মাতৃত্ব প্রত্যেক নারীর জন্য এক অসীম কৃপা মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে।এমনও অনেক নারী আছেন এই মাতৃত্বের অনুভূতি ছাড়াই জীবন কাটিয়ে গেছেন শেষাবধি পর্যন্ত। এরকম ভুড়ি ভুড়ি নারী আছেন যারা মা হওয়ার পরম সৌভাগ্য বা কৃপা থেকে বঞ্চিত রয়ে গিয়ে আজীবন শুন্যতা বহন করে চলেছেন বা পৃথিবী থেকেই বিদায় নিয়েছেন। ভারতের শাবানা আযমী, আমাদের সুবর্না মোস্তফা এরকম বহু নামী -বেনামি  নারী আজও রয়েছেন আমাদের জানাশোনার বাইরে অথবা জানার গন্ডিতে আছে। বিজ্ঞানের।অগ্রতির সাথে সাথে চিকিৎসা বিজ্ঞানেরও বহুলাংশে এগিয়ে যাওয়ার সুফলে টেষ্টটিউব বেবির কাহিনীও আমাদের জানা আছে অনেকেরই। আমার আরএক আত্মীয় আছেন, সে দম্পতিরও বিবাহিত জীবন ৩০ বছর চলছে। বিশ্বের সর্বোন্নত দেশে বসবাস করছেন এই ৩০ বছর ধরে সন্তানহীনা হয়ে। আমেরিকার মত দেশে টেষ্টটিউব পদ্ধতি অতি খুরুচে হবার কারনে বাংলাদেশে এসে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছেন এবং লাখ লাখ টাকা খরচ করিয়েছেন শুধুমাত্র একটা পজেটিভ রিপোর্টের আশায়। মহান স্রষ্টা না চাইলে পথের ধুলাও পায়ের আঙুলের টোকায় স্থানান্তর হয়না। সেই আত্মীয়া মামিও সন্তানের গৌরবান্বিত মা হতে পারেননি মহান স্রষ্টার ইচ্ছায়।

বিষয় ছিলো মাতৃত্বে জন্মপদ্ধতি নিয়ে। একটা কথা চিরন্তন সত্য বলে মানতেই হবে অকাট্যে। ‘বিধির বিধান না যায় খন্ডন’ সব রকম সতর্কতা বা সচেতন হবার পরেও যদি সন্তান জন্মের প্রাক্কালে জটিলতা দেখা দেয়! তখন বিকল্প ব্যাবস্থা নিতেই হয়।আমাদের দেশ স্বল্প শিক্ষিতের দেশ বলেই খ্যাত। যথাযথ শিক্ষা মাতৃত্ব কালিন জটিলতা সম্পর্কে অজ্ঞতা, পুরোনো ধ্যানধারনা, ধর্মান্ধতা, বাল্যবিবাহ, অপরিপুষ্ট শরীরে গর্ভ ধারন সহ নানামূখী জটিলতা থেকে জন্মকালীন সমস্যার সৃষ্টি হতেই পারে। এমনও অনেক রোগী শেষ মুহুর্তে যখন চিকিৎসকের কাছে যান,  তখন চিকিৎসকের হাতে করার মত তেমন কিছুই থাকেনা।  উপরন্ত সব দায় তখন চিকিৎসকের উপরে বর্তায়।