মাকে মনে পড়ে

সিকদার ৬ অক্টোবর ২০১৫, মঙ্গলবার, ০৩:৫৪:৪৮অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২১ মন্তব্য

মা ছোট্ট একটি বাক্য । কতইনা মধুর । মা নামের আরও উপনাম আছে আম্মা , মাম্মি , মাম ।

আমরা আমাদের মাকে কখনও মা ডাকিনি । আমরা সব সময় আম্মা বলে ডাকতাম । অসুখে হোক , বিপদে হোক , আনন্দে হোক, বেদনায় হোক আমরা সব সময় আম্মা বলেই ডাকতাম। আমার আম্মা ছিলেন হুবহু বাংলাদেশের একজন প্রধান মন্ত্রীর মতন । চেহারায়, গায়ের রংয়ে, লম্বায়, এমনকি ব্যাক্তিত্বে প্রায় এক রকম। তবে প্রধানমন্ত্রীর মতন আর্টিফিশিয়াল কোন মেকাপ করতেন না । সাধারন সাজগোছেই আম্মা থাকতেন অসাধারন । উনার আত্মসম্মান বোধ ছিল খুবই প্রখর । আমারা আম্মাকে আপনি বলে সম্বোধন করতাম । একদিন আমি কি কারনে যেন তুমি বলে সম্বোধন করেছিলাম । যেই না তুমি বলেছি তারপর আমার উপর শুরু হয়েছিল কঠিন তিরষ্কার আর বকাবকি । এরপর আর কোনদিনও তুমি ডাকার মত ভুল করিনি। আম্মা ছিলেন শিক্ষিত রুচিশীল সদা হাস্যময় প্রানচান্চল্য ভরপুর। যে কোন অনুষ্ঠানে গেলে আমার আম্মা একাই মেয়ে মহলটাকে হাস্যরসে ভরপুর করে রাখতেন। এজন্য ছোট বড় সব মহিলারা যে কোন অনুষ্ঠানে আম্মাকে পেলে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠত। এত গল্প কৌতুক তিনি জানতেন যে কখনও তার জানার পরিধি পরিমাপ করা যেত না। আর জানবেন নাই বা কেন । কারণ তিনি প্রচুর বই পড়তেন । আমার নানিও ছিলেন নাকি বইয়ের পোকা । আমরা চার ভাইও তেমন বইয়ের পোকা । আমার মেয়েতো হুবহু আমার আম্মার মত গঠনে গাঠনে মেজাজ চলাফেরা এমনকি বই পড়াটাও ,এতটুকু অমিল নাই । যদিও ওর বয়স মাত্র সাড়ে এগার।

বই পড়ার ব্যাপারে আম্মার কোন বাছ বিচার ছিল না । ছোট কালে দেখেছি চুলার পাড়ে রান্না করতে করতে বই পড়ছেন । অনেক সময় বই পড়ায় মশগুল থাকাতে চুলার দুধ বা ডাল উথলে নিচে পড়ে যেত । অসম্ভব বইয়ের পোকা ছিলেন তিনি। বাজারে ঠোংগার নিচে যে কাগজটা থাকত সেটাও উনার পড়া চাই । ( আমাদেরও এই স্বভাবটা আছে । উনার থেকেই পাওয়া। )। উনি একজনের একটি বিছানায় একাই শুতেন। এশার নামাযের পর অনেকক্ষন কোরান শরীফ পড়তেন । তারপর ভাত খেয়ে শুয়ে পড়তেন । বেশ মোটা ছিলেন তাই শুয়ে শুয়ে বই পড়তেন। বয়স হওয়ার পর রাতে সহজে ঘুম আসতনা বলে অনেক রাত পর্যন্ত লাইট জ্বালিয়ে বই পড়তেন । পড়তে পড়তে চোখ ঘুম আসলে গভীর রাতে বিছানা থেকে উঠে লাইট নিভাতে কষ্ট হত বলে , উনার বিছানার পাশে ছোট একফুটি টিউব লাইট লাগিয়ে দিতে হয়েছিল। উনার বিছানায় সারাদিন নানা ধরনের বই পড়ে থাকত । মাসিক মদিনা , ইসলামিক গল্প ,বেগম ( মহিলা লেখিকাদের পত্রিকা ) ঝিনুক ( অনেক আগের সিনেমা পত্রিকা ) ভ্রমন কাহিনী, মাসুদ রানা , রহস্য পত্রিকা , বিচিত্রা, শারদীয় পূজা সংখ্যা , আরও কত কি বই । এর মাঝে উর্দু গল্পের বইও ছিল। তিনি উর্দু ও হিন্দি দুই ভাষাই পড়তে ও লিখতে পারতেন । উনার জন্য আমি অমর বই ঘর , ফুটপাতের পুরাতন বই বিক্রেতার কাছ থাকে উর্দু বই খুজে খুজে আনতাম। রহস্য পত্রিকা হকার থেকে নিতাম। আমার পিঠেপিঠি ছোট ভাই মেজটা আনত শারদীয় পূজা সংখ্যা ।

