিতে পারেনি রমজান। সে যখনই ছুটিতে বাড়ি আসতো তখনই রমজানকে লেখাপড়াটা ঠিকমতো চালিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিত। কোনভাবে ধাক্কাতে ধাক্কাতে মেট্রিক পাশ করেছে। এরপর আর পড়া হয়নি। যে পরিবারে সবাই মূর্খ; সেই পরিবারের একজন মেট্রিক পাশ সেটাইতে অনেক।
গাছে চড়ে আয়েশে বসে দুই বন্ধু মিলে মেতে ওঠে নানা গল্পগুজবে। এবার প্রত্যেকটি গাছেই আম ধরেছে প্রচুর। কাঁচা দুইটি ঢাসা আম পেরে চিবুতে চিবুতে গল্প জমিয়ে বসে। এখানে এলেই শামীমের মনে পড়ে যায় লতার কথা। এমন দিনে আমের চাটনী বিভিন্ন ধরণের আচার এনে খাওয়াতো লতা। শামীমও অদম্য উৎসাহে তাকে পেড়ে দিত ঢাসা ঢাসা আম। একদিন লতা বায়না ধরল, একটা পাকা আম পেরে দেয়ার জন্য। তখন আম পুরোপুরি পাকা শুরু না হলেও একদম মগ ডালে একটা হলুদ আম দেখতে পেয়ে এটা পাড়তে আরো ওপরের দিকে উঠতে থাকে শামীম। লতা একটা আম খেত চেয়েছে সেটা শামীম পেরে দেবেনা, সেটা কখনো হতেই পারে না। আরো একটু এগিয়ে গিয়েই ডাল ভেঙ্গে একাবারে ডোবার কাদায় পড়ে গিয়েছিল শামিম। ভাগ্যিস কাদায় পড়েছিল; না হলে তার হাড্ডি মাংস সব গুড়িয়ে যেত। তবু সে যাত্রায় বেশ চোট পেয়েছিল। এটা তাকে ভোগিয়েছেও কিছু দিন। সেসব দিনের কথা এখন বেশ মনে পড়ছে শামীমের। এখানে এলেই যেন লতার গায়ের গন্ধ খুঁজে পায় শামীম। শৈশবের অনেক সুবর্ণ সময় তাদের কেটেছে এই দিঘির পাড়ে। বিশেষ করে এ পুরনো আম গাছটির তলায়। এখানেই চলতো ওদের চড়–ইভাতি, নকল সংসার সংসার খেলা। এখানে এসে দাঁড়াতেই যেন নস্টালজিয়ায় পেয়ে বসেছে তাকে। ভীষণ মনে পড়ছে লতার কথা। তাই লতার কথা সরাসরি না জিজ্ঞেস করে অনেকটা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে শামীম –
: কিরে রমজান! তোর আলেয়ার খবর কি?
: কোন আলেয়া? রমজানের চোখেমুখে যেন বিষ্ময়!
: তুই আকাশ থেকে পড়লি বলে মনে হলো! আলেয়াকে এখন আমারই তোকে চিনিয়ে দিতে হচ্ছে?
: আরে না। রাগ করছ ক্যান। আমাগো গ্রামেতো আলেয়া আরো কতজনই আছে।
: গ্রামের সব আলেয়ার সাথেই কি তোর প্রেম প্রেম খেলা নাকি? বিরক্তির সুরে বলে শামীম।
: ও হেই কথা। হা হা হা। এই চলছে গাড়ি ঠেইল্যা-ঠুইল্যা। কথাটা বলার সাথে সাথেই তার চেহারায় হতাশার মেঘ জমে। গাছের শরীরে একটু আঁকিবুকি করে আবার বলে-
: তয় তারে মনে অয় আটকাইয়া রাখতে পারমু না। আস্তে আস্তে মন হয় মানুষ আলেয়ার আগের ঘটনার কথা ভুইল্যা গেছে। হে যে ভাইয়ের বউদের লগে ঝগড়া কইরা বিষ খাইচলো হেই কতা মন হয় সবাই ভুইল্লা গেছে; হের লাইগ্যাই অহন ঘন ঘন বিয়ার আলাপ আইতাছে।
: তাতো জানিই, আর কোন নতুন সমস্যা ?