আবার এমনও ঘটনা আছে সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরেও অজানা কারনে ডাক্তার কোনো এক অজানা রহস্যের কারনে সিজার(অস্ত্রোপচার) করার সিন্ধান্ত ধরিয়ে দেন রোগীর অভিবাবকদের। অনেকে এমনও আছেন- আগেভাগেই(গর্ভধারন করার আগে থেকে) মনস্থির করে নেন ‘ আমি বাপু ডেলিভারি পেইন সইতে পারবো না, তারচে সিজারই আমার জন্য ভালো’ আমারই এক বান্ধবি এমনটাই করেছে। আমাদের মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে মেয়েদের ফুলেল বিছানায় শুয়ে বসে গর্ভকালিন সময় কাটানোর কোনো সুযোগ আছে বলে আমি অন্তত মানবো না। গর্ভধারনের তিনমাস অবধি ভারী কাজ ব্যাতিরেকে এ হেন কোনো কাজ করা থেকে কোনো মেয়ে নিজেকে বিরত রাখেন বলে আমার ধারনা নেই। আমার চার নম্বর দেবরের স্ত্রী’র কথাই যদি বলি তো অবাক হতে হয়। গ্রামে থাকে আমার জা। গ্রামের বাড়ির কাজকর্ম আর গুণে বলার কিছু নেই। ধান সেদ্ধ শুরু করে ধান শুকানো পর্যন্ত। এ হেন কোনো কাজ নেই যা খাদিজা করে না। অত্যন্ত কর্মঠ আমার জা। একবারের জন্যও কোনো চিকিৎসকের শরনাপন্ন হয়নি। পাঁচ ওয়াক্ত নামায যার কখনো কাজা হয়না কোনো ওয়াক্তে। এক দুপুরে মাটির চুলায় রান্না করতে করতেই টের পাচ্ছিলো চিনচিনে ব্যাথা কোমড় থেকে শুরু হয়ে পুরো পা পর্যন্ত অবশ হয়ে আসছে। গুরুত্ব না দিয়েই সব কাজ সম্পন্ন করলো, উঠোন বাড়িঘর সব ঝাট দিলো। ঢাকা থেকে বেড়াতে যাওয়া খাদিজার সেজ ভাসুর(আমার সেজ দেবর) কে ভাত বেড়ে দিলো, নামাজও ফরজ রাকাত শেষ করে উঠে বুঝতে পারলো, সুন্নত সলাত আর আদায় করতে পারবে না। আমার বড় ননাস’কে ডেকে বললো মামি’কে খবর দিয়ে জলদি আসতে। মামি শাশুড়ি বাড়ির প্রধান গেইটে পা দেবার আগেই সন্তান ভুমিষ্ট হয়ে পৃথিবীর আলোতে চলে এসেছে। বড় ননাস নাড়ি ধরে বসে আছেন ভয়ে। মামি শাশুড়ি এসে কেবল নতুন ব্লেড দিয়ে নাড় কেটে পুত্র সন্তানকে মায়ের দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন।

