ঊর্দ্ধশির যদি তুমি কুল মান ধনে;
করিও না ঘৃণা তবু নীচশির জনে!

সংসারে ছোট বড় ব্যবধান সৃষ্টিকর্তা বিধিত। আপাত দৃষ্টিতে আমরা যদিও সৃষ্টির এই বিভেদের পার্থক্য অনুধাবন করতে না পারি তবুও এই ব্যবধানের পেছনে একটা নিগুঢ় রহস্য তো অবশ্যই আছে। মানুষ সৃষ্টি রহস্যের ঠিক ততখানিই জানে যতোটা মানুষ ক্যারি করার ক্ষমতা রাখে। এর বেশি জানতে গেলে মানুষ তখন আর স্বাভাবিক থাকতে পারে না। তখন হয়তো সে অতিমানব নতুবা অমানুষ হয়ে যায়। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর রসাল ও স্বর্ণ-লতিকা কবিতায় সমামাজের উঁচু নীচু দুই শ্রেণীর মানুষকে যে সৌহার্দ্যের আহ্বান জানিয়েছেন উপরের লাইন দুটোতে সেটাই প্রতীয়মান হয়।

যুগে যুগে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে যে কয়েকজন মানুষের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে তাদের একজন মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। বৃটিশ ভারতের যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদী তীরবর্তী সাগরদাঁড়ি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও যৌবনে তিনি পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে প্রলুব্ধ হয়ে ইংরেজি সাহিত্যে খ্যাতি অর্জনের মোহে ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেন।

পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী। পিতার অবর্তমানে মাতা জাহ্নবীর তত্বাবধানে সাগরদাঁড়ি গ্রামের স্কুলেই তার শিক্ষা জীবনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে তিনি কলকাতার হিন্দু কলেজে স্থানান্তরিত হন। সেখানেই তিনি ইংরেজি, সংস্কৃত ও ফারসী ভাষা শেখেন।

হিন্দু কলেজে অধ্যায়ন কালেই মধূসুদন দত্তের কবি প্রতিভা বিকাশ লাভ করে। ১৮৪৩ সালের ৯ ই ফেব্রুয়ারি ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নামের আগে “মাইকেল” লিখতে শুরু করেন। যে কারণে তিনি হিন্দু কলেজে আর পড়াশোনা করতে পারেন নি।

এ সময় ধর্মান্তরের কারণে মধুসূদন তাঁর আত্মীয়স্বজনদের নিকট থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তাঁর পিতাও এক সময় অর্থ পাঠানো বন্ধ করে দেন। অগত্যা মধুসূদন ভাগ্যান্বেষণে ১৮৪৮ সালে মাদ্রাজ গমন করেন। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। প্রথমে মাদ্রাজ মেইল অরফ্যান অ্যাসাইলাম স্কুলে এবং পরে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন।

মাদ্রাজে অবস্থানকালেই Timothy Penpoem ছদ্মনামে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ The Captive Ladie (১৮৪৮) এবং দ্বিতীয় গ্রন্থ Visions of the Past প্রকাশিত হয়। রেবেকা ও হেনরিয়েটার সঙ্গে তাঁর যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় বিবাহ সংঘটিত হয় এখানেই। মাদ্রাজে বসেই তিনি হিব্রু, ফরাসি, জার্মান, ইটালিয়ান, তামিল ও তেলেগু ভাষায় জ্ঞান লাভ করেন।

১৮৫৮ সালে মহাভারতের দেবযানী-যযাতি কাহিনী অবলম্বনে তাঁর লেখা নাটক “শর্মিষ্ঠা” বাংলা সাহিত্যের প্রথম মৌলিক নাটক। যার সূত্র ধরে মধূসুদনই বাংলা সাহিত্যের প্রথম সফল নাট্যকার।

১৮৬০ সালে তিনি গ্রীক পুরাণ থেকে কাহিনী নিয়ে রচনা করেন পদ্মাবতী নাটক। এ নাটকেই তিনি পরীক্ষামূলকভাবে ইংরেজি কাব্যের অনুকরণে অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন। বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহার এটাই প্রথম যে কারণে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে বাংলা সাহিত্যের অমিত্রাক্ষর ছন্দের জনক ও বলা হয়ে থাকে।

বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহারের এই সফলতা তাঁকে ভীষণভাবে উৎসাহিত করে এবং একই ছন্দে একই বছর তিনি রচনা করেন “তিলোত্তমাসম্ভব” কাব্যগ্রন্থ।

নানান চড়াই উৎরাই পেরিয়ে অবশেষে ১৮৬১ সালে রামায়নের কাহিনী নিয়ে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রয়োগ করে তিনি রচনা করেন তার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র “মেঘনাদবধ”। বলা হয়ে থাকে মধূসুদনের জীবনে আর কোন লেখা না থাকলেও এই একটিমাত্র মহাকাব্যের মাধ্যমে মধূসুদন মহাকবির উপাধি লাভ করতেন।

১৮৬২ সালের ৯ জুন মধুসূদন ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে বিলেতে গমন করেন এবং ইংল্যান্ডের গ্রেজ-ইন-এ যোগদান করেন। সেখান থেকে ১৮৬৩ সালে তিনি প্যারিস হয়ে ভার্সাই নগরীতে যান এবং সেখানে প্রায় দুবছর অবস্থান করেন।

ভার্সাই নগরীতে অবস্থানকালে তাঁর জীবনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। এখানে বসেই তিনি ইতালীর কবি পেত্রার্কের অনুকরণে বাংলায় চতুর্দশপদী কবিতা সনেট লিখতে শুরু করেন। বাংলা ভাষায় এটিও এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। এর আগে বাংলা ভাষায় সনেটের প্রচলনই ছিল না।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো ভার্সাই নগরীতে থেকেই তিনি যেন মাতৃভূমি ও মাতৃভাষাকে নতুনভাবে এবং একান্ত আপনভাবে দেখতে ও বুঝতে পারেন, যার চমৎকার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর ‘বঙ্গভাষা’, ও ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতায়। সেখানে বসেই কবি লেখেন-

“সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে-
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে”

ভার্সাই নগরীতে দুবছর থাকার পর মধুসূদন ১৮৬৫ সালে পুনরায় ইংল্যান্ড যান এবং ১৮৬৬ সালে গ্রেজ-ইন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন। ১৮৬৭ সালের ৫ জানুয়ারি দেশে ফিরে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসায় যোগ দেন।

জমিদার বংশে জন্মগ্রহণ করলেও মহাকবি মধূসুদনের জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে খুব অসহায় ভাবে। ঋণের দায়, অর্থাভাব, অসুস্থতা, চিকিৎসাহীনতা ইত্যাদি কারণে তাঁর জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। লোক মুখে শোনা যায় মধূসুদন কাউকে দান করলে কখনো গুণে দিতেন না, সেই মধূসুদনই তাঁর অমিতব্যয়ী স্বভাবের জন্য জীবনের শেষ দিনগুলোতে প্রচন্ড অর্থাভাবে কাটান।

স্ত্রী হেনরিয়েটার মৃত্যুর তিনদিন পরে ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন বাংলার এই মহাকবির মহাপ্রয়াণ ঘটে।

আজ ২৫শে জানুয়ারি মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৬তম জন্মবার্ষিকী। জন্মদিনে কবির প্রতি রইলো সোনেলা ব্লগ পরিবারের পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা।

২৮৬জন ৮০জন
70 Shares

২৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য