: কত যে সমস্যা তা বইলা শেষ করা যাইতো না। এক হইল দুইদিন পর পরঐ পাত্রপক্ষ তারে দেখতে আসে। দুই নম্বর সমস্যা হইল; আমার কোন কুলকিনারা হইল না। বাবা-ভাইয়েরা চাপ দিতাছে চাকুরীর লাইগ্যা। চাকুরী যেমন গাছের আম চাইলাম আর পাইরা খাইলাম! আইজ কাইল চাকুরী হইতে মামা-চাচা না হয় দুলাভাইয়ের জোর লাগে। আমার চৌদ্দ গোষ্ঠীত এমন কেউ আছে যে আমারে ডাইক্যা নিয়া চাকুরী দিব। সবাইতো মূর্খ, খেতকামলা। ভালা চাকুরী পাইতে হইলে খুঁটির জোরের লগে লেখাপড়াও লাগে তেমন। আমার অবস্থা এখন গেছরা আলুর মতো।
গেছরা আলু কথাটা শুনে বেশ মজা পায়। হাসতে হাসতে শমীম বলে-
গেছরা আলু, হা হা হা।
রমজান অসহায়ভাবে শামীমের হাসি দেখে বলে-
: তুই আমার কতায় হাসতাছস, আমার জীবন গেছরা আলু নায়তো কি? গেছরা আলু যেমন না কাচা, না সিদ্ধ, এখন আমার অবস্থা হইছে গিয়া এমন। না শিক্ষিত না মূর্খ। ‘বাফের হোডেলে খাই মজিদে ঘুমাইর অবস্থা।’ বেকার। বেকার ছেলেরে কোন মা-বাপ বিয়া করায়, আর কে ই বা বিয়া দেয়। বিড়ি-সিগারেট আর পকেট খরচের টাকা জোগাইতে হয় মা’রে আত রাইখ্যা। চুরি কইরা গোলার চাইল বেইচ্যা। তুই অহন আমারে একজন পাক্কা চোরঐ বলতে পারস। বলতে পারস কিরে রমজান চোরা, কেমন আছত। তর অহন চুরি-টুরি কেমন চলছে। হা হা হা।
রমজানের কষ্টভেজা হাসির সাথে শামীম ও একাত্ব হয়ে যায় যেন। শামীম পিঠ চাপড়ে রমজানকে শান্তনা দেয়। রমজানের চোখ দুটো অশ্রুতে ছলছল করে। নিজকে মুহূর্তেই সামলে নিয়ে বলে-
: তয় ভালাই আছি। কিন্তু চিন্তা অইল আলেয়ারে নিয়া। হেরে না পাইলে কোন অঘটন যে ঘইট্যা যায়, কওয়া যায় না।
: কি অঘটন ঘটাবি, গাছে ঝুলবি?
: তা ও কওয়া যায়না। ঝুলতামও পারি।
: ধুর ব্যাটা কাপুরুষ! শামীম ধমক লাগায়। এটা কোন পুরুষ মানুষের কথা হলো। আর এটাতো কোনো নতুন সমস্যা নয়। পুরনো সমস্যা। ‘রাধা নাচনের কেচ্ছা’
: রাধা নাচনের কিচ্ছা মাইনে? রমজান বলে। শমীম হাসে হো হো করে। হাসি থামিয়ে বলে-
: ধুর গাধা, এটাও জানিস না। এটা একটা প্রবাদ,‘ষোল মন ঘি ও হবেনা, রাধাও নাচবে না।’ অর্থাৎ তোর এই জনমে চাকুরিও হবেনা আর আলেয়াকেও পাবিনা। তোর জীবন দেখছি ‘ষোল আনাই মিছে’।
আমার জীবন ষোলআনা মিছা হইতো নাতো, সত্য হইবো। ভাই তর মা-বাবার মত ঘরে ত জন্মাই নাই, এই হইল এক নম্বর মিছা। দুই নম্বর মিছা হইল তর মতো ত ইনভারসিটিত পড়ার কফাল কোন দিনঐ আমার অইত না। কারণ, তুই হইলি ভালা ছাত্র। তার ব্রেরেইন আল্লায় বানাইছে ঘি দিয়া। আমারটা বানাইছে গোবর দিয়ে। তাই দুই দুইবার ফেইল দিলাম। ত আমার জীবন মিছা হইব নাতো কি সত্যে জীবন অইবো?