এই ঘটনা থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট, স্বয়ং মহান আল্লাহ্ যাকে নিরাপদে রাখবেন বলে নির্ধারন করবেন তার আর ডাক্তারি শরনাপন্ন হবার দরকার কী? বলা বাহুল্য,  আমার জা’য়ের ৬টি সন্তান সব একই পদ্ধতিতে জন্মগণনা  করেছে। এবং প্রত্যেকটি সন্তান সুস্থ্য  সবল ভাবেই বড় হয়েছে এ পর্যন্ত।

আমার সেজ জা রুমার মাতৃকালিন সময়ের কথা বলি এখনঃ

প্রতি মাসে গাইনী ডাক্তার  মিটফোর্ড হাসাপাল এবং কলেজের অধ্যাপক ডঃ আনোয়ারার তত্বাবধানে ছিলো।প্রচুর কর্মঠ আমার এই জা’টাও। সবসময় সময় ধরে ধরে শৃঙ্খলার মধ্যে চলা আমার এই জাও নামায রোজায় কোনো গাফিলতি নেই এতটুকু। পহেলা বৈশাখের দিন আমার বাসায় তো পরের দিন ওদের বাসায় দাওয়াত। ওদের বাসায় যেদিন গেলাম। রুমাকে দেখেই আমার ভালো লাগেনি। মনে হচ্ছিলো শরীর খারাপ লাগছে হয়ত। জিজ্ঞেস করাতে যথাযথ কোনো উত্তর পাইনি। পরের দিন বিকেলে খবর পাঠালো রুমাকে হাসপাতালে নিতে হবে। আমি গেলাম সাথে। আমার ছোট ছেলে তখন দেড় বছর বয়স। মেজো জায়ের কাছে রেখে আমি রুমার সাথে গুলশানের মাদার &বেবি কেয়ার ক্লিনিকে গেলাম। তখন রাত সাড়ে আটটা মত।  রুমার মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই কতটা পেইন হচ্ছে। নার্স ডাক্তার ভিজিট করে বলে গেলেন দেরি আছে হাঁটুন। ক্লিনিকের করিডোর থেকে শুরু করে আশপাশ সারারাত ধরে হাঁটাহাঁটি। আমি নার্সদের ঘুম ভাঙিয়ে ৩/৪ঘন্টা পরপর ডেকে তুলি একটু দেখে যান এখন কী অবস্থা? নার্স আমার ওপরে কেমন কেমন চোখে তাকায়। বিরক্তি প্রকাশ করতেও যেন তাঁদের ব্যাক্তিত্বে বাঁধে এমন ভাব। অর্থাৎ এখানকার ডাক্তার নার্সদের আচরনগত ব্যাবহার অত্যন্ত সন্তোষজনক। কোনো বিপরিত অভিযোগ করার মত কিছু খুঁজে পাইনি। সারারাত কাটিয়ে সকালে আমি বাসায় ফিরলাম, যেহেতু ছোট বাচ্চা রেখে গেছি আরেক জায়ের কাছে। সেদিনটাও পুরো কেটে গেছে এভাবেই। একটাই কারন….নর্মাল ডেলিভারী। সন্ধ্যার পরে ডাক্তার এসে চেকআপ করে জানালেন সিজার লাগবে। তখনও রুমার আব্বা এবং রুমা নিজে আরো অপেক্ষা করতে চাইছে যাতে সিজার ছাড়াই সন্তান জন্ম হয়। ডাক্তার বললেন, তাহলে আপনারা রিস্ক নিন, আমি কোনো ঝুঁকি নেবনা। বাচ্চার হার্টবিট বেড়ে গেছে, রোগীর প্রেসার ফলডাউন করছে। এ অবস্থায় আমি তো কোনো দায়িত্ব নেব না’।  অবশেষে সন্ধ্যা ৭:৩০ মিনিটে সিজারের মাধ্যমে প্রথম কন্যা সন্তানের জন্ম দিলো রুমা।

অনেকেই বলেন, সিজারের বাচ্চারা সাধারনত খুব বেশি রোগে ভোগে। আমার সেজো দেবর আর রুমার এক মেয়ে এক ছেলে দেখে এমন ধারনা আমার মনেই আসেনা। এই বিষয়টা নিয়ে লেখার আমার আগ্রহ এজন্যই জন্মেছে যে, আমার দেখা শোনা জানার আওতায় যতগুলো জন্মকালিন ঘটনা আমি জানি, তা কোন যুক্তিতে অস্বিকার করব? যে লেখাটা পড়ে আমার মনে নানামূখী প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছিলো, তার কিছুটা হলেও এই লেখার মধ্যে রেখে যেতে চাই পাঠক বৃন্দের কাছে। একটা বিষয় হলো, আমি যদি কোনো বিষয়ে নেগেটিভ বলি, তা আমি আমার মত করেই বলে যাব যুক্তিহীন ভাবে। যেমন ওই লেখক যেভাবে ঢালাও ভাবে একপেশে ডাক্তার এবং বর্তমান নারীর অবহেলা, কর্মবিমূখতা, মহান আল্লহর প্রতি আস্থা না রাখা, মোট কথা ধর্মের প্রসঙ্গ টেনে, ডাক্তারি ব্যাবসাটাকে জোড় দিতে চাওয়া।লেখক জেনো ধরেই নিয়েছেন  ওনার বক্তব্য অনুযায়ী সবটাই সঠিক। আমার বিরোধিতা সেখানেই।

