মাই হিরোইন নং ৩

ইমন ২৬ আগস্ট ২০১৫, বুধবার, ০৭:৪১:৩১অপরাহ্ন বিবিধ ২২ মন্তব্য

ভাবিকে প্রথম যেদিন আমি দেখি সেদিনটা বৈশাখ মাষের কোনো একদিন ছিলো।
ক্লাস টু-তে পড়তাম যতোদূর মনে হচ্ছে।
আমাদের বাড়ির ঠিক বাইরে বিশাল বড় এক গাব গাছ ছিলো। গ্রামের সবাই সেই গাব গাছের শিকরে বসে শরীর জুড়াতো।
বিকালের দিকে আমাদের মতো কেরছা(কচি) পোলাপাইন গাছে উঠে গাব ফল পারতাম।
তো সেদিন বিকালে আমি সহো চাচাতো দুই ভাই গাছে উঠেছি। আস্তে আস্তে উপরে উঠতেছি। আমি তখন কেবল নতুন গাছে উঠা শিখেছি। তেমন পটুনা।
কৈশুরের জোশে অনেক উপরে উঠে গেলাম।
হঠাত্ত খেয়াল হল আমি অনেক উপরে উঠে গেছি। ভয় ডুকে গেলো মনের ভিতরে। চাচাতো ভাইরা বললো যেভাবে উঠেছিস আস্তে আস্তে সেভাবে নেমে যা।
এদিকে আমার হাত পা ঠক ঠক করে কাপতেছে। ভয়ে কেদে দিলাম।
ভাই দুটা কাছে আসলো । খুব কাছে এসে হাত ধরে নামাইতে চাইলো । কিন্তু আমার পা চলেনা।
মানুষ জরো হয়ে গেলো। মা আসলো । গ্রামের দুই জন চাচা টাইপের লোক উঠলো আমাকে নামানুর জন্য। আমি কোনো ভাবেই তাদের হাত ধরে নামার সাহস পেলাম না।

হঠাত, একজন মহিলা নিচে থেকে বলতেছে, ” এই ছেড়া! ডরাইস না। খারা আমি আইতাছি।
তাকিয়ে দেখি কালো কুচ কুচে এক মহিলা পুরুষ মানুষের মতো কাপড় নেংটি দিয়ে গাছে উঠতাছে।
সবাই বলতাছে ” আরে রে ! এই বাসুর মা(ভাবির বড় ছেলের নাম বাসু ছিলো) তুই কি করস! আয় সব্বনাশ ! তুই পাগল হয়ে গেছস !”
মহিলা ধিপ ধিপ করে গাছে উঠে চলেছে। আর বলতাছে ” মাছুম পুলাডা পইরাতো মরবো ! ”

মা তখন থেকে কেদেই যাচ্ছে । আর বলতেছে ” বাবা ! নরিস না। শক্ত কইরা ঢাইল ধইরা থাক। ”
আমার এখনো স্পষ্ট খেয়াল আছে, আমি ভয়ে আল্লাহ আল্লাহ করতেছিলাম!
আমার খালি মনে হচ্ছিলো ,” আমার কিছু হইলে মায় খুব কষ্টো পাইবো । ”
আল্লাহর কাছে বিরবির করে বলতেছিলাম, ” আল্লাহ মায় কষ্ট পাইবো ! মায় কষ্ট পাইবো ! মায় অনেক কানবো! ”

বাসুর মা (ভাবি) আমার কাছে চলে এসেছে। হাত বাড়াইছে সামনে ধরার জন্য।
আমি কোনো মতেই হাত সামনে বাড়াইতে পারতেছিনা। ভয়ে আমার হাতই নড়তেছেনা।
ভাবি বলতেছে ” বাবা না ভালো হাতটা ধর আমার !ধর হাত,তুই পরতিনা। আমি আছিনা ! আয় আয় বাবা ধর হাতটা!”
আমি পারছিনা কোনো ভাবেই। কেদেই যাচ্ছি… আর বিরবির করে যাচ্ছি ” আল্লাহ বাচাও ! আল্লাহ বাচাও মায় কান্তাছে ! আল্লাহ মইরা যামুগা! …”

ভাবী কইলো ” তুই নরিছ না। আমি তর ডাইলে আইতাছি। ”
ভাবি আস্তে আস্তে আমার ডালে আসলো । এসে আমার সামনে ঝুকে ডালে বসে পরলো ।
বললো ” তুই আমার পিডে উঠ । আমি তরে আস্তে আস্তে নামতাছি। ভয় পাইসনা। তর কিচ্ছু অইবোনা। ”

আমি ঢাল ছেড়ে কোনো ভাবেই ভাবির কাধে যেতে পারছিনা। আমার হাত ঢাল থেকে উঠাতেই পারছিনা ভয়ে।
সবাই বলতেছে , কিচ্ছু হবেনা , আমি পরবো না। কিন্তু আমি ভরষা পাচ্ছিনা।
এদিকে মা মা করে কেদেই যাচ্ছি।
মাও কাদতেছে।

ভাবি কইলো , ” ভাই না ভালা, তুই আমার কান্দে উঠ ! দেহসনা, তর মায় কান্তাছে ! আয় ভাই আমার কান্দে উঠ। ”
মা কান্তাছে বলার পরে , আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। মা নিচে থকে বললো ” বাবা ওডো ! ওডো বাবা, কিচ্ছু হইতো না !