রমাজানের চোখ ও চেহারার ভাষা পড়ে আর এগুয় না শামীম। পুরো ইউ টার্ণ নিয়ে বলে Ñ
: রমজান, তুই কি লতার কোন খবর জানিস? আসার পর থেকে রায় বাবু স্যারকে দেখিনা । স্যার কি বাড়িতে নেই। নাকি…
কথা শেষ করতে পারেনা। রমজান কথা কেড়ে নেয়-
: স্যাররে দেখবি ক্যাম্নে, স্যার বাড়ি থাকলে তো দেখবি। স্যারত আগরতলা গেছিল।
: আগরতলা মানে, ইন্ডিয়া?
হ ইন্ডিয়া। ইন্ডিয়াঐ গেছিল স্যার। তবে…
: তবে কি? শামীম জানতে চায়।
: স্যার এইতো আধাঘন্টা আগে বাড়িত আইছে। তোর একটা সুখবর আছে।
: সুখবর মানে?
: সুখবর মানে আর কি, মাইনে হইল গিয়া সুখবর।
: ফাজলামি করিসনাতো বল সুখবরটা কী?
: লতা। বলতে বলতেই লুঙ্গির কোছা থেকে বিড়ি বের করে আগুন ধরায় রমজান।
লতা নামটা বলার সাথে শামীমের ভেতরটা ঘুমভাঙ্গা অজগরের মতো মোচড় দিয়ে ওঠে। চেহারায় তার কৌতুহলের আর বিষ্ময়ের রেখা। বিষ্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই শামীম বলে-
: কি হয়েছে লতার? বিয়ে-শাদী নাকি?
বিড়িতে লম্বা একটা টান দিয়ে আকাশের দিকে ধোঁয়া ছড়িয়ে রমজান বলে-
: আরে না। বিয়ে-শাদী না। স্যারের লগে লতাও আইছে। রমজানের কাছে নিজের উচ্ছ্বাস গোপন করেই শামীমের সংক্ষিপ্ত জবাব-
: ও তাই বল। আমি ভাবলাম কি না কি!
: এত ছোড কইরা উত্তর দিলি যে, লতা তোর কাছে এহন তা অইলে আর কোনো সুখবর না! তুই এমন কথা কইতে পারলি। নাকি ঢাকা গিয়া সব ভুইল্যা গেছত। আমিতো তর সব কথাঐ জানি। নাকি জানি না?
: কি জানস?
: ক্যান, লতারে যে তোর ভালালাগত হেই কথা তুই আমারে কস নাই। যহনই ছুটিতে বাড়ি আইসস, এমন কোন দিন গেছে, তুই আমারে লতার কথা জিগাস নাই। কি মিছা কইলাম? কথা শেষ না করেই হঠাৎ করেই রজমান গাছ থেকে লাফ দিয়ে নামে।
: কি ব্যাপার নামলি কেন। যাচ্ছিস কোথায়? শমীম জানতে চায়।
: আসতাছি, তুই বস।
রমজানের শেষ প্রশ্নটির সরাসরি উত্তর দিতে পারেনি শামীম। ভেতরে ভেতরে একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে শৈশবের পাতা উল্টায়-

সরকার বাড়ি এবং রায় বাড়ি দু’টোই পাশাপাশি। বিশাল দুইটি দিঘির দু’মাথায় বাড়ি দুইটি। দিঘির দক্ষিণ মাথায় রায়বাড়ি। উত্তর মাথায় সরকার বাড়ি। সাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠার উজ্জল দৃষ্টান্ত এই দুই বাড়ি। উভয় বাড়ির মানুষই ঈদ ও পূজা সমান সমান উপভোগ করেন এক সাথে। এ নিয়ে উভয় সম্প্রদায়ের গোড়া ধর্মীয় নেতারা কানাঘুসা করলেও সম্পর্কে অবনতি ঘটাতে পারেনি।

চলবে——-

৩২০জন ২৩০জন
10 Shares

১৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য