আমার মেজো জা নিপা যেবার প্রথম মা হবার সুসংবাদ পেলো! সেও সেই নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে  চলা, এবং যাবতীয় আনুষঙ্গিক নিয়মানুবর্তিতা মেনেই চলছিলো পুরো গর্ভকালীন সময়। আর তারওপর নিপার সাথে ছিলাম আমি নিজে ওর দেখাশুনা করার। যথাসময়ে লেবারপেইন শুরু হলে নিয়ে গেলাম অধ্যাপক ডঃ আনোয়ারা বেগমের ক্লিনিকে। ডাক্তার চেকআপ করে বলে দিলেন বাসায় নিয়ে যান, ব্যাথা বেড়ে গেলে সকালে নিয়ে আসবেন।  সারারাত লেবার পেইন ভোগ করে সকালে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার জানালেন, সিজার জরুরী। বাচ্চা পজিশনে আসছে না। আপনারা কি করতে চান অপেক্ষা নাকি সিজার? এই একটা কথার ফাঁক! ডাক্তার সরাসরি কেন বললেন না সিজারই দরকার? কেন বললেন না রোগী বা সন্তানের কি কি অসুবিধা হতে পারে সিজার না করার কারনে? আমার দেবর সহ ওখানে তখন উপস্থিত অনেকেই মাঝখানের ওই ফাঁকটুকুর সুযোগ নিয়ে বলে দিলেন ‘অপেক্ষা করতে চান ‘।  নর্মাল ডেলিভারী  হবার অপেক্ষা। পাশেই আরেক মেয়েকে দেখছি অসহ্য যন্ত্রনায় গলাকাটা গরুর মত চিৎকার করে যাচ্ছে।সে মেয়েরও কম্প্লিকেশন ধরা পরেছে। মেয়েটা অল্প বয়সী দেখে নিজেরই কষ্ট হচ্ছিলো। আমার জা নিপাও কম বয়সী। ১৯ বছরে মা হতে যাচ্ছে। লম্বায় বেশ খাটো। এটা আরেকটা কারন স্বাভাবিক সন্তান জন্মদানের বাধা। মেডিকেলের পরিভাষা ব্যাখ্যা করতে পারছি না এখানে।সে জন্য দুঃখিত। নিপাকে স্যালাইন এবং ব্যাথা বাড়াবার ইঞ্জেকশন পুশ করা হলো। ৩৫/৪০ মিনিটের মধ্যে নিপাকে লেবার রুমে নেয়া হলো। ডাক্তার নার্সের আপত্তির কারনে আমাকে থাকতে দেয়া হলো না লেবার রুমে। একজন মুরুব্বি(নিপার মায়ের দিকের আত্মীয়) কে রাখলেন। তারও প্রায় ৫০ মিনিট পরে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ পাওয়া গেলো। জানানো হলো ছেলে সন্তান। অস্বাভাবিক স্বরে বাচ্চা কাঁদছিলো। নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলাম না বলে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লাম লেবার রুমে।পাশের একটা খালি বেডে বাচ্চাটাকে রাখা হয়েছে। ডাক্তার নার্স নিপাকে নিয়ে ব্যাস্ত। নিপাও চিৎকার করে যাচ্ছে এখনো যন্ত্রনায়। কিন্তু বাচ্চার কান্না অস্বাভাবিক লাগছে আমার কাছে। একটানা গলাচিড়ে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। আমি অনুমতি নিয়ে কোলে তুলে নিতে গিয়ে বাচ্চার মাথাটা লক্ষ করলাম। এমন কেন? মাথা হওয়ার কথা গোল অথবা একটু চ্যাপ্টা ধরনের,  এ তো পুতা’র (পাটা-পুতা)শিল -নোড়া=মশলা বাটা হয় যাতে) মত লম্বাটে!!যাইহোক, কাউকে কিচ্ছু না বলে বাচ্চার কান্না থামাবার  চেষ্টা করতে লাগলাম। মা ছেলেকে কেবিনে দিয়ে আমি বাসায় চলে এলাম। বিকেলে শাশুড়িকে নিয়ে যখন গেলাম তখন তারা অপে ক্ষা করছিলো আমার ওখানে পৌঁছুবার। কারন কি? বাচ্চা এবং মা’কে অন্য ক্লিনিকে স্থানান্তর করতে হবে। বাচ্চা কিছুক্ষন পরপর হিচকি দিচ্ছে, মায়ের দুধ টেনে খাচ্ছে না। চামেলিবাগ থেকে ইস্কাটন নিয়ে চললাম। ওখানে শিশু বিশেষজ্ঞ বাচ্চার চিকিৎসা করবেন। রাতে বাসায় ফিরেছি। তখন হাতে হাতে মোবাইল ছিলো না। ল্যান্ডফোন ও নেই। কাজেই সময় সময় খবর জানা সম্ভব না। পরেরদিন যখন সন্ধ্যার পরে ক্লিনিকে গেলাম! জানলাম, দুপুরে বাচ্চার অবস্থা শংকটাপন্ন হওয়াতে স্থানান্তর করা হয়েছে ঢাকা শিশু হাসপাতালে। ইস্কাটন থেকে বেবিট্যাক্সি  নিয়ে ছুটলাম আগারগাঁও শিশু হাসপাতাল। বাচ্চাকে রাখা হয়েছে ইনটেনসিভ কেয়ারে। নিবিড় পর্যবেক্ষনে।নিপা ইস্কাটন ক্লিনিকে। ওখানকার ডাক্তার জানালেন, যখন দরকার হবে তখন বাচ্চার মাকে নিয়ে আসবেন। ওখানে ভীড় করে লাভ নেই। পরেরদিন নিপাকে পৌঁছে দিলাম আগারগাঁও শিশু হাসপাতালে।

