সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

ঘটনার ঘনঘটায় যে ঘটনা নিয়ে ল্যাখক আজ লিখতে বসেছে সে প্যারাময় ঘটনার সূত্রপাত এই মে’ মাসের প্রথম বৃহঃস্পতিবার বিকাল পাঁচটায় শুরু হয়েছিল। সোনেলা’র জনপ্রিয় ধারাবাহিক আয়না’য় সেদিনের পর্বে ব্লগার প্রহেলিকাকে দাঁড় করানোর নিমিত্তে একটি পোষ্ট লিখতে হবে এই ভাবনা গত পনেরো দিন থেকে ল্যাখকের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে অবিরত।

প্রহেলিকার সাথে ল্যাখকের পরিচয় ব্যক্তিগতভাবে নয়, অনলাইনেই যৎসামান্য হাই হ্যালো আর কিছু কথা চালাচালিতেই সীমাবদ্ধ। এমন অবস্থায় ক্ষুরধার লেখক প্রহেলিকাকে নিয়ে কিছু লেখা, সে কি যা তা কম্ম? পুরাই শীলপাট্টা!

কি লিখবে আর কি লিখবেনা ভাবতে ভাবতেই সেই কাঙ্ক্ষিত দিন এসে ল্যাখকের দরজায় কড়া নাড়লো। সেদিন দুপুরে সোনেলার প্রধান মডু কর্কশ ঘন্টা বাজিয়ে এলান করে দিলেন, বৃহস্পতিবার ঠিক রাত বারোটায় দিতেই হবে পোষ্ট।

এদিকে ল্যাখক স্বার্থক গোপন অভিসারের মৌনতৃপ্তি প্রাপ্তির মতই চিন্তা করেছিল নিজের পোষ্টে নিজেই প্রথম সফল মন্তব্যকারী হবে। কিন্তু সে চিন্তা যে আপাতঃদৃষ্টিতে আশায় গুড়েবালি হবে তা ল্যাখক ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। প্রহেলিকাকে প্রথম মন্তব্য করা থেকে নিবৃত করা চাট্টিখানি কথা নয়। পোষ্টদাতা হিসেবে ল্যাখকের ভাবখানা এমন ছিল – প্রহেলিকা যতই ঘুড়ি হয়ে ফুর ফুর করে উড়ুক, আজ এ যাত্রায় সুতাখানি ধরে থাকবে ল্যাখক নিজের হাতে। সুতা ছেঁড়ে দিলেই প্রহেলিকা প্রথম মন্তব্যকারী হয়ে আবারো মেডেল গলায় ঝুলাবে নিশ্চিত। তাই ল্যাখক ঘুড়ির সুতায় যত্ন করে মাঞ্জা মেরে রেখেছিল যাতে ঘুড়িখানি উড়ে না যায়।

প্রহেলিকাকে আয়নায় কিভাবে সাজানো যায় সেসব চিন্তা মনের খসরা খাতার পাতায় সেদিন সকাল থেকেই সাজিয়ে রেখেছে ল্যাখক। কম্পিউটার নাই, ল্যাপটপ নষ্ট। লেখার একমাত্র সঙ্গী নিজের মোবাইলটি হাতে নিতেই এমারজেন্সি রিংটোন এম্বুলেন্স সাইরেনের মত বেজে উঠলো। অপরপ্রান্তে কলদাতা অতীব বিনয়ের সাথে যা আবদার করলো ল্যাখকের বাপেরও সাধ্য ছিলোনা সেটাকে পাশ কাটানোর। আজ বুঝি ঘরে অশান্তি নিশ্চিত। সেই আবদার মেটাতে মেটাতে বাজলো রাত আটটা ত্রিশ মিনিট। ল্যাখক ভাবে, যাক এখন তাহলে লিখতে বসি। কিভাবে কি লিখবো না লিখবো এসব সাজাতে গুছাতেই রাত্রি বাজে গেলো নয়টা।

আয়নার পোস্টের জন্য ছবি লাগবে প্রহেলিকার। ইনবক্স করতে হবে প্রহেলিকাকে। বড় লেখক সে, তার কি ভাব! নিজেওতো পারতো ল্যাখককে ঝকঝকে একটা ছবি ইনবক্স করতে? প্রবাসী প্রহেলিকার দেশে এখন রাত, তিনি গভীর ঘুমে কবিতা লেখার স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু তার ছবি যে অত্যাবশ্যকীয়। ল্যাখক প্রহেলিকার ছবি এখন খুঁজবে কার কাছে? সব দ্বায়ভার যেন ল্যাখকের, হুহ!