অনেক সাহস করে শুধু মার কাছে যেতে পারবো ভাইবা , একটা হাত ঢাল থেকে ছাড়লাম।
একটু পর আরেকটা হাত ও ছেড়ে ভাবির কাধে হাত দিলাম। আস্তে আস্তে ভাবিকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলাম।

ভাবি আস্তে আস্তে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে আমাকে নিয়ে নামছে।
আমার তখন কেবলি মনে হচ্ছিলো ” আল্লাহ তারাতারি নামাও ! তারাতারি নামাও! ”

কিছুক্ষন পরেই, মাটির খুব কাছে চলে আসলাম। নিচে দেখি মা হাত বারাইয়া আছে।
দিলাম কুলে লাফ! তিন জনেই (মা, ভাবি ,আমি) মাটিতে পরে গেলাম।
মা ছেলের সে কান্না আর দেখে কে 🙂 পূরাই সিনামার মতো ।

তখনো আমি নায়িকা বলতে বুঝতাম ” কালো পোশাক পরা নায়িকা নূতন বা চম্পাকে ” !
কিন্তু সেদিন আমি যার পিঠে করে নেমেছিলাম সেই ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে স্পেশাল নায়িকা, আমার শিক্ষক, জ়ীবনের অনেক গূর সত্যি-মিথ্যার পরিচায়ক, অনেকদিনের অনেক বিকেলের আলাপের বন্ধু ।

ভাবি, এই ঘটণার জন্য শুধু আমার নায়িকা না।
ভাবি, আমার কাছে নায়িকা এই কারণে ছিলো, যে উনি খুব শান্তির ছিলেন। যে কেও যেকোনো সমস্যায় উনার কাছে গিয়ে বসে গল্প করে আসতো। উনার পাশে বসে দুঃখের কথা বলে কেদে আসতো ।
উনার কাওকে কোনো কিছু দিয়ে সাহায্য করার সামর্থ্য ছিলোনা।
যেটা ছিলো সেটা হচ্ছে ,ভালোবাসা 🙂 সাহস আর নির্ভয়বানী।

বলতো ” আরে ধুর কিচ্ছু হইতো না । আরে চিন্তা করিস না , আইসা পরবো” । বা ” আরে চিন্তা কইরনা , তুফানে কিচ্ছু হইতোনা” ।
মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়া কে কেমন আছে খুজ খবর নিতো।
কারো গলায় মাছের কাটা বিধলে ভাবির কাছে গেলে, বলতো ” আরে ধুর ! মাছের কাডায় মানুষ মরে ! আয় গলায় ফু দিয়া দেই”
ব্যাস 🙂 হয়ে গেলো। 🙂

ভাবি ভীষণ কালো ছিলো। সমাজের প্রথাগত নিয়মে চেহারা খারাপ।
কিন্তু এখনো আমি স্পষ্টো দেখতে পাই , ১০ বছর আগে বাসুর মা যেমন রূপবতী ছিলো, তেমন এখনো আমার চোখে পরেনি।
ভাবি অনেক লম্বা ,ছিপছিপে গড়নের ছিলো। গা বেয়ে যাকে গ্রামের ভাষায় বলে ” রুপ বাইয়া পড়তো…। 🙂

যখন ইচড়ে পাকা হয়ে গেলাম। ভাবিকে জিজ্ঞেস করলাম ” ভাবি আপনি কি কবিরাজ নাকি ? আপনার কাছে জ্বর হলে মানুষ আসে, গলায় কাটা বিধলে মানুষ আসে? ঘটণা কি ? ”
জবাবে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা পেলাম ভাবির কাছ থেকে।
বললো ” ধুর ছেমরা ! আমি কি ঝার ফুক জানি নাকি ! নামায রোযা-ই করিনা ঠিক্মতো, আমার কথা আল্লায় কি হুনবো ?
হুন ছেমড়া, বিফদের সময় মাইনষেরে টেহা দিয়া বিফদ উদ্ধার করা যায়না। ভালোবাইস্যা সাহস দিলেই হয়। ভরষা দিলেই হয়। মনের জোর হইছে বড় জোড়। মাইনষে মনে জোড় পাইলে শান্তি পায়। শান্তি-ই হচ্ছে আসল জিনিষ। শান্তি টেহা পয়সা দিয়া পাওয়া যায়না। ” ……

পড়া শুনা কিছুই করেনি।
হাতে সবসময় বিড়ি থাকতো ভাবির। আর বুকে জমা থাকতো মানুষের জন্য সাহস, ভালোবাসা আর শান্তি”
মানুষ শান্তি পেতো ভাবির দুয়ারে দু-দন্ড বসে।
ভাবি মানুষ্কে শান্তি দিতে দিতে গতো ১২ তারিখে না ফেরার দেশে চলে গেলো।
আমি ভাবিকে শেষ দেখা দেখতে পারিনি।

আর লিখতে পাড়তেছিনা…। আমার হাত কাপছে ভিষণ। কানে বাজতেছে ” এই ছেড়া হাতটা ধর”!!…।।

[[ বাসুর মা। আমার ভাবির জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ জেনো ভাবিকে বেহেশত নসিব করে।
শান্তিতে রাখে। ]]

৫১৯জন ৫১৯জন
0 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