জীবনের শেষ দিকে উনার যখন ক্যান্সার রোগ ধরা পড়ে তখন একবার কেমো থেরাপি দেওয়ার পরই চোখের দৃষ্টির চরম ক্ষতি হয় । তখন উনার সেকি কান্না । বার বার আমাদের বকাবকি করছেন চশমার পাওয়ার বাড়িয়ে আনার জন্য। আমরাও উনার আবদার মত পাওয়ার দ্বিগুন করে আয়না এনে দিলাম তারপরও পড়তে পারছেন না, তাই আবার আরও দ্বিগুন পাওয়ারের আয়না এনে দিলাম তারপরও বই পড়তে পারেন নি। বই পড়তে না পারার যে আক্ষেপ ও বেদনা উনার হৃদয়ে রক্ত ক্ষরণ করত তা বাইরে থেকেও বোঝা যেত । বিছানায় মাথার পাশে রাখা ছড়ানো ছিটানো বই গুলো দেখে দেখে বইগুলোর উপর উনার দুর্বল কোমল হাত বুলিয়ে দিতেন আর নোনা চোখের জলে স্রষ্টার কাছে অভিযোগ করতেন হে প্রভূ রোগ দিয়েছ মেনে নিয়েছি, চোখের দৃষ্টি কেন কেড়ে নিলে ? যে কদিন বেচে আছি সে কদিন কোরান তেলোয়াত আর বই পড়া ছাড়া কি করে বাচব বল?

আমার আম্মা থেকে শোনা অনেক গল্প থেকে একটি গল্প দিলাম পড়ে দেখুন কেমন হাস্যরসে ভরপুর।

কুচমহল।

অনেক আগে ভারত উপমহাদেশে এক বাদশাহ ছিল। বাদশাহর খাবার মেনুতে অনেক দামি খাবার থাকলেও বাদশার প্রিয় খাবার ছিল কচু শাক। একদিন বাদশাহর সেই প্রিয় খাবার একদিন বিড়ালে রান্নাঘর থেকে চুরি করে খেয়ে ফেলল। এরপর বার্বুচি মহাচিন্তায় পড়ে গেল, দরবার ভর্তি দেশি-বিদেশী এত লোকের সামনে কিভাবে বাদশাহকে এই খবরটা দেবে। দরবারের লোকেরা যদি শুনে বাদশাহ কচু শাক খায়…। দরবারের সবাই ছি ছি করবেনা। হঠাৎ বার্বুচির মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। বের করে ফেলল বাদশাহকে ঘটনাটা কিভাবে বলতে হবে। সে রান্নাঘরে বেশ কিছুক্ষন দৌড়ে গায়ের ঘাম বের করল, তারপর যুদ্ধের পোষাক পড়ে দৌড়ে দরবারে প্রবেশ করল । বাবুর্চির যুদ্ধের পোষাক পড়া ঘর্মাক্ত দেহ দেখে বাদশাহতো অবাক!

বাবুর্চি হাপাতে হাপাতে উচ্চ কণ্ঠে বলল:হুজুর হুজুর আপকা কুচ মহল লুট গেয়া । (হুজুর আপনার কাচের মহল লুটে নিয়ে গেছে ।) ।

বাদশাহ প্রথমে বার্বুচির কথা বুঝতে না পারলও কিছুক্ষন পড়ে বুঝতে পারল । বুঝতে পেরে রাগের সাথে গদি থেকে উঠে চিৎকার করে বলল:কৌন লুট লিয়া?(কে লুটে নিয়েছে?)।

:হুজুর বেলাওয়ার খা লুট লিয়া।

বাদশাহ বুঝতে পারল বেলাওয়ার খা অর্থাৎ বিড়াল।

বাদশাহ রেগে মেগে বলল:কুতুবুদ্দিন খা (কুকুর) কো লেলা দো।(কুতুবুউদ্দিন খা অর্থাৎ কুকুরকে ওর পিছনে পাঠিয়ে দাও।)

দরবারের সবাই বাদশাহ আর বার্বুচির কথা শুনেত অবাক।বাব্বাহ কত বড় বাদশাহ তার কুচ মহল আছে। আবার কুচ মহল পাহারা দেওয়ার জন্য সেনাপতি কুতুবুদ্দিন খা ও আছে। এমন বাদশার দরবারে বসতে পেরে সবাই নিজেকে নিয়ে গর্বিত বোধ করতে লাগল।

৪৮২জন ৪৮২জন
0 Shares

২১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