এদিকে ল্যাখক ইন্টারনেট চালু করতে পারছেনা কিছুতেই। নেট বন্ধ, থ্রি জি নাই। নেটওয়ার্ক টু জি মুডে নিয়ে আসার পরেও কোনরকম কাজ হচ্ছেনা দেখে ল্যাখক ভাবে এটা ব্রাউজারের সমস্যা। ক্যাশ মেমরি, ব্রাউজার ইতিহাস সব ফাঁকা করার পর বাইম মাছ ধরার মত পিচ্ছিল ভাব নিয়ে নেট আসাযাওয়া করতে থাকলো ল্যাখকের মোবাইলে।

প্রহেলিকাকে ইনবক্স করার পর অনেক টালবাহানার করে তিনি দিলেন একযুগ আগের সাদাকালো একটা ছবি। তাও কবেকার? ক্লাস এইট নাইনের ছাত্র থাকাকালীন সময়কার! এইটা কিছু হলো? এই লোক দেখি বড্ড মনুষ্যবিমুখ।

হবেনা, এসব চলবেনা – ল্যাখকের এমন ঝাড়িঝুড়ির পরে দায়সারা ভাব নিয়ে তিনি দিলেন আর একখান ছবি। সে ছবিও খুলতে সময় লাগলো পাক্কা পনেরো মিনিট। নেটওয়ার্ক স্বল্পতার জন্য সেটাও আর দেখা যাচ্ছেনা মোবাইলে। অবশেষে যখন দেখা গেলো- আরে! এও যে সেই কৈশরে খিঁচানো ছবি! নায়ক নায়ক ভাব। কি করি তবে? যাক তাই সই। ল্যাখক ভাবলো ছবি নিয়ে পরে মাথা ঘামানো যাবে, আগে লেখা শেষ করি।

কিন্তু নেটের এই অবস্থা থাকলে আজ আর আয়নায় পোষ্ট দেয়া হবেনা ল্যাখকের। এর মধ্যে বেজে গেছে রাত দশটা। অগত্যা আবার প্রহেলিকাকে ইনবক্স করে ল্যাখক জানালো তার অপারগতার কথা। বড় লেখক হলেও লোকটা আসলে বেশ ভালো মনের। প্রহেলিকার সাহস জাগানিয়া বাণী বিপদে মধুরকন্ঠী শোনালো ল্যাখকের কর্ণকুহরে। সে ভরসা থেকেই ল্যাখক লিখতে বসলো লেখা।

একটু পর পর ঘড়ি দেখছে সে। এই বুঝি সময় এলো! এবার মায়ের চিৎকার! এই এক্ষুনি আগে ভাত খেয়ে যা, কত রাত জাগবো তোর জন্য? ধুর! গোল্লায় যাক ভাত, আগে লেখা শেষ করতে হবে। তাই সেদিকে কর্ণপাত না করে ল্যাখক নিজের লেখায় ব্যস্ত। রাত তখন এগারোটা। ফুড়ুৎ করে সময় উড়ে যাওয়া কাকে বলে ল্যাখক আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।

অর্ধেক লেখা হয়েছে কি হয়নি, আবার নেট চেক করতে গিয়ে ল্যাখক দ্যাখে মোবাইল হ্যাঙ করেছে তার। ব্যাটারি খুলে আবার লাগালো সে, এবার মোবাইলই অন হচ্ছেনা। আবার ব্যাটারি খুলে আবার লাগালো, এবারো হয়না। মোবাইলটা বুঝি গেলো। নাহ্! একটা ভালো মোবাইল ল্যাখককে কেউ গিফটাইলোনা অদ্যবদি। আজকাল গিফট দেয়ার মতন ভালো মনের বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।

হঠাৎ এগারোটা বেজে বিশ মিনিটে ক্ষীণ বাজখাই কন্ঠে কোথা থেকে যেন বেজে উঠলো সেই সাইরেন!
– ভাত না খেলে কিন্তু সব ফ্রীজে রাখলাম? অগত্যা সেই সাইরেনের ধ্বনি লেখক আবারো উপেক্ষা করতে পারলোনা। হায় ইশ্বর! আজ বুঝি মান সোলেমান সবই হারাতে হয়? কখন লিখবে আর কখন পোস্ট দেবে ল্যাখক?

