প্রিয় মা,

তোমাকে কতদিন হল দেখিনি। আমি তোমার “মেয়ে” এই অনুভূতিটা, অধিকারটাও আস্তে আস্তে কেড়ে নিয়েছো। ছোটবেলায় তোমায় জড়িয়ে বাঁচতাম, তোমার হাসিতে হাসতাম আবার তোমার কান্নায় কাঁদতাম। তুমি কি তা জানতে না? জেনেও না জানার, না বোঝার ভান করতে!

আশা করি এখন তুমি ভালো আছো, সুখে আছো, খুব আনন্দে আছো। আমার দুষ্টুমি আজ আর তোমায় বিরক্ত করে না, আমার ছেলেমানুষি আজ আর তোমাকে সহ্য করতে হয় না। জানো মা এখনো সকাল হলে, বিকেলে মাঠে বড় রাস্তায় ভিড় জমলে তোমার সিঁদুরমাখা লাল পলা, সাদা শাঁখা সিঁথিতে সিঁদুরের সাজ চোখে ভেসে উঠে।

তুমি যে আমার “মা”, আমাকে পৃথিবীতে এনেছো! যখন চার বছর বয়স তখন থেকে আমাকে আগলে আগলে রেখেছ। আমার অ আ ক খ, আমার এ বি সি ডি র অহংকার সব তোমার দান।

ষোল বছর যখন হলো, তখন তুমি আমাকে এক নারী রূপে দেখলে। এক মেয়ে, যার অস্তিত্ব শুধু সংসারের সেবায়, সংসারের উঠোনের পাতা কুড়োনো, বাসন মাজা, ভাইয়ের যত্ন নেওয়া, স্নান করানো, রান্না করা, জল তোলা, ধান ভাঙা, চাল বাছা, বুড়ো দাদুর খেয়াল রাখা—–“আমি” তখন এক নারী তে রূপান্তরিত হলাম। তুমি-ই শেখালে পড়াশোনা নয় স্বামীসেবাই মেয়েদের মূলমন্ত্র।

এখন আমার ছাব্বিশ। এক বাচ্চার মা। পড়াশোনাটা না হয় কষ্ট করে চালিয়েছি কিন্তু স্বাধীনতাটা তুমি ছিনিয়ে নিয়েছ। বাপের বাড়ির খাওয়া, হৈ চৈ, লুডো খেলা, জমিয়ে পিকনিক সব মনে পড়ে। আর যাই হোক শ্বশুরবাড়ির দয়াতে বাঁচতে হতো না। শ্বশুড়বাড়ির জল অন্ন সবেতেই খুব দাম মা, যেখানে খোঁটা খেয়েই সারাজীবন বেঁচে থাকতে হয়।

জানিস মা তোর দেওয়া গহনাগুলো আর পরতে ভালো লাগে না। বাচ্চা নিয়ে এতোই ব্যস্ত তোর কোলের স্বাদ কবেই ভুলে গেছি। খুব একা একা লাগে মনে হয় তুই আমাকে ছেড়ে অন্য মেয়েকে আপন করেছিস।

বিয়ে হয়ে গেলে কি মেয়ে বাপের বাড়িতে থাকতে পারে না? পর হয়ে যায়! আজ তুমি মুক্ত, তোমার গন্ধ, তোমার মায়া সবটাই কি মুক্ত? জানি না মা তুমি এখনো মনে করছো কিনা আমার কথা, তবে আমি প্রতিক্ষনে ক্ষনে তোমাকে খুব মিস করি!

জানো মা এখন আর কেউ তোমার মতো ডাকে না। খাবার বেড়ে অপেক্ষা করে না বরং আমাকেই অপেক্ষা করে বসে থাকতে হয় প্রতিদানে অবহেলার চাটি মেলে। বুঝতে পারি সংসারের বৌ মানে, অনুগ্রহ আর দয়ার পাত্রী। কন্যা কে পেটে ধরে অনেক কষ্টই পেয়েছ?

এখন আমি অনেক বড় অনেক অভিজ্ঞতার বোঝা পিঠে চেপে বসে আছে। শৈশব, কৈশোর, স্কুল জীবনের দিনগুলি! বৌ বাসন্তী, টিপ খেলা, রান্নাবাটি খেলার সেই স্বাধীনতা সেই খোলা মাঠের উন্মুক্ত ভালোবাসা কোথাও খুঁজে পাই না মা! তুমি আর “আপন” মনে করে বকতেও পারো না কেননা আমি পরের বাড়ির সম্পত্তি, “বৌ”!

যাইহোক তুমি খুব ভালো থাকবে। আমার ভালোবাসা সবসময় তোমার জন্য থাকবে। খেতে বসে চোখের জল ফেলবে না তাহলে আমার গলা থেকে ভাত নামবে না। তুমি আমার মা আমার জন্মদাত্রী; তুমি কষ্টে থাকলে আমি কি করে ভালো থাকব? বাবারও ভালোভাবে যত্ন নিও।

ইতি
তোমার মেয়ে অরুণিমা

৩৮৮জন ৩৮৭জন
0 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য