নিপার কম্প্লিকেশন ধরা পড়েছিলো সন্তান প্রসবের দুমাস আগেই। কয়েকবার আলট্রাসনোগ্রাফি করার রিপোর্টে বলা হয়েছিলো সিজার লাগবে। যখন নেয়া হলো লেবার পেইন শুরু হবার পরে তখনো বলা হলো সিজার লাগবে। এখানে ত্রুটি কার? ডাক্তার না রোগীর অভিভাবক বৃন্দের। নাকি ওই লেখকের ভাষ্য মোতাবেক উল্লেখিত কারনসমূহ?

টানা ৭দিনের পর্যবেক্ষনের পরে বাচ্চা দেয়া হলো মায়ের কাছে। প্রতিদিন দুটো ইঞ্জেকশন পুশ করতে হয়েছিলো সেই সময়ে (আজ থেকে ২৩/২৪ বছর আগে) যার মূল্য ১৫০০/২০০০।

ওই সাতদিনে সর্বসাকুল্যে টাকার পরিমান ছিলো প্রায় ৭০/৮০ হাজার টাকা। ভেবে দেখার বিষয় হলো সিজারের খরচ বা নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য কোন পদ্ধতিটা তাহলে উপযুক্ত ছিলো? পরবর্তি সময়ে যে বাচ্চাটা সম্পূর্ণ সুস্থ্য হয়ে উঠেছিলো তা কিন্তু নয়। এখানে আরেকটা যে বিষয় স্কিপ রয়ে গেছে তা হলো, নিপার প্রসব বেদনার অন্তিম পর্যায়ে ডাক্তার দেখলেন বাচ্চা পাঁজরের দুই হাড়ের সংকীর্ণতার কারনে, বাচ্চার মাথা আটকে গেছে দুই হাড়ের মাঝখানে।যখন আর হাতে বিকল্প কোনো পথ নেই তখন আধুনিক অস্ত্রের সাহায্যে টেনে বের করায় বাচ্চা প্রসব পরবর্তি সমস্যায় পরেছে। বুকের দুধ টেনে খেতে না পারা, দুদিন পরপর প্রচন্ড হিচকি, নিঃস্বাসের কষ্ট। পরবর্তিতে মাথায় প্রেসার নিতে না পারা। এবং সবচে যে প্রতিবন্ধকতা লক্ষনিও তা হলো,  বাচ্চাটা পড়া মনে রাখতে পারতো না। টেনেটুনে এইচ এস সি পার করে ভার্সিটি লেভেলে এসে শেষে ছেড়েই দিলো পড়াশোনা। জীবন বড় বিচিত্র। আমাদের মজ্জায় মিশে আছে যে কোনো ত্রুটি বিচ্যুতির ময়না তদন্ত করতে গিয়ে তুচ্ছ অথবা মূল কারনটাকে ধামাচাপা দিয়ে বুঁদো খুঁজি উঁদো হয়ে চাপিয়ে দেবার মত একটা ঘাড়(উদোর পিন্ডি বুঁদোর ঘাড়ে)। প্রতিটা বিষয়েরই আলাদা আলাদা কারন অবশ্যই আছে বা থাকে। আমরা মেনে নেই আবার কখনো বিতর্ক করি নিজেদের মতো নিজেদের মহা পন্ডিত ভেবে।