নাকে মুখে পাঁচ মিনিটেই রাতের খাবার গলাধঃকরণ করে মোবাইল হাতে নিয়ে দোয়া দরুদ যত জানা ছিলো সব মনে মনে আওড়াতে থাকে ল্যাখক। শেষবারের মত অন করে সে নিজের মোবাইলটাকে। উহ! হয়েছে এবার। বড্ড প্যারা গেলো এতক্ষন। কিন্তু নেটওয়ার্ক যে নেই তো নেই ই।

কি করবে না করবে এসব ভাবতে ভাবতেই সময় তখন রাত এগারোটা বেজে পঞ্চাশ মিনিট। ল্যাখকের লেখা শেষ, এইবার ব্লগে যাবার পালা। কিন্তু নেট নেই, নেই নেই নেই। বুকে শুরু হলো হাতুড়িপেটা। মডুদের কাউকে লেখাটি পাঠিয়ে দিয়ে পোষ্ট দিতে বলার সময়ওতো আর হাতে নেই। কি হবে এবার? নিশ্চিত সবাই মোবাইল হাতে নিয়ে বসে আছে বারোটা বাজার অপেক্ষায়।

ল্যাখকের কল্পনায় ভেসে উঠছে প্রহেলিকার কর্মকাণ্ডগুলি ,কত আশা নিয়ে তিনি বারবার রিফ্রেশ মারছেন ব্লগের ওয়েবসাইট পেজটিকে তা ভাবনায় আসতেই হাসি পেলো ল্যাখকের। এই লেখা এল বলে! প্রহেলিকা প্রথম মন্তব্যকারী হবেই হবেন আজ আয়নায়!

এদিকে ল্যাখকের প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়। এগারোটা আটান্ন বাজে। টু জি দিয়েই প্রায় দশ মিনিট আগে সোনেলার মূল পাতায় লগইন করেছে সে। কিন্তু নেটওয়ার্ক ঘুরছেতো ঘুরছেই।

রাত বারোটা বেজে গেলো। ধুর! কি হবে হবে, এই ভাবনা থেকেই ল্যাখক আয়নায় লেখাটি পোষ্ট করে প্রকাশিত বাটন চেপে দিয়েছে। অবশেষে সফলতা হাতে নিয়ে “আপনার লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে”- এটি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে করতে ঘড়িতে তখন বাজলো রাত বারোটা দুই মিনিট। খানিক দেরী হওয়ায় লজ্জা পেল ল্যাখক।

এবার মন্তব্যে করার পালা। ল্যাখককে প্রথম মন্তব্যকারী আজ হতেই হবে। নিজের পোষ্ট বলে কথা। নাহ্, কেউ মন্তব্য করেনিতো। মন্তব্যের ঘর সব ফাঁকা!

যাক, তাহলে ল্যাখকই প্রথম মন্তব্য করে মেডেলধারী হবে আজ। কিন্তু হায়! সব আশাকে জলাঞ্জলি দিয়ে ল্যাখক করুণ চোখে তাকিয়ে দেখে প্রহেলিকাই প্রথম মন্তব্য করে মেডেলখানিকে আবার নিজের বগলদাবা করে ফেলেছেন।

নাহ! মেডেল এবারেও আর পাওয়া হলোনা ল্যাখকের। ইচ্ছেডানা মেলে ল্যাখকের মাঞ্জাদেওয়া সুতোখানি ছিঁড়ে ব্লগের আকাশে প্রহেলিকা ঠিকই উড়ে চলেছেন তার আপন গতিতে।

বিরস বদনে ল্যাখক নিজের মোবাইল ঘুঁতাঘুঁতি করছে। টুঁট টুঁট শব্দে বারোটা তিন মিনিটে মোবাইল অপারেটর থেকে এসএমএস আসলো- আপনার নেটওয়ার্ক এখন অক্কে। সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা দুঃখিত!

এই এসএমএস দেখে ল্যাখক সেদিন বিকেল পাঁচটায় শুরু হওয়া গত সাত ঘন্টার মানসিক ধকল মাথায় নিয়ে হাসবে নাকি কাঁদবে সে চিন্তায় ঠায় হয়ে বসেছিল পাক্কা বিশ মিনিট। বড় শান্তনা, সেদিন এত এত প্যারাময় মাইনক্যাচিপার পরেও সফলভাবে পোষ্ট দেবার জন্য পাঠক মনে হয়তো কিঞ্চিত জায়গা করতে পেরেছে ল্যাখক !!

কি জানি? আদৌ পেরেছে কি?

৩৯২জন ১৯৪জন
25 Shares

৩০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য