আমার সবচে ছোট জা মুক্তা যখন সন্তান প্রসবা!ওকে  নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পরে আমি নিজে নার্সকে বলেছি -‘সিজার করেন, ওর গরুর মত চিল্লানী সহ্য হচ্ছিলো না। মুক্তারও সেই ধৈর্য নেই যে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে বাচ্চা জন্ম দেবে। মেজো জা নিপা,আমি দুজনেই ছোট দেবরকেও বললাম, সিজারে রাজি হয়ে যা, হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ড একমাত্র মুক্তার চিৎকারে রাতের নিস্তব্ধতা ভয়ানক লাগছিলো। ১৫/১৬টা সন্তান সম্ভবা মহিলারা বরং বিরক্তিভরে দেখছিলো আমার জা মুক্তার বিভৎস চিৎকার। প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হচ্ছিলো, অথচ কার কথা কে শোনে?

আমার এই ছোট জা মুক্তার ক্ষেত্রে আমি  ওই লেখকের কিছু পয়েন্টে একমত।

 

আমি নিজে যখন প্রথম সন্তান সম্ভবা হলাম! অধ্যাপক ডঃ আনোয়ারার কাছ থেকে নিশ্চিত হবার পরই একটা বাক্য উচ্চারন করেছিলাম।আমি কোনো ক্লিনিক হাসপাতালে থাকব না। মায়ের কাছে থাকব। পারিবারিক একজন বহুবছরের ধাত্রী  আছেন লালবানু আপা, সবার উপরে মহান আল্লাহ্ আর তারপর লালবানু আপার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। মাসে মাসে চেকআপে থেকেছি।প্রতিবার মনে হতো,  শুধু শুধু কেন যাই? আল্লাহর রহমতে কোনো অসুবিধা নাই।দুমাস আগেই মায়ের কাছে চলে গেছি।লালবানু আপা একদিন পরপর আসেন, দেখে যান। অথচ দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আমার বেলায় এসে হোঁচট খেলো। তিনদিন চার রাত অবধি পেইন নিয়ে শেষ মুহুর্তে ঘটলো জটিলতা। খুব সাধারন জটিলতাও মারাত্মক হয়ে ওঠে কপালে লেখা থাকলে। আমার বেলায়ও হলো তেমন। আমি মায়ের কাছে যাবার পরে মা আরেকজন অভিজ্ঞ নার্সের সাথে যোগাযোগ করে রেখেছিলেন।প্রচন্ড প্রসব ব্যাথা থাকার পরেও যখন বাচ্চা ভুমিষ্ঠ হবার লক্ষন দেখা যাচ্ছিলো না! শেষ রাতে আব্বা, মেজো চাচা ছুটলেন ডাক্তার আনতে আম্মাকে কতক্ষন বকাঝকা দিয়ে! কেন আমাকে বাসায় রাখা হয়েছে বলে। হাসপাতাল বা রেডক্রিসেন্ট হাসপাতালে কেন নিতে দিলো না। আম্মা বলেছিলেন, আগে ডাক্তার আনো, ডাক্তার যদি বলে হাসপাতালে নেয়া লাগবে! তাইলে নেবো।। আম্মা গেলেন নার্স নাসিমা খালাকে ডাকতে।নাসিমা খালা এসে দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে ঘুম চোখে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষন আমার দু’ভাগ হয়ে যাওয়া পেটের দিকে। আগের সপ্তাহে এসে তিনি সব পরীক্ষা করে বলে গিয়েছিলেন আম্মাকে, আল্লাহর রহমতে সব ঠিক আছে, এখন অপেক্ষা করো সতীন বা স্যারের সতান আসার।” তখনও তার মনে হয়নি যমজ বেবি হবার মতো কোনো অস্তিত্ব। কিন্তু এখন কেন মনে হচ্ছে পেটে টুইন বেবি? পেটে হাত রেখে তার ভুল ভাঙল।কমপক্ষে  ৪/৫ঘন্টা হয়ে গেছে ব্লাডার ক্লিয়ার হয়নি। পেট দুভাগ হয়ে গেছে ইউরিনের চাপে।বাচ্চা বাঁ পাঁজরের  কোনে চেপে আছে। আর আমি প্রসব যন্ত্রণায় আধমরা। ইতিমধ্যে  তিনি স্যালাইন ঝুলিয়ে ব্লাডার ক্লিয়ার করার ব্যাবস্থা করে ফেললেন। কাছে থাকা লালবানুআপা যেন দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় নাকানিচুবানী খেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। বোঝাতে চাইলেন, অধৈর্য আমি এবং আমার মা চাচি। আমি ব্যাথা ভুলে পরিস্থিতী আঁচ করছিলাম। এখন ঝগড়া লেগে যাবে নাতো? ডাক্তার এসে দেখে সব আপডেট নিলেন নাসিমা খালার কাছ থেকে। সব ওকে।  সবার অগোচরে ডাক্তার নার্স চোখাচোখি করে নিয়েছেন তখন তা কেউ টের পায়নি।

সকাল ৮:৪৩ মিনিটে একটা চিৎকার কানে এলো আম্মার, ‘এত কষ্টের পর এইয়া?” আমি সহ ওই রুমে থাকা সবাই বুঝতেই পারেনি আসল কাহিনী কি? আমি কান উৎকর্ণ করে রেখেছি, কখন শুনবো আমার প্রথম সন্তানের কান্নার আওয়াজ! ১৫/২০ মিনিট পর আওয়াজ পেলাম কান্নার। তিন চারদিন পরে জানা গেলো, বাচ্চার হার্টবিট বেড়ে গিয়ে মৃতাবস্থা হয়েছিলো। ভুমিষ্ঠ হয়েছে একেবারে মৃতের মত। নাসিমা খালা মুখের ভেতর মুখ দিয়ে শ্বাস দিয়ে, উল্টো করে পিঠ চাপড়াতে চাপড়াতে ১৫/২০ মিনিট পরে নিঃশ্বাস নিয়ে কেঁদে উঠেছিলো প্রথম কন্যা সন্তান আমার সুরঞ্জনা ইসলাম শিফা।

 

কোনো মেয়ে বিয়ের পরে পরিপূর্ণ নারী হয়ে ওঠেন মহান বিধাতার অপরিসীম মহা কৃপায় সন্তান ধারনের মাধ্যমে। সন্তান ধারনের চিহ্নগুলো চিহ্নিত হওয়ার পর থেকেই ধর্মিয় এবং আবশ্যিক সবরকম সতর্কতা অবলম্বন করা হয়ে থাকে বলে আমার ধারনা। অজ্ঞতা, অশিক্ষা, কুসংস্কারের কারনে অনেক সময় নানারকম বিপদ ঘটে থাকে। এতে বিতর্কের কিছু আছে বলে আমার মনে হয়না। পুরুষ শাষিত সমাজে সবসময় একটা শ্রেনী নারীদেরকে দোষারোপ করে আসছেন যে কোনো পরিস্থিতীর কারন হিসেবে। এক শ্রেনীর পুরুষ সবসময় নারীর দোষ খুঁজতেই তৎপর থাকেন। ধিক্কার তাদের প্রতি।

যে সব কারনে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে বাচ্চা জন্ম হবার সম্ভাবনা দুরহ হয়ে ওঠে, সে কারন গুলো সম্পর্কে আগে থেকেই মোটামুটি ধারনা নেয়া উচিত বলে মনে হয় আমার। আমার ছোট কাকিমাও দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দেবার আগেই উচ্চরক্তচাপের কারনে ব্রেইনস্ট্রোক করলেন। সিলেট ক্যাডেটের হাসপাতালের ৫/৬জন ডাক্তার সর্বস্ব চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। যখন বোঝা গেলো কাকিমার আর আশা নেই, তখন সিজারের মাধ্যমে কন্যা শিশুটিকে পৃথিবীতে নিয়ে এলেন।

অযথা সিজারের বিরুদ্ধে আমারও অবস্থান। কারন এ কথাও অনস্বীকার্য  যে, সিজার করার পরে মায়ের স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব নয়।

 

 

বি,দ্র, পূর্ববর্তি লেখার পরে এ পর্ব দিতে দেরি হলো বলে দুঃখিত।

১২৬জন ৫জন
0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য